রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ ও জনআকাঙ্ক্ষার আলোকে স্থানীয় সরকার সংস্কার’ শীর্ষক এক জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। দি এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরাম ২৮ সেপ্টেম্বর এ সংলাপের আয়োজন করে। মিডিয়া পার্টনার ছিল বণিক বার্তা। গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরামের সমন্বয়কারী ও ওয়েভ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলীর সঞ্চালনায় এতে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এ. এফ. হাসান আরিফ। সংলাপে ২২টি সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম

মহসিন আলী

স্থানীয় সরকারকে কার্যকর করতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা দৃঢ় হতে হবে। স্বাধীনতার পর থেকে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হলেও দুর্নীতি ও স্বেচ্ছচারিতার কারণে সেগুলো কার্যকর হয়নি। আমাদের স্থানীয় প্রতিনিধিরা দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য ব্যতিব্যস্ত থাকেন, পক্ষান্তরে জনআকাঙ্ক্ষার বিষয়গুলো পেছনে পড়ে যায়। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সক্ষমতার বিকাশ ঘটিয়ে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো দরকার। তবেই জনআকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার সংস্কার কার্যক্রম ফলপ্রসূ হবে। উল্লেখ্য, স্থানীয় সরকারে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে নারীর ক্ষমতায়নের প্রস্তাব দিলেও তা হয়নি। স্থানীয় সরকারের বাজেটের একটা অংশ চলে যায় সংসদ সদস্যদের কাছে। স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে যে ধরনের চেষ্টা ও সামর্থ্য থাকা উচিত, তা অনুপস্থিত। জেলা প্রশাসক পদের নাম জেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ডেপুটি কমিশনার কিংবা অন্যকিছু হতে পারে। জেলা পরিষদ হবে জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। একটি টাস্কফোর্স গঠন করে এসব নির্ধারণ করতে হবে।

ড. মোবাশ্বের মোনেম

বাংলাদেশের সংবিধানে ১১, ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত কয়েকটি সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এ অনুচ্ছেদগুলোতে বলা হয়েছে, প্রশাসনের সব স্তরে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার থাকবে এবং এ সব প্রতিষ্ঠানকে যথেষ্ট ক্ষমতা, বিশেষত আর্থিক ক্ষমতা দিতে হবে। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত যতগুলো পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল এবং যত ধরনের গবেষণা করা হয়েছিল, তা পর্যালোচনা করে দেখেছি যে, নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার কোনো কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। কারণ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় সাবসিডিয়ারি প্রিন্সিপালের মাধ্যমে ছোট স্তরেও কাজ করতে দেয়া হয়নি। পর্যাপ্ত জনবল এবং ফাইন্যান্সও দেয়া হয়নি। ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স করা হলেও কোনো অফিসার সেখানে বসেন না। ১৩টি স্ট্যান্ডিং কমিটি ও ওয়ার্ড সভা করার বিধান থাকলেও তা করা হয় না। রিজার্ভ সিটে যে মহিলা প্রতিনিধি রয়েছেন, তাদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হয়।

অমিত রঞ্জন দে

নির্বাচন ব্যবস্থাকে সংস্কার করা ছাড়া স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ঠিক করা যাবে না। নির্বাচন না হওয়ায় প্রতিনিধিরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ হচ্ছে না। স্থানীয় সরকারের বাজেট প্রকাশ করা হয় কিন্তু সে বাজেট বাস্তবায়ন হয় কিনা সেটা দেখার কেউ নেই। জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থায় সংস্কার আনা জরুরি। দ্বিতীয়ত, একজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা বড় কোনো চাকরিজীবী গ্রামে গিয়ে থাকেন না। এর কারণ হচ্ছে তার পরিবার নিয়ে তিনি সেখানে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পান না। তাই স্থানীয় পর্যায়ের অবকাঠামো উন্নয়নে নজর দেয়া দরকার।

আব্দুল আউয়াল

এখন একটি মৌলিক রূপান্তরের সময় এসেছে। বিকেন্দ্রীকরণের ক্ষেত্রে একটি রাজনৈতিক কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তাব এখানে এসেছে। স্থানীয় সরকারের মাঝে যে গতানুগতিক ধারণাগুলো রয়েছে, সেগুলোর ডিকলোনাইজেশন প্রয়োজন। শুধু কাঠামো এবং প্রক্রিয়াগত সংস্কার নয়, আরো অনেক সংস্কার প্রয়োজন। জেলা পরিষদ রেখে কী লাভ যদি তা কাজেই না লাগে। সুতরাং এই তিন স্তরে কে কী কাজ করবে, তার প্রস্তাব এই সংলাপ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বের করে আনা দরকার।

উম্মে ফারিহা নানজীবা

একটি ইউনিয়ন পরিষদে তিন ওয়ার্ড মিলে একজন নারী সদস্য থাকেন। ফলে তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো কাজ থাকে না। আবার সংরক্ষিত আসনের কারণে যথাযথ মর্যাদা পান না। ফলে নারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। ফলে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ইউনিয়ন পরিষদের বাজেট ও পরিকল্পনায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। স্ট্যান্ডিং কমিটিগুলোতে ইয়ুথদের প্রাধান্য দিতে হবে।

লামিয়া আফরোজ রিহা

স্থানীয় পর্যায়ের নারীরা শিক্ষা ও কাজের জন্য ঢাকামুখী হন। এক্ষেত্রে যদি তাদের প্রয়োজনটা এলাকায়ই করা যায় তাহলে তারা ভালো করতে পারবেন। স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে তাদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।

এ. এফ. হাসান আরিফ

স্থানীয় সরকারের বিষয়ে উপমহাদেশে সবচেয়ে বেশি সচেতন বাংলাদেশের মানুষ। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ডিস্ট্রিক্ট অ্যাক্ট ছিল, ১৮৮২ সালে প্রণীত হয়েছিল লোকাল সেল্ফ গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট। তার মানে ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন নামে স্থানীয় সরকারের কাঠামো চালু থাকলেও এখনো আমরা এ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তুলতে পারিনি। যেকোনো সংস্কারের দাবিই নির্বাচিত সরকারের কাছে হওয়া উচিত। অন্তর্বর্তী সরকার একটি সংস্কার করলে পরবর্তী সময়ে তা যে অব্যাহত থাকবে, সেটার নিশ্চয়তা শুধু নির্বাচিত সরকারই দিতে পারে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ও আইন কার্যকর করতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা দৃঢ় হতে হবে, রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নির্বাচন দলীয় নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে হবে। তবেই জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে। ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের জন্য আমাদের সভা-সেমিনারগুলোকেও ঢাকার বাইরে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।

আব্দুল্লাহ আল নোমান

আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় সবার অভিযোগের তীর থাকে জনপ্রশাসনের দিকে। জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের এসিআর (বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন) লেখা আর প্রশাসকের কার্যালয় তথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়কে স্থানীয় সরকার বিভাগের কার্যালয়ে রূপান্তর করা—এভাবে গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব নয়। গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের জন্য জনপ্রশাসন এবং স্থানীয় সরকারকে পুরোপুরি আলাদা করতে হবে। আমাদেরকে সম্পূর্ণ স্বাধীন স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গঠন করতে হবে।

স্বপন কুমার সরকার

বিকেন্দ্রীকরণ করতে চাইলে প্রথমে নির্বাচনটাকে সুষ্ঠু করতে হবে। স্থানীয় সরকারে নির্দলীয় নির্বাচন পদ্ধতিটা চালু করা উচিত। স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে করা গেলে জাতীয় নির্বাচন অপেক্ষাকৃত সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব হবে।

আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়েও আমাদের ভাববার দরকার আছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে যে টাকা দেয়া হয়, সেখানে সঠিক কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় না। এখানে সুনির্দিষ্ট সূচক নির্ধারণ করা উচিত। একটা সাধারণ তহবিল ও একটি কর্মসম্পাদন তহবিল থাকা দরকার। দেখতে হবে, যে টাকাটা বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে, সেটা সঠিকভাব অডিট হচ্ছে কিনা! বর্তমানে কেন্দ্রীয়ভাবে সরকারের অডিট বিভাগ স্থানীয় সরকারের ৫ শতাংশও অডিট করতে পারে না।

আব্দুস সবুর

একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে প্রশ্ন করেছিলাম, যদি ছুটির প্রয়োজন হয় তাহলে কার কাছে ছুটি নেবেন? তখন তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ইউএনও সাহেবের কাছ থেকে ছুটি নেবেন। সুতরাং স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। স্থানীয় সরকারের দক্ষতার একটা মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি জানেন না কীভাবে একটি মিটিং পরিচালনা করতে হয়। একজন মেয়র জানেন না যে, কোনগুলো হস্তান্তরিত বিভাগ। সেক্ষেত্রে সক্ষমতার জন্য স্থানীয় সরকারকে ঢেলে সাজাতে হবে।

মুনিরা শারমিন

শুধু স্থানীয় সরকারব্যবস্থা নয়, পুরো রাষ্ট্রটাই আইসিইউতে আছে। একটা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপ করার পর একটা সুন্দর রাষ্ট্রগঠনে আমাদের যুদ্ধটা সবে শুরু হয়েছে। স্থানীয় সরকারে শুধু চেয়ারম্যানই মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। সদস্যরা নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত মনে করেন না। সেক্ষেত্রে একটা কাউন্সিল গঠন করা যায় কিনা, যেখানে সবার সমান কর্তৃত্ব থাকবে এবং যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে চক্রাকার পদ্ধতিতে একজনের পর আরেকজন কাউন্সিলের প্রধান হবেন।

আবু হেনা মোরশেদ জামান

আমাদেরকে আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি বিপ্লব চাই নাকি সংস্কার চাই। এরপর সরকারের কাছে গোছানো দাবি জানালে কাজ করা সহজ হবে। বেসামরিক আমলাতন্ত্রকে বাদ দিতে চাইলে বিকল্প ভাবতে হবে। সংস্কারে নাগরিক সমাজ যেমন একটি অংশ, আমলাতন্ত্রকেও এর অংশীজন হিসেবে বিবেচনায় নিতে হবে, প্রান্তিক জনগণের কাছ থেকে প্রস্তাব গ্রহণ করতে হবে। জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সবাইকেই একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রস্তাব হতে হবে পূর্ণাঙ্গ, যা সমঝোতার মাধ্যমে সংস্কার করতে হবে। স্থানীয় সরকার বিভাগ অবশ্যই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে ভূমিকা রাখবে। সকল সংস্কারের লক্ষ্য হতে হবে সুশাসন কায়েম ও জনসেবা নিশ্চিত করা। অন্য সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে হলে সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর মধ্যেও সমন্বয় করতে হবে। অন্যান্য অনেক দেশে যে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা চলছে, এ মুহূর্তে সেটা আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে যাবে কি না, সেটা করতে পারব কিনা, তা ভেবে দেখতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণ করে সেগুলোকে দীর্ঘদিন চলতে দিলে সমাজে এক ধরনের অভ্যস্ততা তৈরি হবে। তখনই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাদের কাজ করতে পারবেন।

