লড়াইটা জুলাইয়ে শুরু হয়নি, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আগেও লিখতাম, আন্দোলন করতাম, তখন শুধু এত মানুষ একজোট হয়ে ভাবেনি। আলাদা করে বললে, ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রহসনের নির্বাচনের আগের সময় থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করেছি।
আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো নারী শিল্পীরা জুলাইয়ে কাজ করার পরিবেশ পাননি। অথবা বলা যায় রাষ্ট্র তাদের সে নিরাপদ পরিবেশ দিতে পারেনি। সে সময় আমি অসংখ্য ধর্ষণের হুমকি ও চরিত্রহননের শিকার হয়েছি।
জুলাইয়ের পর নারীরা অনেকে এখন আগের চেয়ে বেশি কাজ করছে, বেশি সাহস নিয়ে এগোচ্ছে। এ সাহস ধরে রাখার মতো সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাঠামো সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
জুলাইয়ে আমার সবচেয়ে আইকনিক কাজ ছিল ‘শাকচুন্নি’ আর্টওয়ার্কটি, যেখানে প্রথমবারের মতো কোনো শিল্পকর্মে হাসিনাকে এভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ শাকচুন্নির কার্টুনটা অনেকেই হয়তো দেখেছেন। আমি এটা এঁকে পোস্ট করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর অনেকেই সরাসরি হাসিনার চেহারা ব্যবহার করে ক্যারিকেচার ও কার্টুন আঁকতে শুরু করে—যে চর্চাটা অনেক বছর ধরে প্রায় কেউই করার সাহসই পায়নি লীগের ত্রাসের রাজত্বে।
প্রেক্ষাপট:
জুলাইয়ের শুরুতে আমি দেশের অন্যতম স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম।
১৫ জুলাই: কার্টুনটা দেখে আমার এক ‘শুভাকাঙ্ক্ষী’ বললেন, তুমি এটা কেন আঁকছ? তোমার লিস্টে অমুক প্রতিষ্ঠানের তমুক আছে! চাকরিটা হবে না তো।
তারপর: ৩৬ জুলাই পর্যন্ত কাজ করলাম।
হয়তো সারারাত ধরে আঁকছি, কাঁদছি, এর মধ্যেই ফজরের আজান, ভোরের আলো—আরো একটা পরাধীন ভোর। এর মধ্যে অনেক কিছু ঘটেছে— মা কেঁদেছে, বাবা পুরুষ হয়ে জন্মেছেন বলে আমার সামনে কাঁদেননি। হাজারের ওপর ডেথ থ্রেট এবং নারী কোটায় রেইপ থ্রেট পেয়েছি। এবং চাকরিটা আমার হয়নি।
এখনো কারো সঙ্গে দেখা হলে শুনি, ১৪-১৫ জুলাই কাজটি তাদের কতটা সাহস জুগিয়েছিল। আমার মনে হয়, এটি কেবল সাহসের নয়, বরং তার চেয়েও বেশি প্রয়োজনীয়তার বিষয় ছিল। তবে লাখ লাখ মানুষের সমর্থন আর সাহস মনে থাকবে। আমি কৃতজ্ঞ সবার কাছে।
দেশটাকে এখনো সবার জন্য নিরাপদ হিসেবে পাইনি, তাই লড়াইটাও শেষ হয়নি। সে কারণেই জুলাই আমার চিত্রকর্মে এখনো প্রভাব ফেলছে, অবশ্যই।
শিল্পী হিসেবে আমি এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে শিল্পীরা মুক্তভাবে শিল্পচর্চার সুযোগ পায়। আর আমার দীর্ঘমেয়াদি ইচ্ছা হলো শিল্পীদের জন্য একটি সরকারি তহবিল গঠন করা, যাতে তারা ছবি আঁকার সময় এ ছবি আঁকলে চাল-ডাল কিনতে পারব কিনা, এমন দুশ্চিন্তায় না ভোগে।





