বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির প্রথম সভাপতি মরহুম মাযহারুল হক তার ভাষণে ‘দেশের রাজনৈতিক বা সামাজিক ও নৈতিক পরিস্থিতিতে যে (প্রথম) পাঁচসালা পরিকল্পনা চালু করা হলো, তা নির্ভীক সত্যাশ্রয়ী মন দিয়ে বিশ্লেষণ’ করেছিলেন এবং সে ভাষণ এ দেশে বিভিন্ন মহলে অভিনন্দিত হয়েছিল। দ্বিতীয় সভাপতি ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর ১৯৭৬ সালে সামরিক শাসনামলে তদানীন্তন রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পটভূমিকায় যে পরিবর্তন সাধিত হয়ে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছিল, তারই সার্বিক বিবেচনা তুলে ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি কোন পথে— এ সম্পর্কে একটি আলোচনা উপহার দিয়েছিলেন সমতাভিত্তিক কল্যাণাশ্রয়ী রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানিয়ে। সমিতির তৃতীয় সভাপতি ড. মির্জা নুরুল হুদা তার ইংরেজি ভাষণে ১৯৭৬-৭৭ সালে সরকারের প্রচেষ্টায় যে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, তারই ওপর আলোকপাত করেছিলেন। ১৯৭৯ সালে সমিতির চতুর্থ সভাপতি ড. সোলায়মান মণ্ডল তার ইংরেজি ভাষণে বাংলাদেশের অর্থনীতির আলোচনা করে মিশ্র অর্থনীতি ও সমাজতান্ত্রিক উন্নয়ন সম্পর্কে বিভিন্ন প্রকার দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবতারণা করেন, যার প্রেক্ষিত ছিল ত্রিবার্ষিক হার্ড কোর পরিকল্পনা ও দ্বিবার্ষিক উন্নয়ন প্রস্তাব। সমিতির পঞ্চম সভাপতি ডা. আবদুল গফুর রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে ১৯৮১ সালে দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দিহান বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন। সমিতির ষষ্ঠ সভাপতি অধ্যাপক আখলাকুর রহমান ১৯৮৩ সালে তার ইংরেজি ভাষণে গ্রামীণ উন্নয়ন সম্পর্কে তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নকালে সুচিন্তিত, সুবিন্যস্ত ও সুপরিকল্পিত চিন্তাধারা পেশ করেছিলেন; যেখানে গ্রামীণ আর্থসামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব নিরসনে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার একটি সম্ভাব্য দিকনির্দেশনা ছিল। সমিতির সপ্তম সভাপতি অধ্যাপক রেহমান সোবহান তার ইংরেজি ভাষণে তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রেক্ষিত ও দারিদ্র্য নিরসনে এর অন্তর্নিহিত ব্যর্থতার বিশ্লেষণ করেছিলেন এবং সেই সঙ্গে রাষ্ট্র যে সম্পদের প্রধানতম উৎস হয়ে উঠেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনীতিবিদদের আর্থিক উন্নয়ন ও নৈতিক দায়িত্বের সংকট ও বৃহত্তর সমাজে Sponsored affluence-এর প্রাধান্য সুন্দরভাবে চিত্রিত করে ন্যায়সঙ্গত Rationality-র সন্ধান ও দারিদ্র্য নিরসনের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়নের আর্থসামাজিক দিক প্রাঞ্জলভাবে বিধৃত করেছিলেন। এ ঐতিহ্যের বাহক হিসেবেই আমি আপনাদের সামনে দাঁড়িয়েছি। আপনারা লক্ষ করে থাকবেন, এসব ভাষণের সাধারণ মূল সুর বাস্তবতার আলোকে সরকারি নীতির আলোচনা ও সমিতির সভাপতির ভূমিকা একজন বিবেকবান প্রতিবাদীর।

স্মরণীয়, পাকিস্তান আমলে তিনটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার দুটি রচিত হয়েছিল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক শাসনামলে। বাংলাদেশেও তা-ই ঘটেছে। সুতরাং সামরিক শাসন আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রচেষ্টার একটি বাস্তবতা, একথা স্বীকার করে নিতে কোনো বাধা নেই। এ কারণেই আমি আমার ভাষণের বিষয় হিসেবে সামরিক শাসন ও উন্নয়নকে বেছে নিয়েছি। এ দেশে শাসনের উচ্চাসন থেকে প্রায় প্রতিনিয়ত বলা হয়ে থাকে, এ দেশের উন্নয়নে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা ছিল, আছে এবং থাকবে। আমি তৃতীয় বিশ্বে সামরিক শাসনের সঙ্গে উন্নয়নের কী সম্পর্ক, তারই একটি আলোচনা আজ তুলে ধরতে চাই।

দুই.

সামরিক শাসন ও উন্নয়ন সম্পর্কে নানাবিধ তাত্ত্বিক মতবাদ— এ সম্পর্কে যারা বিশেষজ্ঞ, তাদের লেখায় পাওয়া যায়। একটি মতবাদ হলো, সামরিক শক্তি সাধারণত রক্ষণশীল প্রগতিবিরোধী ভূমিকা পালন করে। দ্বিতীয় মতবাদ হলো, তারা প্রতিবিপ্লবীর ভূমিকা পালন করে এবং সেজন্য প্রকৃত বিপ্লবের আগে বিপ্লববিরোধী শক্তি হিসেবেও বিভিন্নভাবে আত্মপ্রকাশ করে। তৃতীয় মতবাদ হলো, সামরিক শক্তি হলো শৃঙ্খলাবদ্ধ জাতীয়তাবাদী শক্তি এবং সে কারণে সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তারা বিশ্বস্ত ভূমিকা পালন করে। আমরা তিনটি মতামতকেই সংক্ষেপে তুলে ধরতে চেষ্টা করব।

প্রথম মতবাদের প্রবক্তারা হলেন উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী। তারা বিশ্বাস করেন, গণতন্ত্র হলো একটি সর্বজনীন প্রক্রিয়া, যেখানে একটি অসম শক্তিধর কোনো গ্রুপের আবির্ভাব গণতন্ত্রে উত্তরণের পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে। এ মতের প্রতিধ্বনি করে de Tocqueville লিখেছিলেন, ‘How do you deal with the problem of this unassimilated group in the community, forming a small nation by itself where the mind is less enlarged and habits more rude than in the nation at large?’ [de Tocqueville,  Democracy in America, New York; Knopf 1959]. এ মতাবলম্বীরা মনে করেন, সাধারণভাবে বেসামরিক প্রক্রিয়ায় যে রাজনৈতিক অগ্রগমন, তা ক্রমাগতভাবেই শিক্ষা প্রসার ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অভিঘাতে গণতন্ত্রায়ণকেই সম্ভব করে তোলে, যদি না কোনো লৌহমানব সামরিক শক্তির প্রচ্ছায়ায় সে প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে তোলে। সুতরাং সামরিক শক্তির যেকোনো প্রকার হস্তক্ষেপই অশুভ। কারণ অসম শক্তির মোকাবেলায় সাধারণ মানুষের বিজয় প্রায় দুঃসাধ্য। শুধু তা-ই নয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণ করে সামরিক শক্তি যে আর্থসামাজিক নীতি গ্রহণ করে, তার ফলে যে চাটুকার অর্থশক্তির আবির্ভাব হয়, তারাও গণতন্ত্র উত্তরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং উদার গণতন্ত্রীদের মতে, সামরিক বাহিনীকে হতে হবে অরাজনৈতিক, পেশাদার ও বেসামরিক শাসনের অধীন। সামরিক বাহিনী কখনই ‘ইন্টারেস্ট গ্রুপ’ হিসেবে ভূমিকা পালন করবে না। যদি তা করে, তাহলে গণতন্ত্র নতুন রাষ্ট্রে ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। [Mc Alistor : Recent researches and writings on the role of the military in Latin America. Latin American Research Review. Vol II No. 1(1966)] সত্যিকার পেশাদারিই সেনাবাহিনীকে রক্ষণশীল করে। কারণ শাসকশ্রেণী ও শাসনপদ্ধতির প্রতি আনুগত্য তাদের শিক্ষার একটি মৌল উপকরণ। ইউরোপ ও আমেরিকার সামরিক বাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসনের সম্পর্ক সম্বন্ধে Mosca যে বিশ্লেষণ করেছে, তাতে এ আইনগত রক্ষণশীল সম্পর্ক অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে। [Mosca, 4. The Ruling Class, New York, McGraw-Hill. 1939]. বুর্জোয়া ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শাসক অভিজাত শ্রেণী ও সামরিক বাহিনী উভয়ই দ্রুত সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিবর্তন কামনা করে না। [Vogt, A: history of Militarism, New York, Meridian, 1959]. সে কারণে তৃতীয় বিশ্বে কলোনিয়াল শাসনে লালিত সামরিক বাহিনী অনেক সময়ই গণ-অভ্যুত্থানকে প্রতিহত করে এগিয়ে এসেছে। কারণ সামরিক পেশাদারির মূল্যবোধ মূলত সামন্ততান্ত্রিক। সে কারণেই ফরাসি সেনাবাহিনীর অনেকেই প্রথম কোয়ালিশনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিপ্লবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। যে কারণে প্রথম মহাযুদ্ধের সময় জারের বাহিনীতে অনেক কৃষক ও বুদ্ধিজীবীর যোগদান সত্ত্বেও লাল ফৌজের চেয়ে শ্বেত অফিসারের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল আর ফ্যাসিবাদের অধীনে সামরিক বাহিনী অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। [Abrahamsson, B: Military Professionalisation and Political Power, Beverly Hills, California, Sage, 1972] লাতিন আমেরিকার মিলিটারি ক্যুর ইতিহাস হলো সংস্কারবিরোধী শক্তির অভ্যুত্থান। Needler এসব ক্যুর যে বিশ্লেষণ করেছেন, তা থেকে তিনি দেখিয়েছেন, লাতিন আমেরিকার প্রায় সব ক্যু সামরিক ও অর্থনৈতিক গণমুখী সংস্কারের পরিপন্থী এক সংরক্ষণবাদী রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ মাত্র। [Needler, M: Political Development and military Intervention in Latin American, American Political Science Review, VOL, LX 1966] অবশ্য হান্টিংটন এ সম্পর্কে দ্বিমত পোষণ করে নাইজেরিয়ার গাওয়ান, মোহাম্মদ ও ওবেশানজো শাসনের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, সামরিক বাহিনী কখনো কখনো সুবিধাভোগী শ্রেণীর বিপরীতে নতুন ধারার সৃষ্টি করতে পারে, যদি সেনাবাহিনীতে রক্ষণশীল মতবাদের বিপরীতে বিপ্লবী বা সংস্কারপন্থী দলের অস্তিত্ব থাকে [Huntington, S.P. Changing Patterns of military politics, New York, Free Press, 1962]। কিন্তু লক্ষণীয় যে, তিনি আগের লেখকদের তুলনায় সামরিক বাহিনীর গঠন সম্পর্কে ভিন্ন ধারণা পোষণ করেছেন।

তবে একথা স্মরণ করতে হবে যে, যেসব দেশের যেখানে সেনাবাহিনী ভূস্বামী, শিল্পপতি বা অভিজাত শ্রেণীর বিপক্ষে সাধারণের সঙ্গে সত্যিকার অর্থে একাত্ম হয়ে মুক্তিসংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে, সেখানে তাদের ভূমিকা রক্ষণশীল না হয়ে প্রগতিশীল হয়ে উঠেছিল। ফরাসি বিপ্লব, কিউবা, নাসেরের মিসর, আলজেরিয়া বা ভিয়েতনামে এ সত্য প্রত্যক্ষ করা যায়।

তিন.

দ্বিতীয় মতবাদের প্রবক্তারা সাম্প্রতিক কালে তৃতীয় বিশ্বে পশ্চিমের বৃহৎ শক্তিগুলোর সাহায্যে সামরিক বাহিনীর প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণগত উন্নয়নের তথ্য তুলে ধরে পরনির্ভরশীলতার মানসিক ও বৈষয়িক ভিত্তি নির্দিষ্ট করে বলেন, তৃতীয় বিশ্বের সেনাবাহিনী মূলত প্রতিবিপ্লবী [Cockcroft etal: Dependence and Underdevelopment, New York; Anchor Books. 1972]। এ মতবাদের প্রবক্তারা বলেন, পাশ্চাত্যে শিক্ষাপ্রাপ্ত সামরিক বাহিনীর নেতারা ধনতান্ত্রিক উন্নয়ন কৌশলে বিশ্বাসী ও সমাজতন্ত্রের প্রতি বৈরী মনোভাবাপন্ন হয়ে থাকেন। তারা পাশ্চাত্যের ওপর উন্নয়নশীল দেশের নির্ভরতাকে অনাবশ্যম্ভাবী মনে করেন এবং বিদেশী সাহায্যকে তারা অতি প্রয়োজনীয় ভেবেই সাহায্যদাতা দেশের সব শর্ত অত্যন্ত সহজে মেনে নেন। এ কারণেই পাকিস্তানের আইয়ুব, জিয়াউল হক, ঘানার আফরিফা, সুদানের নিমেরি— এমন সব সামরিক রাষ্ট্রনায়কের মূল্যবোধ ও সামাজিক মানসিক গড়নে সুন্দর সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায় এবং তারা সবাই জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছিলেন।

সামরিক সাহায্য, সামরিক বাহিনীর জন্য প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সাহায্য ইত্যাদির মাধ্যমেই পাশ্চাত্যের সঙ্গে একটি গাঁটছড়া বেঁধে ওঠে। কিন্তু যেহেতু তৃতীয় বিশ্বের সামরিক বাহিনীর পাশ্চাত্যের বৃহত্তর গণতান্ত্রিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে যথার্থ পরিচয় ঘটে না, সেহেতু তাদের ওপর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চেয়ে সামরিক বাহিনীর অথরিটেরিয়ান ব্যবহারিক মানসিকতা, ক্ষমতার জন্য অভিলাষ ও সামরিক গোপন তত্পরতার সঙ্গে সম্পর্ক সহজেই গড়ে ওঠে। তৃতীয় বিশ্বের প্রায় সব সামরিক অভ্যুত্থানের নায়কদের প্রশিক্ষণ হয়েছিল পাশ্চাত্যে এবং অনেকেরই গোপন সামরিক তত্পরতার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

একথা স্মরণযোগ্য যে তৃতীয় বিশ্বের কোনো সামরিক বাহিনীই বয়স, ইতিহাস, উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ইত্যাদির দিক থেকে পাশ্চাত্যের উন্নত সামরিক বাহিনীর সমকক্ষ নয়, যদিও তারা বিভিন্ন প্রকার যোগাযোগের কারণে তাদের অনুকরণই করে থাকে, কিন্তু সমকক্ষ না হওয়ায় একটি অপূর্ণ অভিলাষ এবং সমকক্ষ হওয়ার জন্য অধিকতর সম্পদের অধিকার গ্রহণের মানসিকতা তাদের ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানে যে রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠতে শুরু করে, তার থেকে সরিয়ে নেয় এবং রাজনীতিবিদদের সমালোচনায় তারা মুখর হয়ে ওঠে। তারা মনে করে, রাজনীতিবিদদের সরিয়ে দিয়ে সেনাবাহিনীকেই জাতীয় সংহতি ও প্রগতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব। তারা বিস্মৃত হয় পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যই সামরিক বাহিনীকে জাতীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে, সামরিক বাহিনী জাতীয় গণতান্ত্রিক ভিত্তি রচনা করেনি। এ কারণে পাশ্চাত্যে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেও সামরিক প্রফেশনালিজম তৃতীয় বিশ্বে প্রায়ই গড়ে গঠে না, বরং প্রশিক্ষণের ফলে লব্ধ শক্তি তাদের মধ্যে অধিকতর ও দ্রুততর সামরিক শক্তি সৃষ্টির যে অভিলাষ সৃষ্টি করে, সে কারণে তারা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপে উদ্গ্রীব হয়ে ওঠে। এরই বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখেছি নাইজেরিয়া, ঘানা, ইথিওপিয়া, বেনিন, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ইত্যাদি দেশে।

প্রশ্ন উঠতে পারে কেনিয়া, তানজানিয়া, জাম্বিয়া, ভারত, সেনেগাল ইত্যাদি দেশে এমনটি ঘটেনি কেন? এর উত্তর অত্যন্ত সহজ, এসব দেশে জনবরেণ্য শক্তিধর রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছিল। কেনিয়ায় কেনিয়াত্তা, তানজানিয়ায় নায়ারে, জাম্বিয়ায় কাউন্ডা, মালয়িতে বান্ডা, সেনেগালে সেঙ্গর, ভারতে নেহরু ছিলেন জাতীয়তাবাদী শক্তি উত্থান ও উন্নয়নের দিশারি। অবশ্য নক্রুমা সে দেশকে সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থান থেকে রক্ষা করতে পারেনি, তার অবশ্য একটি কারণ ঘানার সামরিক বাহিনী জনগণের রাজনৈতিক চেতনার Sophistication-এর পরিমাপে অনেক বেশি ক্ষমতাধর, দক্ষ ও অভিলাষী ছিল অর্থাৎ রাজনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর উন্নয়নের এমন এক বৈষম্য বিদ্যমান ছিল, যা সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণকে সম্ভব করে তুলেছিল। ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। যখন ভারসাম্য বিনষ্ট হয়, তখনই সামরিক বাহিনী বেসামরিক রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতি হুমকিস্বরূপ হয়ে পড়ে। পাশ্চাত্য গণতন্ত্রে অত্যন্ত সজ্ঞানভাবে এ ভারসাম্য গড়ে তোলা হয়েছে, যে কারণে ব্রিটেন, আমেরিকা, কানাডায় এমন ঘটনার সম্ভাবনাও অকল্পনীয়।

বিদেশী সাহায্যের মাধ্যমে যখন ভারসাম্যহীন সামরিক শক্তি গড়ে ওঠে, তখনই তারা প্রতিবিপ্লবের মাধ্যমে জাতীয় গণতান্ত্রিক উন্নয়নকে ব্যাহত করে এবং পাশ্চাত্যের সঙ্গে নির্ভরশীলতার সম্পর্ক নিবিড় করে তোলে। আর সেসঙ্গে পাশ্চাত্যের ধনতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও আর্থসামাজিক নীতিমালায় বিমূর্ত হয়ে ওঠে। সে কারণেই শতাব্দীকাল ধরে স্বাধীনতা ভোগ করেও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো সামরিক শাসনের নিগড় ভাঙতে পারেনি। সর্বক্ষেত্রে আমেরিকার ওপর নির্ভরতা তাদের কমেনি আর সেনাবাহিনী শ্রমিকবিরোধী, কৃষকবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে দেশকে রাজনৈতিক অশান্তির ক্ষেত্রে পরিণত করে রেখেছে। চিলি, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল থেকে শুরু করে পানামা, নিকারাগুয়া, ক্যারিবীয় দেশগুলো এর সাক্ষ্য দেয়। এছাড়া এসব দেশে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বহুজাতিক কোম্পানির সম্পর্কও বেশ নিবিড়।

ষাটের দশকে কেনেডির শাসনামলে তৃতীয় মতের আবির্ভাব হয়। সে সময় Area studies-এর প্রসার ঘটেছে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘Modernisation’ থিওরির বেশ একটা প্রাধান্য গড়ে উঠেছে। সেসঙ্গে প্রয়োজন হয়ে পড়েছে আঞ্চলিক স্থায়িত্ব/আনুগত্যের সন্ধান। এই তিনের সংমিশ্রণে যে তত্ত্বের আবির্ভাব, তার সারবস্তু হলো তৃতীয় বিশ্বে বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বই আধুনিকায়ন, উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নিয়ামক। এখানে স্মরণযোগ্য যে, ১৯৫৯ সালে র্যান্ড করপোরেশন উন্নয়নশীল দেশের সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বের ভূমিকা সম্পর্কে একটি সম্মেলন অনুষ্ঠান করে; সেখানে যে আলোচনা হয়, তার সার হলো, ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানে সেনাবাহিনীই ভেতরের অনেক বিরোধকে দাবিয়ে দেশের অখণ্ডতা বজায় রেখেছে এবং আধুনিকায়নের জন্য মধ্য শ্রেণীর উদ্ভবে তারা সক্রিয় সহযোগিতা করেছে এবং প্রশাসনে যে প্রযুক্তিগত বা তত্পর সিদ্ধান্ত গ্রহণে দক্ষতার অভাব রয়েছে, তা পূরণ করতে সমর্থ হয়েছে। ১৯৬১ সালে MIT-তে একটি সম্মেলন হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যে শ্রেণীভিত্তি, তাদের যে পেশাগত দক্ষতা এবং তাদের কর্মসম্পাদনের পরিবেশ ও পদ্ধতি— সবই নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশের আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের পক্ষে সহায়ক। অবশ্য এখানে সর্বত্রই রাজনৈতিক পদ্ধতি ও গণতন্ত্রের কথা অনুল্লেখ থাকে।

১৯৬৪ সালে জনসন যেসব বই লেখেন, তার মূল প্রতিপাদ্য ছিল, তৃতীয় বিশ্বে সামরিক বাহিনীই জাতীয় সার্বভৌমত্বের একমাত্র প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। [Johnson J.J. Military and Society in Latin America, Stanford University Press, California] অবশ্য হালপের্ন লক্ষ করেছিলেন যে, সামরিক বাহিনী যতই আধুনিক হয়ে উঠবে; এর গঠন, সংগঠন দক্ষতা ও ক্ষাত্রধর্ম যতই সংগঠিত হয়ে উঠবে, ততই এরা প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়বে। [Halpern, M: Middle Eastern Armies and the New Middle Class; in Johnson J.J. (ed), The Role of the Military in the Underdeveloped Countries: Princeton, NJ: Princeton University Press] অর্থাৎ একথাও বলার চেষ্টা হয়েছে যে, সুদক্ষ ও সুসংহত সামরিক বাহিনী আধুনিকায়নের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে হস্তক্ষেপ করতে পারে এবং যদি করে, তবে সেটা জাতীয় উন্নয়নের জন্য অসঙ্গত হবে না। পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ এ মতামতের প্রতিধ্বনি আমরা বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সামরিক অভ্যুত্থানের সময় শুনতে পেয়েছি। এ আধুনিকায়নের অগ্রনায়ক হিসেবে সেনাবাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এরা সহজেই অর্থনৈতিক ভৌতকাঠামো গড়ে তুলতে পারে, এদের দক্ষ ব্যবস্থাপনাশক্তি রয়েছে এবং নিম্ন সামাজিক শ্রেণী থেকে অফিসার গ্রহণ করে তারা সামাজিক বিবর্তনকে সহায়তা করে। লক্ষণীয় যে এখানেও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন, শিক্ষা, আর্থিক নীতি-পদ্ধতি, আধুনিকায়নের ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ বিবেচনা— সবই অনুপস্থিত। এ কারণেই সামরিক বাহিনীকে যথেষ্ট অর্থ জোগান দিয়েও তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ আজো অনুন্নত এবং সামরিক বাহিনীতে জোগান না দিয়ে জাপান ও জার্মানি নতুন বিশ্ব অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। সুতরাং আর্থরাজনৈতিক আধুনিকায়নের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর শাসন বা প্রভাব সম্পর্কে কোনো অর্থবহ যোগাযোগ পাওয়া দুষ্কর। [Mc Alister, L: Recent Researches and Writing on the role of the military in Latin America, Latin American Research Review, Vol. LXX September-1966]

চার

আমরা এবার আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের পথিকৃৎ বলে চিহ্নিত সামরিক বাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে তৃতীয় বিশ্বের তথা আফ্রো-এশিয়া লাতিন আমেরিকার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কিছু আলোচনা করতে প্রয়াসী হব। মনে রাখা প্রয়োজন, সামরিক বাহিনী যে আধুনিকায়নের অগ্রদূত— এই তত্ত্ব ডালেস ডকট্রিন; যার ফলে সমাজতান্ত্রিক ও জোটনিরপেক্ষ দেশগুলোকে মিত্র সরকার ও সামরিক ‘কেন্দ্র’ স্থাপনের মাধ্যমে ঘিরে ফেলার প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছিল তারই মানবিক মুখোশধারী রূপ, যা কেবল আমেরিকায় রিপাবলিকান দল থেকে ডেমোক্রেটিক দলের ক্ষমতায় অধিষ্ঠানের ফলে ঘটেছিল।

হান্টিংটন এ তত্ত্বের আলোচনায় যা বলেছিলেন তার সারকথা হলো, সামরিক বাহিনী নীতিনিষ্ঠ একটি গোষ্ঠী এবং অভিজ্ঞতা তাদের কষ্টের মধ্যে জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে তোলে। তারা দায়িত্বজ্ঞানশীল ও শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং তাদের শিক্ষা তাদেরকে যুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন করে তোলে। এই নীতিনিষ্ঠা, শৃঙ্খলাবোধ যুক্তিজ্ঞান তাদের কঠিন সাদামাটা জীবনযাপন করে উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে তৃতীয় বিশ্বে একমাত্র আধুনিকায়নকামী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে। [Huntington, S.P. Changing Pattern of military Politics, New York, Free Press, 1962] এ তত্ত্বের পেছনে কতগুলো বিশেষ অনুমান রয়েছে। প্রথমত. দেশের রাজনৈতিক বিবর্তন এ পর্যন্ত পৌঁছেছে, যেখানে জাতীয়তাবোধ সম্পর্কে সর্বজনগ্রাহ্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কার্যকরভাবে বহাল আছে। না হলে কী হতে পারে, তার প্রমাণ উগান্ডার ইদি আমিন। দ্বিতীয়ত. দেশের সামরিক বাহিনীর যে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, সেটি দেশের মৌল নীতির ভিত্তিতেই হয়েছে এবং সেনাবাহিনীতে এ সম্পর্কে দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। না হলে কী হতে পারে, তার প্রমাণ ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ইরাক, লেবানন ও ফিলিস্তিন। তৃতীয়ত. সামরিক বাহিনীর শিক্ষা মূলত পেশাভিত্তিক এবং এ পেশাকেন্দ্রিক মূল্যবোধের মাধ্যমেই তারা একীভূত; তা যে নয়, তার উদাহরণ ঘানা, নাইজেরিয়া, কঙ্গো। চতুর্থত. মনে করা হয়েছে যে, পেশাকেন্দ্রিক মূল্যবোধ সহজেই সামরিক কর্ম থেকে বেসামরিক কর্মে স্থানান্তর করা যায়। এটা যে কত দুষ্কর, তার প্রমাণ পাকিস্তান, এমনকি বাংলাদেশও। পঞ্চমত. এটাও মনে করা হয় সামরিক বাহিনীর অভিলাষী জীবন, শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ সহজেই সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবে। এ মূল্যবোধগুলো সত্য হলেও সামাজিক, আর্থসামাজিক জীবনে দ্রুত এসব মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেয়া যায় না; উপরন্তু বৃহত্তর সামাজিক জীবন যেখানে এ মূল্যবোধের বিপরীত অবস্থা বিদ্যমান বলে ধারণা করা হয়েছে, তার সংস্পর্শে সেনাবাহিনীর তথাকথিত মূল্যবোধ অতি দ্রুত পরিবর্তিত হয় বলেই তৃতীয় বিশ্বের একটি সামগ্রিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। ওই অভিজ্ঞতা থেকে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বও যে মুক্ত, তা মনে করার কারণ নেই।

একথা অবশ্য অনেকখানি সত্য যে, দীর্ঘদিনের উপর্যুপরি প্রশিক্ষণ, অতি তীক্ষ বিচার-বিবেচনা, অযোগ্যদের অপসারণের মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনী একটি পেশাভিত্তিক মূল্যবোধের অধিকারী হতে পারে। কিন্তু এজন্য যে দীর্ঘ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন, কার্যক্ষেত্রে যে পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার মাধ্যমে মূল্যবোধগুলো দৃঢ় হতে পারে এবং যে দৃঢ় কঠিন বাছাই-পদ্ধতি এ মূল্যবোধগুলো সমুন্নত রাখে, তৃতীয় বিশ্বে এমনটি প্রায়ই ঘটে না, কারণ দ্রুততার সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সম্প্রসারণ ঘটে ও পদোন্নতি হয়। প্রশিক্ষকের যে অভাব, প্রশিক্ষণের যে ত্রুটি, সর্বোপরি নেতৃত্বে সাধারণ জীবন, জাতীয়তা, সামাজিক দায়িত্ব, শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগের যে ঘাটতি দেখা যায়, সে সম্পর্কে নাইজেরীয় সামরিক বাহিনীর পরিপ্রেক্ষিতে Moore এবং Ogbebor যে আলোচনা করেছেন, তৃতীয় বিশ্বের প্রায় সব দেশে তা সমধিক প্রযোজ্য।

Moore, W: The Professions, Role and Rules, New York, Russel Sage, 1963 and Ogbebor, P: Training the Nigerian army Ubiquitous, Vol. 3. No. 7, 1976] আমাদের দেশে যে এমনটি ঘটেনি, সে কথাও বলা যাবে না অর্থাৎ আধুনিকায়ন ও উন্নয়নতত্ত্বের যে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণজাত মূল্যবোধগত ভিত্তি, সেটিই আর সত্য নয়।

তৃতীয় বিশ্বের সেনাবাহিনী একদিকে গণবাহিনী নয়, অন্যদিকে তাদের জনসাধারণ থেকে ঔপনিবেশিক আমলের মতো সমাজবিযুক্ত ক্যাম্পবাসী করে রাখাও সম্ভব নয়। সুতরাং মধ্য ও নিম্নবিত্তের সন্তান এই সেনাবাহিনী, যারা প্রতিনিয়ত সমাজের বিভিন্ন মানুষের সংস্পর্শে এসে প্রভাবিত হচ্ছে, তাদের কাছ থেকে সমাজের সাধারণ মানুষের চেয়ে উন্নততর মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ ও নেতৃত্ব আশা করাটাও সঙ্গত বলে মনে হয় না।

উপরন্তু উন্নত বিশ্ব থেকে সামরিক বাহিনীর প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পেশাভিত্তিক মূল্যবোধ সৃষ্টির প্রচেষ্টা ও প্রক্রিয়া আজ যথেষ্ট পরিমাণে সহজলভ্য। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় যে, মূল্যবোধ হস্তান্তরের প্রশিক্ষণ ও প্রক্রিয়া ভিন্ন সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে একই প্রকার মূল্যবোধের জন্ম দিতে পারে কিনা? পুরনো ICS বা Sandhurst-এর যুগে এ উত্তর সম্ভবত ইতিবাচক হতো, কেননা তখন এরা সমাজবিচ্ছিন্ন ছিল এবং একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী ঔপনিবেশিক শাসকদের স্বার্থ রক্ষায় নিযুক্ত ছিল। বর্তমান তৃতীয় বিশ্বের স্বতঃপ্রসারমাণ সামরিক বাহিনীর ও আমলাতন্ত্রের Behavioural attributes সম্পর্কে যেসব গবেষণা হয়েছে, তাতে হস্তান্তরের মাধ্যমে বিজাতীয় সমাজবিযুক্ত মূল্যবোধ সৃষ্টি প্রায় অসাধ্য কাজ। অথচ সে অসম্ভব প্রচেষ্টা যে চলে না, তা নয়।

উপরন্তু সামরিক বাহিনী অসামরিক দায়িত্ব গ্রহণ করলে প্রশাসনে তাদের মূল্যবোধ অতি দ্রুত বিস্তার করতে পারবে বলেও মনে হয় না। ইন্দোনেশিয়া, লিবিয়া, কঙ্গো, আর্জেন্টিনা, চিলি, দক্ষিণ কোরিয়া ইত্যাকার দেশে এ ধরনের সাফল্যের পরিমাণ সবিশেষ উল্লেখযোগ্য নয়। Odetola এ সম্পর্কে তার গবেষণামূলক নিবন্ধে বলেছেন, সামরিক বাহিনী সংস্কার ও আধুনিকায়নের কথা বলে ক্ষমতায় আসে, আর অতি দ্রুত প্রশাসনে বিরাজমান ক্ষত ও দুষ্ট মূল্যবোধকেই গ্রহণ করে তাদের কথিত নতুন মূল্যবোধকে ধরে থাকতে চাইত। [Odetola, T.O: Military Politics in Nigeria: Economic Development and Political Stability, Transaction Books. New Brunswick, New Jersy, 1978]

তৃতীয় বিশ্বে আইয়ুব খানের চেয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করে ক্ষমতা দখল খুব কম জেনারেলই করেছেন। তার নেতৃত্ব সামরিক বাহিনী হিসেবে অত্যন্ত গতিশীল ছিল। তার চিন্তাধারায় পরিপক্বতার ছাপও ছিল। তার পেশাদারি স্বভাব, লক্ষ্যের প্রতি স্থিরচিত্ততা এবং দেশ শাসন সম্পর্কে স্থিরীকৃত ধারণা ছিল। কিন্তু তিনিও কেবল সেনাবাহিনী-সহযোগে দেশ শাসনে অপারগ ছিলেন, আর সেজন্য এক প্রকার আমলাতন্ত্র, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে আঁতাত গড়ে তুলেছিলেন। তবুও তার দেশকে উন্নয়ন-প্রচেষ্টায় বিদেশী সাহায্য গতি সঞ্চার হলেও মূল আর্থরাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হয়নি বলেই তার প্রশাসন ব্যর্থ। ইয়াহিয়া তো সেদিক থেকে দেশবিধ্বংসী এক নেতিবাচক শক্তিমাত্র।

অন্যদিকে নাইজেরিয়ায় জেনারেল গাওয়ানকে মোটামুটিভাবে দেশের নেতৃত্ব গ্রহণে প্ররোচিত করা হয়েছিল। তার দেশের উন্নয়ন সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। কিন্তু তেলের মূল্য বাড়ায় তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন-প্রচেষ্টা ইতিবাচক এক সম্ভাবনা দেখা দেয়। কিন্তু গৃহযুদ্ধের আমলে যে ব্যবসায়ীরা অর্থ উপার্জন করেছিল, বেসামরিক শাসনে যেসব রাজনীতিবিদ ক্ষমতাসীন হতে পারেনি এবং আমলাতন্ত্রের এক গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল, সেটাকে বিভিন্ন প্রকার অপ্রয়োজনীয় নির্মাণকাজ ও আমদানির মাধ্যমে বিনষ্ট করে ফেলে। এ ধরনের ঐতিহ্য ইন্দোনেশিয়ায় সামরিক শাসনেও নির্মিত হয়েছে।

কিছুটা সফল সামরিক শাসনের দৃষ্টান্ত হিসেবে ইথিওপিয়ার কর্নেল মেনজিটসুর নাম করা হয়। তাকে গৃহযুদ্ধ, মহামারী, দারিদ্র্য ইত্যাদির শিকার হতে হয়েছে; তবুও সামাজিক উৎপাদন-সম্পর্ক পুননির্মাণ সম্পর্কে তার শাসনের অধিকতর পরিচ্ছন্ন ধারণা ছিল। কৃষক সমিতি, উৎপাদন সমবায়, বর্গাচাষী সমিতি ইত্যাদি সংগঠনের মাধ্যমে সংস্কারকে অর্থবহ করে তুলতে মেনজিটসু প্রয়াসী হন। কিন্তু তার সীমাবদ্ধতা এখানেই যে এক ক্ষেত্রে সংস্কার এনে সব ক্ষেত্রে তার বিস্তার আপনা-আপনি ঘটবে, এমনটি ভেবেছিলেন এবং সর্বক্ষেত্রে সংস্কার আনার মতো তার সাংগঠনিক প্রস্তুতি বা শক্তিও ছিল না। স্মর্তব্য, এই বিপ্লবী সরকার আইয়ুব বা গাওয়ানের মতো বেসামরিক মিত্র খুঁজে পায়নি বা খুঁজতে প্রয়াসী হয়নি।

যেকোনো সরকারের জন্য সমাজে সামগ্রিকভাবে কী সম্পদ রয়েছে, সেগুলো কীভাবে বণ্টিত হয়েছে এবং কীভাবে সে সম্পদ দেশের কাজে লাগানো যেতে পারে— এসবই উন্নয়নের জন্য বিশেষ বিবেচনার বিষয়। স্মরণীয় যে সামরিক সরকার দেশের প্রশাসন দখল করে নেয়, তাদের তাঁবেদারিতে দেশের সব সম্পদ তাত্ক্ষণিকভাবে হাজির হয় না। এ সম্পদের কতটুকু সরাসরি সামরিক শক্তি গঠনে ব্যয়িত হয়, তার ওপর সামরিক শক্তির ক্ষমতা নির্ভর করে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক সম্পদের দ্রুত প্রবৃদ্ধি না ঘটলে সামরিক শক্তি বর্তমানে যত বৃহদংশই গ্রহণ করুক না কেন, তা ক্রমেই সীমিত হয়ে আসে। আর সামরিক বাহিনীকে জাতীয় ঐক্য সংগঠনেও সম্পদ ব্যয় করতে ব্রতী হতে হয়, যদি তারা দীর্ঘ মেয়াদে প্রশাসনে থাকতে চায়। কেননা জাতীয় ঐক্য ও জাতীয় সম্পদের প্রবৃদ্ধিই সেনাবাহিনীর জন্য সম্পদের নিশ্চয়তা দিতে পারে। এ ত্রিলক্ষ্যের মধ্যে সম্পদ বণ্টন একটি দুরূহ জটিল ব্যাপার। তৃতীয় বিশ্বের সর্বত্রই সামরিক শাসন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সামরিক বাহিনীর জন্য সম্পদের অংশ বৃদ্ধি করেছে অত্যন্ত দ্রুত হারে, যখন জাতীয় সম্পদের প্রবৃদ্ধির হার থেকে গেছে অনেক নিচে এবং জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি রচনায় মানুষের প্রাথমিক প্রয়োজন মেটাতে, বিশেষ করে মনুষ্য সম্পদ গড়ে তুলতে সম্পদ তেমন পাওয়া যায়নি।

সামরিক শাসনের শুরুতেই সেনাবাহিনী ভাগ্যবান উচ্চবিত্তের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করে তাদের সাদাসিধে, মিতব্যয়ী, শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনের মূল্যবোধকে জলাঞ্জলি দিয়ে বসে। ঘানায় সামরিক শাসন এমনটি করেছিল, জেনারেল সুহার্তো বা জেনারেল গাওয়ানও তেমনটি করেছেন। যেখানে সম্পদ সহজলভ্য, যেখানে বিদেশী সাহায্য প্রচুর আসে এবং যে সমাজে বৈষম্য সহজে মেনে নেয়া হয়, সেখানেই সামরিক শাসনে কালো টাকা বানানো, সরকারি অর্থ্যের অপচয় ও অপব্যবহার, তহবিল তছরুপ বৃদ্ধি পেতে থাকে। জেনারেল গাওয়ানের নাইজেরিয়া, সুকর্নর পরবর্তী ইন্দোনেশিয়া, ঘানার সামরিক শাসন, মার্কোসের সামরিক শাসন, লাতিন আমেরিকার সামরিক শাসনাধীনে দেশগুলো এ সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে। অর্থাৎ সামরিক শাসনের ইতিহাস অর্থনৈতিক সম্পদকে উন্নয়নের মুক্তিনির্ভর কাঠামোতে ব্যবহার ও বণ্টনকে ব্যাহত করার ইতিহাস।

উন্নয়নের মূল লক্ষ্য হতে হবে সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষ সংগঠিত হয় সামাজিক প্রক্রিয়ায় সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের স্বার্থেই। এসব সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তন, অনেক স্থানেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন প্রয়োজন। তৃতীয় বিশ্বে শাসনের যে ইতিহাস আমরা পাই, সেখানে তাদের সামাজিক নীতি এই পুনর্গঠনে যে অবদান রেখেছে সে চিত্রইবা কী রকম? অনেক সামরিক শাসকই সাধারণ মানুষের জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের আশ্বাস দেন ক্ষমতায় এসে। তারা সামাজিক বৈষম্য ও নৈরাজ্য দূরীকরণেরও আশ্বাস দিয়ে থাকেন। অন্য কথায় তারা ক্ষমতা, আয় ও উৎপাদন-উপকরণের বণ্টনে অধিকতর সমতা আনবেন, একথাই বলে থাকেন। মেনজিটসু, গাওয়ান, ওবেশানজো থেকে আইয়ুব, সুহার্তো, মার্কোস— সবাই এ আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সামরিক শাসনের ঘোষণা এবং তাদের যে ক্রিয়াকাণ্ড, তাতে ফাঁকটা অনেক ক্ষেত্রেই বেশ ব্যাপক।

তৃতীয় বিশ্বে দারিদ্র্য নিরসনই সামাজিক উন্নয়ন-প্রক্রিয়ায় মূল সমস্যা। দারিদ্র্যের অনেকটাই মানুষ ও তার সমাজের সৃষ্টি। উৎপাদনের উপকরণ ও সম্পদ আহরণের জন্য যে সামাজিক ক্ষমতা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সেটিই দারিদ্র্য সৃষ্টির মূল কারণ।

[Townsend. O : Sociology and Social Policy, London, Allen Lane, 1985] এই সামাজিক কাঠামো পরিবর্তনে কেবল যে অর্থ বিনিয়োগের প্রশ্ন জড়িত তা নয়, এ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও বেশ প্রাধান্যের দাবিদার।

যে সমাজে সম্পদের অপ্রতুলতা রয়েছে, সেখানে যখন সামরিক শাসনে সামরিক বাহিনী ও তাদের সহযোগী শ্রেণী ভালো বাড়ি, ভালো গাড়ি, ভালো পোশাক, বিলাসবহুল জীবনের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়, তখন কেবল বৈষম্যের প্রবৃদ্ধিই চিহ্নিত হয় না, তখন প্রচণ্ড সামাজিক ক্ষোভেরও জন্ম হয়। ঘানা বা ইন্দোনেশিয়ার সামরিক শাসন এর সাক্ষী। তখন বিদেশী সাহায্যে দারিদ্র্য নিরসন প্রকল্পের আবির্ভাব হতে পারে একটি Holding operation-এর জন্য, যেমন ঘটছে গ্রামীণ ব্যাংক, রুরাল পুওর প্রোগ্রাম বা এ ধরনের প্রোগ্রামের মাধ্যমে। কিন্তু তাতে এ ক্ষোভের উপশম হওয়ার কারণ নেই। তাদের অপেক্ষা কেবল সময় ও নেতৃত্বের। যে সমাজে সম্পদের প্রবৃদ্ধি ঘটে, যেমন গাওয়ানের নাইজেরিয়া বা সুহার্তোর ইন্দোনেশিয়া, সেখানে ক্ষুদ্র একটি শ্রেণীর বিলাসবহুল জীবন ও সামাজিক বৈষম্য ও অনৈক্যকে চিহ্নিত করে এবং সামাজিক বিভাজনের কারণে উন্নয়ন-প্রচেষ্টা যথেষ্ট ফলপ্রসূ হতে পারে না। শুধু তা-ই নয়, বিলাসজীবী ও দরিদ্র শ্রেণীর বিভাজন যত বড়, সামাজিক অপরাধের মাত্রাও তত বাড়ে। এর ফলে সামাজিক সম্পদের অপচয় বৃদ্ধি পায়। যে সামরিক শাসন এ বিভাজনকে বাড়িয়ে তোলে, সেখানেই এটা বৃহদাকার ধারণ করে। এর সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হলো জেনারেল জিয়াউল হকের পাকিস্তান।

উন্নত বিশ্বে মানুষের জীবনের মান একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও সম্পদ সৃষ্টি বেসরকারি পর্যায়েও গড়ে উঠতে পারে এবং কতটুকু Social goods উৎপাদিত হবে, সেটি অনেকখানি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি Social goods সৃষ্টি ও তার বণ্টনের ওপর নির্ভরশীল। এই সাধারণ সত্যটি যেমনি পাশ্চাত্যের পরামর্শদাতারা অনুধাবনে ব্যর্থ হন, তেমনি সামরিক শাসন কেন অনেক ধনতান্ত্রিক প্রশাসনও অনুধাবন করতে পারে না। তবে জনসাধারণের কাছে প্রকৃত জবাবদিহিমুক্ত সামরিক শাসন Social goods সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি উদাসীন।

বৈষম্যহীন সমাজের মূল শর্ত হলো উৎপাদন, উপকরণ ও উৎপাদিত সম্পদে সমতার (Equity) নীতি অনুসরণ, যার একমাত্র সীমা হলো সেটি, যেখানে আর্থসামাজিক অদক্ষতা, সামাজিক ন্যায় ও তার আর্থসামাজিক সুফলকে অতিক্রম করে। যেহেতু আইনেরও একটি রাজনৈতিক অর্থনীতি রয়েছে, যেহেতু ইউরোপীয় ন্যায়ের আলোকে তৃতীয় বিশ্বে সমতার সন্ধান আইনের ন্যায়সঙ্গত সীমা অতিক্রম করতে পারে না। বিশ্বজনীন ন্যায়ের সঙ্গে আইনসঙ্গত ন্যায়ের পার্থক্য থাকতে পারে শ্রেণীবিদুষ্ট আইনের চারিত্রিক কারণে। সেজন্য তৃতীয় বিশ্বের সামাজিক বিনির্মাণ নতুন সমাজকাঠামোর সন্ধান ছাড়া সম্ভব নয়। এজন্য যে আদর্শিক সজ্ঞানতা প্রয়োজন, সাধারণত সামরিক শাসন সে সজ্ঞানতা দেখাতে সমর্থ হয়নি। সামরিক শাসকরা সমাজের গরিষ্ঠ কিন্তু হতবল মানুষের দিকে তাকিয়ে তাদের নীতি রচনা করে না। তাদের আঁতাত ঘটে সম্পদশালীদের সঙ্গেই, জাতীয়করণ সত্ত্বেও। এ কারণে তৃতীয় বিশ্বে পশ্চিমের সামরিক ঐতিহ্যে লালিত কোনো সামরিক শাসকই এমন কোনো সামাজিক পুনর্গঠন-প্রচেষ্টা কার্যকর করেননি, যার ফলে বিদেশী সাহায্য অথবা দেশীয় মিত্রদের সমর্থন তাদের হারাতে হয়।

একথা সত্য নয় যে, সামরিক শাসনে শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা বাসস্থানের ক্ষেত্রে সরকারি ব্যয় বাড়ে না। কিন্তু সত্যটি হলো, সমাজ পুনর্গঠনে যতটুকু সম্পদ এসব খাতে প্রয়োজন, তার এক-দশমাংশও তারা দিতে কুণ্ঠিত হয়। যদিও সামরিক বাহিনীর জন্য ব্যয়, আমলাতন্ত্রের জন্য ব্যয়, ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সুযোগ-সুবিধাজনিত ব্যয় বাড়তেই থাকে। নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, সুদান, ঘানা, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, চিলি— এসব দেশের ইতিহাস এর সাক্ষ্য দেয়।

শুধু তা-ই নয়, শিক্ষার মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক শক্তির অভ্যুত্থানও সামরিক শাসনের কাম্য হয় না, সেজন্য শিক্ষা ব্যবস্থার বিভাজন ও বিভিন্ন প্রকার নিয়ন্ত্রণ তাদের নীতির অঙ্গ হয়ে পড়ে। তবুও শেষ রক্ষা হয় না, তার প্রমাণ দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন। কিন্তু সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে, তার প্রমাণ পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ঘানা, মিয়ানমার— এসব দেশের সামরিক শাসনের ইতিহাস।

সামরিক শাসনে রাজনীতি বন্ধ করে দিলেও একটি দেশের রাজনীতি বন্ধ হয়ে থাকে না, এটি নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে এবং সামরিক শাসন একে নিজের স্বার্থে পুনর্গঠন ও নিয়ন্ত্রণে ব্রতী হয়। তৃতীয় বিশ্বের একটি প্রধান রাজনৈতিক সমস্যা হলো জাতীয় সংহতির অভাব; গোষ্ঠীজাত দ্বন্দ্ব, আঞ্চলিকতা, সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা— সবকিছুই জাতীয় সংহতির বিপক্ষে কাজ করে। সামরিক বাহিনী শিক্ষা ও আদর্শের দিক থেকে এসব মানসিকতা থেকে মুক্ত থাকলে তারা জাতীয় সংহতি সৃষ্টিতে অবদান রাখতে সমর্থ হতে পারে, কিন্তু যদি তা না হয়, তবে সামরিক শাসন জাতীয় সংহতি সৃষ্টি করতে পারে না। তার প্রমাণ পাকিস্তান, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া, সুদান, ঘানা— এসব দেশ। সুতরাং সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক অর্থে স্বতঃসিদ্ধভাবে জাতীয় সংহতির প্রতীক হয়ে ওঠে না।

[Rosberg and Nottingham, J: The Myth of Mau Mau: Nationalism in Kenya, New York, Prager, 1966]। মনে রাখা দরকার, সামরিক বাহিনীর সংগঠন ঔপনিবেশিক শাসকরাই তৈরি করেছিলেন, যেমন— ব্রিটিশ ভারতে পাঠান, বেলুচ, পাঞ্জাবি ও শিখদের প্রাধান্য, পাকিস্তানে পাঞ্জাবিদের প্রাধান্য, ঘানায় উত্তরের প্রাধান্য, নাইজেরিয়ায় ইবোদের প্রাধান্য ইত্যাদি। সুতরাং ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার হিসেবেই সামরিক বাহিনী জাতীয় সংহতির অবিসংবাদী প্রতীক হয় না এবং তাদের ঔপনিবেশিক শিক্ষা ও ঔপনিবেশিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কও তাদের এমন ভূমিকার জন্য তৈরি করে না। মনে রাখা দরকার, গোষ্ঠী বা উপজাতীয় অনৈক্য থাকলে সামরিক বাহিনী সাধারণ সামাজিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। সে কারণে Grass-root পর্যায়ে জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠিত না হলে, সামরিক বাহিনীর পক্ষে জাতীয় সংহতির প্রতীক হওয়া সম্ভব নয়।

অনেক সময় এ যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে যে, তৃতীয় বিশ্বে বেসামরিক শাসন জাতীয় অনৈক্যের এমন একটি সংকট বৃষ্টি করে যে, সম্পূর্ণভাবে ঐক্যবদ্ধ না হলেও তুলনামূলকভাবে সামরিক শাসন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এনে দেয়। [Shills. E: The Military in the political Development of the new states; in Johnson. J.J. (ed), The Role of the Military in the Underdeveloped Countries; Princeton University Press, 1962]। কিন্তু এর বিপরীতে একথাও বলা হয়েছে, একবার সামরিক অভ্যুত্থান হলে অর্থবহ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ বন্ধ হয় এবং একটি ‘ক্যুর’ বিপরীতে কালক্রমে অন্য ক্যু ঘটতে থাকে। [Possony, S.A: forward Strategy for America, Harper, 1961]

কিন্তু একথা স্মরণীয় যে যারা সামরিক শাসনকে স্থিতিশীলতার প্রতীক বলে মনে করেছেন, তারাও দীর্ঘ মেয়াদে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পদ্ধতি ছাড়া কোনো প্রকার রাজনৈতিক অগ্রগমন ও স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। সুতরাং তারা মনে করেন, সামরিক বাহিনীর স্বল্পকালে এ দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অগ্রগমনের পূর্বশর্ত সৃষ্টি করা প্রয়োজন। [Halpern, M: Middle Eastern Armies and the new Middle Class; in Johnson J.J. (ed), The Role of the Military in the Underdeveloped Countries, Princeton University Press. 1962] কিন্তু সামরিক শাসকের এ আত্মোৎসর্গ করার মানসিকতা সাধারণত কখনই থাকে না। সুতরাং সামরিক শাসন তথাকথিত অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে সাময়িক একটি সমাধান আনলেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান তাদের আয়ত্তে নেই এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত সৃষ্টি তাদের শিক্ষা ও মানসিকতায় অনুপস্থিত। [Horowitz, Three Worlds of Development, OUP, New York, 1966] একথা বলা হয়েছে যে, সামরিক শাসকদের রাজনৈতিক উত্তরণের ব্যাপারে সাধারণত কোনো সুষ্ঠু ধারণা থাকে না এবং তাদের সাংগঠনিক প্রকৃতি এ উত্তরণকে ব্যাহত করে। তারা ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণকে অংশগ্রহণকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার চেয়ে কার্যকর মনে করে; তারা শক্তি ও বলপ্রয়োগকে Persuation ও consultation-এর চেয়ে বেশি মূল্য দেয়। তাদের মূল্যবোধগুলো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বিবর্তনের সহায়ক নয় [Lovy, M: Modernization and the Structure of Societios : A Setting for International Affairs. Princeton University Press. 1966; Bienen; The Military and Modernisations. Chicago. Aldine, 1971] এ প্রকার সিদ্ধান্ত আমরা Hopkins, Horowitz, Huntington (প্রাগুক্ত) লেখাতেও পাই।

সামরিক শাসনে রাজনৈতিক বিবর্তনের পরিচয় তৃতীয় বিশ্বে সর্বত্র এক নয়। ব্রাজিল ও ঘানায় সামরিক শাসকরা কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন সূচক পদক্ষেপ নিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। নাইজেরিয়ায় সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন সামরিক শাসনামলেই নেয়া হয়েছে, আইয়ুব ও জিয়ার পাকিস্তানেও তা-ই ঘটেছে। ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়ায় এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কিন্তু Huntingtion এসব বিশ্লেষণ করে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, তা হলো, সামরিক শাসন পরিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা করতে পারে কিন্তু স্থায়ী রাজনৈতিক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ধারার সৃষ্টি করতে পারে না। এ কারণে সব সামরিক শাসন রাজনৈতিক ও আইনভিত্তিক বৈধতাহীনতায় ভোগে। [Odetola: প্রাগুক্ত]।

একথা আজ জানা যে, সামরিক শাসন নিজেদের স্বার্থে রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে প্রয়াসী হতো। ইন্দোনেশিয়া, ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম নয়। সামরিক শাসন যখন সমাজতান্ত্রিক চেহারা গ্রহণে প্রয়াসী হয় বা সে ধরনের মতাদর্শ প্রচার করে, তখন তারা Grassroot প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চেষ্টা করে (ইথিওপিয়া)। সমাজতান্ত্রিক উদ্দেশ্য না রেখেও সামন্ততন্ত্রকে সংগঠিত করতে আইয়ুব ‘বেসিক ডেমোক্রেসি’ গড়ে তুলেছিলেন। ধনতান্ত্রিক স্বার্থেও অশান্ত জনতাকে কিছুটা স্বস্তি দিতে গ্রামমুখীন প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশে জিয়ার শাসনামলে এটাও আমরা দেখেছি, গ্রাম সরকার নিয়ে যে মানসিক দ্বন্দ্ব, স্বীকৃতি ও অস্বীকৃতির যে দোদুল্যমানতা, সেটি এ পরিপ্রেক্ষিতে বিচার্য। এরশাদীয় আমলে গ্রাম পরিষদের কথা উঠেছে। জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে একটি অনুগত শ্রেণী সৃষ্টির প্রচেষ্টায়। কিন্তু স্মরণীয় যে ইথিওপিয়ার সমাজতন্ত্রী সামরিক শাসন কৃষক-সংগঠন, গ্রাম সমবায়, ভূমি সংস্কার ইত্যাদি করতেও দ্বিধাগ্রস্ততার পরিচয় দিয়েছিল।

সামরিক প্রশাসনের জাতীয় সমর্থন আদায়ে আফ্রিকা ও এশিয়ার যে, রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তার মন্ত্রণা সাধারণত দিয়েছে বিদেশী পরামর্শক ও আমলাতন্ত্র। নাইজেরিয়া, ঘানা, বেনিন, আপার ভোল্টা, নাইজার, পাকিস্তানসহ প্রায় সব তৃতীয় বিশ্বের দেশেই এটা সত্য। কিন্তু একথাও সত্য যে, রাজনৈতিক সব কাঠামো পরিবর্তনের বিরাট কর্মসূচি কোনো স্থানেই সাফল্যমণ্ডিত হয়ে স্থায়িত্ব বা জনসমর্থন লাভ করেনি, সামরিক শাসনের প্রত্যক্ষ নীরবতাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লক্ষ করা গেছে।

সাম্প্রতিককালে সামরিক প্রশাসন অবশ্য এটা অনুধাবন করেছে যে, রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন। সেজন্য গোলকার পার্টির মতো পার্টি আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকাসহ অনেক দেশেই আজ দৃশ্যমান। আর এই রাজনৈতিক ক্রিয়াকাণ্ডে সামরিক বাহিনী যুক্ত হয়ে তাদের পেশাদারি বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলছে। কিন্তু সামরিক শক্তির প্রচণ্ড উপস্থিতি ছাড়া এ ধরনের রাজনৈতিক সংগঠন কখনই জনসমর্থন লাভ করেনি।

অনেক সময় বলা হয়ে থাকে যে, সামরিক শাসন প্রথাগত রাজনৈতিক পার্টির পরিবর্তে জনসাধারণের কাছে সরাসরি চলে যায় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনমত অধিকতর সফলতার সঙ্গে প্রতিফলিত হয়। ষাটের দশকের সামরিক শাসকদের গণতন্ত্রবিরোধী মতবাদের সপক্ষে এ যুক্তি অনেক ক্ষেত্রেই তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু জনগণের অংশগ্রহণ অর্থবহ হতে হলে জনগণের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হয় এবং তাদের স্থানীয় ও জাতীয় সমস্যা ও সমাধানের বিভিন্ন মত ও পথ সম্পর্কে জ্ঞানদান করতে হয় এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনমত প্রতিফলনের প্রক্রিয়াকে সংহত করতে হয়। কেবল Universal adult suffrage, স্থানীয় সরকার ইত্যাদির আইনগত বিধানই যথেষ্ট নয়। উপরন্তু কী কী বিষয়ে জনসাধারণের মত গ্রাহ্য হচ্ছে, সেটিও বিবেচ্য। তৃতীয় বিশ্বের সামরিক শাসনের অধীন কোনো দেশেই এসব শর্ত পূর্ণ হয়নি এবং সে কারণে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে জনগণের অংশীদারি অর্থবহ হয়নি, কিন্তু সেনাশাসন প্রচলিত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়াকে বিনষ্ট করতে অনেক ক্ষেত্রেই সমর্থ হয়েছে। [Jemibewon, D. M: A Combatant in Government : Ibadon : Heinemann, 1978] এটি অত্যন্ত সহূদয় জনপ্রিয় সামরিক শাসনকর্তাদের সম্পর্কেও সত্য। সত্কর্ম ও রাজনৈতিক সংগঠন সমান্তরালে চলে না এবং কেউ কেউ সত্কর্ম ও প্রাথমিক চাহিদা পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজনৈতিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে প্রয়াসী হয়েছেন। অথচ অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সামাজিক সংগঠনের মতো রাজনৈতিক সংগঠনের ভূমিকাও মুখ্য।

সামরিক শাসনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা-সম্পর্কিত আলোচনা এখনো যথেষ্ট সহজলভ্য নয়। Nordlinger তার গবেষণার যে ফলাফল তুলে ধরেছেন, তাতে তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন যে, সামরিক শাসকরা জাতীয় অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায় বিফল হয়েছে [Nordinger E: Soldiers in Mufti: The Impact of Military Rule upon Economic and Social Change in the Non-Western Societies, American Political Science Review, Vol. LXIV, No. 4, Dec. 1979] অন্যদিকে Mckinlay বলেছেন, সামরিক শাসকরা বেসামরিক শাসনের তুলনায় অধিকতর দক্ষতার পরিচয় রাখতে পারেননি। [Mckinlay. R.D. and Cohan, A.S. Performance and Instability in Military and non-Military Regiments, American Political Science Review, Vol, LXX No 3 September, 1976] অবশ্য কখনো কখনো অর্থনৈতিক সংকটে সামরিক শাসন দ্রুত ও অধিকতর সফল ব্যবস্থা গ্রহণে সমর্থ হয়েছে, কিন্তু এসব ক্ষেত্রে তাদের ব্যর্থতাও কম নয়। পাকিস্তানে ১৯৬৫-উত্তর, ’৭১-উত্তর অর্থনৈতিক সংকটসমূহ তাদেরই সৃষ্টি এবং এগুলো মোকাবেলায় তারা ব্যর্থ হয়েছিল। এ বছরও পাকিস্তানের যে অর্থনৈতিক চিত্র জেনারেল জিয়ার অর্থমন্ত্রী চিত্রিত করেছেন, তাতে জেনারেলের আমলে অর্থনৈতিক সংকট ঘনীভূত হয়েছে একথা বলা চলে। ঘানা, মালি, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, সুদান, নাইজেরিয়া, লাতিন, আমেরিকা— সর্বত্রই এ ব্যর্থতার ছাপ পরস্ফুিট।

মূল যে প্রশ্ন সামরিক শাসনে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পরস্ফুিট হয়ে ওঠে, সেটি হলো বলপ্রয়োগের হুমকিতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয় কিনা। বলা হয়, সামরিক বাহিনী যদি প্রকৃতই সংগঠিত হয় এবং নৈতিক শক্তি তাদের সম্পদের অপব্যবহার থেকে মুক্ত রাখে, তাহলে তারা অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে (Horwitz: প্রাগুক্ত)। একথাও বলা হয়, তৃতীয় বিশ্বের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য নেই বলেই বলপ্রয়োগে নৈতিক শক্তি বিরাজমান থাকলে এবং জনকল্যাণে আহূত সম্পদ ব্যবহূত হলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হয়ে ওঠে। (Ordeltola: প্রাগুক্ত) অবশ্য এজন্য রাষ্ট্রকেই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নামতে হয় এবং ব্যক্তিমালিকানাকে অত্যন্ত কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। (Horwitz: প্রাগুক্ত) অর্থাৎ যেখানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাকে খর্ব করা হয়, সেখানে সামরিক শাসনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার শক্তি সীমিত হয়ে পড়ে। Horwitz তার এক গবেষণায় দেখিয়েছেন উচ্চ সামরিকীকরণ, উচ্চ রাষ্ট্রীয়করণ ও উচ্চ অর্থনৈতিক উন্নয়ন যেসব দেশে প্রত্যক্ষ করা গেছে, সেগুলো হলো— ইসরায়েল, লিবিয়া, গ্রিস, নিকারাগুয়া, ইরাক, ইরান, তাইওয়ান, আইভরি কোস্ট, জর্ডান, বলিভিয়া, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়া (Horwitz: প্রাগুক্ত)। এ থেকে তিনি বলতে প্রয়াসী হয়েছেন যে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে স্বৈরশাসনের কোনো বৈরিতা নেই।

কিন্তু এ মতবাদেরও প্রতিবাদ হয়েছে বিশ্লেষণের পদ্ধতিগত ত্রুটি নিয়ে, কারণ Variableগুলো বিভিন্নতার জন্য Adjusted ছিল না। যেমন— তেল আবিষ্কার, বিশেষ বাণিজ্যিক সম্পর্ক, নগরায়ণের ধারা, বিদেশী সাহায্য ইত্যাদি। এ সত্ত্বেও ইদি আমিনের উগান্ডা, চিলি, পাকিস্তান, ইথিওপিয়া, ফিলিপাইন, ডমিনিকান রিপাবলিক— এগুলোর চিত্র উপরোক্ত সিদ্ধান্তের বিপরীত। অর্থাৎ সামরিক শাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে কোনো যৌক্তিক সম্পর্ক নিরূপণ সম্ভব নয়, কারণ সফলতা ও বিফলতা— দুই প্রকারের অভিজ্ঞতাই আমাদের রয়েছে। এ বৈপরীত্য বুঝতে হলে অর্থনৈতিক নীতিগুলো, সামরিক শাসনে অর্থনৈতিক সম্পদের ব্যবহারের প্রকৃতি এবং নেতৃত্বে নৈতিকতার দিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে। সমতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক নীতি পরিচালিত না হলে যেকোনো শাসনেই বিংশ শতাব্দীর শেষপাদে যেকোনো প্রকার উন্নয়ন একটি স্তরের পর আর অগ্রসর হতে পারে না। Adelman ও Morris সামরিক শাসনের রাজনৈতিক শক্তি ও অর্থনৈতিক বিবর্তন নিয়ে যে গবেষণা করেছেন, তা থেকে এ দুয়ের Correlation অত্যন্ত কম মানের বলে ধরা পড়েছে। GNP-র প্রবৃদ্ধির হার ও সামরিক শাসনের রাজনৈতিক শক্তির Correlation (N=74) হলো শূন্য দশমিক ১৩; শিল্পায়নের সঙ্গে এ সম্পর্ক হলো শূন্য দশমিক ২৯; কৃষিক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে শূন্য দশমিক ০৭, শিক্ষাগত উন্নয়নের সঙ্গে শূন্য দশমিক শূন্য ৮ এবং বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির হারের সঙ্গে শূন্য দশমিক ১১ [Adelman and Morris: Society, Politics & Economic Development] এসব তথ্য আমাদের একটি সিদ্ধান্তের দিকে অগ্রসর হতে বাধ্য করে, তা হলো সামরিক শাসনে সাধারণত অর্থনৈতিক উন্নয়নও দ্রুত এবং অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে না।

তৃতীয় বিশ্বে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সামরিক শাসন-সম্পর্কিত যে তথ্য আমাদের কাছে আছে, তার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্পর্কে আমরা কী সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি, সেটা আজ স্পষ্ট। আর সে কারণে মানুষ হিসেবে, নাগরিক হিসেবে, শিক্ষক হিসেবে, অভিভাবক হিসেবে আমি আজ শঙ্কিত। আপনাদের আশার বাণী শোনাতে পারলাম না, সে বেদনা আপনাদের মতো আমারও।

[বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতির ভাষণ, অষ্টম দ্বিবার্ষিক সম্মেলন, জুন ১৯৮৯-৯০]

 

লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ ও ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক