চট্টগ্রামে গতকাল শুক্রবার অনুষ্ঠিত হয়ে গেল '৭ম বই বিনিময় উৎসব'। চট্টগ্রামের বইপ্রেমীদের কাছে পরিচিত এই আয়োজনে তারা তাদের বইগুলো দিয়ে বিনিময় করে নিয়ে যাবেন পছন্দের অন্যান্য বইসমূহ। চট্টগ্রাম নগরীর জামালখান মোড়ে স্টোরিটেলিং প্ল্যাটফর্ম ফেইল্ড ক্যামেরা স্টোরিজ এর উদ্যোগে এমন এক অভিনব উৎসব আয়োজিত হয়ে আসছে প্রতিবার।
সকাল ১০টায় শুরু হয় ৭ম বই বিনিময় উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাস। তিনি বলেন, প্রতিবার এই বই বিনিময় উৎসব তার নিজের কলেবরকে বড় করছে৷ এত সীমাবদ্ধতার ভেতরেও সাহিত্যের প্রতি তাদের এই মুগ্ধতা আমাদের উচ্ছ্বসিত করে। চট্টগ্রামের অসংখ্য ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক স্থান আছে। এই বই বিনিময় উৎসব চট্টগ্রামের তেমনই এক নতুন ঐতিহ্য হিসেবে গড়ে উঠেছে। এই ঐতিহ্যকে আমাদের সংরক্ষণ করতে হবে।
উদ্বোধনের মাধ্যমে বই বিনিময় উৎসব ও প্রদর্শনী শুরু হয়। বেলা বাড়ার সাথে সাথে আনাগোনা বাড়তে থাকে পাঠকদের৷ সাথে বাড়তে থাকে বই বিনিময়ের সংখ্যাও। বিভিন্ন বয়সী শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের আগমনে জামালখান পরিণত হয় পাঠকদের মিলনমেলায়।
বিকালে প্রদর্শনীতে আসেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক জি এইচ হাবীব। তিনি এই বই বিনিময় উৎসবটি যে সময়ের সাথে সমাজের একটি শক্তিশালী বার্তাবাহক হয়ে উঠতে পেরেছে তার জন্য আয়োজকদের প্রশংসা করেন। এই বই বিনিময় উৎসবের পাশাপাশি প্রদর্শনীর আয়োজন বই বিনিময় উৎসবের প্রাসঙ্গিকতাকে আরো বেগবান করবে বলে মনে করেন তিনি।
এবার বই বিনিময় উৎসবে কথাসাহিত্য, শিশুসাহিত্য, প্রবন্ধ, হুমায়ুন- ছফা, কবিতা, ইতিহাস, রাজনীতি ও আত্মজীবনী, ক্যারিয়ার ও বিজ্ঞান, একাডেমিক সহ মোট ১১টি স্টলে বই বিনিময় করা হয়। সর্বাধিক বই বিনিময় হয় কথাসাহিত্যের স্টল, একাডেমিক বইয়ের স্টল এবং হুমায়ুন আহমেদের স্টলে বই বিনিময় হয়রাত আটটায় শেষ হয় বই বিনিময় উৎসব। গোটা বই বিনিময় উৎসবে ২৫ হাজারের অধিক বই বিনিময় হয়।
বই বিনিময় উৎসবে একজন পাঠক তার পঠিত বইটি রেখে অন্য বই বিনিময় করে নিয়ে যেতে পারেন বিনামূল্যে। যেমন: কোনো পাঠকের যদি একটি উপন্যাসগ্রন্থ পড়া শেষ হয়ে থাকে কিংবা আর প্রয়োজন না হয় তিনি এসে উক্ত বইটি জমা দিয়ে অন্য কোনো অপঠিত উপন্যাসের বই তার পছন্দমতো বিনিময় করে নিয়ে যেতে পারেন।

ছবি- স্টোরিটেলিং প্ল্যাটফর্ম ফেইল্ড ক্যামেরা স্টোরিজ
