বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে প্রত্যেকটি আন্দোলন-সংগ্রামেই নারীর উপস্থিতি লক্ষণীয়। পুরুষ যখন রাস্তায় নেমে এসেছে, নারী তখন ঘরে বসে থাকেনি। একইভাবে জুলাই আন্দোলনে তথা ২৪-এর ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানে নারীর অংশগ্রহণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২৪-এর সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন পর্যন্ত নারীর ভূমিকা ছিল সাবলীল ও অবশ্যম্ভাবী। বিগত আন্দোলনে বিভিন্ন বয়সের নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ আন্দোলনে ‘অরাজনৈতিক‘ ভাবমূর্তি ও আন্দোলনের পক্ষে সারা দেশে জনমত গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, নারী কোটা থাকা সত্ত্বেও কেন কোটা সংস্কার আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ ব্যাপক হারে দেখা গেছে। বিচক্ষণ নারীরা তাদের অনুভূতি ব্যাক্ত করেছেন যে বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থায় সমাজে মেধাবীদের যথেষ্ট মূল্যায়ন হয় না, এমনকি মূল্যায়ন হয় না সমাজে খেটে খাওয়া মানুষের মেধাবী সন্তানদের। কোটাভিত্তিক অসমতার কারণে নিম্নবিত্ত পরিবারের মেধাবী সন্তানরা শিক্ষাজীবনের শুরু থেকে অক্লান্ত পরিশ্রমের পরেও সরকারি চাকরি নামের সোনার হরিণের সন্ধান পায় না। কোটা ব্যবস্থায় যথারীতি অযোগ্য ব্যক্তিরা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। অন্যদিকে নারী কোটা থাকলে এ ব্যবস্থায় সমাজে বরাবর গুরুত্ব পাওয়া, শহুরে সুবিধাপ্রাপ্ত নারীরাই সে কোটা ব্যবহারে অগ্রগামী থাকেন। সারা দেশের অবহেলিত নারীরা কমই ‘নারী কোটা’র সুবিধা নিতে পারতেন। তাই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সুবিধাবঞ্চিত ও বেশি যোগ্য মানুষকে চাকরি ও নেতৃত্বের সুযোগ দিতে নারীরা কোটার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। নারীর এ সিদ্ধান্ত মূলত সমাজে সাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এক বিশেষ যাত্রা ছিল।
দিনের পর দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, অবস্থান কর্মসূচির পর হতাশা-শ্রান্তি ক্রমেই সবাইকে গ্রাস করেছে। আন্দোলনকে সরকারবিরোধী ট্যাগ দেয়া হয়, ‘রাজাকারের বংশধর’ বলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধ শক্তি বলা হয়। মেয়েরা সেদিন হল গেটের তালা ভেঙে রাজু ভাস্কর্যের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল ক্ষমতার এ নগ্ন অবিবেচনার প্রতি ক্ষোভ থেকে, আত্মপরিচয়ের ওপর আঘাতের অপমান থেকে। রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন পর্যায় থেকে আসা হুমকি ভয়ভীতির মুখেও মেয়েদের উপস্থিতি দিনকে দিন বেড়েছে, প্রতিদিন মেয়েদের মিছিলটা আগের দিনের চেয়ে লম্বা হতো, মেয়েদের স্লোগানের জোরটা আগের দিনের চেয়ে তীব্র শোনা যেত। ১৭ জুলাই সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো থেকে ঘোর অনিরাপদ ঢাকা শহরের রাস্তায় নামতে বাধ্য হওয়া নারী শিক্ষার্থীরা তা বুঝতে পেরেছিলেন, নারীর নিরাপত্তার বুলি, নারীর মর্যাদার বুলি এ দেশে কতটা ফাঁকা, ক্ষমতার স্বার্থের প্রশ্ন এলে কতটা আপেক্ষিক।
সারা দেশে গণহত্যা শুরু হওয়ার পর সব জমায়েত-মিছিলে দেশের মেয়েরা-মায়েরা নেমে এসেছিলেন। নারীকে চিরাচরিত দুর্বল করে দেখানো হয়, দেখানো হয় নারী ভয় পায়, বলা হয় নারীর প্রতিরোধের শক্তি নেই। সেই নারী দুই হাতে পুলিশের প্রিজনভ্যান আটকে দিয়েছে, গুলির সামনে বুক পেতেছে, সহযোদ্ধাদের দৌড়ে ছিনিয়ে এনেছে পুলিশের হাতকড়া থেকে, ঘনঘোর ফ্যাসিবাদের দিনে গণমাধ্যমের সামনে চিৎকার করে এক দফার উচ্চারণ করেছে, দেয়ালে লিখেছে–‘জন্মভূমি নাহয় মৃত্যু’।
এ আন্দোলনে প্রতিটি শ্রেণী-পেশার নারীর অংশগ্রহণ ছিল, স্কুল-কলেজের মেয়েরা পরিবারের নিরাপত্তা বলয় এড়িয়ে গিয়ে ফ্যাসিবাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, উদ্যত গুলির আঘাতে লুটিয়ে পড়েছে রাজপথে রক্তাক্ত লাল গোলাপ হয়ে। শহীদ মারওয়া, নাইমা, লিজা এ যুগের নারীদের সাহস, আত্মবিশ্বাস আর লড়াকু মনোভাবের প্রতিমূর্তি। তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে পারে না। দেশের প্রতি তাদের যে ভালোবাসা, দেশকে নিয়ে তাদের যে চিন্তা, নতুন বাংলাদেশের বিনির্মাণে নারীর রাজনৈতিক চিন্তা আকাঙ্ক্ষাকে জানতে হবে, নারীদের সে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