ড. ফেরদৌস আরফিনা ওসমান

বিকেন্দ্রীকরণের জন্য দরকার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। সরকারগুলো যে বিকেন্দ্রীকরণ চায় না, এটার প্রমাণ আমরা এরই মধ্যে পেয়েছি। সংসদ সদস্যকে স্থানীয় সরকারের উপদেষ্টা নিয়োগ করা এবং তার উপদেশ গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক করার মধ্য দিয়েই ইঙ্গিত করা হচ্ছে যে, সরকার আসলে বিকেন্দ্রীকরণটা চায় না। দ্বিতীয়ত, আইনে ইউনিয়ন পরিষদে সাতটি এবং উপজেলা পরিষদে ১৭টি দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়েছে। এগুলোকে বিকেন্দ্রীকরণে নামে পুনঃকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে আসলে। স্থানীয় সরকারে যে দপ্তরগুলো আছে, তারা শুধু নিজেদের বিভাগের কাছে জবাবদিহি করছে। তাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কাছে। তখনই সত্যিকারার্থে বিকেন্দ্রীকরণ হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অন্তত একটা বার্ষিক কর্মসম্পাদন প্রতিবেদন লিখুক। যার ভিত্তিতে বিভাগগুলো এসিআর লিখলে কিছুটা হলেও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যাবে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, ওভারল্যাপিং অব ফাংশন। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ে আলাদা আলাদা আইন আছে। কিন্তু একই কাজ দেয়া হয়েছে। পর্যালােচনা করে কাজগুলোকে সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে।

স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প ও দুর্নীতির কথা বলা হচ্ছে। কেন্দ্রীয়ভাবে একটা ডিজিটালাইজ কাঠামো দাঁড় করালে কাজগুলোর পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে। বর্তমান সরকার ছয়টি সংস্কার কমিশন করেছে। স্থানীয় সরকার সংস্কারের জন্যও একটা কমিশন করার দরকার আছে বলে মনে করি।

আমানুর রহমান

আমাদের অনেকের মধ্যে একটু হতাশা আছে যে যুগ যুগ ধরে আলোচনা হচ্ছে; কিন্তু কোনো পরিবর্তন নেই। আমাদের স্থানীয় সরকারের যে স্তর ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন— এর বাইরে কিন্তু আমরা বের হতে পারছি না। জনগণ আসলেই এই কাঠামো আর চায় কি না, তা ভাবা জরুরি। একটা গ্রামের জন্য স্থানীয় সরকারের তিনটি স্তর। সেখানে আমার প্রকৃত প্রতিনিধি কে? ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ নাকি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান? আমি কতবার ভোট দেব? জেলা যদি সমন্বয় করে তাহলে সেখানেও তো নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং অন্যদের নিয়ে একটি অ্যাসেম্বলি হতে পারে। আমাদের ক্যাডার অফিসাররা স্থানীয় পর্যায়ে যেতে চায় না। তাহলে স্থানীয় সরকারের জন্য পৃথক ক্যাডার সার্ভিস প্রস্তাব করা যেতে পারে।

রাউফুন নবী

একটি এলাকার সমস্যাগুলো সম্পর্কে সেই এলাকার মানুষই সবচেয়ে ভালো করে জানে। তাদের নিজস্ব চাহিদা, সমস্যা, এবং সমাধানের উপায় সম্পর্কে তারা আমাদের চেয়ে ভালো বোঝে। যখন কমিউনিটির মানুষ সমস্যার মূল কারণগুলো মোকাবেলা করতে সক্ষম হয় তখন তারা আরো বেশি ক্ষমতায়িত হয় এবং তাদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হতে পারে। এ পদ্ধতি স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আত্মনির্ভরশীলতাকে উৎসাহিত করে এবং তারা বাধ্য হবে কমিউনিটির দাবির প্রতি মনোযোগ দিতে এবং তাদের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হতে।

কাজী ফয়সাল বিন সেরাজ

আমরা এ ধরনের কাজে বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোকে ৭০ বছর ধরে সহায়তা করে আসছি। আজকের এ আয়োজনটিও অনুপ্রেরণামূলক।

বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকার সংস্কার বিষয়ে আরো কী কাজ করা যায়, সে বিষয়ে দি এশিয়া ফাউন্ডেশন আরো ভাবনাচিন্তা করবে। কারণ আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে আমাদের কাজ হচ্ছে অংশীদারদের কথা শোনা এবং তাদের সঙ্গে কাজ করা ও কাজের পরিকল্পনা করা।

