সেনাবাহিনীতে যোগদানের পর মার্চেই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিই। ৩ মার্চ স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় আন্দরকিল্লার তিনটি অস্ত্রের দোকান ভেঙে অস্ত্র সংগ্রহ করি। ২২টি রাইফেল, কিছু পিস্তল, রিভলভার আর গোলাবারুদ হাতে পাওয়ার পর আমাদের মনে হয়েছিল ‘দারুণ কাজ হয়েছে’। কিন্তু না, কয়েক দিনের মধ্যেই বুঝতে পারলাম সামনে কতটা ভয়ংকর পরিস্থিতি আমাদের, মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে অপেক্ষা করছে।
২৬ মার্চ সকালে গুলির শব্দ, বিস্ফোরণ শুরু হয়ে যায়। দলে দলে মানুষ শহর ছাড়ছে। আমাদের ১ নম্বর সেক্টরের টিম কালুরঘাটের দিকে যেতে থাকি। পথে দেখা হয় শওকত হোসেনের সঙ্গে। তার গাড়িতে ছিলেন লে. শমশের মোবিন চৌধুরী (৮ ইস্ট বেঙ্গল)। আমরা বুঝতে পারি, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা উভয় পক্ষের জন্য। পাকিস্তানি বাহিনী যেকোনো সময় আকাশ থেকে হামলা করতে পারে। কিন্তু আকাশ প্রতিরোধের মতো আমাদের প্রস্তুতি একেবারেই ছিল না, ছিল শুধু হালকা মেশিনগান। এ মেশিনগানের ওপর ভরসা করেই শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে, এ চিন্তা মাথায় নিয়েই আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকি।
কয়েকদিন পর কালুরঘাটের দিকে যাওয়ার সময় হঠাৎ আমাদের মাথার ওপর দিয়ে জেট বিমান উড়তে থাকে। জিপ থামিয়ে দৌড়ে একটা বড় কংক্রিটের নর্দমায় (ড্রেন) ঢুকে পড়ি। বেতার কেন্দ্র ছিল প্রায় এক হাজার গজ দূরে। তারপর শুরু হয় গুলিবর্ষণ। দীর্ঘ বজ্রপাতের মতো সেই গুলিবর্ষণের মধ্যেও নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা থাকে। নর্দমার ভেতরে আটতে থাকার সময় সামান্য অস্ত্রে প্রতিরোধের কোনো সুযোগ ছিল না। কয়েক মিনিট পর বিমান চলে যায়, কিন্তু শরীরের কাঁপুনি থামে না। ভাবলাম, যুদ্ধ মানে শত্রুর সামনে বুক চিতিয়ে লড়াই—এটা সত্য। তবে নিজেদের শক্তি-সামর্থ্য বিবেচনায় কখনো কখনো বেঁচে থাকার কৌশলটাও লড়াইয়ের অংশ।
এরপর যুদ্ধ চারদিকে দ্রুতবেগে ছড়িয়ে পড়ে। টাইগারপাস এলাকাটা ছিল পাহাড়বেষ্টিত। এক অপারেশনে পাকিস্তানি বাহিনীকে অ্যামবুশ করা হলেও আমরা জায়গাটা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারিনি। মুক্তিযোদ্ধারা সবাই সরে যান কোর্ট হিলের দিকে। পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে ছিল একে-৪৭ ও আধুনিক রাইফেল। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকের হাতেই পুরনো পয়েন্ট থ্রি নট থ্রি রাইফেল। তবু অসীম সাহসের সঙ্গে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকি। কোথাও পিছু হটে অন্য প্রান্তে গিয়ে আবার শত্রুকে মোকাবেলা করেছি সীমিত শক্তি আর কৌশলের মাধ্যমে।
২ এপ্রিল কোর্টহিলের দিকে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলির মুখে পড়ি, পাশে থাকা একজন সঙ্গী গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যান, বুক থেকে গলা পর্যন্ত কয়েকটি গুলি লাগলে আমি নর্দমায় ঝাঁপ দিয়ে প্রাণে বেঁচে গেলেও ওই সঙ্গীকে আর কখনো দেখিনি। পরবর্তী চকবাজার এলাকার প্রতিরোধ যুদ্ধে আমরা ছিলাম ১০০ জনের মতো। মর্টার, ট্যাংকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলাম। তবু আমাদের সামনের সারির অনেকে হতাহত হয়। আমরাও মর্টারের পাল্টা আঘাত হানলে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ কিছুটা স্তিমিত হয়ে এলে আমাদের কালুরঘাটের দিকে চলে যাওয়ার নির্দেশনা আসে। তবে চকবাজারে ফেলে আসা সরঞ্জাম আনতে গিয়ে পাকিস্তানি এসএসজি কমান্ডো বাহিনীর সামনে পড়ে যাই। কাটা শটগান থেকে গুলি করলে দুজন পাকিস্তানি শত্রুসৈন্য পড়ে যায়। বুঝতে পারি, জীবনে প্রথমবার সামনাসামনি কাউকে হত্যা করেছি। তার পরও যুদ্ধ থামে না, আমরা পড়ে থাকা দুটি একে-৪৭ তুলে নিয়ে পেছনে আসতে থাকি। স্বল্প অস্ত্রে যুদ্ধে নেমে পাকিস্তানি সৈন্যদের হত্যার পর অস্ত্র নেয়া ছাড়া আমাদের উপায়ও ছিল না।