বিগত কয়েক বছর ধরে তাদের অভিনব এই আয়োজন দেশজুড়ে সাড়া ফেলে আসছে। রাস্তার দু'পাশে ফুটপাতে সারি সারি সাজানো বইয়ের স্টলে উপচে পড়া ভীড়। 'বই নয়,জ্ঞানের বিনিময়' শ্লোগানে বই বিনিময় উৎসবের এই ভীড়ে যেমন দেখা যায় স্কুল-কলেজ পড়ুয়া কাঁধে ব্যাগ ঝোলানো কিশোর-কিশোরীর দল তেমনি দেখা মিলে প্রবীণ পাঠকদের। কখনো বা বাবার কাঁধে চড়ে আগমন ছোট্ট সোনামণিদের। এবার বই বিনিময় উৎসবে আরো ছিলো 'প্রায়োরিটি বাংলাদেশ' নামে চিত্র প্রদর্শনী যেখানে স্থান পায় বাংলাদেশের সাহিত্য, সিনেমা, লোকগান, ইতিহাস, চট্টগ্রাম, জাতিবৈচিত্র্য ও অন্যান্য বিষয়ে বিভিন্ন স্থিরচিত্র।
চুয়েটের শিক্ষার্থী মেহেদি বই বিনিময় করতে এসে জানান প্রতিবারই তিনি এই বই বিনিময় উৎসবের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন। এবারও তার পঠিত বইগুলো নিয়ে অপেক্ষা করে ছিলেন কখন বই বিনিময় উৎসবের ডাক আসবে আর তিনি তার পছন্দের বইটি বিনিময় করে নিবেন। তিনি সুনীলের সেই সময় বিনিময় করে নেন শহীদুল জহিরের সেই রাতে পূর্ণিমা ছিলো।
সুনীতির 'বাংলার ইতিহাস' বইটি বিনিময় করে লর্ড কিনরড এর রাইজ এন্ড ফল বিনিময় করেন ব্যাংকার নিষাণ কুন্ডু। প্রতিবার কাঙ্ক্ষিত বইটি খুঁজে পান বলে আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান তিনি। দোহাজারী থেকে কলেজ শিক্ষক শাহরিয়ার ইমশিয়াত বই বিনিময় করতে এসে বইয়ের বৈচিত্র্য দেখে বলেন, বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে এই তরুণেরা যেভাবে নিজেদের ভেতর লালন করছে তা আশাব্যঞ্জক। মানুষকে বইয়ের কাছাকাছি রাখার এই উদ্যোগ একটি পাঠকনির্ভর সমাজ তৈরি করবে বলে জানান তিনি।
এসেছিল শিশুরাও। প্রার্থনা নামে এক চতুর্থ শ্রেণী পড়ুয়া শিক্ষার্থী কমিকবুক বিনিময় করতে দেখা যায়। বিকাল হতে হতে বাড়তে থাকে ভীড়। জামালখান পরিণত হয় সববয়সী পাঠকদের মিলনমেলায়। একুশে বইমেলার পূর্বে এই ধরণের আয়োজন পাঠককে আড়মোড়া ভাঙতে সাহায্য করবে মনে করেন অনেকেই।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সাংবাদিক সামসুদ্দিন ইলিয়াস বলেন, একটা উৎসব সাতবারের মতো আয়োজন করে আসাটা কষ্টসাধ্য। এই আয়োজনটি গোটা বাংলাদেশের মানুষের মাঝেই ছড়িয়ে দিতে সকল স্তরের মানুষদের এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন সিটি ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আল জোবায়েদ, বই বিনিময় উৎসবের আয়োজক সদস্য আকিবুল ইসলাম জিশাদ, কাজী সদরুল্লাহ রাকিব, অহনা বড়ুয়া, সানজিদা রহমান, তূর্ণ পাল প্রমুখ।










