মাস্টারকার্ডের বৈশ্বিক অবস্থান ও বাংলাদেশে ব্যবসা সম্পর্কে জানতে চাই।
বৈশ্বিকভাবে মাস্টারকার্ড একটি উদ্ভাবনী পেমেন্ট নেটওয়ার্ক। ‘উদ্ভাবনী’"শব্দটি ব্যবহার করছি, কারণ মাস্টারকার্ড তার কার্যক্রমের মাধ্যমে বাজারের অন্যান্য কার্ড থেকে নিজেকে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। বিশ্বের ২১০টি দেশ ও অঞ্চলে আমাদের কার্যক্রম রয়েছে। যদিও মাস্টারকার্ড একটি কার্ড নেটওয়ার্ক, আমরা নিজেদের প্রযুক্তিগত সেবা প্রদানকারী একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছি। তবে আমরা সরাসরি কোনো কার্ড ইস্যু করি না। বিশ্বব্যাপী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্ড ইস্যু করে এবং আমরা তাদের কার্ড ইস্যু করার জন্য প্রযুক্তিগত, লাইসেন্স সহায়তা ও উৎসাহ প্রদান করি।
বৈশ্বিক পেমেন্ট ব্যবস্থায় নতুন নতুন প্রডাক্ট আনার ক্ষেত্রে মাস্টারকার্ড সবসময়ই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। যেমন বাংলাদেশে মাস্টারকার্ড প্রথম বাংলা কিউআর কোড চালু করে এবং কন্টাক্টলেস পেমেন্টসেবাও মাস্টারকার্ডই নিয়ে আসে। অ্যাড মানি সার্ভিসেও আমরাই প্রথম এমএফএসের সঙ্গে ইন্টারঅপারেটিভ কার্যক্রম চালু করি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো সহজ ও নিরাপদ লেনদেন নিশ্চিত করা। আমরা আমাদের সিস্টেমকে যেকোনো সাইবার আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করি। কারণ আমাদের সিস্টেম সুরক্ষিত থাকলে গ্রাহকরাও সুরক্ষিত থাকবেন।
বাংলাদেশে মাস্টারকার্ড ১৯৯১ সালে কার্যক্রম শুরু করে এবং তখন এটি শুধু একটি কার্ড ব্র্যান্ড হিসেবে স্বীকৃত ছিল। ২০১৩ সালে মাস্টারকার্ড বাংলাদেশে অফিস নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সঙ্গে ২১টি ব্যাংক, একাধিক মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠান, ফিনটেক এবং হাজারো মার্চেন্ট কাজ করছে। বাংলাদেশে আসা নতুন পেমেন্ট সলিউশনগুলোর ক্ষেত্রে মাস্টারকার্ড সবসময়ই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে এবং ভবিষ্যতেও নতুন নতুন পেমেন্ট সলিউশন নিয়ে আসার জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশ ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নিয়ে মাস্টারকার্ড কতটা সন্তুষ্ট?
মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের বাজারে থট লিডার হিসেবে কাজ করতে চায় এবং সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি। বাজারে অনেক নীতিমালা থাকে, যা আমাদের নীতিনির্ধারকরা প্রণয়ন করেন। তারা আমাদের মতো পেমেন্ট নেটওয়ার্ক ও ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এসব নীতি কার্যকর করেন। আমরাও আমাদের পক্ষ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করি, যাতে তারা সঠিক ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। গত কয়েক বছরে যেসব নীতিমালা গ্রহণ করা হয়েছে, তার বেশির ভাগই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে এবং ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। তবে সন্তুষ্ট হওয়ার বিষয়টি আপেক্ষিক। আমরা চাই নীতিনির্ধারকরা আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করুন, যাতে পেমেন্ট সেবা আরো সহজ, নিরাপদ এবং সবার জন্য সহজলভ্য হয়।
আমরা অনেক দিন ধরেই ক্যাশলেস সোসাইটির কথা বলছি। যদিও দেশের মানুষ এখনো ক্যাশনির্ভর। এটা কেন? এক্ষেত্রে বাধাটা কোথায়?
আমি বলব, এখনো আমাদের ডিজিটাল অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বাধা হলো নগদ টাকা। আমরা এখনো বলি, ‘ক্যাশ ইজ দ্য কিং’। আমরা যতই অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করি না কেন, প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী এখনো নগদ অর্থের প্রচলন। মাস্টারকার্ড থেকে আমরা প্রতিনিয়ত একটি বিষয় তুলে ধরি—সরকার যদি মনে করে ডিজিটাল পেমেন্টকে উৎসাহিত করার পর্যাপ্ত সক্ষমতা বর্তমানে নেই, তাহলে নগদ লেনদেনকে নিরুৎসাহিত করা হোক। অর্থাৎ নগদ টাকা দিয়ে কিছু কিনলে যেন খরচ বাড়ে। যেমন যদি কেউ দোকান থেকে ১০০ টাকায় একটি সাবান কেনেন, তাহলে দামদর করে কিছুটা কম দামে কেনার সুযোগ থাকে। কিন্তু একই পণ্য ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে কিনলে ১০০ টাকার ওপর অতিরিক্ত ভ্যাট গুনতে হয়। ফলে একজন ভোক্তা কেন বেশি টাকা দিয়ে ডিজিটাল পেমেন্ট করবেন?
তাই বাংলাদেশের জন্য এ মুহূর্তে পুরোপুরি ক্যাশলেস সমাজ গঠন করা সম্ভব নয়। এজন্য আমরা বলছি, ‘ক্যাশলেস’ না হোক, আমরা অন্তত ‘লেস ক্যাশ’ অর্থাৎ নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে আনার দিকে মনোযোগ দিতে পারি। কিছু নির্দিষ্ট এলাকা ধরে পরীক্ষামূলকভাবে কাজ করলে মানুষ ধীরে ধীরে নগদ টাকার পরিবর্তে ডিজিটাল লেনদেনের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারবে। কোনো দেশই রাতারাতি ক্যাশলেস হয়নি—এটি বাস্তবায়ন করতে বিভিন্ন কৌশলগত পদক্ষেপ নিতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সফলতার দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
বাংলাদেশের মতো এত নগদ টাকার ব্যবহার এখন কোন দেশে আছে?
আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এখন নগদ টাকার ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। বাংলাদেশে যদি কাঁচাবাজারে যান, দেখবেন যে নগদ টাকা ছাড়া কেনাকাটা করা প্রায় অসম্ভব। বেশির ভাগ দোকানদার মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসও (এমএফএস) ব্যবহার করতে আগ্রহী নন এবং তারা নগদ লেনদেনের ওপরই বেশি ভরসা রাখেন। বাংলাদেশের মতো এত ব্যাপক নগদ টাকার ব্যবহার অন্য কোথাও নেই।
বাংলাদেশে মাস্টারকার্ড ২১টি ব্যাংকের সঙ্গে কাজ করছে। এক্ষেত্রে কোন ধরনের কার্ডের গ্রাহক ও ব্যবহার বেশি?
মেজরিটি এখনো ডেবিট কার্ড। তবে প্রিপেইড কার্ডও ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এর অন্যতম কারণ হলো এর সহজ কেওয়াইসি প্রক্রিয়া। মাত্র একটি সিঙ্গেল পেজ কেওয়াইসি ফর্ম পূরণ করে এবং জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেই একজন গ্রাহক প্রিপেইড কার্ড পেতে পারেন। এ সহজলভ্যতার কারণে এটি জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ডও বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে, তবে এখন তা বিভিন্ন সেগমেন্ট অনুযায়ী বিভক্ত। যেমন ট্রাভেলের মতো বিশেষায়িত কার্ডগুলো ভালো করছে। আমরা মিলেনিয়াল গ্রাহকদের জন্য বিশেষ কার্ড তৈরি করেছি। আমাদের ক্যাশব্যাক সুবিধাযুক্ত প্রডাক্ট, টেলকোভিত্তিক পেমেন্ট সলিউশন ও করপোরেট গ্রাহকদের জন্য বিশেষ সুবিধাযুক্ত কার্ড রয়েছে।
এফ-কমার্সের (ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসা) বেশির ভাগ উদ্যোক্তা এখনো নগদ টাকার ওপর নির্ভরশীল, বিশেষত নারী উদ্যোক্তারা। তারা সারা দিনের বিক্রির টাকা ডেলিভারি কোম্পানির মাধ্যমে পান, যা হাতে আসতে প্রায় সাতদিন লেগে যায়। এ সমস্যা সমাধানে আমরা দুই বছর আগে একটি ডুয়াল কারেন্সি প্রিপেইড কার্ড এনেছিলাম। বেশকিছু এফ-কমার্স উদ্যোক্তাকে আমরা এ কার্ড সরবরাহ করেছি। এর ফলে কুরিয়ার কোম্পানিগুলো এখন প্রতিদিন তাদের বিল পরিশোধ করতে পারে এবং উদ্যোক্তারা দ্রুত লেনদেন করতে পারছেন। এটি বিশেষভাবে ইন্টারন্যাশনাল বুস্টিং পেমেন্টেও সাহায্য করছে। ফলে নারী উদ্যোক্তারা ধীরে ধীরে নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া ফ্রিল্যান্সার ও আইসিটি ইন্ডাস্ট্রির জন্যও আমাদের বিশেষ কার্ড রয়েছে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক পেমেন্ট সলিউশন প্রদান করা। আবার যাদের ক্রয়ক্ষমতা তুলনামূলক বেশি, তাদের জন্য আমাদের ‘ওয়ার্ল্ড’ ক্যাটাগরির প্রডাক্ট রয়েছে। আমরা ‘ওয়ার্ল্ড এলিট’ নামে একটি বিশেষ প্রডাক্ট বাজারে এনেছি, যেখানে লাউঞ্জ অ্যাকসেসসহ নানা ধরনের বিশেষ সুবিধা ও অফার রয়েছে।
বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ডের বাজার এখনো বলতে গেলে খুবই ছোট। অ্যাকটিভ ক্রেডিট কার্ডহোল্ডার হয়তো ১৫ লাখ হবে। এ বাজার সম্প্রসারণ হচ্ছে না কেন?
দুই বছর আগে ক্রেডিট কার্ডের ওপর বাধ্যতামূলক ট্যাক্স রিটার্ন ধার্য করা হয়। তবে ইনকাম ট্যাক্স অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী, ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত কেউ যদি পার্সোনাল লোন নেন, তাহলে তার জন্য ট্যাক্স রিটার্ন বাধ্যতামূলক নয়। অথচ ক্রেডিট কার্ড একটি লোন প্রডাক্ট হওয়া সত্ত্বেও এক টাকা লোন নিতেও ট্যাক্স রিটার্ন প্রয়োজন হয়। এটি বাজারে ক্রেডিট কার্ডের স্বল্পতার অন্যতম কারণ। এ সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে কাজ করছি। আমরা আশাবাদী যে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ক্রেডিট কার্ডের জন্য ট্যাক্স রিটার্নের বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হবে। এটি বাস্তবায়ন হলে বাজারে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা বাড়বে এবং ডিজিটাল লেনদেন আরো প্রসারিত হবে।
রোজা বা ঈদ উপলক্ষে মাস্টারকার্ডের ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের জন্য আপনাদের অফার কী?
রমজান মাসকে আমরা একটি বিশেষ উৎসব হিসেবে দেখি, যেখানে উৎসবের অর্থনীতি ভিন্নমাত্রা ধারণ করে। মাস্টারকার্ডের পক্ষ থেকে আমরা এ উৎসবের অর্থনীতিকে আরো চাঙ্গা করতে নানা অফার দিয়ে থাকি। এ বছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বাংলাদেশের শীর্ষ ৫০টি রেস্টুরেন্টে মাস্টারকার্ড ব্যবহারকারীদের জন্য ইফতার ও সাহরিতে বিশেষ বাই ওয়ান গেট থ্রি পর্যন্ত অফার দেয়া হচ্ছে, যা দেশে সর্ববৃহৎ। বর্তমানে লাইফস্টাইল ক্যাটাগরির ৪০টি ব্রান্ডে ১৭৫টি আউটলেটে মাস্টারকার্ডের মাধ্যমে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় রয়েছে। দেশের স্বনামধন্য সাতটি গ্রোসারি চেইনে বড় ধরনের অফার চলছে। এছাড়া মানুষ এ সময়ে ভ্রমণে আগ্রহী হওয়ায় ট্রাভেল সেক্টরেও বিশেষ ছাড় দেয়া হচ্ছে। আমাদের মূল উদ্দেশ্য মানুষকে ডিজিটাল লেনদেনের প্রতি আরো আগ্রহী করে তোলা।
বৈশ্বিক রেমিট্যান্সের বাজারেও এখন মাস্টারকার্ডের বড় অংশীদারত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের বাজারে মাস্টারকার্ডের ভূমিকা কী?
২০১৮ সালে আমরা ট্রান্সফাস্ট নামে একটি কোম্পানি অধিগ্রহণ করি। এটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি বৃহৎ রেমিট্যান্স কোম্পানি ছিল। মাস্টারকার্ড এতে বিনিয়োগ করে এর কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করে। আমাদের মাস্টারকার্ড নেটওয়ার্ক বর্তমানে ২১০টি দেশে বিস্তৃত। ফলে এসব দেশ থেকে রেমিট্যান্স পাঠানো ও গ্রহণের কার্যকর পদ্ধতি সম্পর্কে আমাদের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে। বাংলাদেশ সবসময়ই ট্রান্সফাস্টের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার ছিল। বর্তমানে এ সেবার পরিধি আরো বাড়ানো হয়েছে। দেশের মোট রেমিট্যান্স প্রবাহের একটি বড় অংশ মাস্টারকার্ডের মাধ্যমে আসে, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
মাস্টারকার্ড গ্রাহকদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
আমি একটা বিষয় সবসময় বলি—আমাদের মধ্যে ভীতি কাজ করে যে ডিজিটাল লেনদেনে প্রতারণা হবে, হ্যাক হবে—এটা ভুল ধারণা। কার্ডে এমনটা হওয়ার সুযোগ খুব কম। কারণ কার্ডে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, তা সহজে ক্লোন বা হ্যাক করা যায় না। বরং প্রতারণামূলক জালিয়াতি/অপরাধই এখন বেশি সংঘটিত হচ্ছে। আপনার লেনদেন সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব আমাদের মতো নেটওয়ার্কের এবং ব্যাংকের। আপনি শুধু আপনার ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করুন এবং ব্যক্তিগত পিন নম্বর প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকুন। ডিজিটাল লেনদেন আপনার অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে এবং নগদ টাকা বহনের ঝুঁকি থেকে আপনাকে মুক্তি দিচ্ছে।





