সংগঠনটির উদ্দেশ্য ছিল নারীর সাফ্রেজ (রাজনৈতিক নির্বাচনে ভোটাধিকার) অধিকার নিশ্চিত করা। এমেলিন প্যাঙ্কহার্স্ট ও তার সহযোগীরা পরিচিতি পান সাফ্রাজেট হিসেবে। আর তাদের আন্দোলন ইতিহাসে উল্লিখিত আছে সাফ্রাজেট আন্দোলন হিসেবে।
এ আন্দোলনের মূল দাবি ছিল নারীর ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। উনিশ শতকের শেষ ভাগ পর্যন্ত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার অধিকাংশ দেশে ভোটাধিকার ছিল কেবল পুরুষদের জন্য। এরপর সাফ্রাজেটরা দাবি তোলে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীকে পিছিয়ে রাখা যাবে না। তাদের বক্তব্য ছিল: যেহেতু রাষ্ট্রের আইন, করনীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নারীর জীবনকে প্রভাবিত করে, সেহেতু রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়ায় নারীরও সমান রাজনৈতিক অধিকার থাকতে হবে। দীর্ঘদিন তারা ‘ভোটস ফর উইমেন’ স্লোগানে লন্ডনের রাস্তা প্রকম্পিত করেছেন। তাদের অনেকেই গ্রেফতার হয়েছেন। কেউ কেউ কারাগারে অনশনও করেছেন। তাদের দীর্ঘ আন্দোলনের পর যুক্তরাজ্যে ১৯১৮ সালে নির্দিষ্ট বয়স ও সম্পত্তির শর্তে নারীদের ভোটাধিকার দেয়া হয় এবং ১৯২৮ সালে পুরুষদের সমান ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। আর যুক্তরাষ্ট্রে ১৯২০ সালে সংবিধানের ১৯তম সংশোধনের মাধ্যমে নারীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়। শুধু পাশ্চাত্য নয়, গোটা বিশ্বেই নারী আন্দোলনের ইতিহাসে সময়টিকে দেখা হয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে।
এ আন্দোলন মৌলিক একটি প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। নারী যদি অর্থনীতি, পরিবার ও সমাজে ভূমিকা রাখেন, তবে রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের অংশগ্রহণ কেন সীমিত থাকবে? বিশ শতকে নারী মুক্তি আন্দোলনের বিভিন্ন ধারাও এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকেই আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সাফ্রাজেটরা যখন লন্ডনের রাস্তা প্রকম্পিত করছিলেন, একই সময়ে ইউরোপের অন্যান্য অংশে নারী শ্রমিকদের ভোটাধিকার এবং রাজনৈতিক সমতার দাবি তুলছিলেন ক্লারা জেটকিন ও রোজা লুক্সেমবার্গের মতো নেত্রীরা। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল নারীকে কেবল ‘ভোটার’ নয়, বরং ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। ১৯১০ সালে কোপেনহেগেনে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলনে জার্মান নেতা ক্লারা জেটকিন আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের প্রস্তাব দেন। এ নারী দিবস পালনের প্রস্তাবটি ছিল মূলত একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার। তার যুক্তি ছিল, শ্রমক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও রাজনৈতিক অধিকার না থাকলে সেই অগ্রগতি অসম্পূর্ণ থাকবে।
সে সময় শ্রমিক আন্দোলনের ভেতরে নারীর সমঅধিকারের প্রশ্ন তুলেছিলেন আরেক সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিদ রোজা লুক্সেমবার্গ। তার মতে, রাজনৈতিক অধিকার ছাড়া অর্থনৈতিক সমতা টেকসই হতে পারে না।
ঠিক একই সময়ে এ ভূখণ্ডে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন তার লেখনী আর কর্মের মাধ্যমে নারী মুক্তির ডাক দিচ্ছিলেন। বাংলার প্রেক্ষাপটে নারী শিক্ষা ও সামাজিক মুক্তির প্রশ্নটি তিনিই প্রথম উত্থাপন করেন। তার লেখায় উঠে আসে, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া রাজনৈতিক মুক্তি অসম্ভব। একই সঙ্গে নারী শিক্ষাকে সামাজিক পরিবর্তনের একটি মৌলিক শর্ত হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন লিখেছেন, ‘কন্যাগুলিকে সুশিক্ষিতা করিয়া ছাড়িয়া দাও, তাহারা নিজেরাই নিজেদের অন্নবস্ত্রের সংস্থান করিবে’।
এর এক শতাব্দীর বেশি সময় পর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিকে আবারো সামনে নিয়ে এসেছে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশের সংবিধান নারী-পুরুষের সমান ভোটাধিকার নিশ্চিত করেছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত সব জাতীয় নির্বাচনে নারীরা ভোট দিয়েছেন। সরকার ও বিরোধী দল গঠন-পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান অনুঘটক ছিল তাদের ভোট। আবার যেকোনো আন্দোলন বা অভ্যুত্থানকে সফল করার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো নারীর অংশগ্রহণ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ দৃশ্যমান মাত্রায় হ্রাস পেয়েছে।
সর্বশেষ অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো থেকে নারী প্রার্থী মনোনয়নের হার ছিল আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কম। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্যমতে, গত মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৯৮১ জন। তাদের মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ৭৮ জন। সে হিসাবে মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। মনোনয়ন কমে যাওয়ায় এবারের জাতীয় সংসদে নারী এমপির সংখ্যাও ব্যাপক মাত্রায় কমে গেছে। এবারের নির্বাচনে ভোটযুদ্ধে জিতে সংসদে জনপ্রতিনিধিত্বের সংখ্যা পেয়েছেন মাত্র সাতজন নারী।
