মাহবুবের রহমান-আফরোজা রহমান দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন মাহমুদুর রহমান সৈকত। সদ্য এইচএসসি পাস করা এ সন্তানকে নিয়েই দিনভর ব্যস্ততায় পার করতেন আফরোজা রহমান। কলেজ-কোচিং সব জায়গায়ই ছেলের সঙ্গে ছুটে বেড়াতেন। এর বাইরে বাকি সময়টুকু নানা গল্প-খুনসুটিতে পার করতেন মা-ছেলে। তবে ১৯ জুলাই আফরোজা রহমানের দৈনন্দিন জীবনের এ চিত্র বদলে যায়। আন্দোলনে গিয়ে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন মাহমুদুর রহমান সৈকত। একসময়ে পুরো ঘর মাতিয়ে রাখা সৈকত এখন কেবলই স্মৃতি।
বুধবার মোহাম্মদপুরে নূরজাহান রোডে সৈকতের বাসায় গিয়ে দেখা যায় সৈকতের সাইকেল, ক্রিকেট ব্যাট এখনো যত্নে সাজানো। আইইএলটিএসের প্রস্তুতির বইগুলোও এখনো টেবিলে রয়েছে। শুধু সৈকত নেই। এ সময় কথা হয় সৈকতের মায়ের সঙ্গে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সৈকতের মা বলেন, ‘আমার সারাদিনের ব্যস্ততা ছিল সৈকতকে ঘিরে। ওকে কখনো কোথাও একা যেতে দিতাম না। আর সৈকতেরও যেন আমার মাঝেই প্রাণ ছিল। এইচএসসির পর বেশির ভাগ সময় বাসায়ই থাকত। একটু পর পর আমার কাছে ছুটে আসত, ফেসবুকে কিছু একটা হয়তো দেখেছে সেটা আমাকে দেখাত, কখনো পেছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরত, কখনো আমার মাথার চুল এলোমেলো করে দিত। আমি অনেক সময় কপট রাগ দেখাতাম। এমন নানা খুনসুটিতেই দিন পার হতো। অথচ ঘাতকের বুলেট আমার সন্তানকে কেড়ে নিল। সারাদিন শূন্য ঘরে সন্তানের স্মৃতিই আমার একমাত্র সম্বল।’
আন্দোলনের শুরু থেকেই সৈকত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে সক্রিয় ছিলেন। শুরুর দিকে বাবা-মায়ের বাধায় আন্দোলনে যেতে না পারলেও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তবে ১৯ জুলাই বন্ধুর আহত হওয়ার সংবাদ পাওয়ার পর বাবা-মায়ের নিষেধ উপেক্ষা করেই আন্দোলনে ছুটে যান। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় সৈকত তার মাকে বলেছিলেন, বন্ধু রাবার বুলেটে আহত হয়েছে। সে বন্ধুর কাছে যাচ্ছে। মায়ের সঙ্গে সৈকতের এটাই ছিল শেষ কথা। এর কিছু সময় পরই নূরজাহান রোডে আন্দোলনে শহীদ হন তিনি। প্রতিটা মুহূর্তই সন্তানের নানা স্মৃতি আফরোজা বেগমের চোখে ভেসে ওঠে। বিগত রমজানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই রমজানে নিয়মিত রোজা রাখত সৈকত। কিন্তু সেহরির সময় প্রায়ই দেরি করে উঠত। তাকে দ্রুত ঘুম থেকে ওঠাতে ঘড়ির সময় এগিয়ে রাখাসহ কত কি যে করতাম। ইফতারে সৈকতের পছন্দ ছিল পেঁয়াজু, বেগুনিসহ নানা ভাজা-পোড়া। প্রতিদিনই ইফতারে পছন্দের এ খাবারগুলো তৈরি করতাম। কিন্তু এবারের দৃশ্য ভিন্ন। ইফতার-সেহরিসহ প্রতিটা মুহূর্তে সন্তানের শূন্যতা যেন আরো বেশি আকড়ে ধরে। এখন প্রতিদিনই ইফতারে সৈকত বা আমার মেয়ের বন্ধুরা আসে। ওদের জন্য ইফতার তৈরি করি আর ওদের মাঝেই নিজের সন্তানকে ইফতারি করানোর তৃপ্তিটুকু খুঁজে নেয়ার চেষ্টা করি।’ আফরোজা রহমানের এখন একটাই প্রত্যাশা। সন্তান হত্যাকারীর উপযুক্ত বিচার চান তিনি।





