কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতাকে আমি ‘কৃত্রিম বাস্তবতা’ বলি। এখানে নারী দিবস মানেই পাশ্চাত্যের অনুকরণে কেবল একটি দিনের আনুষ্ঠানিক স্মরণ। অথচ আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে নারী দিবস শুধু ৮ মার্চ হওয়া উচিত নয়, এটি হওয়া উচিত প্রতিটি দিনের লড়াই। বর্তমানে আমরা এমন এক ভয়াবহ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে ধর্ষণের প্রতিবাদ বা বিচার চাইতে গিয়েও নারীদের হত্যার শিকার হতে হচ্ছে। অথচ এ বিষয়গুলো নিয়ে পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক বলয়ে তেমন কোনো কার্যকর প্রতিবাদ বা তৎপরতা চোখে পড়ে না।

আমাদের রাজনীতির মাঠটি গোড়া থেকেই ত্রুটিপূর্ণ। আমরা তৃণমূল থেকে যে ধরনের রাজনীতি দেখে অভ্যস্ত, সেখানে শক্তিমত্তার রাজনীতি প্রাধান্য পায়। এখানে অর্থবিত্ত ও বাহুবল ছাড়া রাজনীতি ভাবার সুযোগ খুব কম।​আরেকটি বড় সমস্যা হলো বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতিকে কৌশলে নারীদের জন্য সীমাবদ্ধ করে রাখা। অনেক প্রভাবশালী পুরুষ রাজনীতিবিদ মনে করেন, যারা ক্রিটিক্যাল অ্যানালাইসিস বা সমাজ পরিবর্তনের তাত্ত্বিক আলাপ করেন, তারা কেবল ড্রয়িংরুমের রাজনীতিবিদ, মাঠে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। এভাবে রাজনীতির পরিমণ্ডলকে জটিল ও কলুষিত করে রাখা হয়, যাতে কেবল যারা শক্তি প্রদর্শনে পারদর্শী, তারাই টিকে থাকতে পারেন। এটি কেবল নারীদের নয়, বরং শক্তিমত্তায় দুর্বল পুরুষদেরও রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। পুরো রাজনৈতিক মাঠই আসলে একটা অ্যান্টি-উইমেন বা নারীবিদ্বেষী ধারণা থেকে পরিচালিত হচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি দেখেছি, যতক্ষণ একজন নারী পুরুষ সহকর্মীদের ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি না করেন, ততক্ষণ কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু যে মুহূর্তে তার যোগ্যতা অন্যদের চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করে, অমনি পুরুষ সহকর্মীদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। তাদের মানসিকতা এমন—‘সে রাজনীতি করবে, কিন্তু আমাকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে না’। দীর্ঘ সময় নারী প্রধানমন্ত্রী থাকার ফলে আমাদের দেশে সব দলের মধ্যে একধরনের অলিখিত সমঝোতা তৈরি হয়েছে যে, নারীদের একটা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত আসতে দেয়া হবে, কিন্তু তার বেশি নয়।

গ্রামীণ ও প্রান্তিক নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে সবচেয়ে বড় বাধা আমাদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার আইনের প্রয়োগ না থাকা। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী নারীরা পিতা ও স্বামী উভয় পক্ষ থেকেই সম্পত্তির ভাগ পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই বললেই চলে। প্রায় ৮০ শতাংশ নারী তাদের প্রাপ্য সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হন। রাজনীতির এ ‘পুরুষালীকরণের’ কারণে গ্রামীণ নারীরা যখন সম্পত্তি বঞ্চিত হন, তখন স্থানীয় প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে তাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। একজন নারীর কাছে যদি সম্পদ না থাকে, তবে তার পক্ষে স্বাধীনভাবে রাজনীতি করা বা স্বাবলম্বী হওয়া অসম্ভব। তাই নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। ​এছাড়া বর্তমানে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে নারীদের সামাজিক সুরক্ষাবলয় নষ্ট করা হচ্ছে। ইসলামে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের যে সামাজিক নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে, তাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে নারীদের ঘরের চার দেয়ালে বন্দি করার চেষ্টা চলছে। তারা এমন একটা পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে যে নারী ঘরে থাকলেই নিরাপদ আর ঘরের বাইরে বের হলে তার নিরাপত্তা দায়িত্ব কারো নয়। রাষ্ট্র ও দলগুলোকে এ অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে এবং সম্পত্তির অধিকার আদায়ের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিতে হবে।

সামান্থা শারমিন: জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক, এনসিপি