এ অবস্থায় নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক অবস্থানকে আরো শক্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ নারী, অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি। এ কারণে আমরা নারীদের ক্ষমতায়ন ও সামাজিক অবস্থান শক্ত করার উদ্যোগ হাতে নিয়েছি। কিন্তু উদ্যোগটি এখনো তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে পারেনি। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে আরো কিছু সময় লাগবে। কারণ নারীদের মধ্যে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সুসজ্জিত করার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিএনপি সবসময় নারীর ক্ষমতায়নে যেমন বিশ্বাস করে। নারী নেতৃত্ব উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় উদাহরণ হলেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। সে সময় কেউ কেউ বলেছিল বিএনপি মাত্র ১০টি সিট পাবে। কিন্তু দেশের মানুষের ভালোবাসা নিয়ে তিনি দলের প্রধান হয়েছেন এবং সংসদ নেতা হয়েছেন। দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছেন। এটি নারীর ক্ষমতায়নের এক অনন্য উদাহরণ। তিনি বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম প্রধানমন্ত্রী। তিনি সেই সময় তার দায়িত্বটি সঠিকভাবে পালন করেছেন। বিএনপির শাসনামলে নারীর ক্ষমতায়নের অনেক উদ্যোগ চিহ্নিত করা যায়। বর্তমান সরকারও যে বিষয়টিকে এগিয়ে নিচ্ছে তার প্রথম উদাহরণ ফ্যামিলি কার্ড।’
এবার সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা বিগত তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর সব স্তরে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘জেতার সক্ষমতা’ বা ‘উইনাবিলিটির’ অজুহাতে নারী প্রার্থী মনোনয়নে একপ্রকার অনীহা দেখা গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যেখানে রাজনৈতিক সক্ষমতায় নারী রাজনীতিবিদরা কোনো অংশেই তাদের পুরুষ সহকর্মীদের চেয়ে পিছিয়ে নেই বলে বারবার প্রমাণ দিয়েছেন, সেখানে এ ধরনের মনোভাব হতাশাজনক।
রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ বাড়াতে নারীকে নিজেকেই এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করছেন সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন এমপি। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘রাজনীতি একটি বিশাল ক্যানভাস, যেখানে মানুষের আবেগ আর অধিকার নিয়ে কাজ করতে হয়। একজন নারী যখন রাজনীতিতে আসেন, তাকে হাজারো সামাজিক ট্যাবুর মুখে পড়তে হয়। বাঁকা কথা শুনতে হয়। আমি নিজেও এ চড়াই-উতরাই পার করে আজ এখানে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার বড় হাতিয়ার হলো “মানসিক জেদ”। যারা রাজনীতিতে সাময়িক সুবিধা নিতে আসেন, তারা বেশিদূর যেতে পারেন না। কিন্তু যারা মানুষের সঙ্গে আত্মিক বন্ধন তৈরি করতে চান, তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হয়। আমাদের সামাজিক কালচারে নারীকে এখনো ঘরকুনো হিসেবে দেখার প্রবণতা আছে। এসব ট্যাবু ভাঙতে হলে আমাদের নারীদেরই এগিয়ে আসতে হবে।’
রাজনীতিতে অংশগ্রহণ লক্ষণীয়ভাবে কমলেও দেশের অর্থনীতি ও শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তিতে নারীর অবদান প্রায় ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ। তাদের বড় অংশই কাজ করছেন তৈরি পোশাক শিল্পে। দেশের প্রধান রফতানি পণ্যের জোগানদাতা এ শিল্পকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণা, আইন পেশা, চিকিৎসা ক্ষেত্র, প্রকৌশলবিদ্যা, গণমাধ্যম, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ সব ক্ষেত্রেই নারী তার মেধা ও দক্ষতার ছাপ রেখে চলেছে পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের অবদান এখন পুরুষের চেয়েও বেশি।
নারী শিক্ষার দিক থেকে অনেকটাই এগিয়েছে বাংলাদেশ। বিগত দশকগুলোয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের ভর্তির হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে ছাত্রীসংখ্যা ছাত্রের চেয়ে বেশি। এর মধ্যে বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান ২০২৪-এ দেখা যায় দেশে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৫১ শতাংশই ছাত্রী। আর শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪-এ উঠে এসেছে, মাধ্যমিক পর্যায়ে (ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী) মোট শিক্ষার্থীর ৫৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ নারী। কলেজ পর্যায়ে এ হার ৫১ দশমিক ৫২ শতাংশ। মাদরাসা শিক্ষায়ও (আলিয়া) নারী শিক্ষার্থীরাই সংখ্যায় এগিয়ে, যার হার ৫২ দশমিক ৯ শতাংশ। যদিও উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের তুলনায় একটু কম। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সর্বশেষ প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনের (২০২৩) তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, অধিভুক্ত কলেজ ও বেসরকারি কলেজে মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রী আছে ৪৬ দশমিক ২১ শতাংশ।