১১ এপ্রিল কালুরঘাট ব্রিজের যুদ্ধ ছিল আমাদের কাছে সবচেয়ে নাটকীয়। দূর থেকে কিছু মানুষকে নিজের লোক মনে হয়েছিল। তবে হাঁটার ভঙ্গি দেখে সন্দেহ হয় যে তারা পাকিস্তানি। মাত্র পাঁচজন মিলে আমরা তখন ব্রিজটি নিজেদের আয়ত্তে রাখার চেষ্টা করি। গুলি শুরু হলে ক্যাপ্টেন হারুন আহমেদ চৌধুরী গুলিবিদ্ধ হন, পেটে রক্তক্ষরণ এত বেশি হয় যে নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসে। গামছা দিয়ে তা ভেতরে ঠেলে, বেঁধে জিপে তুলে তাকে ভেটেরিনারি হাসপাতালে নিয়ে অপারেশন করা হয়। শুধু সাধারণ সুই-সুতার সেলাইয়েও ক্যাপ্টেন হারুনের জীবন রক্ষা হয়।
চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি এলাকার চাপ বাড়তে থাকে। ২ মে রাতের দিকে আমরা রামগড় দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যাই। এরপর ‘মূর্তি’ প্রশিক্ষণ শেষে ৯ অক্টোবর ১৯৭১ কমিশন প্রাপ্ত হই। সেক্টর-১-এ যোগ দিই, যার কমান্ডার ছিলেন মেজর মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, বীর উত্তম। পরে আমাকে মদুনাঘাট সাব-সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব দেয়া হয়। এরপর ছোট ছোট অভিযান, গেরিলা আক্রমণ, হিট-অ্যান্ড-রান সবকিছুই চলতে থাকে। ডিসেম্বরে আসে চূড়ান্ত বিজয়। তার আগে দায়িত্ব নেয়ার পর মীরসরাই, সীতাকুণ্ড, কুমিরা এলাকার কাদামাখা খাল পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া, মাঝে মাঝে হঠাৎ গোলাগুলি ও প্রতিরোধের মধ্যে কেটেছে পুরো নভেম্বর মাস। এর মধ্যে অনেক সহযোদ্ধার চিরবিদায় ছিল মর্মস্পর্শী। তবু আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা জীবনের মায়া ত্যাগ করে পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে থাকেন পাহাড়, নদী আর চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে।
এ প্রতিরোধে আমাদের অগণিত মানুষ সহায়তা করেছে নিভৃতে। সাধারণ মানুষ যদি সাহস করে এগিয়ে না আসত, মাত্র নয় মাসের মধ্যে একটি দেশ শক্তিশালী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধজয় সম্ভব হতো না। আমরা নানা প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধ করেছি, তবে সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে যারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছে তারাও অসামান্য বীরত্ব দেখিয়েছে মুক্তিযুদ্ধে। সাংঘাতিক রকমের অবদান রেখেছে আমাদের গ্রামবাংলার কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র যারা প্রাণের মায়া ত্যাগ করে যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। অনেকেই ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ এমন একটা পরিস্থিতি যেখানে আপনি আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই বাঁচার তাগিদে, দেশ রক্ষার মহান ব্রত নিয়ে প্রতিরোধের অংশ হয়ে যাবেন। আমাদের মুক্তিকামী মানুষ যুদ্ধে নেমেই যুদ্ধ শিখেছিল, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় শত্রুকে মোকাবেলা করার সাহস পেয়েছিল মুক্তিযোদ্ধারা। মাঠের যুদ্ধেরই প্রকৃত প্রশিক্ষণ নিয়েছে অনেক মুক্তিযোদ্ধা।
সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখন। সাক্ষাৎকার গ্রহণ: সুজিত সাহা










