২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে ম্যালেরিয়ামুক্ত করার বৈশ্বিক অঙ্গীকার রয়েছে বাংলাদেশের। ম্যালেরিয়া নির্মূলে কার্যকর উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সচেতনতা, তাদের স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে করণীয় সম্পর্কে ৭ নভেম্বর রাজধানীর  একটি হোটেলে গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে বণিক বার্তা ও ব্র্যাক


দেওয়ান
হানিফ মাহমুদ
সম্পাদক ও প্রকাশক
বণিক বার্তা

ম্যালেরিয়া বাংলাদেশে অনেকটাই নির্মূল হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় এখনো ম্যালেরিয়া রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই। তারা শুধু ম্যালেরিয়াই নয়, অনেকগুলো রোগের ক্ষেত্রে বিশেষ করে সংক্রামক রোগ নির্মূলে সাফল্য দেখিয়েছে। করোনা নিয়ন্ত্রণেও তাদের সাফল্য শুধু দেশে না, দেশের বাইরেও নানাভাবে প্রশংসিত হয়েছে। বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নতুন নতুন স্বাস্থ্য সমস্যা আমাদের সামনে এসেছে। ম্যালেরিয়া সেই অর্থে সংকুচিত হলেও আমাদের জন্য বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে এখনো রয়ে গিয়েছে।

 

ডা. মো. শাহ আলম

মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা
আইইডিসিআর

আমরা ম্যালেরিয়া নির্মূলের কাছাকাছি চলে এসেছি। কিন্তু উল্টো ঘটনাও আছে। অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ হাজারের মতো রোগী দেখা গেছে। এটা গত বছরের দ্বিগুণের বেশি এবং সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত বান্দরবানে। বান্দরবানে রোগীর সংখ্যা, যেহেতু বেশি, তাই আমাদের ওই অঞ্চলটাকেই ধরা উচিত। কিন্তু দুর্গম এলাকা বলে কাজটা করা এখনো সম্ভব হয়নি। অথচ এর চেয়েও দুর্গম এলাকা আছে। খাগড়াছড়ির অন্তত দুটো জায়গা, এছাড়া দীঘিনালায় হেলিকপ্টার ছাড়া যাওয়া যায় না। অথচ সেখানেও এ নিয়ে কাজ হচ্ছে। এখন আমাদের কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে।

ম্যালেরিয়া নির্মূূলের লক্ষ্য অর্জন করে চীন যে সফলতা উদযাপন করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সেখানে ভারতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। আমরা ছিলাম। অথচ বাংলাদেশের তিনদিকে ভারত। সীমান্ত পেরিয়েও ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ ছড়াতে পারে। ময়মনসিংহে এমনই একজন শনাক্ত হয়েছেন, যিনি ভারতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এখন এটা নির্মূল করতে হলে কৌশলগুলো ভারতেরও জানতে হবে। তাদের সঙ্গে আমাদের একযোগে কাজ করতে হবে।

আমাদের যে এনজিও অংশীদাররা আছেন তাদের আরো শক্তিশালী করা দরকার। আমাদের এন্টোমোলজিস্টদের গবেষণা করতে হবে। এসব মশা মারার জন্য কোন ধরনের ওষুধ কার্যকর, তা খুঁজে বের করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা।


ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম

ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার
বাংলাদেশ কার্যালয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

বাস্তবতা হলো গত এক দশকে বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া সমস্যা ক্রমান্বয়ে সমাধানের দিকে গেছে। তবে বান্দরবানের ক্ষেত্রে তা হয়নি। এ রোগীরা আবার দুর্গম এলাকায় বসবাস করে। এদের মধ্যে জুমচাষীর সংখ্যা বেশি। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কিছু মানুষ রয়েছে যাদের চিকিৎসা গ্রহণের ধরন আমাদের তুলনায় ভিন্ন। এছাড়া আছে কিছু ভ্রাম্যমাণ মানুষ।

