যে সময় আমরা আন্দোলন করেছি সে সময় একটা জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছিল ঠিকই। সেটা আরো অনেকেরই হয়েছিল। সেই জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে নিজের ক্যারিয়ার তৈরি করার যে প্রবণতা আমি দেখেছি, সেটিকে আমি কখনই সমর্থন করিনি। এটা আমার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আমার বিশ্বাস, নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার আরো অনেক পথ আছে।
বাংলাদেশে রাজনীতিতে স্পেশালাইজড মানুষের অভাব স্পষ্ট। যদি বিশেষজ্ঞরা রাজনীতিতে আসে, তবে রাজনীতির মান ও প্রভাব দুটোই বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু দেশে এখনো এ ধরনের চর্চা নেই। রাজনৈতিকভাবে কাউকে তার শিক্ষাগত বা গবেষণার জায়গায় অর্থায়নের বিষয়টি আমাদের এখানে হয় না। সব ব্যয় আমাদের নিজেদের বহন করতে হয়। এ বাস্তবতা বিবেচনা করে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে বর্তমানে নিজের শিক্ষাগত ও পেশাগত ভিত্তি তৈরি করাই জরুরি। অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি আমরা সবাই দেখেছি, রাজনৈতিকভাবে কোনো দলে যুক্ত হতে হয় অথবা নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করতে হয়। এছাড়া কিছু করা সম্ভব না। এসব বিবেচনা করে আমি এখন আমার ক্যারিয়ারের দিকে মনোনিবেশ করছি।
নারী হিসেবে রাজনীতিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার জায়গাটা বাংলাদেশে কতটুকু আছে?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে হালাল পথে চলে কতটা টিকে থাকা যায় সেটা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। তরুণদের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে যারা পড়াশোনা করছে, তাদের একাডেমিক এবং বিশেষজ্ঞ সেক্টরে অবদান রাখার সম্ভাবনা অনেক বেশি। সবাইকেই মাঠের রাজনীতি করতে হবে বিষয়টি তো এমন নয়। দেশের প্রতিটি জায়গায় উন্নয়নমূলক কাজের জন্য বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা হলো বিশাল জনগোষ্ঠীর মেধাশূন্যতা। আমাদের জনশক্তি আছে। কিন্তু অনেকেই বিদেশে নিম্নমানের কাজ করছে। তাদের মধ্যে আবার বড় অংশই নারী। এ সমস্যার সমাধান কেবল রাজনীতি দিয়ে সম্ভব নয়। প্রান্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে সুপরিকল্পিত উন্নয়নমূলক কাঠামো তৈরি করতে হবে। তবে বর্তমানে কাউকে এমন নিখুঁত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে দেখছি না। বরং রাজনৈতিক বিতর্ক ’৭১ ও ’২৪-এর প্রসঙ্গের মধ্যে আটকে আছে। যারা সুপরিকল্পিত উন্নয়নের কথা ভাবেন, তাদের কোনো সুযোগ বা সমর্থন নেই। পূর্বসূরিরা যারা এ ধরনের চিন্তাভাবনা নিয়ে রাজনীতিতে এসেছিলেন, তারা এক পর্যায়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গিয়েছেন। ইতিহাস এবং বাস্তবতা তাই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে রাজনীতিকে আদর্শ পেশা হিসেবে নেয়া এখনো কঠিন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে যেকোনো আন্দোলনে নারীরা সক্রিয় ছিল। চব্বিশের অভ্যুত্থানে সক্রিয় থাকতে গিয়ে আপনি ছিলেন। নারী হিসেবে আপনার সংগ্রামটা কি আপনার পুরুষ সহযোদ্ধার মতোই ছিল নাকি একধাপ বেশি ছিল?
অবশ্যই নারী হিসেবে সামাজিক একটা প্রতিবন্ধকতা সবার আগে চলে আসে। মাঠের অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি সেটিকেও মোকাবেলা করতে হয়েছে। আমরা তো এ সমাজ থেকেই উঠে এসেছি। নারীদের ক্ষেত্রে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন আমরা সবাই জানি। আমার যে পুরুষ সহযোদ্ধা আমারই সঙ্গে অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনে নেমেছে, তাকে যেভাবে গ্রহণ বা উদযাপন করা হয়েছে, আমাকে কিন্তু সেভাবে করা হয়নি। বরং যখন আন্দোলনে তার ভূমিকা, সফলতা ও সংগ্রাম নিয়ে আলোচনা করা হয়, তখন একই সময় আলোচনা হয় আমার চরিত্র, পোশাক আর বন্ধুদের নিয়ে। চায়ের দোকানে আলাপের বিষয় হয়ে ওঠে নারীর চরিত্র।
আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োকেমিস্ট্রিতে পড়েছি, বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করেছি এবং রাজনীতিতে সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। তবুও সমাজে আমার পরিচয় নারী নিয়ে সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে আটকে আছে। তবে নারী পরিচয়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আলাদা সুযোগ নেয়ার কোনো চেষ্টা আমি করিনি এবং ভবিষ্যতেও করব না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের নিরাপদ, আবাসন, স্যানিটেশন এমনকি নিজের হলে প্রবেশে বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য কি বিদ্যমান আছে? আপনার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কেমন কাটছে?
