এখনো এসব পুরোপুরি নির্মূল হয়নি, তবে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক নানা ন্যারেটিভের কারণে নারীদের মধ্যে একধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল তাদের স্বাধীনতা, পোশাক, কর্মক্ষেত্র হয়তো একটা নিয়ন্ত্রণের মুখে পড়বে। একধরনের ভীতি তৈরি হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ও অদৃশ্য বিধিনিষেধ চলছিল। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ধ্যার পর মলচত্বরে থাকা যাবে না। বেশি রাত করে কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরার ব্যাপারে একটা ভয় কাজ করছিল। সব মিলিয়ে এক ধরনের ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে সেই ভয়ের মাত্রা কমেছে। ভবিষ্যতে আরো কমবে বলেই আমি আশাবাদী।
এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থী উল্লেখযোগ্য হারে কম ছিল। রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্বে এ অবনমনের কারণ কী?
এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, আমাদের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচন একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া, অর্থায়ন এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, সংগঠিত সমর্থন। আমাদের সমাজে ক্ষমতার চর্চা এবং নেতিবাচক প্রতিযোগিতা আমরা সব জায়গায়ই দেখতে পাই। আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় নারীরা তুলনামূলক সংযত ও নৈতিকতায় দৃঢ় হওয়ায় সে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। উপরন্তু রাজনীতিতে নারীবান্ধব পরিবেশ এখনো পরিপূর্ণভাবে গড়ে ওঠেনি। নারীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, নিপীড়ন, যা পুরুষদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম, এগুলো নারী নেতৃত্বের পথে বড় প্রতিবন্ধক। রাজনীতির পরিবেশ নিরাপদ ও সম্মানজনক করা গেলে নারী নেতৃত্ব বহুদূর এগোবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমি আশাবাদী যে পরিবর্তন আসবে।
নারীদের রাজনীতিতে আসার ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা কতটা জরুরি? আপনি কেমন সমর্থন পেয়েছেন?
পরিবারের সমর্থন একজন নারীর জন্য অপরিহার্য। শুধু রাজনীতিতে নয়, প্রতিটি ক্ষেত্রে। আমি পরিবার থেকে পূর্ণ সমর্থন পেয়েছি বলেই টিকে থাকতে পেরেছি। ২০০৯ সাল থেকে আমার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। তখন আমরা বিরোধী পক্ষে। সে প্রেক্ষাপটে একাডেমিক সহায়তা থেকে দৈনন্দিন ব্যয় সবই পরিবার বহন করেছে। রাজনীতি থেকে উপার্জনের মানসিকতা আমার ছিল না। জেলজীবনেও পরিবার ও দল পাশে ছিল বলেই হারিয়ে যাইনি। তবে আমার অনেক সহকর্মী এ সমর্থন না পেয়ে হারিয়ে গেছেন। রাজনৈতিক পরিবারে জন্মালে সমর্থন তুলনামূলক সহজ হয়। কারো বাবা, মা বা পরিবারের কেউ রাজনীতিতে থাকলে সে হয়তো সহজেই এখানে আসতে পারে। কিন্তু শূন্য থেকে শুরু করা নারীদের সংগ্রাম অনেক কঠিন। কারণ আমাদের সামাজিক পরিবেশ এখনো যথেষ্ট নারীবান্ধব নয়। পরিবার নিরাপত্তার কথা ভেবে কন্যাকে রাজনীতিতে আসতে নিরুৎসাহিত করে। অথচ জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। তাদের বাদ দিয়ে অগ্রগতি অসম্ভব। এ বিষয়ে তৃণমূল থেকেই সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে হবে। দেখুন আমাদের ঘরে আসলে যা চলে, রাজনীতির মাঠেও তাই। একজন গৃহকর্ত্রীর ভূমিকা আর মাঠে রাজনীতিবিদের ভূমিকায় অনেক কিছুই মিল পাবেন। এসব বিষয় যদি সমাজের সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া হয়, ইতিবাচক জায়গাগুলো তুলে ধরা হয়, নারীর নেতৃত্বের জায়গাগুলোকে আরো প্রমোট করা হয়, আমার মনে হয় তাহলেই নারীরা এবং তাদের পরিবার আগ্রহী হয়ে উঠবে। এর একটি বড় উদাহরণ শিক্ষা ক্ষেত্র। একসময় নারীরা পিছিয়ে ছিল। এখন পরিবারই তাদের এগিয়ে নিচ্ছে। ধারাবাহিক কাজের মাধ্যমে অন্যান্য ক্ষেত্রেও এ মানসিকতার পরিবর্তন সম্ভব।
কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী করণীয়?
নারীর নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশে আইন রয়েছে, কিন্তু প্রয়োগ দুর্বল। নতুন আইন প্রণয়নের চেয়ে বিদ্যমান আইন কঠোর ও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন জরুরি। পাশাপাশি সবচেয়ে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন মানসিকতায়। পুরুষ সহকর্মীদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। নারী সহকর্মীর প্রতি সম্মানবোধ গড়ে তুলতে হবে। এ মূল্যবোধ পরিবার থেকেই শিক্ষা দিতে হবে। শৈশব থেকে সামাজিক শালীনতা, সমতা ও শ্রদ্ধাবোধ চর্চা করাতে হবে। এটি তাৎক্ষণিক নয়, ধীরে ধীরে সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবর্তন করা সম্ভব।
ডমেস্টিক ভায়োলেন্স প্রতিরোধে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী?
ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ তুলনামূলক দৃশ্যমান হলেও সমস্যার অবসান হয়নি। আমার মনে হয়, প্রথমে নারীদেরই সচেতন ও সক্রিয় হতে হবে। অনেক সময় ভুক্তভোগী নারী নীরব থাকেন। এর পেছনে বড় কারণ অর্থনৈতিক নির্ভরতা। বিশেষত তৃণমূল পর্যায়ে। অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা না থাকলে প্রতিবাদ বা আইনি পদক্ষেপ কঠিন হয়ে পড়ে। তাই আমি নারীদের অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করার ওপর জোর দিতে চাই, নিয়মিত শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটানো জরুরি।
কার অনুপ্রেরণায় রাজনীতিতে এসেছেন?
তিনি বাংলাদেশের আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে জাতীয় নেতৃত্বে উঠে আসা তার জীবন আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি যদি পারেন, তবে আমিও পারব—এ ভাবনাই আমাকে সাহস দিয়েছে। পাশাপাশি আমার ভাই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে রাজনীতিতে আমাকে সমর্থন ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তাদের অনুপ্রেরণায়ই আজকের এ পথচলা।










