আমি নিজেই তাদের দেখে ব্যক্তিগতভাবে খুবই অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। আমরা যা পারিনি, এই বাচ্চা বাচ্চা মেয়েরা তা পেরেছে। কিন্তু পরে খুব দ্রুত দেখলাম নারীরা অদৃশ্য হয়ে গেল। এতে আমি খুবই মর্মাহত হয়েছি। দুঃখও হয়েছে। আবার রাগও হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সময় স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সরকারে নেয়া হলো। কিন্তু সেখানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুজনই নেয়া হলো পুরুষ। সেটা আমার কাছে খুবই আপত্তিকর মনে হয়েছে। কারণ আন্দোলনে নারী-পুরুষ সমানভাবে পাশাপাশি ভূমিকা রেখেছে।
আন্দোলন যখন তুঙ্গে, প্রথমে রোকেয়া হলের মেয়েরাই কিন্তু রাত ১২টায় বেরিয়ে এসেছিল। তাদের যে সাহসী ভূমিকা ছিল, সরকার গঠনের সময় সেটি উপেক্ষা করা হয়। সরকারে নারী ছিল। কিন্তু নারী শিক্ষার্থীকে নেয়া হয়নি। এটা আমার কাছে ভালো লক্ষণ মনে হয়নি। তখনই মনে হয়েছিল, আমরা তবে তিন পা এগিয়ে চার পা পিছিয়ে গেলাম কিনা!
পরে একই ধারাবাহিকতা দেখা যায়। নারী কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেয়ার সময় অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানের কাছে খুব উৎসাহব্যঞ্জক প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলাম। এটি দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে দ্রুত ছাপানোর ব্যবস্থার কথা বলা হয়। আরো বলা হয়েছিল, এটি দ্রুত ইংরেজিতে অনুবাদ করা হোক। কারণ অনেক দেশ থেকেই এ বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই হেফাজতে ইসলাম একটি বড় জনসভা করে শুধু এ প্রতিবেদনকেই প্রত্যাখ্যান করেনি, গোটা কমিশনকেই প্রত্যাখ্যান করেছে। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে গালিগালাজ করা হয়েছে। তখন আমরা আশা করেছিলাম, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে একটি কড়া প্রতিবাদ আসবে। কিন্তু তারা নিশ্চুপ ছিল। এতে আমরা খুবই আশাহত হয়েছি।
হেফাজতের আপত্তি ছিল মাত্র তিনটি সুপারিশ নিয়ে। তারা চাইলে সেটি প্রত্যাখ্যান করতেই পারে। আমরা তো কখনো ভাবিনি যে সবাই সব সুপারিশ মেনে নেবে। আমরা মোট ৪০০টি সুপারিশ দিয়েছিলাম। আমি সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলাম, যদি এর মধ্যে ২০০টিও বাস্তবায়ন হয়, তাহলেও নারীর অগ্রগতির পথ অনেকটাই সুগম হবে। কিন্তু এত গালিগালাজের পর যখন কোনো প্রতিক্রিয়া এল না, তখন মনে হলো আমরা কার ওপর ভরসা করলাম!
এখন অবশ্য নতুন সরকার এসেছে। আমরা নতুন করে আশা করছি, হয়তো এবার ভিন্ন কিছু দেখব। যদিও এখনো সেই পরিবর্তন চোখে পড়েনি। তবু আমি আশা ছাড়িনি। সরকার ক্ষমতায় এসেছে বেশি দিন হয়নি। সময় দিলে হয়তো ভিন্ন চিত্র দেখা যাবে। আমরা সরকারের সঙ্গে বসার জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট চেয়েছি, যাতে আমাদের প্রতিবেদনের মূল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা যায়।
সংস্কার প্রস্তাবগুলো তিনটি মেয়াদের জন্য ভাগ করেছিলাম। একটি মেয়াদ ছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কী করা সম্ভব। আমরা জানি এটি নির্বাচিত সরকার নয়, তবু অধ্যাদেশের মাধ্যমে কিছু কাজ করা সম্ভব। পরবর্তী নির্বাচিত সরকার চাইলে তা বহাল রাখতে পারে বা বাতিল করতে পারে। দ্বিতীয় মেয়াদ ছিল, নির্বাচিত সরকার এসে কোন বিষয়গুলো বিবেচনা করবে। আর তৃতীয় মেয়াদে ছিল নারী আন্দোলনের স্বপ্ন। অনেকে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, স্বপ্ন কেন লিখলেন? আমি বলেছিলাম, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক দলিল। এটি জনপরিসরে আলোচিত হবে, সমালোচিত হবে, তর্ক-বিতর্ক হবে। এর মাধ্যমে মানুষ জানবে, নারী কী চায়, তাদের আকাঙ্ক্ষা কী, তাদের স্বপ্ন কী। সবকিছুতে সবাই একমত নাও হতে পারে। কিন্তু জানাটা জরুরি, আলোচনা হওয়া জরুরি।
এদিকে নতুন সরকার আসার পরও দেখছি নারীর ওপর সহিংসতা বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরীদের ওপর যে ধরনের যৌন সহিংসতা হচ্ছে তা ভয়ংকর, বীভৎস এবং কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আমরা অবশ্যই এর বিচার চাই। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, এ অপরাধ যেন না ঘটে। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি কাজ করতে হবে। সমাজে যে নারীবিদ্বেষী মানসিকতা আছে, সেটিকে পরিবর্তন করতে হবে। নারীকে মানুষ হিসেবে, সহনাগরিক হিসেবে সম্মান করার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। আমাদের স্লোগানই আছে—‘নারীকে মানুষ হিসেবে চিনুন, জানুন, সম্মান করুন’।
শিরীন পারভিন হক: প্রধান, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন










