গত বছর জুলাইয়ের শুরুর দিকে আমি কক্সবাজার ছিলাম। ছোট শহর থেকে তখনো সংকটটা আঁচ করা যাচ্ছিল না। যেহেতু অভ্যুত্থানে রূপ নেয়নি, ভাবছিলাম দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। ঢাকায় এলাম। ১৫ তারিখ যখন ছাত্রলীগ আন্দোলনকারীদের মারতে শুরু করল, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছিলাম। সে সময় আশ্রয় নিই জগন্নাথ হলে। ২ ঘণ্টা পর রাস্তায় এসে দেখি বিপর্যস্ত অবস্থা। এখানে-ওখানে স্যান্ডেল পড়ে আছে। তখন আঁচ করলাম পরিস্থিতি বড় কোনো দিকে বাঁক নিচ্ছে। ওই রাতেই রাজাকার প্রসঙ্গ উঠল। রাতেই ছাত্রছাত্রীরা বের হয়ে স্লোগান দিতে লাগল। নতুন রূপ নিল আন্দোলন। তখন পর্যন্ত আমি কেবল দর্শক, আন্দোলনকারী হয়ে উঠিনি। দর্শক ছিলাম, যেভাবে গত ১৫ বছর দেখেছি।

নারীর চাইতে আমি বরং একজন নাগরিক হিসেবে যতটুকু করা উচিত ছিল, করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু যখন সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন শিল্পীরা নামতে বাধ্য হয়। শিল্পীরা বিভিন্ন বিষয়ে গভীরভাবে মগ্ন থাকার কারণে সবাই ভাবেন তারা সমাজের অনেক কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন। অভ্যুত্থানের সময়ও তেমন ছিল। তারপর একসময় অনিশ্চয়তা চরম মাত্রায় পৌঁছল। কেউ বুঝতে পারছিল না কী ঘটতে যাচ্ছে। ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ার পর সংকট যেন আরো বাড়লে। ছেলেমেয়েদের ধরপাকড় করা হচ্ছে। সবাই তখন মৃত্যুর ঝুঁকিতে। তখন আসলে আমরা সবাই এক বিন্দুতে মিলিত হলাম। রাজনীতিবিদ, ছাত্র ও শিল্পীর পার্থক্য রইল না।

যখন কোনো কিছু অর্জন জীবনের চাইতে বড় কিছু হয়ে যায়, তখন জীবনের প্রতি ঝুঁকিটা আর থাকে না। সেখানে নারী, আদিবাসী কিংবা ছাত্র পরিচয়ে কিছু আসে যায় না। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল যেকোনোভাবে একটা সেফ জোন তৈরি করা। নিজের ও সবার জন্য। সে চিন্তা থেকেই শামিল হয়েছিলাম। লড়াইটা ছিল আমাদের সবার। আমাদের বোঝাপড়াটা কিন্তু ওই ক্ষমতার অধীনেই। ক্ষমতার পালাবদল দেখার কোনো সুযোগ আমাদের প্রজন্মের হয়নি। তারা একটা রেজিমকেই দেখেছে। গত রেজিমের যে ছাত্ররাজনীতি, সেটার জন্য আমি শব্দ বাছাই করতে বলতে চাই না। এখনো খুব স্পেস পাওয়া গেছে, বিষয়টা এমন না। সম্প্রতি নারীকে হ্যারাস করার পর তাকে ফুলের মালা দেয়ার ঘটনা বেশ হতাশাজনক। গত রেজিমেও মেয়েরা হ্যারাস হইছে, রেপ হইছে। অনেকের মরদেহ আমরা পাইনি। এসব নতুন কিছু না।

সত্যি বলতে দেশ সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা আমার ছিল না। একটা রাষ্ট্র যদি সঠিকভাবে গড়ে ওঠে তখন তাকে সংস্কার করা যায়। যে রাষ্ট্রে আইনই অন্যায়ের দিকে থাকে; সেখানে রাষ্ট্রে কীভাবে সুশাসন আছে বলে দাবি করতে পারি। যার ওপর আমরা ভরসা করব, তারাই আমাদের লাঠিপেটা করছে। সেখানে আমি বলতে পারি না রাষ্ট্র সঠিকভাবে গঠিত হয়েছে। রাষ্ট্র গঠন হওয়ার পরেই আসে সংস্কারের কথা। সংস্কার আসলে অনেক দূরের পথ। যে সমাজে নারীকে শাস্তি হিসেবে ধর্ষণের হুমকি দেয়া হয়; সে সমাজ মেয়েদের জন্য অনিরাপদ। ঘর হতে বের হতে না দেয়া বা আটকে রাখা তো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। আমাদের সমাজে সংস্কৃতির সঠিক চর্চা নেই। কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায় - সেটা বিবেচনার সংস্কৃতি সমাজে নেই । তাই বলে আমি বলতে চাই না, আশা নেই। আমি আশাবাদী মানুষ। এখনো আশা রাখি মানুষ টিকে থাকবে। জীবনের মূল্যবোধ টিকে থাকবে।