মিঠা পানিতে বাগদা চিংড়ি চাষ জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত। রফতানি সম্ভাবনার কারণে গত দুই দশকে এ খাতের উন্নতি উল্লেখযোগ্য মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। বিশ্ববাজারে মিঠা পানির চিংড়িকে অত্যন্ত মূল্যবান বিবেচনা করা হয়। এজন্য প্রায় সব চিংড়ি রফতানি করা হয়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানে। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ ৪৯ হাজার ৩১৭ টন বাগদা ও গলদা চিংড়ি রফতানি করেছে, যার মূল্য ৪১৫ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ বাগদা চিংড়ি।
এখন প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে বাগদা চিংড়ি করা হচ্ছে। বেশির ভাগ (৭১ শতাংশ) বাগদা চিংড়ির ফার্মের অবস্থান বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে, প্রধানত খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায়। মিঠা পানিতে বাগদা চিংড়ি চাষ প্রতি বছর গড়ে ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। আনুমানিক ১২ লাখ লোক বাগদা ও গলদা চিংড়ি চাষ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাত প্রক্রিয়ায় জড়িত এবং আরো ৪৮ লাখ পারিবারিক সদস্যের এ খাতে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এর সঙ্গে চার লাখ লোকের, যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু, জীবনযাত্রা উপকূলে চিংড়ি পোনা উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনায় জড়িত।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে, ধানের জমি রূপান্তর করে চিংড়ি চাষের ফার্ম করা হয়েছে, যাকে বলা হয় ঘের। এই ঘের করে চিংড়ি চাষ একটি স্থানীয় প্রযুক্তিগত বিপ্লব। এ উদ্ভাবন, সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ির উচ্চমূল্য মিলিয়ে আরো বেশিসংখ্যক কৃষক নিজেদের ফসলি জমি চিংড়ি চাষের জন্য পরিবর্তন করছেন। এটিকে সমন্বিত মত্স্য-কৃষি (আইএএ) পালন ব্যবস্থা বলা যেতে পারে। আইএএ পদ্ধতি অল্প সম্পদের গরিব চাষীদের জন্য বেশি প্রযোজ্য। যদি দক্ষতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা করা যায়, তবে এ পদ্ধতিতে চাষবাদ কম ঝুঁকিপূর্ণ। এ পদ্ধতির উদ্দেশ্য হলো চাষের বহুমুখীকরণ, প্রাকৃতিক সম্পদের দক্ষ ব্যবহার, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও টেকসইতা। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে এ সমন্বিত পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ ‘ব্লু বিপ্লবের’ সঙ্গে সম্পর্কিত। ‘ব্লু বিপ্লব’ বলতে বোঝায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চ উৎপাদনশীল কৃষি কার্যক্রম হিসেবে মত্স্য চাষের লক্ষণীয় আবির্ভাবকে।
১৯৭৮ সালের দিকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের বাগেরহাট এলাকার কিছু সচ্ছল কৃষক স্বাদু পুকুরে স্বল্প পরিসরে বাগদা চিংড়ি চাষ শুরু করেন। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে কিছুটা এবং ১৯৮০-এর দশকের মধ্যভাগ থেকে কিছু চাষী নিচু স্তরে থাকা জমিতে প্রথম বাগদা চিংড়ি চাষ শুরু করেন। ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে বাগদা চিংড়ি চাষ ফকিরহাট এলাকায় জোরেশোরে শুরু হয়, যেখানে আগে থেকেই পোনা মাছ ও ধানের সঙ্গে বাগদা চিংড়ি চাষ করা হতো। ১৯৮৭ সালে স্থানীয় কিছু চাষী প্রথমবারের মতো নিজেদের নিচু জমি চিংড়ি চাষের জন্য ঘেরে রূপান্তর করে। এর পর থেকে এ রূপান্তর দ্রুত বিস্তার লাভ করতে শুরু করে। অন্যান্য কৃষক যখন দেখলেন, তাদের প্রতিবেশী কৃষকরা বাগদা চিংড়ি চাষ করে মুনাফা করছেন, তখন তারাও চিংড়ি চাষের সিদ্ধান্ত নেন। এ খবর অন্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে বাগেরহাট জেলার অন্যান্য অংশের কৃষকরাও এ নতুন প্রদ্ধতি গ্রহণ করা শুরু করেন। যদিও অন্য এলাকায় এটি উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে গেছে, তবুও ফকিরহাট এলাকায় এখনো সর্বোচ্চ চিংড়ি ফার্ম ও চাষী রয়েছেন। বাগদা চিংড়ি চাষের বদৌলতে ফকিরহাট অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিবর্তন এসেছে। ফলে এ এলাকাকে বলা হচ্ছে ‘বাংলাদেশের কুয়েত’।
প্রথমে এ উদ্যোগ নিয়েছিলেন বড় ও মধ্যম আকারের কৃষকরা, কিন্তু পরবর্তী সময়ে বাগদা চিংড়ি চাষে ছোট কৃষকদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়। বাগদা চিংড়ি চাষের বিস্তৃতি নাটকীয়ভাবে ঘটেছিল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমের অন্য জেলাগুলোয় ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে ১৯৯০ সাল থেকে এর গতি বেড়েছে। এর পর থেকে বাগদা চিংড়ি চাষ দেশের অন্যতম আর্থিকভাবে আকর্ষণীয় বিনিয়োগ খাত ও মাল্টিমিলিয়ন ডলার শিল্পে পরিণত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আন্তর্জাতিক বাজারে বাগদা চিংড়ির চাহিদা বৃদ্ধি বাংলাদেশের বিভিন্ন অংশের বহু মত্স্য কৃষককে বাগদা চিংড়ি চাষের প্রতি আগ্রহ তৈরি করেছে।
গবেষণা জরিপ অনুযায়ী, বাগদা চিংড়ি, মাছ ও চালের গড় বার্ষিক উৎপাদন হেক্টরপ্রতি যথাক্রমে ৪৬৭, ৯৮৬ ও ২ হাজার ২৫৭ কেজি। কৃষক ভিন্নতার কারণে উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য ভিন্নতা দেখা গেছে। এর কারণ ফার্মের আকার, খাবার ও বীজ জোগান ও ব্যবস্থাপনার দক্ষতা। জরিপ ফলাফল বলছে, বেশি জোগান, ফার্মের বড় আকার ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কারণে অন্যদের তুলনায় বড় কৃষকরা উচ্চতর ফসল উৎপাদন করতে পারেন। এক্সটেনসিভ মেথড ব্যবহার করে বেশির ভাগ বাগদা চিংড়ি চাষ করা হয় এবং অন্য দেশের তুলনায় উৎপাদনশীলতা কম। বাংলাদেশের তুলনায় রফতানি বাজার বেশি দখল করে থাকা দেশগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ইনটেনসিভ টেকনিক ব্যবহার করে এবং এতে লক্ষণীয়ভাবে উচ্চফলন পেয়ে থাকে।
ধান চাষের জমিকে চিংড়ি ফার্মে রূপান্তরের বিস্তৃতি ঘটার কারণে মোট চাল উৎপাদন সম্ভবত কমেছে। তবে ফার্ম পর্যায়ে বহু কৃষকের (১৮%) ধান উৎপাদন বেড়েছে। কারণ উচ্চতর আইল লবণাক্ত পানিকে মাঠ থেকে সম্পূর্ণভাবে বাইরে রাখে। ধান উৎপাদন হিসেবে বাগদা চিংড়ি চাষের খাল ও পানি অন্তর্ভুক্তি রয়েছে এবং এজন্য প্রকৃত উৎপাদন সাধারণভাবে ২০-২৫ শতাংশ বেশি হবে। সাধারণভাবে ঘের এলাকার ৫০ শতাংশের বেশি অংশ ধান উৎপাদনে ব্যবহূত হয়।
