আমরা ক্রেডিট কার্ডকে ক্ষুদ্র ঋণ সুবিধা হিসেবে নয়, বরং গ্রাহকের দৈনন্দিন আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি নিয়ন্ত্রিত ও দায়িত্বশীল টুল হিসেবে বিবেচনা করি। এক্ষেত্রে আমাদের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো প্রতিযোগিতামূলক সুদহার ও স্বচ্ছ ইএমআই কাঠামো, আকর্ষণীয় ক্যাশব্যাক ও রিওয়ার্ড প্রোগ্রাম, ঈদ কেনাকাটায় শীর্ষ ব্র্যান্ডে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত ক্যাশব্যাক, আন্তর্জাতিক মানের ইএমভি চিপভিত্তিক নিরাপত্তা, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম কার্ড কন্ট্রোল, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস মডেল এবং ২৪/৭ কাস্টমার সাপোর্ট।

গ্রাহকদের জন্য আপনারা কত ধরনের ক্রেডিট কার্ড বাজারে এনেছেন?

বর্তমানে আমরা দুটি প্রিমিয়াম সেগমেন্ট—প্লাটিনাম ও উইমেনস প্লাটিনাম ক্রেডিট কার্ড বাজারজাত করছি। করপোরেট ও উচ্চ আয়ের গ্রাহকদের চাহিদা বিবেচনায় আমরা শিগগিরই অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সিগনেচার ক্রেডিট ক্রার্ড চালু করতে যাচ্ছি। এতে প্রিমিয়াম ট্রাভেল সুবিধা, উন্নত নিরাপত্তা ও এক্সক্লুসিভ সার্ভিস অভিজ্ঞতা যুক্ত থাকবে, যা আমাদের পোর্টফোলিওকে আরো পরিপূর্ণ করবে।

রমজান ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আপনাদের বিশেষ অফার কী কী?

রমজান ও ঈদ আমাদের অর্থনীতির অন্যতম বৃহৎ ভোক্তা মৌসুম, যেখানে রিটেইল, ফ্যাশন ও ডাইনিং খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। এ সময়কে সামনে রেখে আমরা ডেটাভিত্তিক সেগমেন্টেশন করে লক্ষ্যভিত্তিক অফার চালু করেছি। যেমন দেশের স্বনামধন্য ব্র্যান্ডগুলোয় সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত ক্যাশব্যাক সুবিধা দেয়া হচ্ছে। নির্বাচিত মার্চেন্টের ক্ষেত্রে দেয়া হচ্ছে বিশেষ ডিসকাউন্ট। এছাড়া শূন্য শতাংশ বা স্বল্পসুদে ইএমআই সুবিধা, ডাইনিং ও লাইফস্টাইল সেগমেন্টে বিশেষ অফার এবং ইফতার ও সেহরিতে খ্যাতনামা রেস্টুরেন্টে বিওজিও (বাই ওয়ান, গেট ওয়ান) সুবিধা দেয়া হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য কেবল বিক্রয় বৃদ্ধি নয়; বরং উৎসবের সময় গ্রাহকের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা।

দেশে কার্ডভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থার সম্প্রসারণে প্রধান অন্তরায় কী?

ডিজিটাল পেমেন্টের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। যেমন পর্যাপ্ত পস অবকাঠামোর অভাব, অসম ও উচ্চ এমআরডি রেট, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রযুক্তি গ্রহণে ধীরগতি, সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতার সীমাবদ্ধতা এবং নগদ লেনদেনের প্রতি দীর্ঘদিনের আচরণগত নির্ভরতা। তবে আমরা আশাবাদী। তরুণ জনগোষ্ঠী ও শহরাঞ্চলে ডিজিটাল লেনদেনের গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বাড়ছে। মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারের সম্প্রসারণ ভবিষ্যতে কার্ডভিত্তিক লেনদেনকে আরো গতিশীল করবে। আমাদের বিশ্লেষণ বলছে, আগামী কয়েক বছরে কার্ড ও ডিজিটাল পেমেন্টের অংশীদারত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে, যদি অবকাঠামো ও সচেতনতা একসঙ্গে অগ্রসর হয়।

কার্ড ব্যবহার আরো জনপ্রিয় করতে আপনাদের কৌশল কী?