তালেয়া রেহমান

উন্নত দেশে সম্পদ কিংবা গ্রামের ভিটামাটি বিক্রি করে শহরে এসে চিকিৎসা করতে হয় না। সেখানে প্রান্তিক পর্যায়ে হাসপাতাল ও অন্যান্য সেবাকেন্দ্র আছে। শুধু স্থানীয় সরকারব্যবস্থা সংস্কার করলে হবে না। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সমাজব্যবস্থা অনেক কিছুই ঠিক করতে হবে। এটা বিরাট কাজ। বাজেট কিংবা ওয়ার্ডসভা, যা-ই হোক না কেন, সবকিছুতেই জনগণকে সংযুক্ত রাখতে হবে। জনসংখ্যা ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করে স্থানীয় সরকারকে বাজেট দিতে হবে।

মো. জিয়াউল করিম

সংবিধানের ১১ নং ধারায় বলা হয়েছে, প্রশাসনের প্রত্যেক অংশ পরিচালিত হবে নির্বাচিত সরকারের অধীনে। কিন্তু আমরা যদি প্রশ্ন তুলি যে বিভাগে কেন আমাদের নির্বাচিত সরকার নেই। এটা কি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক? আবার জেলা প্রশাসনে আমলাতান্ত্রিক কাঠামো বিদ্যমান। উপজেলা পরিষদেও আমলাতন্ত্র মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সংস্কারের সময় এ বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে। স্থানীয় সরকারে দুর্নীতি দেখার দায়িত্ব কার ছিল? স্থানীয় আমলাদের তো প্রশ্নের আওতায় আনা হচ্ছে না যে তারা কয়টি ভিজিট করেছেন বা ভিজিট করে থাকলেও তা প্রকাশ্যে আসছে না। স্থানীয় সরকার দুইভাবে মনিটরিং হতে পারে। এক আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে; দুই জনগণের মাধ্যমে। আমাদের আইনগুলো কিন্তু জনগণের মনিটরিং সিস্টেমের ব্যবস্থা রাখেনি। কষ্ট ভোগ করছে জনগণ, কিন্তু বলার কোনো ক্ষমতা নেই। এগুলো পরিবর্তনের মাধ্যমেই ঘটবে আসল বিকেন্দ্রীকরণ। সংবিধানের ৭৭ নং অনুচ্ছেদে ন্যায়পালের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমরা ন্যায়পালের ব্যবস্থা করতে পারলাম না।

আরমানুল হক

আমরা বাংলাদেশে এত বছর ধরে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার বদলে স্থানীয় শাসনই দেখতে পাচ্ছি। সত্যিকার অর্থে যদি আমরা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, তাহলে শিক্ষা, চিকিৎসা, কাঠামোগত উন্নয়ন, কর ব্যবস্থাসহ সব ধরনের নাগরিক সুবিধাসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও কেন আমাকে চিকিৎসা পেতে সুদূর কক্সবাজার কিংবা পঞ্চগড় থেকে ঢাকায় আসতে হবে? এ প্রশ্ন মাথায় নিয়ে আমাদের সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। একজন সংসদ সদস্য সংসদে গিয়ে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং আইন প্রণয়ন করবেন, কিন্তু বাকি কাজগুলো মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা। আমরা যদি এভাবে বিকেন্দ্রীকরণ করি, তাহলেই আমাদের রাজধানী কেন্দ্রিক জনস্রোত উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

উম্মে সুহালা

গ্রামের মানুষ কোনো সমস্যায় পড়লে ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছাড়া আর কাউকে চেনেন না। যেকোনো বিপদে তাদের কাছেই যান। বিচার-সালিশেও চেয়ারম্যানদের দ্বারস্থ হন। কিন্তু জনপ্রতিনিধি হিসেবে তারা ভোট ব্যাংকের চিন্তা করে বিচারের রায় দেন। এতে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হয়। আরেকটি বিষয় হলো জনপ্রতিনিধিদের শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জনপ্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাটাও দুর্বল।