বাগদা চিংড়ি চাষের পথে যেসব বাধা দেখা গেছে সেগুলো হলো— পানিদূষণ, রোগবালাই, প্রাকৃতিক দুর্যোগ (বন্যা, খরা) ও উচ্চ উৎপাদন ব্যয়। জরিপ অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৫৮ শতাংশ তাদের একক সমস্যা হিসেবে উচ্চ উৎপাদন ব্যয়কে চিহ্নিত করেছে। পোনা, খাবার ও শ্রমব্যয় বৃদ্ধির কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাগদা চিংড়ি চাষের ব্যয় বেড়েছে। বাগদা চিংড়ি চাষের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পাওয়ার পর চিংড়ি পোনা ও খাবারের দাম নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। এজন্য অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ বড় বাধা হতে পারে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ২৪ শতাংশ চিংড়ি পোনার অপর্যাপ্ত সরবরাহের কথা বলেছে। ১১ শতাংশ ও ৭ শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে যথাক্রমে বন্যা ও রোগের কথা বলেছে। কৃষকভেদে উৎপাদন বাধার উল্লেখযোগ্য তফাত রয়েছে।
বাগদা চিংড়ি মার্কেটিংয়ের জন্য নভেম্বর থেকে জানুয়ারি সেরা সময়। কৃষকরা খেপলা জাল ও সাইন নেট ব্যবহার করে চিংড়ি চাষ করেন। চাষকৃত চিংড়ি অ্যালুমিনিয়াম বা প্লাস্টিক কনটেইনারে রাখা হয়। চিংড়ি টিউবওয়েলের পানি দিয়ে পরিষ্কার করা হয় এবং বিক্রির আগ পর্যন্ত কনটেইনারে রাখা হয়। আকার ও ওজনভেদে কৃষকরা চিংড়ি ভাগ করে সাজান এবং ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন। চিংড়ির দাম নির্ভর করে গ্রেড, মান, ঋতু, সরবরাহ ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করে। চিংড়ির ফার্ম-গেট গড় মূল্য কেজিপ্রতি ২ দশমিক ৬১ থেকে ৬ দশমিক ৫৫ ডলার।
চাষী থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ি পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত কয়েক ধাপ বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর হাতবদল হতে হয়। চাষীরা সাধারণত ভ্যান ও রিকশা ব্যবহার করে চিংড়ি স্থানীয় বাজারে নিয়ে আসেন। মাঝে মধ্যে কিছু ব্যবসায়ী, যাদের স্থানীয়ভাবে ফড়িয়া বলা হয়, ফার্ম থেকে চাষীদের কাছ থেকে চিংড়ি কিনে ব্যবসায়ীদের কাছে নিয়ে যান। চিংড়ি ব্যবসায়ীরা সাধারণত চিংড়ি চাষের এলাকার কাছাকাছি থাকা স্থানীয় বাজারভিত্তিক হন। তারা সরাসরি অথবা এজেন্টের মাধ্যমে চিংড়ি কেনার এক বা দুদিনের মধ্যে প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় সরবরাহ করেন। মধ্যবর্তী সময়টায় চিংড়ি বরফ দিয়ে রাখা হয়। প্রত্যেক ব্যবসায়ী একবারে ২০০-২৪০ কেজি চিংড়ি পাঠান। ট্রাক ও পিকআপ ব্যবহার করে প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় চিংড়ি পাঠানো হয়। সবশেষে প্রক্রিয়াকরণ প্লান্টগুলো মোংলা বন্দর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে মাথাবিহীন চিংড়ি রফতানি করে। চিংড়ি মার্কেটিং খুব বেশি প্রতিযোগী নয়, কিন্তু চাষী ও বিদেশী ক্রেতাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, এজন্য মূল্যসংযোজন প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে এবং এভাবে বিদেশী মুদ্রা অর্জনেও।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় ৩৫টি প্লান্ট যুক্ত রয়েছে চিংড়ি প্রক্রিয়াকরণ ও রফতানিতে। তবে চিংড়ি প্রক্রিয়াকরণে মান বজায় রাখতে সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যদিও গত দুই দশকে চিংড়ি বাজার বড় হয়েছে, তবে প্রক্রিয়াকরণে মানের বিষয়টি বাংলাদেশের অবস্থানকে দুর্বল করছে। ভেজাল বা দূষিত পণ্য রফতানির সঙ্গে যে ঝুঁকি যুক্ত রয়েছে, তা অবহেলা করলে চলবে না। যদি চিংড়ি রফতানি বাড়াতে হয়, তবে এটিকে সতর্কতার সঙ্গে বাজারজাত করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের দিক থেকে মানসম্পন্ন পণ্যের ভালো পরিচিতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং ধরে রাখতে হবে।
