১৯৮০ থেকে ১৯৯০ পুরো দশকটিই ছিল বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলকভাবে ব্যাপক বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ ও অনুদানপ্রাপ্তির উদ্বোধনকাল। আগের দশক ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের কাল। সেখানেও বিদেশী সাহায্য-সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা ছিল। তবে তা ছিল অনুদান ও বন্ধুপ্রতিম দেশ থেকে প্রাপ্ত দ্বিপক্ষীয় সাহায্য। সেখানে শর্ত-সাবুদ তেমন ছিল না, দেয়ার ছিল, নেয়ার কথা ছিল না তেমন। কিন্তু আশির দশক থেকে নানা শর্ত ও বাধ্যবাধকতার মধ্যে বিদেশী সহায়তা নেয়া শুরু হয়।
এরই মধ্যে বিদেশী সাহায্যপ্রার্থী দেশের সংখ্যা বাড়তে থাকায় সাহায্যদাতা দেশগুলো দ্বিপক্ষীয় সাহায্য প্রদানের চেয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থায় অর্থলগ্নি করে তাদের মাধ্যমে দরিদ্র দেশগুলোয় সহায়তা দেয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠে। ঠাণ্ডা যুদ্ধের অবসান হওয়ার প্রাক্কালে সাহায্যদাতা দেশগুলোর মধ্যে এ প্রবণতা বাড়তে থাকে। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অর্থনৈতিক সহায়তাদানের জন্য বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্বে সাহায্যদাতা দেশ বা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে ভিন্ন ভিন্ন এইড গ্রুপ গঠিত হয়। বাংলাদেশের জন্য এইড গ্রুপ গঠিত হয় এ দশকেই। এইড গ্রুপের বার্ষিক সভা সাধারণত ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অনুষ্ঠিত হতো বলে সে সময় এইড গ্রুপকে প্যারিস কনসোর্টিয়াম নামেও অভিহিত করা হয়। বাংলাদেশ এইড গ্রুপভুক্ত সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে— যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড ও ফিনল্যান্ড এবং বহুপক্ষীয় সংস্থা এডিবি, আইডিএ, ইসি, ইফাদ, এনডিএফ, ইউনিসেফ ও ইউএনসিস্টেম। নন-এইড গ্রুপভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে— চীন, ভারত, কুয়েত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, দক্ষিণ কোরিয়া, স্পেন, ইউএই এবং বহুপক্ষীয়দের মধ্যে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও ওপেক। এইড গ্রুপের বার্ষিক সভায় উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থাগুলোর সামনে সাহায্যগ্রহীতা দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যাখ্যা করতে হয় সামষ্টিক অর্থনীতির সার্বিক পরিবেশ পরিস্থিতি, বিগত বছরে বেঁধে দেয়া লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অগ্রগতি ও আরোপিত শর্ত পালনে গৃহীত পদক্ষেপ এবং আগামী অর্থবছরের কর্মপরিকল্পনা। জাতীয় অর্থনীতির আন্তর্জাতিক বার্ষিক পর্যালোচনা সভা এইড গ্রুপ মিটিংয়ে সাহায্যদাতা দেশ ও সংস্থাগুলোর প্রকাশিত মনোভাবকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হতো সাহায্যগ্রহীতা দেশের জন্য। দ্বিপক্ষীয় বন্ধুপ্রতিম দেশের সঙ্গে সৌহার্দপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক এইড গ্রুপ সভায় খাতক-মহাজনের তিক্ত আলোচনায় দেনদরবার ও বোঝাপড়ায় পর্যবসিত হতো। বিশেষ করে বাংলাদেশের তত্কালীন সরকারের বৈধতার একটা পরোক্ষ স্বীকৃতি মিলত প্যারিস কনসোর্টিয়াম সভা থেকে পাওয়া সাহায্যের প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ওঠানামার মাধ্যমে। এ দশকে বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয় ও এর দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের প্যারিস সভা মোকাবেলায় অধিক মনোনিবেশ ও পারঙ্গমতা প্রদর্শনের চাপ থাকত। এ দশকে বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেটের সিংহভাগ (কোনো কোনো বছরে শতভাগেরও বেশি) অর্থায়নের উৎস ছিল বৈদেশিক সাহায্য।
১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ মোট ১৪ বিলিয়ন ৪২৮ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সাহায্য পায়। তুলনায় আগের দশকে (১৯৭২-১৯৮০) এর পরিমাণ ছিল ৬ বিলিয়ন ৬০৮ মিলিয়ন ডলার এবং পরের দশকে (১৯৯০-২০০০) ছিল ১৫ বিলিয়ন ৬১৩ মিলিয়ন ডলার। আশির দশকে প্রাপ্ত সাহায্যের মধ্যে অনুদান ৬ হাজার ৭৪০ মিলিয়ন ডলার (৪৬.৭১%) এবং ঋণ ৭ হাজার ৬৮৮ মিলিয়ন ডলার (৫৪.২৯%)। আগের দশকে পাওয়া সাহায্যের অনুদানের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৩৬১ মিলিয়ন ডলার (৫০.৮৬%) এবং ঋণ ৩ হাজার ২৪৭ মিলিয়ন ডলার (৪৯.১৪%)। ১৯৯০-২০০০ সালে অনুদান ৫ হাজার ৮৯ মিলিয়ন ডলার (৩২.৬০%) এবং ঋণ ১০ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ডলার (৬৭.৪০%)। আশির দশকে প্রাপ্ত বিদেশী সাহায্যের মধ্যে খাদ্য সাহায্য ২ হাজার ৬২৮ মিলিয়ন ডলার, পণ্য সাহায্য ৪ হাজার ৪৬৩ মিলিয়ন ডলার এবং প্রকল্প সাহায্য ৭ হাজার ৩৩৭ মিলিয়ন ডলার। এ সময়ে গৃহীত বৈদেশিক সাহায্যের সিংহভাগ ২ হাজার ৮৯ মিলিয়ন ডলার ব্যবহূত হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। এরপর ১ হাজার ২২৩ মিলিয়ন ডলার কৃষি খাতে, যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে ১ হাজার ৯১ মিলিয়ন ডলার, শিল্প উন্নয়ন সহায়তা খাতে ৯৪৫ মিলিয়ন ডলার, পানিসম্পদ সেক্টরে ৭৬৪ মিলিয়ন ডলার। এ সময় শিক্ষা খাতে আসে মাত্র ৩০৬ মিলিয়ন ডলার এবং স্বাস্থ্য খাতে ১৮৩ মিলিয়ন ডলার। এ সময়ে বাংলাদেশে গৃহীত মোট প্রকল্প সাহায্যের ২২ দশমিক ২৯ শতাংশ ব্যবহূত হয়েছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে, ২০ দশমিক ২৭ শতাংশ পরিবহন ও যোগাযোগ (রেলওয়ে, টিঅ্যান্ডটিসহ) খাতে। বাংলাদেশ অর্থনীতির প্রাণ কৃষি ও পানিসম্পদ খাতে ব্যবহূত হয়েছে মাত্র ১৭ শতাংশ। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পল্লী উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের মতো সামাজিক খাতগুলোয় ব্যবহারের পরিমাণ এখন ৯ শতাংশ। এ দশকে সাহায্যদাতা দেশ ও সংস্থার মধ্যে সর্বাগ্রে অবস্থান বিশ্বব্যাংকের (২,৭২৮ মি.ড.), দ্বিপক্ষীয় দাতা দেশ জাপান (২,১৮৩ মি.ড.) ও যুক্তরাষ্ট্রের (১,৩১৯ মি.ড.) অবস্থান যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (১,২৪৩ মি.ড.)। দ্বিপক্ষীয় দাতা দেশ কানাডার (৮৬১ মি.ড.) পুরোটাই ছিল অনুদান। প্রসঙ্গত, এ দশকে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত সহায়তার সিংহভাগ এসেছিল অনুদান আকারে (৯৪৯ মি.ড.)।
আশির দশকে দেখা যায়, বিশ্বব্যাংক মূলত স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট খাতে সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য সরকারকে বড় বড় দাগে থোক ঋণ দিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় তার সিংহভাগ নিজে বাজেট সাপোর্ট আকারে রেখে দিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু ঋণ সাবসিডিয়ারি লোন এগ্রিমেন্টের আওতায় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় পুনরায় লগ্নি করেছে। এ দশকে বিশ্বব্যাংক থেকে পাওয়া পাঁচটি প্রধান পোর্টফোলিও ঋণ হলো— ১৯৮৬ সালের থার্টিনথ ইম্পোর্ট সাপোর্ট (১৮৭ মি.ড.), ১৯৮৭ সালের ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টর কমোডিটি ক্রেডিট (১৪৮ মি.ড.), ১৯৮৯ সালের এনার্জি সেক্টর অ্যাডজাস্টমেন্ট (১৩৭ মি.ড.), ১৯৮৪ সালের টুয়েলফথ ইম্পোর্ট সাপোর্ট (১৩৫ মি.ড.) এবং ১৯৯০ সালের ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর অ্যাডজাস্টমেন্ট (১৩৩ মি.ড.)। এ সময় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও সরকারকে শুধু বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেক্টরের জন্য বড় বড় স্ট্রাকচালার অ্যাডজাস্টমেন্টের কভারে ঋণ দিয়েছে। এ সময় এডিবির পাঁচ প্রধান ঋণ কিস্তি হলো— ১৯৮৯ সালের এইটথ পাওয়ার (১৩০ মি. এসডিআর); ১৯৮৪ সালের সিক্সথ পাওয়ার (১১৪ মি. এসডিআর), ১৯৮৭ সালের রোড ইমপ্রুভমেন্ট (১০৮ মি. এসডিআর), ১৯৮৪ সালের পাওয়ার ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন (৭৮ মি. এসডিআর) এবং ১৯৮৬ সালের ন্যাচারাল গ্যাস (৬৮ মি. এসডিআর)। থোক প্রকৃতির এসব ঋণের অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ওঠে দুর্নীতির অভিযোগ। আরো লক্ষণীয়, এসব ঋণ অধিকাংশই গৃহীত ও ব্যয়িত হয়েছে ১৯৮৯ ও ১৯৮৪ সালে। দ্বিপক্ষীয় দাতা দেশ জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র এ সময়ে অনুদান দিয়েছে বেশি। যথাক্রমে সড়ক সেতু নির্মাণে এবং খাদ্যশস্য আকারে। জাপান এ দশকে যমুনা ফার্টিলাইজারে ৩১ বিলিয়ন ইয়েন, ঘোড়াশাল সার কারখানায় ১০ বিলিয়ন ইয়েন এবং ১৩ বিলিয়ন ইয়েন কমোডিটি লোন দিয়েছে।
বাংলাদেশ বৈদেশিক সাহায্য-সহায়তার ওপর কতটা নির্ভরশীল হবে— এ প্রশ্ন এ দশকেই উঠে আসে সবার সামনে। তাগিদ আসে, বৈদেশিক সাহায্য-সহায়তা সীমিত সময়ের জন্য গ্রহণ করে নিজেকে স্বয়ম্ভর করে তোলাই শ্রেয়। কেননা সহায়তা সবসময় একই পরিমাণে, শর্তে ও উৎস থেকে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। বিশ্বের আর্থরাজনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তনের ওপর সাহায্য-সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও তারতম্য ঘটে থাকে। নব্বইয়ের দশকের আগ পর্যন্ত সারা বিশ্ব ছিল দুটি শিবিরে বিভক্ত। বাংলাদেশের মতো প্রার্থী দেশের সংখ্যা তখন ছিল গোটা বিশেক। দুই শিবিরই চাইত এসব উন্নয়নশীল দেশকে সাহায্য করে নিজেদের প্রভাববলয়ে রাখতে। ফলে সাহায্য-সহযোগিতা প্রাপ্তির ব্যাপারে তেমন বেগ পেতে হতো না। ঋণ পেলেও সহজ শর্ত তো ছিলই, এমনকি দ্বিপক্ষীয় ঋণ মওকুফও হয়ে যেত। বহুপক্ষীয় সংস্থা থেকে পাওয়া ঋণের ক্ষেত্রে শর্ত বা খবরদারিও ততটা ছিল না। নব্বইয়ের দশকে ঠাণ্ডা যুদ্ধের অবসানে বিশ্ব যখন এক শিবিরের নেতৃত্বে এল, তখন সাহায্যপ্রার্থী দেশের সংখ্যাও বেড়েছে। এখন বাড়তি খাতির করার যৌক্তিক কারণ আর নেই। ফলে দ্বিপক্ষীয় সহায়তা বেশ কমেছে এবং এমনকি বহুপক্ষীয় ঋণপ্রাপ্তিও দুরূহ হচ্ছে। ঋণ অনুমোদন ক্ষেত্রে শর্তও বাড়ছে, খবরদারিও বাড়ছে। অবস্থাটা এখন— দরিদ্র চাষী রহিম মিয়ার মতো। গ্রামের দুই মোড়ল মৃধা আর চৌধুরীর মধ্যে আভিজাত্য আর আধিপত্যের দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। রহিম মিয়া চৌধুরী সাহেবের দূর সম্পর্কীয় আত্মীয়। আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় লোকবল লাগে। রহিম মিয়া চৌধুরীর লোক। হাতে রাখার জন্য চৌধুরী সাহেব তাকে খাতির করতেন। চৌধুরীর কাছ থেকে ধার-কর্জ নিলেও তা শোধের ব্যাপারে তেমন তাড়া থাকত না। এরই মধ্যে মৃধা সাহেবের মৃত্যু হওয়ায় তার ছেলেরা বাপের প্রতিপত্তি বজায় রাখার হিম্মত পায় না। ফলে গ্রামে চৌধুরী সাহেব এখন সর্বেসর্বা। ইদানীং রহিম মিয়া লক্ষ করেন চৌধুরী সাহেবের আলাপ ব্যবহারে বেশ পরিবর্তন। রহিম মিয়ার ডাকও তেমন পড়ে না চৌধুরী বাড়িতে। প্রয়োজনে সাহায্য চাইতে গেলে চৌধুরী সাহেব এখন নানা অজুহাত তুলেন। বলেন, ‘রহিম মিয়া, দ্যাখ, আমার বয়স হয়েছে, ছেলেরা বড় হচ্ছে, সংসারের খরচ বাড়ছে, সংসারের আয়-ব্যয়ে এখন তাদের মতামত শুনতে হচ্ছে। টাকা-পয়সা হাতেও রাখতে পারিনে। ব্যাংকে রাখতে হচ্ছে। আমি তোকে তো আর আগের মতো সাহায্য করতে পারছিনে রে। তোর যখন টাকার এত দরকার, এক কাজ কর, তুই বরং ব্যাংকে যা। ব্যাংকের ম্যানেজার আমার মেয়ের জামাই, তাকে বলে দেব।’ রহিম মিয়া ব্যাংকে গেলে ব্যাংকের ম্যানেজার বলেন, ‘চাচা, ব্যাংকের টাকায় সুদ অনেক, আমি কমাতে পারব না, আর কিছু বন্ধক বা কোলেটারাল না রেখে তো লোনই দিতে পারব না। আমি ব্যাংকে চাকরি করি। আমাকে তো নিয়মকানুনের মধ্যে চলতে হয়।’ দূর আত্মীয় হিসেবে আগে আবদার করলে চৌধুরী সাহেব ধারকর্জ মাফ করতে পারতেন। এখন ব্যাংক ম্যানেজার বলেন, মাফ করা তো দূরের কথা, সুদাসল যথাসময়ে শোধ না দিলে আরোপিত সুদ দণ্ড সুদ বাড়তেই থাকবে।
রহিম মিয়া এতদিন চৌধুরী সাহেবের দয়াদাক্ষিণ্য, খাতির-যত্ন পেয়ে, অনেকটা আলসেমি করে, বেহুদা খরচপাতি বাড়িয়ে নিজে তেমন একটা কিছু করেননি। সংসার তার বড় হয়েছে। আয়ের উৎস, উপায় না বাড়লেও দায়দায়িত্ব বেড়েছে। সংসারে এখন তার সাহায্যের বেশি দরকার। ঠিক এ সময় চৌধুরী সাহেবের এ আচরণ আর সামান্য অর্থ ঋণ করতে গেলেও ব্যাংকের যা বাড়াবাড়ি, তাতে রহিম মিয়ার চোখে শর্ষে ফুল দেখার মতো অবস্থা। বর্তমান বিশ্বে সাহায্যপ্রার্থী দরিদ্র দেশগুলোর অবস্থা এখন রহিম মিয়ার মতো। ব্যাংক এখন আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা। দরিদ্র দেশগুলোর দ্বিপক্ষীয় সাহায্য দেয়ার চেয়ে যেখানে ধনী দেশগুলো কিনছে শেয়ার, ফলে সেখানে বাড়ছে তার প্রতিনিধিত্ব, ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডে বাড়ছে তার প্রভাব। ব্যাংক বোর্ডসভার মাধ্যমে নানা শর্তারোপ করা সহজ সাহায্যপ্রার্থী দেশগুলোর কাছে। প্রকারান্তরে নিয়ন্ত্রণ প্রয়াস। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার টেবিলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের খাতির ও চক্ষুলজ্জার স্বার্থে কড়া কড়া কথা বলা যায় না, যা বলানো যায় ব্যাংকের বেতনভুক কর্মচারীদের দিয়ে, যারা অধিকাংশই শেয়ারহোল্ডার দেশের মনোনীত। সাহায্যপ্রার্থী উন্নয়নশীল দেশগুলোকে যারা হাসতে হাসতে বলে, We appreciate your problem, but... যারা কথার মারপ্যাঁচে এটাও জানান দেয় যে, তোমার দেশের জন্য ক্ষতিকর হবে কিনা, সেটা আমি জানিনে বাপু, এ শর্ত না মানলে তোমাকে অন্য কোনো সহায়তা দেয়ার জন্যও বিবেচনা করা হবে না।
গ্রহীতা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে বৈদেশিক সহায়তা বেশ তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু অনুসন্ধান ও জরিপে দেখা যায়, বাস্তবতা হলো, প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ ভ্রমণ ব্যয় বেড়েছে প্রকল্পে, প্রশিক্ষণার্থীকে পরে সে কার্যালয়ে কর্মরত পাওয়া যায় না, যেখানকার কর্মদক্ষতা বাড়ানোর জন্য তাকে পাঠানো হয়েছিল প্রশিক্ষণে। বৈদেশিক সহায়তায় বাস্তবায়িত প্রকল্পে গাড়ি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধায় প্রকল্প পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জীপনযাপন হঠাৎ করে পরিবর্তিত হয়। ক্রমান্বয়ে মনে হবে তারা এইড অ্যাডিক্টেড হয়ে পড়ছেন। প্রকল্প সাহায্য যেভাবে হোক পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় পেয়ে বসে। ফলে এইড নেগোশিয়েশনের সময় অনেক অগ্রহণযোগ্য শর্ত মেনে নেয়ার বিরুদ্ধে যুক্তি জোরালো হয় না। যেসব কর্মকর্তা বা কর্তৃপক্ষ এইড নেগোশিয়েশন পর্বে থাকেন, তারা হয়তো ভাবেন— এ প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্বে তারা থাকবেন না, সুতরাং অগ্রহণযোগ্য শর্তের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নেয়া হয়ে ওঠে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরুর প্রাক্কালে আরোপিত শর্তাবলি পূরণে হিমশিম খেতে হয় প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষকে। দেখা যায়, এইডের একটা বড় অংশ খরচ করতে হচ্ছে অনুৎপাদনশীল খাতে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০ ডলারের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কাজ বা উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ব্যয়িত হয় সাকল্যে ২০-৩০ ডলার। বাকি ৭০-৮০ ডলারের মধ্যে প্রায় ৩৫ ডলার চলে যায় বিদেশী কনসালট্যান্টের ব্যয়, বর্ধিত মূল্য ধরায় যন্ত্রপাতি/সেবা সংগ্রহ ব্যয় বাবদ ১০-১২ ডলার, ক্রয় ও সংগ্রহে দুর্নীতি অপচয়/আত্মস্ব্বার্থে যায় ১০-১৫ ডলার, আর অঙ্গীকার চুক্তি স্বাক্ষরের তারিখ ও প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যবর্তী সময়ে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারের অবমূল্যায়নজনিত ক্ষতিতে নিঃশেষ হয় আরো ১০-১২ ডলার। এভাবে বিদেশী সাহায্যের প্রকৃত উপযোগিতা যায় হারিয়ে।
প্র্রাপ্ত বৈদেশিক সহায্যের প্রকৃত উপযোগিতা যখন এ পর্যায়ে তখন সেই আশির দশকে বৈদেশিক সাহায্যপ্রাপ্তিকে অনেক সময় দেশ বা সরকারের বিশেষ সাফল্য বিবেচনা করে তা ফলাও করে প্রচারের প্রবণতা পরিলক্ষিত হতো। এইড গ্রুপ মিটিংয়ে বিদেশীরা কত সাহায্য দেবে কি দেবে না, তা মিডিয়ায় বেশ প্রচার পেত। চায়ের টেবিলে আলোচনার ঝড় উঠত। দাতারা ঋণ বা খয়রাত না দিতে চাইলে কিংবা তাদের কঠিন শর্তের ঋণ গ্রহণযোগ্য না হলে তাকে প্রার্থী দেশের দুর্বলতা ভাবা হতো। সময়ে সময়ে দাতা দেশ ও সংস্থার আরোপিত নানা সংস্কার কর্মসূচির প্রেসক্রিপশন পালনেও বৈদেশিক সাহায্য নেয়ার প্রবণতা, বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে বিদেশী কনসালট্যান্ট দিয়ে দেশের মানবসম্পদের দক্ষতা ও কর্মক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়াসের নামে প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে বরং বিদেশী সাহায্যনির্ভর ও আরামপ্রিয় করে তোলার আত্মঘাতী অবস্থা পরিলক্ষিত হয়েছে। ধারকর্জ গ্রহণকে ফলাও করে প্রচারের মতো আত্মপ্রবঞ্চনা নেই। যেহেতু যেকোনো সরকার কর্তৃক গৃহীত ঋণ অনুদানের দায়ভার বহন করতে হবে রীতিমতো তিন প্রজন্ম পর্যন্ত সব সাধারণ নাগরিককে, সেহেতু বৈদেশিক সাহায়্য আর কতদিন, কেন, কোন কাজে এবং কী শর্তে নেয়া হবে বা হবে না— এসব নিয়ে মিডিয়া এমনকি জাতীয় সংসদে (তখন কোনো সংসদও ছিল না) আলোচনা-বিতর্ক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গণসতেচনতা বৃদ্ধি এবং জনমত যাচাইয়ের অবকাশ এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
লেখক: সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের বৈদেশিক সাহায্যের বাজেট ও হিসাব অধিশাখার সাবেক পরিচালক