এখন ম্যালেরিয়ায় মোট আক্রান্তের তিন-চতুর্থাংশ আসে বান্দরবান থেকে। তাহলে আমাদের করণীয় কী তা নিয়ে ভাবতে হয়। এ রকম পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্য দেশগুলো কী করেছে, তা জেনে সেখান থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি গাইডলাইন আছে। এ গাইডলাইনের মাস স্ট্র্যাটেজি আছে। টার্গেট স্ট্র্যাটেজিও আছে। কোনো কোনো জায়গায় এগুলোকে সমন্বিতভাবে উপস্থাপন করা হয়। কৌশল যা-ই হোক না কেন দেশেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই নীতিতে মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। কেবল নীতি গ্রহণ করলেই হবে না, বাস্তবে এর প্রতিফলন থাকতে হবে।

এক্ষেত্রে প্রথমে মানুষকে জানাতে হবে। স্বাস্থ্যগত প্রভাব ছাড়াও এর কিছু অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। সেটা বোঝাতে হবে। তাহলে আমরা ভালো ফল পাওয়ার আশা করতে পারি। অন্তত বান্দরবানে

দ্রুত সমাধান জরুরি, কেননা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এখানেই আক্রান্তের হার বেশি। অর্থাৎ এলাকাটি ঝুঁকিপূর্ণ।


অধ্যাপক
ডা. আহমেদুল কবীর
অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন)
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনার দেশ। এখানে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনাময় মানুষকে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে আগামীর চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। একটা ভিন্ন মাত্রার বাংলাদেশে পরিণত হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে অনেক সফলতা দেখিয়েছে। এখন বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মতো সক্ষমতা আমাদের হয়েছে। আলোচনায় একটা কথা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, সেটা হলো কমিউনিটি এনগেজমেন্ট। যেখানে কাজ করবেন তারা যদি আপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত না হয়, তাহলে এটার কোনো আউটপুট হবে না।

আমরা এখন একটা গ্লোবাল ভিলেজে বাস করি। আমি যে কাজের জন্য দায়ী না সেই কাজেরও ভাগ কিন্তু আমাকে নিতে হবে। করোনা মহামারীর সময়ে আমরা সেটা দেখেছি। মহামারীই বলে দিয়েছে আমাদের দুর্বলতাগুলো কোথায়।

দেশে আপনি নিয়ন্ত্রণ করলেন, কিন্তু পাশের দেশে উৎপাদনস্থল থেকে গেল, তা হলে ম্যালেরিয়া নির্মূল করা সম্ভব হবে না। তাই এটাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। একা একা ভালো থাকার ধারণা এখন বদলে ফেলা প্রয়োজন।

জলবায়ু সংকটেরও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বড় প্রভাব রয়েছে। সংক্রামক, অসংক্রামক, মানসিক স্বাস্থ্য সবক্ষেত্রেই। সংক্রামক ব্যাধিগুলো বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তন। এখন বিকল্প চিন্তা করে স্ট্র্যাটেজিক্যালি কীভাবে এখান থেকে আমরা মুক্তি পাব সেটা ভাবতে হবে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে কাজ করলে প্রকৃতি প্রতিশোধ নেবেই। কিছু বিষয়কে যদি আমাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়, তাহলে এখনই সতর্ক হতে হবে।

কিছু সাইলেন্ট ক্যারিয়ার আছে, যারা উপসর্গবিহীন। তাদের চিহ্নিত করা ও ম্যাস ট্রিটমেন্টে আনা দরকার। আলোচনা থেকে বেশকিছু আইডিয়াও এসেছে। সুস্থ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রতিরোধ খুবই জরুরি, যেন কাউকে হাসপাতালে যেতে না হয়। আমি চাই এই আলোচনাকে কাজে লাগিয়ে যে রোগ প্রতিরোধ সম্ভব, তাতে বেশি বেশি বিনিয়োগ করা হবে।


অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার

শিক্ষক ও গবেষক
প্রাণিবিদ্যা বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ম্যালেরিয়া নির্মূল করার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় আমাদের লক্ষ রাখতে হবে। কোন বিষয়টি কেন হচ্ছে সেটা জেনে সমাধানের দিকে যেতে হবে। আমরা দেখেছি যে জুমচাষী, কাঠুরে অর্থাৎ যারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করতে যায় তারা বেশি আক্রান্ত হয়। দেখা যাচ্ছে নারীর তুলনায় পুরুষের আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি। ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে যাদের বয়স তারাও বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এ তথ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ। এসব তথ্য বিশ্লেষণে বলা যায় আক্রান্তরা বেশিরভাগই মোবাইল মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার।

ম্যালেরিয়া নির্মূল করতে হলে আমাদের নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করতেই হবে। বিশেষায়িত কোনো পোশাক তাদের দেয়া যেতে পারে। আমি সম্প্রতি রিপ্যালেন্ট ক্রিম নিয়ে একটি কাজ করছি। সেটির কার্যকারিতা দেখার চেষ্টা করছি।

আশার বিষয় হলো খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে সংক্রমণ ও মৃত্যু কমেছে। অন্যদিকে এ বছর কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে মৃত্যু বেড়েছে। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে কেসের পরিমাণ বেশি দেখা যাচ্ছে। কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে রোগী বাড়ার পেছনে এটি কারণ হতে পারে। ক্যাম্পের আশপাশে ম্যালেরিয়া ভেক্টরের পরিমাণও জানতে হবে।

চট্টগ্রামে আরবান ম্যালেরিয়া তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে আরবান ম্যালেরিয়া ছিল না। এটি শুরু হলে ঢাকাও হুমকির মুখে পড়বে। এজন্য চট্টগ্রামের অবস্থা নিয়ে গবেষণা করা দরকার।

মশা মারার জন্য বহুদিন ধরে আমরা ডেল্টামেথরিন ব্যবহার করছি। কৃষকরাও এগুলো ব্যবহার করেন এবং তাদের ব্যবহারটি অনিয়ন্ত্রিত। ফলে এ কীটনাশকটির ক্ষেত্রে মশার প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যাচ্ছে।


অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল ইসলাম
পরিচালক
সিডিসি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

বাংলাদেশ এখন যে অবস্থানে আছে, তা গত কয়েক দশকে গৃহীত নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে হয়েছে। অবকাঠামো নির্মাণের কারণে পাহাড়ে সমতল থেকে কর্মী গিয়েছেন। এখন সেখানে স্বাস্থ্যকর্মী ও উন্নয়ন-সহযোগীরা সহজে যেতে পারছেন। আমরা এর সুফলও দেখছি। সংখ্যার হিসেবে যদি দেখি, প্রোগ্রাম শুরুর সময়ের তুলনায় এখন ৯৪ শতাংশ ম্যালেরিয়া রোগী কমেছে। এছাড়া মৃত্যুর হার কমেছে ৯৩ শতাংশ।

এখন বান্দরবানকে ঘিরে চিন্তায় পড়তে হচ্ছে। আমরা হটস্পটগুলো চিহ্নিত করেছি। সেখানে আমাদের কর্মকৌশল নিয়ে আলোচনা করেছি। উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে এ কাজ করতে হবে। আমাদের ফান্ডিংয়ের মধ্যে থেকেই সেটি করতে হবে। কী করে রোগীর সংখ্যা কমানো যায়, তার একটি উপায় আমরা নিশ্চয়ই খুঁজে বের করতে পারব।

তৃণমূলের প্রয়োজন সম্পর্কে এখন জানার চেষ্টা করছি। আমরা ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাহায্য নিয়ে কাজটি করেছি। এখন বান্দরবান নিয়ে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে। বান্দরবান বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়। চীন যদি ম্যালেরিয়া রোগীর সংখ্যা ৩ কোটি থেকে শূন্যে আনতে পারে, তা আমাদের জন্যও অসম্ভব নয়।

