গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আলোচনা হলেও বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন। অনেক নারীই দলীয় মনোনয়ন পাননি। এমনকি কোনো কোনো দল থেকে নারীদের প্রধান নেতৃত্বে আসার ক্ষেত্রে নেতিবাচক মনোভাবও দেখা গেছে। ৫ শতাংশ নারী মনোনয়নের যে দাবি ছিল, সেটিও পূরণ হয়নি। এ প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাকে আমি একটি আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখি। কারণ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অধিকারের আওয়াজ তোলা ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

নির্বাচনী মাঠের অভিজ্ঞতা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। বড় রাজনৈতিক দল বা জোটের বাইরে নতুন ও ছোট দলগুলোর জন্য লড়াই করাটা সহজ নয়। বিশেষ করে আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং প্রচারণার সীমিত সময়ের কারণে। ঢাকা-১২ আসনে ১৫ জন প্রার্থী থাকায় লড়াইটি ছিল বেশ হাড্ডাহাড্ডি। প্রচারণার সময় আমার ব্যানার ও পোস্টার ছিঁড়ে ফেলার মতো ঘটনাও ঘটেছে। নারী হিসেবে নির্বাচনে লড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, নেতৃত্বের জায়গায় নারীকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সমাজ এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।

নির্বাচনী প্রচারণার মাধ্যমে ঢাকা-১২ আসনের শ্রমজীবী মানুষ ও নারীদের সঙ্গে আমার নিবিড় যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং নারী অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অনেক কাজ করার জায়গা আছে। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের নাগরিকরা সে নারী হোক বা পুরুষ, কিংবা যেকোনো ধর্মের বা জাতিগোষ্ঠীর, সবার নাগরিক মর্যাদা নিশ্চিত হওয়া উচিত। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর সরব উপস্থিতি ছাড়া সমাজের এ ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই সামনের দিনগুলোয় শ্রমজীবী ও নারী অধিকারের এসব প্রসঙ্গ নিয়ে আমরা আরো জোরালোভাবে কাজ করতে আগ্রহী।

নারী দিবসের ইতিহাস ও বেগম রোকেয়ার মতো অগ্রদূতদের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আন্দোলনের রূপ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে। এক সময় দাবি ছিল মজুরি, শ্রমঘণ্টা বা ভোটের অধিকার নিয়ে। পরে তা দাঁড়ায় শিক্ষা ও অর্থনৈতিক মুক্তিতে। কিন্তু বর্তমান সময়ে সবচেয়ে জরুরি হলো নীতিনির্ধারণী ও রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর সক্রিয় ভূমিকা। ভোটারদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি এবং নির্বাচনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। আসন্ন স্থানীয় সরকার ও মেয়র নির্বাচনগুলোয় যদি নারীরা আরো বেশি সংখ্যায় এগিয়ে আসেন এবং নীতিনির্ধারণের জায়গায় আসীন হন, তবেই সমাজে প্রকৃত ভারসাম্য তৈরি হবে।

তাসলিমা আখতার: সদস্য, রাজনৈতিক পরিষদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি, গণসংহতি আন্দোলন ও বিগত নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী