ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সুতা বা টেক্সটাইল শ্রমিকদের সেই আন্দোলনের পথ ধরেই আজ আমরা বিশ্বব্যাপী নারী দিবস পালন করছি। কিন্তু ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা নারী অধিকারের খতিয়ান মেলাতে বসি, তখন একদিকে যেমন উন্নয়নের কিছু উজ্জ্বল চিত্র দেখি, অন্যদিকে কাঠামোগত বৈষম্য আর বঞ্চনার এক গভীর ক্ষতও ফুটে ওঠে।
বিগত বছরগুলোয় বাংলাদেশের নারীদের কারিগরি দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এ অগ্রগতির সমান্তরালে একটি অন্ধকার দিকও বিদ্যমান। দারিদ্র্যের কষাঘাতে আজও অনেক মেয়েশিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে। বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ের শ্রমজীবী নারীরা পর্যাপ্ত পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা তাদের কর্মক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের কথা আমরা সগর্বে বললেও বাস্তব চিত্রটি বেশ ধূসর। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও সংসদ নির্বাচনে নারীদের মনোনয়নের হার ৪ শতাংশেরও কম। বর্তমানে রাজনীতিতে নারীদের যে সরব উপস্থিতি দেখা যায়, তার একটি বড় অংশই ‘পরিবারতন্ত্র’ বা ইনহেরিটেন্স পলিটিকসের ফসল। তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে আসা সাধারণ নারীর জন্য রাজনীতির পথ আজও কণ্টকাকীর্ণ। প্রকৃত সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে এই পারিবারিক বলয়ের বাইরে এসে যোগ্য নারী নেতৃত্বকে জায়গা করে দিতে হবে।
শ্রমবাজারের চিত্রটি আরো ভয়াবহ। বাংলাদেশের শ্রমিকরা বিশ্বে অন্যতম সর্বনিম্ন মজুরি পান। যেখানে নারী শ্রমিকদের অবস্থা আরো শোচনীয়। কারখানা পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব নেই বললেই চলে। নারী শ্রমিক হিসেবে আজও নারীরা স্বীকৃতি পাচ্ছেন না, যা চূড়ান্ত অমর্যাদাকর। আবার প্রতিনিয়ত আমাদের দেশে প্লাটফর্ম ওয়ার্কার এবং আউটসোর্সিং ওয়ার্কার বেড়ে যাচ্ছে, যাদের কোনো মজুরি কাঠামো থাকে না। একটি বিশাল অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছে, যারা আজও শ্রম আইনের আওতায় আসেনি। সাড়ে চার লাখের বেশি নারী শ্রমিক এমন আছেন, যারা না পাচ্ছেন মাতৃত্বকালীন ছুটি, না পাচ্ছেন কোনো ন্যূনতম মজুরি কাঠামো।
সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নেও আমরা খুব একটা স্বস্তিতে নেই। উন্নয়নের চাকচিক্য বাড়লেও সমাজে ‘নরপশুদের’ নিষ্ঠুরতা কমেনি। ছোট শিশু থেকে শুরু করে কর্মজীবী নারী—কেউই আজ নিরাপদ নয়। রাস্তাঘাট, কর্মস্থল এমনকি গণমাধ্যমেও নারীরা বিভিন্নভাবে যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। কেবল উন্নয়নের পরিসংখ্যান দিয়ে নারীর প্রকৃত অবস্থা আড়াল করা সম্ভব নয়। আমরা চাই নারীর জন্য একটি নিরাপদ কর্মস্থল, সঠিক শ্রমমূল্য, উন্নত শিক্ষা ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা। প্রবাসী নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং দেশের অভ্যন্তরে আউটসোর্সিং বা প্লাটফর্ম কর্মীদের মর্যাদা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গড়তে হলে রাজনীতি থেকে শুরু করে অর্থনীতি—সব ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ কেবল সংখ্যায় নয়, বরং সমমর্যাদায় নিশ্চিত করতে হবে। তবেই নারী দিবসের প্রকৃত সার্থকতা আসবে।
নাজমা আক্তার: সাবেক পোশাক শ্রমিক এবং ট্রেড ইউনিয়ন নেত্রী










