যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইন্টারনেট ইত্যাদি। এর সবকিছুই নারীর বিপক্ষে কাজ করছে। একজন নারী যখন সামনে আসেন বা জনপরিসরে কাজ করেন; তখন দেখা যায় যে আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবার কাঠামো এত বেশি পুরুষতান্ত্রিক এবং একই সঙ্গে এত বেশি নারীবিদ্বেষী; তার পক্ষে টিকে থাকাটাই একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সেই সঙ্গে যখন আধুনিক যুগের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ ইন্টারনেটের অপব্যবহার যুক্ত হয়, তখন একজন নারীর পথচলাটা আরো অনেক বেশি কঠিন হয়।
আমরা বাংলাদেশের সব আন্দোলনে নারীকে কিন্তু সামনের কাতারেই দেখেছি। এমনকি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মিছিলেও নারীরা সামনে ছিলেন। আমার নিজের ফুফু সেখানে মিছিল করেছেন। তিনি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন। এরপর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়েও নারীদের সরব অংশগ্রহণ ও ত্যাগ ছিল। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনে নারীদের অবদান আছে। এর পর চব্বিশের আন্দোলনে অসংখ্য নারী মুখ আমরা দেখেছি। হাসিনাবিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে, অনেক নারী সামনের কাতারে এসেছিলেন। সেই মেয়েগুলোর বেশির ভাগ কিন্তু পরে হারিয়ে গেছে। এই যে সাইবার বুলিং, ট্রল—এগুলো বহু প্রতিভাবান নারীকে তার কাজের জায়গা থেকে, তার আগ্রহের জায়গা থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশে এ মুহূর্তে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় দুটো বড় দল আছে—বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীতে নারীর অংশগ্রহণ শূন্য শতাংশ। আর বিএনপিতে ৩ শতাংশ। এ প্রসঙ্গ টানার কারণ হলো রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে ৫ শতাংশ নারী সরাসরি মনোনয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অন্তত বিএনপি করেছিল। কিন্তু বিএনপি মাত্র ৩ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। আর জামায়াত দিয়েছে শূন্য শতাংশ। অথচ আমাদের ভোটারদের ৫১ শতাংশ নারী। নারীর ভোটে সরকার আসে। নারীর ভোটেই সরকার যায়। নারীর ভোটেই সরকার গঠন হয়, বিরোধী দল গঠন হয়। কিন্তু নারীকে মনোনয়ন দেয়ার ব্যাপারে কৃপণতার ক্ষেত্রে সব দলের অবস্থান একেবারে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। অর্থাৎ এদিক থেকে কে কার চেয়ে বেশি কৃপণ—তা নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলে।
আরেকটি বিষয় হলো আমাদের জুলাই সনদের আগে বিভিন্ন প্রতিবেদন এসেছিল, তার মধ্যে নারী কমিশনের প্রতিবেদনটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। এ প্রতিবেদন নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু প্রতিবেদনের বক্তব্য অনুযায়ী, কাজগুলো করলে হয়তো মেয়েদের জন্য উপকার হতো। কিন্তু সেটা করা হয়নি। এভাবেই নারীরা প্রতি পদে পদে পিছিয়ে যায়। নারীর ইস্যুটা সামনে আসে না।
নারীদের মনে রাখতে হবে যে তারা জনগোষ্ঠীর ৫১ শতাংশ। আপনি মেজরিটি, আপনি সেই শক্তি যার দ্বারা একটি ঘর তৈরি হয়, একটি সংসার তৈরি হয়, একটি জীবন তৈরি হয়। আপনি সেই শক্তি।
প্রতিটি নারীর মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা ভীষণ জরুরি। শিক্ষা এবং আর্থিক স্বাধীনতা এ দুটো যদি একজন নারী পান, তাহলে আর তার পিছিয়ে পড়ার কোনো সুযোগ থাকে না। পরিবারগুলোর প্রতি আমার আহ্বান থাকবে, অন্তত আপনার কন্যাসন্তানকে আপনি শিক্ষিত করে দিন, পরে তার ভাগ্য সে নিজেই নির্ধারণ করবে। আপনার কন্যা সন্তানের ওপর বিনিয়োগ কখনো বিফলে যাবে না। আপনি তার রিটার্ন পাবেন।
নারী প্রতিনিয়ত প্রতিকূলতার মুখে পড়ে। একজন নারীর যুদ্ধ প্রতি মুহূর্তের যুদ্ধ। দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য শক্তির সঙ্গে যুদ্ধ। এ যুদ্ধ নরম-কোমল শব্দ দিয়ে সে লড়তে পারবে না। তাকে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে টিকে থাকতে হবে। আপনার সন্তানকে এমনভাবে গড়ে তুলুন।
নারী এগিয়ে যাবে কি যাবে না, সেটি নারীর ওপরেই নির্ভর করে। কেউ যদি নিজের লক্ষ্য স্থির করে ফোকাসড হয়ে পরিশ্রম করেন, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখেন, কোনো শক্তিই তাকে থামাতে পারবে না।
আমার সংসদের এবারের যাত্রাটা আগেরবারের মতোই কঠিন। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে মূল কাজ হলো আইন প্রণয়ন এবং নীতিনির্ধারণ। সেখানে যেমন আমাকে কাজ করতে হবে, একই সঙ্গে আমার এলাকার মানুষদের প্রতি দায়িত্বও পালন করতে হবে। যারা আমাকে ভোট দিয়েছেন এবং যারা আমাকে ভোট দেননি, যারা নির্বাচনের সহযোগিতা করেছেন এবং যারা আমার বিরোধিতা করেছেন, তাদের সবার প্রতি আমার দায়বদ্ধতা আছে। একবার যখন নির্বাচিত হলাম, তখন শুধু যারা আমাকে ভোট দিয়েছেন আমি তাদের জন্য কাজ করব, বাকিদের জন্য করব না; এটা হতে পারে না। আমি সবার এমপি। সুতরাং আমাকে সবার জন্যই কাজ করতে হবে। আমার এলাকা একটি পিছিয়ে পড়া এবং গরিব এলাকা। সেখানে অসংখ্য কাজ আছে। এসব কাজ সম্পন্ন করা এবং সরকারের কাছ থেকে কাজগুলো আদায় করে আনা, এটাও আমার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
রুমিন ফারহানা: সংসদ সদস্য, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন










