১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অর্থনীতি বস্তুতপক্ষে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের যুদ্ধবিদ্ধস্ত অর্থনীতির ধারাবাহিকতায় অগ্রসর হতে থাকে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের তত্কালীন সরকারের প্রধানতম লক্ষ্য ছিল অর্থনীতিকে দাঁড় করানো এবং এর পুনর্গঠন। অর্থনীতির পুনর্গঠনে সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করাই ছিল সরকারের মূল লক্ষ্য। সে সময়ে সম্পদের স্বল্পতা ও আর্থিক সক্ষমতার কথা বিবেচনায় রেখে এবং সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিতকরণের নিমিত্তে বড় বড় স্থাপনা ও কল-কারখানার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়।
স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার বাংলাদেশে ব্যাংক জাতীয়করণ অধ্যাদেশ, ১৯৭২-এর আওতায় ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন শুরু করে। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের দুটি শাখা অফিস ও ১৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংক ছিল। স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের বাংলাদেশের শাখাই ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’ নামে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে আবির্ভূত হয়। স্বাধীনতাপূর্ব ১২টি ব্যাংক একত্রিত করে ছয়টি সরকারি ব্যাংকে রূপান্তরের মাধ্যমে ১৯৭২ সালে ব্যাংকিং খাত যাত্রা শুরু করে। সোনালী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয় ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান ও ব্যাংক অব ভাওয়ালপুর এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক একত্রিত করে।
অগ্রণী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয় হাবিব ব্যাংক লিমিটেড ও কমার্স ব্যাংক লিমিটেডের সমন্বয়ে। জনতা ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয় ইউনাইটেড ব্যাংক লিমিটেড ও ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেড সংযুক্তির মাধ্যমে। রূপালী ব্যাংক স্থাপিত হয় মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লিমিটেড ও অস্ট্রেলেশিয়া ব্যাংকে একীভূত করে।
পূবালী ব্যাংক কার্যক্রম শুরু করে ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের নাম পরিবর্তন করে এবং উত্তরা ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয় ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশনের নাম পরিবর্তন করে। ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বাইরে নিম্নবর্ণিত বিদেশী ব্যাংকগুলোকে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার অনুমতি দেয়া হয়।
১. আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংক লি.
২. এএনজেড গ্রিনলেজ ব্যাংক লি.
৩. স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক লি.
৪. স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া
৫. হাবিব ব্যাংক লি.
প্রতিটি ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ছিল ৫ কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংক ব্যতীত অন্য পাঁচটি ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ছিল ২ কোটি টাকা।
১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি নিয়ন্ত্রণে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী পরিচালিত হতে থাকে। আমানত ও ব্যাংকঋণের সুদহার, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প/ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদান, অগ্রাধিকার খাতগুলো চিহ্নিতকরণ, ব্যাংকের শাখা কার্যক্রম সম্প্রসারণ ইত্যাদি বিষয়ে প্রধান কার্যালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে শাখাগুলোয় নির্দেশনা প্রদান করা হতো।
১৯৮২ সাল পর্যন্ত দেশের সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান সরকারের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে ছিল। স্বাধীনতাপূর্ব ব্যাংকিং কার্যক্রম এ দেশে অত্যন্ত সীমাবদ্ধ এবং সম্পূর্ণরূপে শহর এলাকায় কেন্দ্রীভূত ছিল। ১৯৭২ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে ব্যাংকিং কার্যক্রম (নেটওয়ার্ক) উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। শহর ও গ্রামের মধ্যে ব্যাংকের শাখা স্থাপন, আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণ কার্যক্রম আনুপাতিক বিবেচনায় গ্রামগঞ্জের অনুকূলে বৃদ্ধি পায় এবং এতে করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগণের মধ্যে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছানো এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ঋণ বিতরণের উদ্দেশ্যে সফলতা লাভ করে। লাভ-ক্ষতির বিবেচনা না করে গ্রামগঞ্জে অনেক ব্যাংকের শাখা খোলা হয়। অগ্রাধিকার খাতগুলোয় ঋণ বিতরণকালে ঋণের সুদহার নির্ধারণের ক্ষেত্রে আয় ও খরচ বিবেচনায় নেয়া হয়নি। এতে করে বিতরণকৃত ঋণের একটি বৃহৎ অংশ খেলাপি ঋণে পরিণত হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর লাভের হার কমার মাধ্যমে এসব ব্যবস্থায় প্রতিফলন ঘটে। অ্যাক্রুয়াল ভিত্তিতে হিসাব পরিচালনা ব্যবস্থা তথা আয়-ব্যয় বিবেচনা করা সত্ত্বেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অদক্ষ পরিচালন ব্যবস্থা গোচরীভূত হয়। ১৯৭২ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে পরিচালন অদক্ষতার পাশাপাশি গ্রাহকসেবার মানও অবনমিত হয়।
১৯৭৬ সাল থেকে দেশের সার্বিক উন্নয়নে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ভূমিকায় সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আসে। সরকার ওই খাতের উন্নয়নে দেশীয় ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকগুলো কর্তৃক ব্যক্তিখাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকার উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার নিমিত্ত ঋণ প্রদানে দৃঢ়ভাবে অনুভূত হয়।
এই অনুভূতি কয়েকটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিখাতে ছেড়ে দেয়ার পরবর্তীতে আরো দৃঢ় হয়। সরকার ব্যক্তিখাতে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত পূবালী ব্যাংক লিমিটেড ও উত্তরা ব্যাংক লিমিটেডকে বিরাষ্ট্রীয়করণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ব্যক্তিখাতে ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ও এর পরিচালনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনে মূল কারণ ছিল ব্যক্তিখাতকে উৎসাহ দান এবং ব্যাংকিং খাতে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করা।
প্রাথমিকভাবে ১৯৮২ সালে ব্যক্তিখাতে তিনটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পরবর্তীতে এর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে পেতে ডিসেম্বর ১৯৯২ সালে এর সংখ্যা সাতটি বেসরকারি এবং দুটি বিদেশী ব্যাংক শাখায় উন্নীত হয়—
১. পূবালী ব্যাংক লি.
২. উত্তরা ব্যাংক লি.
৩. আরব বাংলাদেশ ব্যাংক লি. (যৌথ সহযোগিতায়)
৪. ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লি. (যৌথ সহযোগিতায়)
৫. ন্যাশনাল ব্যাংক লি.
৬. দি সিটি ব্যাংক লি.
৭. ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (আইএফআইসি) লিমিটেড
বিদেশী ব্যাংক শাখা
১. ব্যাংক অব ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ইন্টারন্যাশনাল ওভারসিজ লি.
২. ব্যাংক ইন্দোসুয়েজ
১৯৮৯ সালে ব্যাংকিং খাতের (সরকারি ও বেসরকারি) মোট বিতরণকৃত ঋণ, আমানত ও শাখাগুলোর মধ্যে ব্যক্তিমালিকানাধীন বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের (পিসিবি) শেয়ার ছিল যথাক্রমে ১০, ২৫ ও ১৫ শতাংশ। শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ১৯৮০-এর দশকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে বেড়ে যায়, যা ১৯৮৯ সাল নাগাদ ২৫ দশমিক ২৩ শতাংশে উন্নীত হয়। একই সময়ে শ্রেণীকৃত বা কুঋণের সঞ্চিতির ঘাটতি দাঁড়ায় ৮৩ দশমিক ৭০ শতাংশ।
এটা লক্ষ করা হয়ে ছিল যে, বিরাষ্ট্রীয়করণ ও ব্যক্তিমালিকানায় ব্যাংক স্থাপনের মাধ্যমে গ্রাহকসেবার উন্নয়ন ও দক্ষ পরিচালনার নিমিত্ত ব্যাংকগুলো প্রতিযোগিতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে উন্নতি লাভ করবে। কিন্তু সম্পূর্ণ আর্থিক প্রজ্ঞাপনের মধ্যে থেকে পরিচালিত রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক (পরিচালনা কাঠামো) ঋণ আদায়ের নিশ্চিত আইনগত বা আইনি কাঠামো সুদূরপ্রসারী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নীতিমালায় বা নির্দেশনায় প্রতিস্থাপন করতে পারেনি এবং ব্যাংকিং খাতের অনাদায়ী ঋণ আদায়ের নিমিত্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ফলে বিরাষ্ট্রীয়করণ ও ব্যক্তিখাতের ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরুর পরবর্তীতে যদিও ব্যাংকিং খাতের সেবা প্রদানে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে কিছুটা উন্নতি পরিলক্ষিত হয়েছিল, তথাপি ব্যাংকগুলোর পরিচালনা দক্ষতার উন্নতির পরিবর্তে আরো অবনতি হয়।
এতে করে ব্যাংকিং খাতের লাভের হার ১৯৮২-৮৩ সালের শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ থেকে ১৯৮৯-৯০ সালে শূন্য দশমিক ১১ শতাংশে অবনত হয়। এই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে একশ্রেণীর স্বার্থশ্রেণী মহলের আধিপত্য বিস্তার লাভ লক্ষ করা যায়, যার ফলে ঋণ বিতরণের সঠিক দিকনির্দেশনার বিচ্যুতি ঘটার পাশাপাশি ঋণ পরিশোধ তথা আদায়ে সমস্যা পরিলক্ষিত হয়।
বিশ্বব্যাংক ও মানি ব্যাংকিং অ্যান্ড ক্রেডিট শীর্ষক জাতীয় কমিটি কর্তৃক প্রাপ্ত ফলাফল ও নির্দেশনার আলোকে ১৯৮৯-৯০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক কতিপয় সংস্কারমূলক কার্যক্রম হাতে নেয়। এর অন্যতম হলো সঞ্চয় ও ঋণের সুদহারের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করা এবং এগুলোকে উন্মুক্ত বাজারের প্রতিযোগিতার ওপর ছেড়ে দেয়া, ঋণের শ্রেণিবিন্যাস ও সঞ্চিতি নির্ধারণ এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকতর অটোনমি এবং নিজস্ব আইনকানুন দ্বারা পরিচালিত হওয়া বা পরিচালন করা, ব্যাংকের মূলধন বৃদ্ধি, পুনঃঅর্থায়নের পরিবর্তে একক বাট্টারের প্রবর্তন, শাখাগুলোর আন্তঃযোগাযোগ তদারকিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন, ব্যাংক কোম্পানি অ্যাক্ট, ১৯৯১ এবং আদালত আইন, ১৯৯০-এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকিং খাতে আইন কাঠামো প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে এদের পরিচালনক্ষমতা দৃঢ়করণ ইত্যাদি। এই সংস্কারে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য ছিল যথাক্রমে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও ব্যাংকগুলোকে পর্যায়ক্রমে বাজার অর্থনীতির আলোকে পরিচালনা করা পরিচালনা দক্ষতা অর্জন এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর অধিকতর শেয়ার নিশ্চিতকরণ।
রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি ব্যাংকের মধ্যে ১৯৮৫ সালে পূবালী ব্যাংক লিমিটেডকে ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকে রূপান্তর করা হয়। ডিসেম্বর ১৯৮৬ সালে রূপালী ব্যাংক লিমিটেডের কিছু শেয়ার ব্যক্তিখাতে ছাড়া হয়। উত্তরা ব্যাংক লিমিটেডকেও ব্যক্তিখাতে স্থানান্তর করা হয়।
মার্চ ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংককে দুই ভাগে বিভক্ত করে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের শাখাগুলো নিয়ে রাজশাহী কৃষি ব্যাংক নামে নামকরণ করা হয়। ১৯৮৮ সাল থেকে ব্যাংক অব স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কমার্স বাংলাদেশ (বেসিক) ব্যক্তিখাতে বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তীতে বেসিক ব্যাংককে শতভাগ সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং পরে এটিকে বিশেষায়িত ব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশে পরিচালিত ব্যাংকগুলোয় সর্বনিম্ন ৫০ লাখ টাকা থেকে বিভিন্ন অংকের পরিশোধিত মূলধন নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (বাংলাদেশ ব্যাংক) সন্তুষ্টিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ১৯৭২-এর ৩৭(২) ধারা অনুযায়ী এগুলোকে তালিকাভুক্ত ব্যাংক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১৩ নং সেকশন (অধ্যায়) অনুযায়ী ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ছিল ২০ কোটি টাকা, তা মার্চ ৩০, ২০০৩ থেকে ১০০ কোটি টাকা, অক্টোবর ৮, ২০০৭ থেকে ২০০ কোটি টাকা এবং ১২ আগস্ট ২০১৮ সালে জারিকৃত বিআরপিডি সার্কুলার লেটার নং বিআরপিডি (আর-১১৭১৭/২০০৮-৫১১) অনুযায়ী সর্বনিম্ন পরিশোধিত মূলধন ৪০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।
ব্যাংকিং খাতে, বিশেষভাবে বেসরকারি ব্যাংকের সার্বিক কার্যক্রমের উন্নতির পেছনের বিশেষ কারণ ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর পরিদর্শন কার্যক্রম। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক পরিদর্শনের গুণগত মান ও এর তীব্রতা ১৯৯০ সাল থেকে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে।
১৯৯০-এর দশকে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পেছনে গৃহীত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিম্নবর্ণিত কার্যক্রমগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখে:
ক. ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) সৃষ্টি বা স্থাপন
খ. মাঠপর্যায়ে ব্যাংক পরিদর্শন কার্যক্রমের সূচনা (ক্যামেল্স রেটিং)
গ. ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রদানের ওপর প্রতিবদ্ধকতা
ঘ. আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্ত বৃহত্তর ঋণখেলাপির চিহ্নিতকরণ
ঙ. বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার বিষয়ে ঋণখেলাপিদের অযোগ্যতা ইত্যাদি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক গৃহীত উপর্যুক্ত পদক্ষেপগুলোর সম্পূরক কার্যক্রম হিসেবে ২০০১ সাল থেকে সরকারি ও বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর ব্যাংকিং কার্যক্রমে উন্নতি সাধনের নিমিত্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিম্নবর্ণিত কার্যক্রমগুলো হাতে নেয়:
- Rationalization/ merger of loss incurring branches of NCB’s
- Formulation of large loan Policy
iii. Single borrower exposure limit
- Loan rescheduling and loan write-off policy
- Large loan restructuring scheme
- Linking large loan with loan portfolio
vii. Steps for recovering default loans
viii. Different corporate governance measures
- Formation of Audit committee and determination of its functions.
- Enactment of new Money Loan Court Act-2003 and Money Lounderining Prevention Act-2002
২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অফ সাইট এবং অন সাইট তদারকি কার্যক্রম অত্যন্ত শক্তিশালী, দৃঢ় ও উন্নততর করা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এসব কার্যক্রমের ফল বেসরকারি ব্যাংকগুলোর উন্নততর কার্যক্রমে প্রতিফলিত হয়।
২০০৭-২০০৮ সালে বিশ্বব্যাপী সৃষ্ট আর্থিক সংকটের পরবর্তীতে আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সামনে চলে আসে। যেহেতু মূলধনকে অভিঘাত আত্মজকরণের নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেহেতু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অখণ্ড অংশ হিসেবে পর্যাপ্ত পরিমাণ মূলধনকে বিবেচনা করা হয়।
১৯৯৬ সাল থেকে ব্যাংকগুলো ব্যাসেল-১ এর আলোকে মূলধন সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু করে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৯ সালে সব ব্যাংককে ব্যাসেল-২ অনুযায়ী মূলধন সংরক্ষণের পরামর্শ দেয়।
যদিও ব্যাসেল-২ অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে Risk Weighted Assets (RWA)-এর ৮ শতাংশ হিসেবে মূলধন সংরক্ষণে কথা, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশে বিদ্যমান ব্যাংকগুলোকে জুলাই ২০১১ সাল থেকে ১০ শতাংশ হিসেবে Capital Adequacy Ratio (CAR) সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। যার মধ্যে ৫ শতাংশ হচ্ছে মূল মূলধন।
২০১১ সালের শেষ দিকে সব ব্যাংকের প্রকৃত মূলধন ছিল ১১ দশমিক ৪ শতাংশ, যা ২০১৩ সালের জুনের ৯ দশমিক ১ শতাংশে অবনমিত হয়।
রাষ্ট্রায়ত্ত বা সরকারি ব্যাংক এবং উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থায়নকারী প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণে অক্ষমতার কারণে এটি সংগঠিত হয়।
২০১৩ সালের জুন শেষে সব সরকারি ব্যাংক, উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি ব্যাংক এবং বিদেশী ব্যাংকগুলোর CAR ছিল যথাক্রমে ১ দশমিক ২, -৯ দশমিক ০, ১১ দশমিক ৪ ও ২০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্পদ ও দায় ব্যবস্থাপনা, ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট (CRM), বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, Internal Control & Compliance, Money Laundering Risks এবং আইটি রিস্ক ইত্যাদি কার্যক্রম গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করে। ব্যাংক পরিচালনায় বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ, চেয়ারম্যান, সিইও এবং পরামর্শকের সুনির্দিষ্ট দায়দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব নির্ধারণ করে বিশদ দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
পরিশেষে এ কথা এখানে উল্লেখ্য, ১৯৮০-এর দশকে এবং ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত মূলত নিয়ন্ত্রণ সংস্থার ক্ষমার কারণে বেসরকারি ব্যাংক এবং কার্যক্রম অত্যন্ত সন্তোষজনক ছিল না। যাহোক, ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ওইসব ব্যাংকের কার্যক্রম সন্তোষজনক হতে থাকে, যা সার্বিক ব্যাংকিং কার্যক্রম বেসরকারি ব্যাংকগুলোর লক্ষণীয় অংশগ্রহণের হারে প্রতিফলিত হয়। ফলে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর আর্থিক কার্যক্রম ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে এবং ২০০০ দশকে উন্নীত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের শক্ত বা কঠিন তদারকি এবং অনেকগুলো নতুন বেসরকারি ব্যাংককে লাইসেন্স প্রদানের কারণে সার্বিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অংশ বৃদ্ধি পায়। তবুও এ মুহূর্তে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর সব কার্যক্রম ততটা ভালো নয়। এখনো এনপিএলের হার অনেক বেশি, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও করপোরেট গভর্ন্যান্সের আরো উন্নয়ন প্রয়োজন এবং লোন পোর্টফোলিও ততটা ব্যাপকতা পায়নি বিধায় এর বহুমুখীকরণ দরকার। ১৯৭২-১৯৮২ মেয়াদকালে পরিচালন অদক্ষতার পাশাপাশি গ্রাহকসেবার মান অবনমিত হয়। আশির দশকে সরকার বেসরকারি খাত সম্প্রসারণের চিন্তাধারায় ব্যক্তিখাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকতর উন্নয়নের নিমিত্তে ঋণ প্রধানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং স্থানীয় বেসরকারি ব্যাংক প্রবর্তন করেন। সরকারের আশা ছিল, সরকারি ব্যাংক উত্তরা ও পূবালী বেসরকারীকরণ এবং নতুন ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকগুলো গ্রাহকসেবার মান বৃদ্ধি করবে ও সরকারি ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক কার্যক্রমে লিপ্ত হবে। কিন্তু পরিচালনা কাঠামো আর্থিক প্রজ্ঞাপন দ্বারা পরিচালিত হতো, বিধায় সেটা কোনো আইনগত বা আইনি কাঠামোয় ঋণ আদায়ের জন্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। যার ফলে এ সময়ে বিরাষ্ট্রীয়করণ এবং ব্যক্তিখাতের ব্যাংকিং কার্যক্রমে কোনো বিশেষ উন্নয়ন লক্ষ করা যায়নি।
আশির দশকের পর বাংলাদেশ ব্যাংক বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী বেশকিছু সংস্কার কার্যক্রম প্রবর্তন করে, কিন্তু এগুলো সত্ত্বেও ঋণের মান উন্নতি না হয়ে ব্যাংকিং সেক্টরে দেখা যায় প্রচুর ঋণখেলাপি।
বিশ্বব্যাংকের Financial Sector Reform Program (FSRP) শেষ হয়ে যাওয়ার পর সরকারের ইচ্ছায় Banking Reform Committee (BRC) গঠন করা হয়। এর কাজ ছিল পুরো ব্যাংকিং সেক্টরের কার্যপ্রণালি প্রধানত সুষ্ঠু ঋণ প্রদান এবং খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি থেকে কীভাবে উদ্ধার পাওয়া যায়, সে বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেয়া। এর পরিপেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক সব তফশিলি সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশী ব্যাংক শাখা পরিচালনার জন্য অনেক নতুন আইন প্রণয়ন করে। এতে সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং সেক্টরের উন্নতি পরিলক্ষিত হয়। এসব সম্ভব হয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের সুদৃঢ় মনিটরিং এবং সুপারভিশন কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে। এ সময় বেসরকারি ব্যাংকের আমানত সংগ্রহ ও ঋণ জোগানের হার তুলনামূলকভাবে বেড়ে যায় এবং সরকারি ব্যাংকের আমানত সংগ্রহ ও ঋণ প্রদানের হার কমে যায়।
সূত্র:
১। বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন
২। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত বাণিজ্যিক ব্যাংক সংক্রান্ত পরিসংখ্যান
৩। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসিক অর্থনৈতিক প্রবণতা প্রতিবেদন
লেখক: সাবেক ব্যাংকার