কেন আলাদা করে নারীর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আজ কথা বলা জরুরি? যদিও ফ্যাসিবাদের কাছে, স্বৈরাচারের কাছে নারী-পুরুষের ভেদাভেদ থাকে না। ফ্যাসিবাদ প্রতিটি উদ্যত কণ্ঠকেই রুদ্ধ করে দিতে চায়। আমরা দেখেছি ইতিহাসের সব মুক্তির আন্দোলনে নারীর অনস্বীকার্য ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও আন্দোলন শেষে ম্লান হয়ে গেছে নারী। তার সাহসের কথা, যোগ্যতার কথা, শক্তির কথা ভুলে গেছে মানুষ। নারীর শক্তি ছাড়া যে আন্দোলন সফল হতো না, সে আন্দোলন শেষে আবার শোনা যায় সেই রব–নারী দুর্বল, কম যোগ্য। কারণ স্বাভাবিকভাবেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মূল ক্ষমতাকাঠামো থেকে নারীকে সুপরিকল্পিতভাবে অপরায়ণ করে রাখা হয়। জনগোষ্ঠীর অর্ধেক অংশের রাজনৈতিক চিন্তা উপেক্ষিত থেকে যায়, রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে তার কোনো সংযোগ থাকে না। অথচ এ চর্চা না থাকলে নতুন প্রজন্মের নারীদের রাজনৈতিক মানস নির্মাণ সম্ভব নয়। যেকোনো গণ-আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ প্রয়োজন হয়, সেখানে নারীর একটি সচেতন রাজনৈতিক মানস না থাকাটা বিপজ্জনক। এর অনুপস্থিতিতে সব রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বা বন্দোবস্তে নারীর অবস্থান থাকে গৌণ ও অন্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। রাজনৈতিকভাবে নারীর চিন্তা যখন উঠে আসে না অর্থাৎ অর্ধেক জনগোষ্ঠীর সক্রিয় মতামত বা বয়ান থাকে না, তখন বিভিন্ন রূপে নানা কৌশলে ফ্যাসিবাদের বিস্তার জেঁকে বসা সম্ভবপর হয়।
আমাদের দেশে মেয়েদের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায়ই রাজনীতির অনুপস্থিতি স্পষ্ট। গ্রামে-গঞ্জে কিংবা শহরে দৈনন্দিন সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যে ছোট ছোট রাজনৈতিক পরিসর গড়ে ওঠে, সেখানে নারীর উপস্থিতি অনাকাঙ্ক্ষিত, নারীর জন্য সে পরিসরগুলো সহজগম্য নয়। এমন সমাজে যে মুষ্টিমেয় কয়েকজন রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারেন, তারা নিতান্তই হয়ে ওঠেন কোনো পুরুষের চিন্তার ছায়ায় কিংবা ব্যক্তিগত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। যে সমাজে নারী হিসেবে রাজনৈতিক হয়ে ওঠার বিপরীতে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেখানে থাকা জরুরি।
নারী এখন আর ঘরের ভেতরে বন্দি থাকার মানুষ নন। নারীকে সারা বিশ্বের নারীদের রাজনৈতিক চিন্তাকে পড়তে হবে, ভাবতে হবে দেশের মানুষের কথা, নারীর কথা, জানতে হবে নাগরিক হিসেবে তার শক্তির জায়গা, গড়ে তুলতে হবে রাজনৈতিক পাঠচক্র, বলতে হবে, লিখতে হবে–এ রকম একটি সাবলীল প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে নারী রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠবে। সে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার বক্তব্য তুলে আনতে পারবে, নাগরিক সমাজের তৈরি বয়ানে নারীর অংশগ্রহণ থাকবে। বর্তমানে শুধু শিক্ষিত সমাজের নারীদের ক্ষুদ্র একটি অংশের কথা সবখানে উঠে আসে। সব নারীর কথাকে শক্তিশালী করে সমাজের জননারীর কথা তুলে আনা জরুরি। গ্রামের স্কুলের অষ্টম শ্রেণীতে পড়া একটা মেয়ের রাজনৈতিক চিন্তা, গার্মেন্টসের একজন কর্মীর রাজনৈতিক চিন্তা, পাহাড়ে মাইলকে মাইল পার করে এক কলস পানি জোগাড় করা নারীর রাজনৈতিক চিন্তা, চা বাগানে হাড়ভাঙা খাটুনি করা বঞ্চিত সে নারীর চিন্তা উঠে আসা জরুরি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রতিটি পর্বে সাম্য, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ঘিরে নারীর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে। অভ্যুত্থানের পরও আমরা নারীর সে কল্যাণকর অস্তিত্ব ধরে রাখতে চাই, রাষ্ট্রের রাজনীতিতে তার অন্তর্ভুক্তি চাই। সবার সংগ্রামে ত্যাগ-তিতিক্ষায় যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখি, সে বাংলাদেশের নির্মাণ অংশগ্রহণমূলক হওয়া বাঞ্ছনীয়। নতুন প্রজন্মের নারীর রাজনৈতিক মানসের নির্মাণ ও সচেতন চর্চা এ দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। নিজের পূর্ণ নাগরিক অধিকার আদায়ে নারীর সচেতন রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষায় সোচ্চার হয়ে ওঠার বিকল্প নেই।
লেখক: পরিচালক, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও কথাসাহিত্যিক





