১৯৮২ সালের শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট এরশাদের সামরিক সরকার উপজেলা ব্যবস্থা চালু করে। শুরুতে নাম ছিল ‘মান উন্নীত থানা’ পরিষদ। অল্প সময় পরেই উপজেলা পরিষদ নাম দেয়া হয়। সরকারি একটি রেজল্যুশন ছিল সূচনার আইনি কাঠামো। এর পরপরই লোকাল গভর্নমেন্ট (উপজেলা পরিষদ এন্ড উপজেলা অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রি-অর্গানাইজেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২ জারি করা হয়। মূলত সাবেক থানা পরিষদকে বিলুপ্ত করেই এর গঠন। আর থানা পরিষদের অবকাঠামো ও জনবল সবকিছুই চলে যায় এর আওতায়। সরকারের বাজেট বিবেচনা ও জনবল সংস্থানের ব্যবস্থা করতে উপজেলা পরিষদ গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সময় নেয় প্রায় দুই বছর। প্রশাসনিক স্তর হিসেবে বিলুপ্তি ঘটে মহকুমার। তবে প্রায় সব মহকুমা হয়ে যায় জেলা। উপজেলাগুলোতে পরিষদের আওতার বাইরে রেখে স্থাপিত হয় দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত। জনগণের সরাসরি ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচনের বিধান করা হয়। সদস্য থাকেন ইউনিয়ন পরিষদগুলোর নির্বাচিত চেয়ারম্যান এবং পৌরসভা থাকলে এর একজন কমিশনার। উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাগণ হন ভোটাধিকারবিহীন সদস্য। সার্কেল অফিসার উন্নয়ন পদ বিলুপ্ত করে প্রশাসন ক্যাডারের কিছুটা অভিজ্ঞ একজন কর্মকর্তাকে করা হয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার। সূচনায় উন্নয়নমূলক ও প্রশাসনিক অনেক কাজ উপজেলা পরিষদকে দেয়া হয়েছিল। ১৯৮৫ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের নেতৃত্বে যায় উপজেলা পরিষদ। নতুন জনবল-কাঠামোর অফিস ও বাসস্থান নির্মাণের জন্য কাজ চলতে থাকে। তেমনি উন্নয়নকাজের জন্যও পরিষদগুলোকে দেয়া হয় থোক বরাদ্দ। এ বরাদ্দ দিয়ে কৃষি থেকে শিক্ষা, পল্লীপূর্ত ইত্যাদি অনেক কাজ হাতে নেয়া হয়। পরিষদগুলোকে ঘিরে শুরু হয় নগরায়ণ প্রক্রিয়া। ঘরের দোরগোড়ায় অনেক ধরনের সেবাপ্রাপ্তি, এমনকি মামলা-মোকদ্দমা নিষ্পত্তির সুযোগ জনগণের কাছে নন্দিত হয়। মহকুমাগুলোকে জেলায় রূপান্তরে সে সুযোগ আরো প্রসারিত হয়। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হওয়ায় তার কাছে স্থানীয় জনগণের অভাব-অভিযোগ জানানোর সুযোগ বেড়ে যায়। শুরুতে কিছু ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে চেয়ারম্যানদের দ্বন্দ্ব থাকলেও উভয় পক্ষ বাস্তবতাকে মেনে নেয়।

উপজেলা পরিষদের যাত্রাপথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। তৃণমূল জনগণের প্রত্যাশা সম্পর্কে ব্যাপক ধারণা একজন সামরিক শাসকের থাকার কথা নয়। উল্লেখ্য, তিনি ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই কার্যত সব রাজনৈতিক দলের বিরোধিতার সম্মুখীন হন। শুরুতে তার কোনো দল ছিল না। এটা গঠিত হয় পরে। সে অবস্থায় নিজের পক্ষে একটি বেসামরিক ক্ষমতাবলয় সৃষ্টি তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। আর ব্যবস্থাটি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ায় সে ক্ষমতাবলয় তিনি সাফল্যের সঙ্গেই ব্যবহার করেন। এ ব্যবস্থার প্রতি তার আনুগত্য যে নিরঙ্কুশ ছিল না তা লক্ষ করা যায় ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনের পর। তখন উপজেলা পরিষদে ন্যস্ত কিছু কিছু বিষয় ফিরিয়ে নেয়া হয়। ঈপ্সিত বেসামরিক ক্ষমতাবলয় তিনি করে ফেলেছেন। তাই তারই সৃষ্ট এ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব হ্রাস পেতে থাকল। শুরুতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়োগ থেকে শুরু করে বরখাস্ত সবকিছু করার কর্তৃত্ব ছিল উপজেলা পরিষদের। সে ক্ষমতা রইল না। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর গ্রাম-গ্রামান্তরে সুপেয় পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন চাষাবাদের জন্য উন্নত বীজ, কীটনাশক ইত্যাদি সরবরাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এ দুটো সংস্থা সূচনায় পরিষদে হস্তান্তরিত হলেও আবার সংরক্ষিত তালিকায় কেন্দ্রীভূত অবস্থায় চলে যায়। বিচার ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণে আইনজীবী সম্প্রদায়ের প্রবল বিরোধিতা মোকাবেলা করতে হয়। এক্ষেত্রে এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালেই হাইকোর্ট বিকেন্দ্রীকরণ সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে বাতিল হয়ে যায়। আর তার ক্ষমতাচ্যুতির পর নির্বাচিত সরকার উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থাই বাতিল করে দেয়। আদালতগুলো তুলে আনা হয় জেলা স্তরে। পাকিস্তান সময়কালে আইয়ুুব খান সামরিক শাসন জারি করে বেসামরিক আবরণে এসেছিলেন মৌলিক গণতন্ত্র নামক একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে। সে ব্যবস্থাও অনেক সমালোচনার মাঝে আমাদের পল্লী অবকাঠামো গড়তে বড় ধরনের অবদান রেখেছিল। তখনই থানা পর্যায়ে উপজেলা পরিষদের অবয়বেই গঠিত হয়েছিল থানা পরিষদ। পার্থক্য ছিল নেতৃত্বে। থানা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন মহকুমা প্রশাসক। উপজেলা পরিষদে নেতৃত্বের গণতন্ত্রায়ণ হয়েছে। অন্যদিকে উপজেলা পরিষদ গঠন করার জন্য তখনকার শাসকদের উদ্দেশ্য যা-ই থাক এটি ফলপ্রসূ ও জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বলেই একবার ভেঙে দিয়েও আবার গড়তে হয়েছে। তবে আদালত আর ফিরে আসেনি। অবশ্য আদালতের সঙ্গে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনে এ স্থানান্তর যৌক্তিক ছিল।

এ প্রসঙ্গে আলোচনায় আমাদের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার গোড়ার দিক কিছুটা তুলে ধরা দরকার। উল্লেখ্য, একটি রাষ্ট্রে জনগণের যত ধরনের কাজকর্ম হয় সবকিছু কেন্দ্রীয়ভাবে করা যায় না। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জনবহুল এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে এটা সম্ভবই নয়। তাই আমাদের সংবিধানেও নির্বাচিত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাটির ওপর জোর দেয়া হয়েছে। আমাদের এ অঞ্চলে কোনো না কোনো রূপে স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা দীর্ঘকাল আগে থেকেই ছিল। যতটুকু দেখা যায় পল্লী অঞ্চলে এটা আইনি প্রতিষ্ঠানের রূপ পায় ১৮৭০ সালে ভিলেজ চৌকিদারি অ্যাক্ট প্রবর্তনের মাধ্যমে। এ আইনের সূচনায় বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য