আমি ব্যক্তিগতভাবে কোটার প্রয়োজন অনুভব করিনি, কিন্তু কোনো গণ-অভ্যুত্থান শুরু হলে তা শুধু একজনের বিষয় থাকে না। অন্যায় রোধ করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হয়। এ ভাবনা থেকেই ৬ জুলাই আমি ষোলশহর স্টেশনে গিয়ে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হই।
১৫ জুলাই চট্টগ্রামের ওয়াসিম আকরাম নিহত হলে আমরা ষোলশহর, দুই নম্বর গেট ও মুরাদপুর এলাকায় প্রবেশ করতে চাইলে ছাত্রলীগের বাধার মুখে পড়ি। সেদিন প্রিমিয়ার, বিজিসি ট্রাস্ট, পোর্ট সিটি, ইনডিপেনডেন্ট, ইউএসটিসিসহ বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা আমাদের আন্দোলনে যোগ দেয়। হাজারখানেক শিক্ষার্থী আটকে পড়ি দুই নম্বর গেট এলাকায়। ফিনলে স্কয়ারের সামনে আমরা ১৪ জন ছাত্রলীগের মুখে পড়ি। বেলা সাড়ে ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আমাদের ওপর ভয়াবহ মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। অকথ্য গালাগালি, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া, এমনকি আমাদের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। অশ্লীল ভাষায়ও আমাদের আক্রমণ করা হয়। প্রথমে আমরা মৃত্যুভয় অনুভব করলেও ধীরে ধীরে সে ভয়কে জয় করি। এর পরের প্রতিটি আন্দোলনে আমরা মৃত্যুভয় জয় করেই এগিয়ে গেছি।
৩ আগস্ট নিউমার্কেট গোলচত্বরে আমাদের মিটিং হয়। আন্দোলনের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে গিয়ে আমরা দেখি, অনেকে নিরাপত্তার অজুহাতে সরে গেছে। মিটিং শেষে সিদ্ধান্ত হয় টাইগারপাস পর্যন্ত মিছিল নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু আন্দোলন বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। একদল টাইগারপাস হয়ে বহদ্দারহাট, আরেক দল আগ্রাবাদ চলে যায়। আমরা দৌড়ে টাইগারপাসে গিয়ে সবাইকে একত্রিত করি এবং পুলিশ বক্সে ভাংচুরসহ অন্যান্য সহিংসতা প্রতিরোধ করি। আন্দোলনকে সঠিক পথে নিয়ে আসার কাজ করি। পরে ৫ আগস্ট সরকার পতনের মধ্য দিয়ে আমাদের আন্দোলন চূড়ান্ত সফলতা লাভ করে।
৫ আগস্টের পর আমরা মন্দির রক্ষা, থানায় পাহারা, ট্রাফিক সিস্টেম নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন জনসেবামূলক কাজ করি। আমাদের আন্দোলনের গণতান্ত্রিক ধারা ছিল, কিন্তু এখন উপদেষ্টা সরকার ও সমন্বয়কদের মধ্যে কোনো নৈতিক জায়গা অবশিষ্ট নেই। উপদেষ্টা সরকার আসার পর আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন হয়নি, বরং তাদের রক্তের বিনিময়ে রাজনৈতিক দল গঠিত হয়েছে। একসময় মিটিংয়ে ১৫ জনও পাওয়া যেত না, এখন সমন্বয়কদের ছড়াছড়ি।
নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করা উচিত ছিল সবাইকে নিয়ে, কিন্তু এটি হয়েছে নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে কেন্দ্র করে। সামাজিক সমস্যা, মব জাস্টিস, ক্ষমতার লড়াই, টেন্ডারবাজি এসবের মধ্যে জুলাই আন্দোলনের মূল চেতনা হারিয়ে যাচ্ছে। নৈতিক আদর্শ বিসর্জন দিলে বিপ্লবের সুযোগ হারাতে হবে। দেশ ও মানুষের স্বার্থে ভবিষ্যৎ রাজনীতি কোন পথে যাবে, তা এখনই নির্ধারণ করতে হবে। পরিবর্তন ও সংস্কার জরুরি।