কার্ডভিত্তিক লেনদেনকে আমরা দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির একটি কৌশলগত স্তম্ভ হিসেবে দেখি। কার্ডের ব্যবহার বাড়াতে পাঁচটি সুস্পষ্ট অগ্রাধিকারের ওপর ভিত্তি করে আমাদের কৌশল দাঁড় করানো হয়েছে। প্রথমত, দেশব্যাপী মার্চেন্ট নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ।

আমরা শহর থেকে জেলা, এমনকি উদীয়মান বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোয়ও কার্ডের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে কাজ করছি। নতুন মার্চেন্ট টাই আপ এবং সেক্টরভিত্তিক পার্টনারশিপের মাধ্যমে গ্রাহকদের দৈনন্দিন ব্যয়ের প্রতিটি পর্যায়ে কার্ড ব্যবহার সহজ ও স্বাভাবিক করে তুলছি। দ্বিতীয়ত, ইএমআই সুবিধার বিস্তৃতি। পরিকল্পিত ব্যয় ব্যবস্থাপনা এখন গ্রাহকের প্রধান চাহিদা। তাই আমরা শূন্য শতাংশ ও স্বল্প সুদে ইএমআই সুবিধা বিভিন্ন সেক্টরে সম্প্রসারণ করছি। বিশেষ করে ইলেকট্রনিকস, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও লাইফস্টাইল খাতে, যাতে আর্থিক চাপ ছাড়াই গ্রাহক বড় কেনাকাটা করতে পারেন। তৃতীয়ত, ভ্যালু-ড্রিভেন পার্টনারশিপ। এজন্য শীর্ষস্থানীয় রেস্টুরেন্ট, ফ্যাশন, ট্রাভেল ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে আমরা ক্যাশব্যাক, ডিসকাউন্ট ও এক্সক্লুসিভ অফার দিচ্ছি। এতে কার্ড ব্যবহার শুধু সুবিধাজনক নয়, বরং মূল্যসংযোজিত অভিজ্ঞতায়ও রূপ নিচ্ছে। চতুর্থত, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন। কন্ট্যাক্টলেস পেমেন্ট, কিউআর ইন্টিগ্রেশন এবং অ্যাপভিত্তিক কার্ড কন্ট্রোলের মাধ্যমে দ্রুত, নিরাপদ ও স্বনিয়ন্ত্রিত লেনদেন নিশ্চিত করছি। ডিজিটাল সেলফ-সার্ভিস ফিচার গ্রাহককে তার ব্যয়ের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দিচ্ছে। আর পঞ্চমত, উন্নত গ্রাহক অভিজ্ঞতা। ওয়ান স্টপ সার্ভিস মডেল ও ২৪/৭ রিয়েল-টাইম সাপোর্টের মাধ্যমে আমরা একটি ঝামেলামুক্ত অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করছি। আমাদের লক্ষ্য শুধু লেনদেন বৃদ্ধি নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি গ্রাহক আস্থা গড়ে তোলা। আমরা বিশ্বাস করি, কার্ড ব্যবহার তখনই জনপ্রিয় হবে, যখন এটি হবে সহজ, নিরাপদ ও বাস্তব মূল্যপ্রদানকারী।

ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধিতে সরকারের করণীয় কী?

ডিজিটাল রূপান্তরে সরকার এরই মধ্যে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। তবে একটি টেকসই ও আস্থাভিত্তিক ক্যাশলেস ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে কয়েকটি কৌশলগত পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে প্রথমটি হলো পস ও ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণ। বিশেষ করে জেলা ও গ্রামীণ অঞ্চলে কার্ডের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি জরুরি। এমডিআর হারের যৌক্তিককরণও আবশ্যক, যাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের কার্ড গ্রহণে উৎসাহ বাড়ে। ডিজিটাল লেনদেনে কর প্রণোদনার মাধ্যমে গ্রাহক ও মার্চেন্ট উভয়ের জন্য ইনসেনটিভ কাঠামো তৈরি করা দরকার। এর পর রয়েছে সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালীকরণ। এর মাধ্যমে সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলে প্রতারণা ঝুঁকি হ্রাস এবং গ্রাহকের আস্থা বাড়াতে হবে। গ্রাহকের অভিযোগ ও লেনদেন-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি কেন্দ্রীয় ও সময়সীমাবদ্ধ সমাধান কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। কারণ দ্রুত নিষ্পত্তি গ্রাহকের আস্থা ও ব্যবহারের ধারাবাহিকতা বাড়ায়। ইন্টারব্যাংক সেটলমেন্ট, মার্চেন্ট পেমেন্ট এবং রিফান্ড প্রক্রিয়াকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও অটোমেটেড করার মাধ্যমে সুশৃঙ্খল তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারল্যপ্রবাহ স্থিতিশীল থাকে এবং ব্যবসায়িক আস্থা বাড়ে। সহজ অনবোর্ডিং, স্বল্পমূল্যের পস ও ডিজিটাল টুলস সরবরাহের মাধ্যমে এসএমই ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তি সহায়তা এবং গ্রাহকদের ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় সচেতনতা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা জরুরি। দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী এখনো গ্রামীণ অঞ্চলে বসবাস করে। তাদের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে শুধু লেনদেনই বাড়বে না, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, স্বচ্ছতা এবং রাজস্ব কাঠামোও শক্তিশালী হবে। আমরা বিশ্বাস করি, সরকার, ব্যাংক ও প্রযুক্তি অংশীদারদের সমন্বিত উদ্যোগে একটি দ্রুত, নিরাপদ ও আস্থাভিত্তিক ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে উঠবে, যা বাংলাদেশকে একটি আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নেবে।