পঞ্চায়েত গঠন করতেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা। পঞ্চায়েত, চৌকিদার নিয়োগ ও তাদের মাধ্যমে প্রহরার দায়িত্বে ছিলেন। স্থানীয় কিছু পূর্ত কাজও তাদের আওতায় দেয়া হয়। এজন্য কর ধার্য করতে পারত পঞ্চায়েত। ধীরে ধীরে পঞ্চায়েতের মনোনীত সদস্যগণের স্থানে আসেন সীমিত ভোটাধিকারের মাধ্যমে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ। শহর এলাকাগুলো এর আগে থেকেই মূলত সরকারি নেতৃত্বে পৌরসভা জাতীয় প্রতিষ্ঠান গঠিত হতে থাকে। কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন গঠিত হয় ১৮৭৩ সালে। তবে ইংরেজ বসতি স্থাপিত হওয়ার পরপরই এখানে পয়োনিষ্কাশন, পানি সরবরাহ ও রাস্তাঘাট তৈরির দায়িত্ব দিয়ে ১৭২৬ সালে এখানে কলকাতা করপোরেশন নামে প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়। নাগরিক সুবিধাদির প্রসার ও নিজেদের শাসনকাজের সুবিধার্থে ব্রিটিশরা সময়ে সময়ে বিভিন্ন স্তরে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। এর মাঝে রয়েছে ইউনিয়ন বোর্ড, মিউনিসিপ্যালিটি, কিছু সময়ের জন্য মহকুমা পর্যায়ে লোকাল বোর্ড এবং জেলায় ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড। এগুলোর কাজকর্মে সুস্পষ্ট বিভাজন ছিল। আয়ের ব্যবস্থাও ছিল সুনির্দিষ্ট। সময়ে সময়ে সরকার কিছু অনুদানও দিত। তেমন দ্বৈধতা ছিল না প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজে। ধীরে ধীরে গণতন্ত্রায়ণ হয়। সীমিত ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই চালাতেন এগুলো। কর্মচারীও ছিল নিজস্ব। তবে ছিল আমলাতান্ত্রিক তদারকি। তা সত্ত্বেও এ ব্যবস্থায় রাজনীতি শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বে গেছেন অনেকে। ১৯৪৭-এ দেশ বিভাগের পর ১৯৫৮-এর সামরিক শাসন পর্যন্ত কাঠামো একই ছিল। তবে ভোটাধিকার ব্যবস্থা হয় প্রসারিত। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড পরিচালনা করত থানা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো। বড় রাস্তা ও খেয়াঘাটগুলোও ছিল তাদেরই আওতায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে দিত কিছু অনুদান। মিউনিসিপ্যালিটি পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, সড়কবাতি, সড়ক মেরামত ও সংস্কার এসব দেখত। দেখত কবরস্থান ও শ্মশান। পল্লী অঞ্চলে এগুলোর কিছু কিছু ছিল ইউনিয়ন বোর্ডের কাজ। এভাবেই মোটামুটি দক্ষ একটি স্থানীয় সরকার কাঠামো আমরা ব্রিটিশ শাসন আমল থেকে পেয়ে এসেছি। তখন এগুলোর নেতৃত্বেও আসতেন সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষিত ব্যক্তিরা। তাঁরা ছিলেন নিবেদিত। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান তার রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করতে প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত আমলা নেতৃত্বে নিয়ে নেন। তবে ইউনিয়ন পর্যায়ে কোনো পরিবর্তন হয়নি। নতুনভাবে গঠিত হয় থানা পরিষদ। এ ব্যাপারে প্রচুর সমালোচনা ছিল। বিপরীতে এসব প্রতিষ্ঠানে সরকার থেকে অনেক বরাদ্দ দেয়া হয়। সে টাকায় গ্রামীণ ও নগর অবকাঠামো নির্মাণ, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে যথেষ্ট অবদান রেখেছেন। পাশাপাশি তখন থেকেই স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় দুর্নীতির ছাপ পড়ে। আর এ ছাপ থেকে মুক্ত হওয়া যায়নি।

হালে উপজেলা পরিষদ আবার গঠিত হয় ২০০৯-এর সূচনায়। প্রথম এর আইনি ভিত্তি ছিল ২০০৮-এর একটি অধ্যাদেশ। সময়ান্তরে জাতীয় নির্বাচনের পরপরই এটি সংসদের আইনের মর্যাদা পায়। সঙ্গে যুক্ত হয় একটি নতুন ধারা। তা হলো স্থানীয় সংসদ সদস্য উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা হবেন এবং পরিষদ তার উপদেশ মেনে চলবে। এ বিধানটি উপজেলা পরিষদের স্থানীয় সরকার বৈশিষ্ট্যকে বড় রকমের ঝাঁকুনি দিয়েছে। এ নিয়ে বহু সমালোচনা, দেনদরবার হয়েছে। কিন্তু বহাল রয়েছে বিধানটি। ফলে কার্যত স্থানীয় আইনপ্রণেতাই হয়ে পড়েছেন প্রতিষ্ঠানটির হর্তাকর্তা। নতুন ব্যবস্থায় নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছাড়া দুজন ভাইস চেয়ারম্যানের বিধান রয়েছে। তাঁদের একজন মহিলা। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছাড়াও রয়েছেন কয়েকজন মহিলা সদস্য। তবে প্রতিষ্ঠানটি আগের চেয়ে কার্যকারিতা হারিয়েছে অনেক। সংসদ সদস্যের উপদেশ মানা বাধ্যতামূলক হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তারাও তার প্রতিই অধিক আনুগত্য দেখায়। আর এটা অস্বাভাবিকও নয়। যেখানে চেয়ারম্যানের সঙ্গে সংসদ সদস্যের মতান্তর রয়েছে, সেখানে কর্মকর্তাগণ বেকায়দায় থাকেন। কেউবা চেয়ারম্যানকে অবজ্ঞা করে সংসদ সদস্যের সমর্থন নিয়ে করে ফেলেন কিছু কাজ। ক্ষেত্রবিশেষে বরাদ্দ অব্যয়িত থাকে। কাজ হয় না। আইনপ্রণেতাগণ তাঁদের এ অবস্থান ছাড়তে অনিচ্ছুক। আরো লক্ষণীয় যে এ বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে তেমন কোনো মতপার্থক্য নেই। কিছুদিন আগে জেলা পরিষদও নির্বাচিত কাঠামো এসেছে। তবে এতগুলো স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মাঝে কর্মবিভাজন বেশ কিছু ক্ষেত্রে অস্পষ্ট। সবাই পূর্ত কাজ করছে। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের আইনে তাঁদের কাজের তালিকা সুদীর্ঘ। কিন্তু খুব কম ব্যাপারেই নিরঙ্কুশ আওতা রয়েছে তাঁদের। সূচনা থেকেই উপজেলা পরিষদকে একটি বিষয়ে সরকারের ওপর বড় ধরনের নির্ভরশীল করে রাখা হয়। সরকারের বরাদ্দ তাদের আয়ের প্রধান উৎস। আর তাদের প্রায় সব কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকার নিয়োজিত। তাদের বদলি ও শৃঙ্খলাও সরকার-নিয়ন্ত্রিত। বেতন-ভাতাদি সবই স্বাভাবিকভাবে সরকার দেয়। জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাগণ করেন সমান্তরাল তদারকি। তাদের আদেশ-নির্দেশও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণকে মেনে চলতে হয়। উপজেলা পর্যায়ের বেশ কিছু কাজের সঙ্গে পরিষদের নেই কোনো সংশ্লিষ্টতা। ক্ষেত্রবিশেষে তাঁরা শুধু অবগত থাকেন। কোনো ক্ষেত্রে তা-ও নয়। এখন বস্তুতপক্ষে কিছু পূর্ত কাজ, কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি এবং সামাজিক নিরাপত্তাবলয়ের কিছু টাকাপয়সা বিলিবণ্টন ছাড়া উপজেলা পরিষদের আর তেমন কাজ নেই। আর এগুলোও করতে হয় সংসদ সদস্যের ইচ্ছাকে আমলে নিয়ে। অথচ ব্রিটিশ শাসনকাল থেকে স্থানীয় সরকারের যে বিকাশ আমরা দেখি তা মূলত নিজস্ব জনবলনির্ভর ছিল। জেলা বোর্ড, মিউনিসিপ্যালিটি ও ইউনিয়ন বোর্ডের জনবল কাঠামো লক্ষ করলে তা-ই দেখা যাবে। ১৯৫৮ সালে মৌলিক গণতন্ত্র প্রবর্তনের পর জেলা ও থানা পরিষদে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ১৯৮২ সালে উপজেলা পরিষদ গঠনের সময় এর পুরো জনবল কাঠামো সরকারিই থেকে যায়। তাই প্রকৃতিগতভাবে এটি কেন্দ্রীয় সরকারের একটি সম্প্রসারিত অঙ্গ হিসেবেই আছে। স্থানীয় সরকারের আদল অনেকটাই অনুপস্থিত।

এ জনবহুল ও সমস্যা ভারাক্রান্ত দেশে কেন্দ্রীভূত শাসন ব্যবস্থার কুফল সম্পর্কে অনেকেই বলেন। তবে বিকেন্দ্রীকরণের সুযোগ থাকলেও তা করা হচ্ছে না অনেক ক্ষেত্রে। আমাদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে যথেষ্ট ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মানুষের খুব কাছাকাছি থাকা উপজেলা পরিষদের প্রতিটি বিভাগের বেশ কিছু পদস্থ কর্মকর্তা ও কর্মচারী আছে। এখানে নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানগণ সবাই না হলেও বেশ কিছু আছেন উচ্চশিক্ষিত। বিশেষ করে রাজনীতির মাঠে বিচরণ করে তাঁরা জনজীবনের প্রত্যাশা সম্পর্কে ভালো ধারণা লাভ করেছেন। অনেকেই শিষ্টাচারী বলে জানা যায়। সরকারি বিধিবিধান যাতে মেনে চলা হয়, সেদিকেও তাঁদের অনেকে যত্নবান। তবে আমাদের সব প্রতিষ্ঠানের ন্যায় রাজনীতির অঙ্গনেও অবক্ষয় চলছে। উপজেলা পরিষদের নেতৃত্বেও এর ছাপ পড়া স্বাভাবিক। বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে তাঁদের নিয়ে কাজ করা খুব সহজ না হলেও অসম্ভব নয়। অনেকে করছেনও। আর আইনের প্রণেতারা যতক্ষণ এ প্রতিষ্ঠানে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখবেন ততক্ষণ এটা মেনেও নিতে হবে। তবে কার্যকর নির্বাচিত স্থানীয় সরকার করার স্বার্থে বিষয়টি তাঁরা বারবার ভাবতে পারেন। সরকার এ প্রতিষ্ঠানটিকে আরো ক্ষমতায়ন করলে এর সুফলভোগী হবে জনগণ। কেন্দ্রীভূত বিশাল আকৃতির প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা তাদের হাতে ছেড়ে দিলে লাভই হবে। শিক্ষকদের বেতন, পদমর্যাদা, পদোন্নতি, পেনশন সরকারি নিয়মেই হবে। সার্বিক ব্যবস্থাপনাটি থাকতে পারে উপজেলা পরিষদের হাতে। এতে ভুলভ্রান্তি বা ক্ষমতার অপব্যবহার একেবারে হবে না, এমন নয়। আর কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থাতেও তা ঘটে চলছে। হাজার হোক নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একটি দায়বদ্ধতা আছে জনগণের প্রতি। সেখানে সরকারি কর্মকর্তারা তাঁদের মেধা, শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সরকারি নিয়ম-কানুন বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারেন সে জনপ্রতিনিধিদের। উপজেলা পর্যায়ে কাজ করার একটি চমত্কার আকর্ষণীয় দিক আছে। জনগণের এত কাছাকাছি থেকে কাজ করার আর কোনো প্রশাসনিক স্তর নেই। এসব দিক বিবেচনায় বিভিন্ন বিচ্যুতি সত্ত্বেও উপজেলা পরিষদকে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন বলতে হবে। মাটি আর মানুষের এত কাছের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান উত্তরোত্তর আরো সমৃদ্ধ হবে— এ প্রত্যাশা অনেকের।

 

লেখক: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব