জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নারীরা হারিয়ে যাচ্ছে না, নারীদের ইচ্ছে করে হারানো হচ্ছে। জুলাই অভ্যুত্থানে নারীরা অসংখ্য আইকনিক মুভ অনেকের আগে নিয়েছে। যেমন রোকেয়া হল থেকে যদি ছাত্রলীগের নেত্রীকে বের করে দেয়ার উদাহরণ তৈরি না হতো, তাহলে ছেলেরাও সাহস পেত না ছাত্রলীগের কর্মী বা নেতাদের হল থেকে বের করতে। ১৪ জুলাইয়েও নারীরা হলের গেট ভেঙে আগে রাজপথে নেমেছে স্লোগান দিতে দিতে ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার’। পুরো অভ্যুত্থানেও তারা ভাইদের বাঁচাতে গিয়ে নিজেদের জীবন বাজি রেখেছেন। নারীরা যখন আন্দোলন করেন, তখন অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েই তারা পথে নামেন। পুরুষদের কিন্তু অতটা বাধার সম্মুখীন হতে হয় না। সে জায়গা থেকে আমি মনে করি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল শক্তি ছিল নারী শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনে নারী শিক্ষার্থীদের ‘স্টেক’ অনেক বেশি ছিল।

তার পরও কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় থেকে শুরু হয়ে এখন পর্যন্ত আমাদের ওপর সাইবার বুলিং চলছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আইন-শৃঙ্খলার যে অবনতি হয়েছে, তারও মূল ভুক্তভোগী হয়েছেন নারী ও শিশুরা। তারা টার্গেটেড ক্রাইমের শিকার হচ্ছেন। ধর্ষণ, খুন হচ্ছে। এমনকি নারীদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরা যখন ধর্ষণ ও নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলনে নেমেছি, সেই ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনকেও নেতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নেতিবাচক ‘স্টিগমা’ দিয়ে আন্দোলনকে জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে।

এছাড়া ৫ আগস্টে যখন বলা হয়, উপদেষ্টা হিসেবে শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে প্রতিনিধি নেয়া হবে, তখন আমরা নারী শিক্ষার্থীদেরও প্রতিনিধি হিসেবে পেতে চেয়েছি। জানতে চেয়েছি, নারী শিক্ষার্থীরা যেতে পারবে না কেন? তখন বলা হয়েছে, নারীদের কেউ ‘পরিচিত মুখ’ হয়ে উঠতে পারেনি। অথচ পরিচিত মুখ নুসরাত তাবাস্সুম বা উমামা ফাতেমাকেও উপদেষ্টা হিসেবে নেয়া যেত, সেটাও হয়নি। এর অর্থ হলো ‘জাতীয় মুখ’ হিসেবে নারীদের তুলে ধরতেই চায়নি কেউ। নারীদের ‘অটো এলিমিনেটেড’ করে দেয়া হয়েছে। তাদের বক্তৃতা দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়নি আন্দোলনে, তাদের লড়াকু ভূমিকা সামনে আনা হয়নি অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে।

আমাদের বড় বড় সমন্বয়ক এখন পর্যন্ত ধর্ষণবিরোধী একটা কথাও বলেননি। বর্তমানে আমরা রাস্তায় অনিরাপদ বোধ করি। আমার মনে হয় গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে পতিত অপশক্তি এবং ভবিষ্যৎ ফ্যাসিস্টরা একসঙ্গে কাজ করছে। তারা চাইছে, অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নারীদের মধ্যে যে নেতৃত্বের স্পৃহা গড়ে উঠেছে, সে জায়গাটাকে একেবারেই মুছে ফেলতে। এটা বাংলাদেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীদের পিছিয়ে রাখার পাঁয়তারা।