আসলে ছাত্রলীগের সময়ও আমাদের মেয়েদের হলগুলো ওই অর্থে দখল হয়নি। হ্যাঁ, খুব কম সংখ্যায় হলে কিছু রুম ছিল ছাত্রলীগের, প্রশাসনের ওপর তাদের একটা নিয়ন্ত্রণ ছিল। কিন্তু মেয়েদের সরাসরি সিট দখল করে রাখা, তাদের উঠতে না দেয়া, এগুলো ওই অর্থে ছিল না। এখনো নেই। কিন্তু ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা, ভবঘুরেদের বিচরণ—এগুলো নিয়ে তখনো নারীদের নানা হয়রানির স্বীকার হতে হয়েছে। এখন ক্যাম্পাসে নির্বাচিত হয়ে একটা কর্তৃপক্ষ এসেছে, সেটি হলো ডাকসু। নারীদের ক্ষেত্রে যেসব পরিবর্তন বা সিদ্ধান্ত তাদের নেয়া উচিত, সেটা তারা যথেষ্টভাবে নিতে পারছে বলে আমার মনে হয় না। তারা প্র্যাক্টিক্যালি ভাবছে না। তারা দেখলাম, অন্য সব বিষয়ের চেয়ে ‘মাতৃত্বকালীন’ নানা সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বেশি চিন্তিত। মাতৃত্বকালীন ছুটি, যেসব নারী শিক্ষার্থীদের সন্তান আছে; তাদের জন্য নানা সুযোগ-সুবিধা নিয়েই তাদের কার্যক্রম বেশি। কিন্তু এটি একটা বিশ্ববিদ্যালয়। খুব বাস্তবসম্মতভাবে চিন্তা করলে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর সন্তান নেই, তারা বিয়েও করেননি। সাধারণত অনার্স শেষ করার পরই বিয়ের বিষয়টি আসে। নারী শিক্ষার্থীদের আরো অনেক অসুবিধা আছে। টিএসসিতে নারীদের ওয়াশরুমের অবস্থা খারাপ। কিন্তু তারা মেইনস্ট্রিম নিয়ে চিন্তা না করে সাইডস্ট্রিম নিয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ডাকসুর আগে নারীদের জন্য যা যা সুবিধা ছিল, তাই আছে। নতুন করে তেমন কোনো কাজ করা হয়নি। শুধু ফ্রি স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবস্থা করাই যদি একমাত্র নারীবান্ধব কাজ মনে করা হয়, তাহলে আমার কিছুই বলার নেই।
নারীদের সাইবার বুলিং প্রতিরোধে করণীয় কী বলে মনে করেন?
বাংলাদেশে আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। নারীদের সাইবার বুলিংয়ের ক্ষেত্রে আইনের আশ্রয় নেয়াকেই অনেক সময় নিরুৎসাহিত করা হয়। পুলিশও অনেক সময়ই ‘মামলা না করে আপস সমাধানের’ কথা বলে। এক্ষেত্রে সরকারের সচেতনতা কর্মসূচি প্রয়োজন। প্রচারমাধ্যমে সাইবার বুলিং সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করা দরকার। সামাজিক ও প্রযুক্তিগত মাধ্যমে নারীরা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হলে এ সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। অনেক পুরুষ জানেই না কোনটা করা যাবে, কোনটা করা যাবে না। সেটি নিয়েও কাজ করতে হবে।
নারীদের কর্মসংস্থানের উন্নতিতে আপনার পরামর্শ কী?
প্রথমেই বলব নারীদের ক্ষেত্রে স্বল্পসুদে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থাটা বাড়াতে হবে। অল্প সুদে ঋণ পেলে অনেক নারীই নিজের ব্যবসা শুরু করতে পারে। এখন তো অনেকে উদ্যোক্তা হচ্ছে, যারা একটু অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল। কিন্তু ঋণের ব্যবস্থাটা করলে প্রান্তিক পর্যায়েও নারীরা স্বাবলম্বী হতে পারবে। শুধু প্রান্তিক পর্যায়ে না, বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটখাটো উদ্যোক্তা হতে পারবে। আর যেসব নারী কর্মসংস্থান নিয়ে কাজ করছেন, তাদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো সচেতন হতে হবে। সবশেষে আইনের প্রয়োগটা থাকতে হবে।