ট্রপিক্যাল ডিজিজের কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছি। আশা করছি ফাইলেরিয়ামুক্ত বাংলাদেশের সনদ আমরা আগামী বছর পেয়ে যাব। সবাইকে নিয়েই আমরা কাজ করেছি। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আশা করি আগামী এক দশকে আরো বেশি এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।


ডা. এমএম আক্তারুজ্জামান
সহকারী পরিচালক
সিডিসি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

চীন ম্যালেরিয়া সংক্রমণ শূন্যে নামিয়ে এনেছে ওয়ান-থ্রি-সেভেন ফর্মুলা বাস্তবায়নের মাধ্যমে। আমাদেরও এই ফর্মুলায় কাজ করতে হবে। যেদিন রোগ শনাক্ত হবে তার তিনদিনের মধ্যে দুই ধরনের সার্ভিল্যান্স হবে। একটি এন্টোমোলজিক্যাল, অন্যটি এপিডেমিওলজিক্যাল। আর সাতদিনের মধ্যে অবশ্যই চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। এই ওয়ান-থ্রি-সেভেন ফর্মুলা যদি সারা দেশে বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলে চালু করতে পারি, তাহলে যেসব এলাকায় প্রাদুর্ভাব বেশি সেটা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। আমাদের রিসোর্স যেহেতু সীমিত, তাই সেটা দিয়ে এই ফর্মুলা বাস্তবায়ন করতে পারব কিনা তা লক্ষ রাখতে হবে। স্বাস্থ্যের সবাইকে নিয়ে এ স্ট্র্যাটেজি বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে। যে প্রান্তেই রোগী শনাক্ত হোক খোঁজখবর নিয়ে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। কক্সবাজারের যেসব মানুষ বাঁশ কাটতে গভীর বনে যায়, তারা দীর্ঘদিন সেখানে অবস্থান করে। তাদের অনেকেই ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়। এসব মানুষের কাছে স্বাস্থ্যকর্মীর মোবাইল নম্বর দেয়া যেতে পারে, যাতে জ্বর হলে দ্রুত যোগাযোগ করে তারা চিকিৎসা নেয়। এতে মৃতের সংখ্যা হয়তো কমে আসবে। থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী হাটে কম্বোডিয়া থেকে আসা মানুষদেরও নিয়মিত পরীক্ষা করা হতো। পরীক্ষায় ম্যালেরিয়া শনাক্ত হলে তাদের ফুল কোর্স ওষুধ দিয়ে দেয়া হতো। ম্যালেরিয়ার আন্তঃসীমান্ত সংক্রমণের সুযোগ থাকায় আমাদেরও এ জায়গায় কাজ করতে হবে।


ডা. শায়লা ইসলাম
কর্মসূচি প্রধান
কমিউনিকেবল ডিজিজেস
ব্র্যাক

ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু নিয়ে আমাদের এবারের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। গত কয়েক বছর স্থির অবস্থায় ছিল। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে মৃত্যু বেশি। সেখানে কাজ করতে হবে। কভিডের সময়ে কক্সবাজারে তেমন কর্মসংস্থান না থাকায় অনেক মানুষ বান্দরবানের বিভিন্ন উপজেলায় জীবিকার তাগিদে কাজ করতে গিয়েছেন। অধিকাংশ রোগী সেখান থেকে শনাক্ত হয়েছে। না জানার কারণে তারা সেখানেই ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে এবং জ্বর নিয়ে দীর্ঘদিন বসে ছিল। যখন জ্বর মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন তারা কক্সবাজারে চলে এসেছে। তারপর প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছে। তখন ডেঙ্গু, করোনা বা টাইফয়েড হিসেবে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে, যাতে সময়ক্ষেপণ হয়েছে। এতে মৃতের সংখ্যাটা ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। একইভাবে চট্টগ্রামেও সেটা লক্ষ করা গেছে।


অধ্যাপক
ডা.বে-নজির আহমেদ
সাবেক পরিচালক
সিডিসি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