কিন্তু নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে এ সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রতিফলন সীমিত। যদিও সংবিধানসহ স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন সনদে রাজনীতিসহ সব ক্ষেত্রে নারীর সমতামূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিতের বিষয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলাদেশ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন ও সাইবার বুলিং নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র এমপি রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে নারীর অবস্থান সবসময় চ্যালেঞ্জিং। এখন অতীতের চেয়ে আরো বেশি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। তার কারণ হচ্ছে, অতীতে এখনকার ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো এতগুলো মাধ্যম ছিল না। এর সবকিছুই নারীর বিপক্ষে কাজ করছে। একজন নারী যখন সামনে আসেন বা জনপরিসরে কাজ করেন; তখন দেখা যায় যে আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার কাঠামো এত বেশি পুরুষতান্ত্রিক এবং একই সঙ্গে এত বেশি নারীবিদ্বেষী; তার পক্ষে টিকে থাকাটাই একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সেই সঙ্গে যখন আধুনিক যুগের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ ইন্টারনেটের অপব্যবহার যুক্ত হয়, তখন একজন নারীর পথচলাটা আরো অনেক বেশি কঠিন হয়।’
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিইডিএডব্লিউ) গৃহীত হয় ১৯৭৯ সালে। এ সনদে রাজনীতিতে অংশগ্রহণকে নারীর মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এ সনদে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশও। দেশের সংবিধানেও নারী-পুরুষ সমতার নীতি উল্লেখ করা হয়েছে। সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নারীদের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনের নজির রয়েছে ঠিকই। কিন্তু সার্বিকভাবে জনপ্রতিনিধিত্ব এবং রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণে নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের তুলনায় বেশ সীমিত।
বিষয়টিকে ‘প্রতীকী নেতৃত্ব’ ও ‘প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ’-এর মধ্যকার পার্থক্যের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানীরা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, শীর্ষ পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব থাকলেও নিচের স্তরে কাঠামোগত অংশগ্রহণ কম থাকলে সামগ্রিক প্রতিনিধিত্ব বাড়ে না। আর সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব কিছুটা বাড়ানো গেলেও রাজনীতিকে প্রকৃতপক্ষেই নারীর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে এটুকু যথেষ্ট নয়। সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও জনসমর্থন তুলনামূলকভাবে বেশি হয়।
রাজনীতিসংশ্লিষ্টদের দাবি, দলীয় কাঠামোয় নারীর উপস্থিতি কম থাকায় মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় তারা পিছিয়ে পড়েন। অধিকাংশ দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্তরে নারী নেতৃত্ব সীমিত। আবার রাজনীতিতে তাদের কৃতিত্বগুলোও পুরুষের মতো সমান মর্যাদায় উচ্চারিত হওয়ার নজিরও খুব কম।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন শিক্ষার্থী ও সমাজকর্মী উমামা ফাতেমা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক এ কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক বলেন, ‘নারীর ক্ষেত্রে এ সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন আমরা সবাই জানি। আমি আমার নিজের গ্রামেই দেখেছি। আমার যে পুরুষ সহযোদ্ধা অভ্যুত্থানে আন্দোলন করেছে, আমারই সঙ্গে তাকে যেভাবে গ্রহণ করা হয়েছে বা উদযাপন করা হয়েছে, আমাকে কিন্তু সেভাবে করা হয়নি। বরং যখন আন্দোলনে তার ভূমিকা, তার সফলতা, সংগ্রাম নিয়ে আলোচনা করা হয়, সে সময় আমার আলোচনা হয় আমার চরিত্র নিয়ে, আমার পোশাক নিয়ে, আমার বন্ধু কারা; তাদের নিয়ে। চায়ের দোকানে আলাপের বিষয় হয়ে ওঠে নারীর চরিত্র।’
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানকে সামনে নেয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নারী শিক্ষার্থীরা। যদিও গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নারী শিক্ষার্থীদের চলাচল ও আবাসিক নিয়ম নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক হলের সময়সীমা বা প্রশাসনিক নির্দেশনা নিয়ে আন্দোলনে নামতে হয় শিক্ষার্থীদের। এসব বিধিনিষেধও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, অংশগ্রহণ ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নারী শিক্ষার্থীরা মনে করছেন।
সামাজিক-রাজনৈতিক যেকোনো অস্থিরতার সময়ে দেশে নারী নিপীড়ন ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নারীর ওপর ঘটে যাওয়া বেশকিছু মব আক্রমণ ও নিপীড়নের ঘটনা জনপরিসরে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ ধরনের নিপীড়ন, সাইবার বুলিং এবং আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক নানা বিষয় বাংলাদেশে নারীর যথাযথ রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।