আমরা অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ, নিয়ন্ত্রণ থেকে নির্মূলের চেষ্টা করে আসছি। এ কাজে অনেক অগ্রগতিও হয়েছে। কিন্তু কিছু সমস্যাও রয়ে গেছে। বান্দরবানে এখনো অনেক কেস পাওয়া যাচ্ছে। বলা যায় ম্যালেরিয়া নির্মূলে আমাদের দুর্বলতার জায়গা বান্দরবান।

আমরা বেশকিছু উদ্ভাবনী পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। যারা জুম চাষ করে তাদের জন্য বিশেষ ধরনের ভেস্ট (পোশাক) দেয়া হয়েছিল। ওখানে মশারি দিয়ে কাজ হয় না। তাই বিশেষায়িত ওই পোশাকের চিন্তা করা হয়েছিল। ব্র্যাকের মাধ্যমে আমরা এটি পর্যবেক্ষণে রেখেছিলাম। যারা এই ভেস্ট ব্যবহার করেছিল তাদের মধ্যে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ কমেছিল এবং পরিবর্তনটা ছিল চোখে পড়ার মতো।

তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা ১৬-১৭টি হাই রিস্ক পাড়া বের করেছিলাম। ওখানকার মানুষের সবার রক্ত পরীক্ষা করা হয়। আক্রান্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এরপর মশা যেন ডিম না পাড়তে পারে, সে ব্যবস্থাও করা হয়। পাশাপাশি ছোট ছোট ডোবা ভরাট করে ফেলা হয়েছিল। এসব উদ্যোগ নেয়ার ফলে ম্যালেরিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল।

মূল সমস্যা চিহ্নিত করে নতুন ও উদ্ভাবনী কৌশলের মাধ্যমে আমরা ম্যালেরিয়ার প্রকোপ কমিয়ে আনতে পারি। কক্সবাজারের যে চিত্র দেখছি, এটি নিয়েও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। সংক্রমণ সেখানেই হচ্ছে নাকি বাইরে থেকে আসছে—তা জানা দরকার। কেননা কক্সবাজারে বহু মানুষ যায়। সেখান থেকে যেন রোগটা না আসে, তা নিশ্চিত করতে হবে। মশা নিয়ন্ত্রণের নতুন কৌশল নিয়েও ভাবতে হবে।


ডা
. মো. আবুল কালাম আজাদ
উপপরিচালক (এমঅ্যান্ডপিডিসি)
সিডিসি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

এ আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী। ম্যালেরিয়া নিয়ে আমরা কাজ করছি। প্রেজেন্টেশন ও আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে বাংলাদেশের একটি অঞ্চল অর্থাৎ বান্দরবানে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেশি। এর মধ্যে তিনটি উপজেলা আলীকদম, থানচি ও লামায় এর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। বহুসংখ্যক মানুষ সেখানে আক্রান্ত। ম্যালেরিয়া নিয়ে বান্দরবানে যারা কাজ করছে তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কৌশলগত পরিকল্পনা করা হবে।

জুমচাষীরা যখন চাষ করতে বনে যায় তারা পরিবার নিয়েই যায় এবং প্রায় তিন মাস সেখানে বসবাস করে। এছাড়া কাঠুরে বা অন্যান্য যারা কাজের সূত্রে বনে যায় পূর্ণ আচ্ছাদিত পোশাক ও মশারির ব্যবহারে অনাগ্রহের কারণে তাদের মধ্যে ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ বেশি। এছাড়া অশিক্ষা, কুসংস্কারের কারণে তারা ডাক্তারের কাছে যায় না। ওঝার কাছে চিকিৎসা নেয়। এ ধরনের নানা কারণে তাদের মধ্যে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেশি। তবে যেহেতু সমস্যা চিহ্নিত করতে পেরেছি ও এটি নিয়ে নানা পর্যায়ে কাজ হচ্ছে, তাই আমরা ম্যালেরিয়া নির্মূলে সফল হব।


ডা. মো. ইকরামুল হক
ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার
জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

২০৩০ সালের মধ্যেই আমরা ম্যালেরিয়া নির্মূল করতে চাই। গত তিন বছরে ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলায় ম্যালেরিয়া শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। ২০২৫ সালের মধ্যে সিলেট, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে আক্রন্তের হার শূন্যে নিয়ে আসতে চাই। আমাদের এ কর্মসূচিতে ৮৫ শতাংশ রোগী কমিউনিটি লেভেলে শনাক্ত করেছি এবং সেখানে সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করেছি।

সরকারি ও বেসরকারি যৌথ সহযোগিতায় কমিউনিটি এনগেজমেন্টের দৃষ্টান্ত ম্যালেরিয়ার ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই। ৯৪ শতাংশ ম্যালেরিয়া কমেছে। মৃত্যু কমেছে ৯৩ শতাংশ, সিভিয়ার ম্যালেরিয়া নেমে এসেছে ৩ শতাংশে। ম্যালেরিয়া অধ্যুষিত ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ এলাকায় কীটনাশকযুক্ত মশারি দেয়া হয়েছে। বর্তমানে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা দুটোই কমে এসেছে। সারা দেশের মোট ৯১ শতাংশ রোগীই শনাক্ত হয় বান্দরবান থেকে। এর মধ্যে রামু, থানচি, আলীকদম থেকে শনাক্ত হয় ৭৫ শতাংশ। শনাক্ত বেশি হলেও এখন মৃতের সংখ্যা কমেছে। রাঙ্গামাটিতে রোগী শনাক্ত ও মৃত্যু দুটোই কমে এসেছে। ম্যালেরিয়া নির্মূলের শেষ পর্যায়ে রয়েছে এ এলাকা। খাগড়াছড়িতে এখন মৃত্যু নেই। শিশু ও নারীরা ছাড়াও প্রসূতিদের মধ্যে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এছাড়া ১৫ বছরের বেশি বয়স্করা ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। তবে আগের তুলনায় তা এখন কমে এসেছে।


ড. মো. আকরামুল ইসলাম
ঊর্ধ্বতন পরিচালক
(
সিডিপি, ওয়াশ, এইচসিএমপি ও আইডিপি)
ব্র্যাক

বান্দরবানের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হেডম্যান, কারবারি, মেডিকেল অফিসার, সিভিল সার্জনসহ জুমচাষীদের মতো স্থানীয় মানুষদের নিয়ে ঢাকায় কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে। এ কর্মশালার মাধ্যমে বান্দরবান নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট কৌশল পাওয়া যাবে। আগামীতে এর সুফল আমরা পাব। তবে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ম্যালেরিয়া রোগী বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

পাবর্ত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে গত দুই বছরে যে উন্নয়ন হয়েছে তার পেছনে ম্যালেরিয়া কমার অবদান আছে। এখন খাগড়াছড়িতে পর্যটকদের আনাগোনা বেড়েছে। এতে সেখানকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে। রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে এ পরিবর্তন আনা গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে পরিবর্তন আসবে। নব্বইয়ের দশকে দেখেছি, সেখানে মানুষজন যেতে চাইত না। রাস্তা ছিল না, ব্যবসা ছিল না। বিপণন ব্যবস্থাও ছিল না। রোগ নিয়ন্ত্রণ করে সেটা হয়েছে।

রোগ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একটি অঞ্চল ও তার জনগোষ্ঠী কীভাবে উপকৃত হচ্ছে তা সামনে আনা প্রয়োজন। ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ শুধু একটিমাত্র রোগ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রীতিমতো একটি অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কাজ করেছি বলে পরিবর্তনটা স্পষ্টভাবে দেখতে পাই। এটা যে একটা সফলতা তা বোঝা ও বোঝানোর সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলতে হবে যে একটি রোগ প্রতিরোধের মাধ্যমে আমূল পরিবর্তন সম্ভব। নীতিনির্ধারকদের সামনে এসব বিষয় এলে এ খাতে অর্থায়ন হবে। তা না হলে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়বে।