সমন্বিত চিংড়ি চাষের বার্ষিক গড় উৎপাদন ব্যয় হলো হেক্টরপ্রতি ২ হাজার ২১৮ ডলার, যেখানে হেক্টরপ্রতি ছোট ফার্মের গড় উৎপাদন ব্যয় ১ হাজার ৮৯৩ ডলার, মাঝারি ২ হাজার ২১৯ ও বড় ২ হাজার ৫৬৩ ডলার। ফার্মের আকারের ওপর ভিত্তি করে উৎপাদন ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য হেরফের হয়। ফার্মের আকার নির্বিশেষে গড় বার্ষিক পরিবর্তনীয় ও নির্দিষ্ট ব্যয় যথাক্রমে হেক্টরপ্রতি আনুমানিক ১ হাজার ৭৮৩ ডলার (মোট ব্যয়ের ৮০%) ও ৪৩৫ ডলার (২০%)। পরিবর্তনশীল ব্যয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বীজ ও খাদ্যে, যথাক্রমে মোট ব্যয়ের প্রায় ৩২ ও ২৮ শতাংশ। নির্দিষ্ট ব্যয়ের মধ্যে গড় বার্ষিক অবচয় ব্যয় (পানির পাম্প, নেট, অন্যান্য যন্ত্রাংশ), পরিচালন মূলধনের ওপর সুদ ও ভূমি ব্যবহার ব্যয় বা ইজারা ব্যয় হলো হেক্টরপ্রতি আনুমানিক যথাক্রমে ১১৫ ডলার, ১৬৭ ডলার ও ১৬৭ ডলার।
গড় বার্ষিক মোট আয় আনুমানিক হেক্টরপ্রতি ৪ হাজার ১০২ ডলার, যেখানে ছোট ফার্মের গড় আয় ৩ হাজার ৩১৩, মাঝারি ৪ হাজার ১৭ ও বড় ৪ হাজার ৯৮৯ ডলার। উচ্চ উৎপাদনের কারণে বড় ফার্মগুলোর গড় মোট আয় সবচেয়ে বেশি, যেখানে কম উৎপাদনের কারণে ছোট ফার্মগুলোর আয় কম। চিংড়ি (৬৬%), মাছ (২৬%) ও ধান (৮%) উৎপাদনের মধ্যে মোট আয়ের বড় পার্থক্য রয়েছে। হেক্টরপ্রতি উচ্চ উৎপাদন ব্যয় সত্ত্বেও মাঝারি (১ হাজার ৭৯৮ ডলার) ও ছোট (১ হাজার ৪২০ ডলার) ফার্মের তুলনায় গড় বার্ষিক নিট রিটার্ন বড় ফার্মের বেশি (২ হাজার ৪২৬ ডলার)। এ ক্যাটাগরির মধ্যে নিট রিটার্ন নিয়ে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
সার্বিকভাবে ব্লু বিপ্লব একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল এবং চিংড়িচাষী সম্প্রদায়ের বেশির ভাগ সদস্য এটা নিশ্চিত করেছে। চিংড়ি চাষের কারণে যে পরিবর্তন এসেছিল, তা ছিল প্রগাঢ়। ফসলের জমিকে চিংড়ি চাষের জন্য রূপান্তর নিছক চাষের কোনো পদ্ধতিগত পরিবর্তন নয়, বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি ছিল প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন থেকে বিশ্ববাজারের জন্য পণ্য উৎপাদনে রূপান্তর। যেহেতু এটি একটি রফতানি পণ্য, চিংড়ি উৎপাদন স্থানীয় বাজারে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে আসছে। বেশির ভাগ কৃষক নিজেদের চিংড়ি চাষ ও চাষাবাদ বহুমুখীকরণের মাধ্যমে নিজেদের আয় বাড়িয়েছেন। পরিষ্কারভাবে অর্থনৈতিক কর্মকণ্ডে দৃশ্যমান গুণগত ও পরিমাণগত পরিবতর্ন দেখা গেছে। চিংড়ি বাজারজাত মৌসুমে (মার্কেটিং সিজন) চাষী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর হাতে খাদ্য, কাপড় ও অন্যান্য মৌলিক পণ্য কেনার জন্য যথেষ্ট অর্থ থাকে। চিংড়ি চাষের অবস্থানগুলোকে কেন্দ্র করে উল্লেখযোগ্য হারে ছোট ছোট বাজার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এ বাজারগুলোর মধ্যে রয়েছে চায়ের দোকান ও খাবার হোটেল, ছোট মুদি দোকান, ফল ও সবজি দোকান।
গবেষণায় দেখা গেছে, সমন্বিত চিংড়ি চাষ থেকে গড় বার্ষিক নিট আয় চাষীপ্রতি ৭৭৬ ডলার, যেখানে ছোট চাষীর গড় আয় ৪৭৬, মাঝারি ৭১৯ ও বড় ১ হাজার ১৩২ ডলার। ফার্মের আকার বৃদ্ধির সঙ্গে গড় বার্ষিক আয় বাড়তে দেখা গেছে। ফার্মের আকার লক্ষণীয়ভাবে ও ইতিবাচকভাবে চাষীর আয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
এটা প্রায় নিশ্চিত, ধনীরা আরো ধনী হয়ে উঠছে চিংড়ি চাষের বদৌলতে। ফলাফল বলছে, বড় চাষীরা বেশ ভালো মুনাফা করছেন এবং মাঝারি চাষীদের মুনাফাও যথেষ্ট। তবে সবচেয়ে কম মুনাফা করছেন ছোট চাষীরা। কিছু ব্যক্তির দাবি, ছোট চাষীরা সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছেন। কেননা চিংড়ি চাষের আগে তাদের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক ছিল। কারণ তাদের দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন তাদের অবস্থা বেশ ভালো। চিংড়ি চাষ থেকে আসা আয় অনেক ছোট কৃষককে ছোট ব্যবসা, পোলট্রি ফার্মিং ও গবাদি পশু চাষের মতো কাজের সুযোগ করে দিয়েছে। এছাড়া এ আয় অনিশ্চিত পরিস্থিতি যেমন— রোগবালাই ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ (বন্যা, ভারি বৃষ্টি ও সাইক্লোন) সামলানোর জন্য নিরাপত্তা বৃদ্ধিরও সুযোগ করে দিয়েছে।
তবে চাষীদের আয় বৃদ্ধির কারণে কিছু নেতিবাচক সামাজিক প্রভাবও দেখা গেছে। যেমন চিংড়ি চাষের কারণে যৌতুকের পরিমাণ বেড়ে গেছে। যে বরের পরিবার আগে কনের পরিবারের কাছ থেকে সাইকেল চাইত, তারা এখন মোটরসাইকেল, বড় অংকের নগদ অর্থ, সোনার গহনা ও ঘড়ি চাইছে। নগদ অর্থের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় চুরি-ডাকাতি বেড়ে গেছে। কোনো কোনো সময় হিংসার বশবর্তী হয়ে অন্যের চিংড়ি ঘেরে বিষ প্রয়োগ করা হচ্ছে। এতে সব মাছ মারা যেতে পারে।
দ্বিতীয় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায় খাদ্য ভোগ বা গ্রহণে। চিংড়ি চাষের আগে চাষীদের বড় একটা অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করত, কিন্তু ফসলের জমিকে চিংড়ি ফার্মে রূপান্তর করার পর এদের খাদ্যভোগ বেড়েছে। জরিপের ফলাফল বলছে, সমন্বিত চিংড়ি উৎপাদন পদ্ধতি লক্ষণীয়ভাবে এদের খাদ্যনিরাপত্তা বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রায় সব ছোট কৃষক চিংড়ি চাষের আগে দিনে দুই বেলা খাদ্য গ্রহণ করত। কিন্তু চিংড়ি চাষের পর তারা দিনে তিন বেলা ভাত খেতে পারে এবং একই সঙ্গে ভালো মানের খাদ্য যেমন— মাছ, মাংস, ডিম, ফল ও সবজি খেতে পারে। সবজি এখন প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় এবং একই সঙ্গে আইল চাষের কারণে এগুলো দামেও সস্তা এবং এগুলো বিক্রি করে কৃষকরাও লাভবান হচ্ছেন।
চিংড়িচাষী ও এ সম্প্রদায়ের অন্যান্য সদস্যের পরিবারের মাঝে মাছ খাওয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বেড়েছে, যেহেতু এখন সমন্বিত চিংড়ি-মত্স্য-ধান চাষের কারণে মাছ প্রচুর পরিমাণে ও সস্তায় পাওয়া যায়। দেখা গেছে, চাষীরা ছোট মাছ বিক্রির বদলে খেতে পছন্দ করছে। এর ওপর প্রাণী প্রোটিনের সঙ্গে ছোট মাছও মূল্যবান। কেননা এটি মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট, ভিটামিন ও মিনারেলের উৎস। আরেকটি বিষয় হলো, চিংড়ি রফতানি মৌসুমে চাষীরা চিংড়ির মাথা ও পা খেয়ে থাকেন। তারা আস্ত চিংড়ি খান না।
যদিও খাদ্যনিরাপত্তা বৃদ্ধি হতো ছোট চাষীদের জন্য, যারা ভালো ফসলি জমিকে চিংড়ি ফার্মে রূপান্তর করেছিলেন, তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে অনেক কৃষক যারা নিজেদের ভালো ফসলি জমিকে চিংড়ি ফার্মে রূপান্তর করেছিলেন, তারা চালের কম দামের কারণে খাদ্য অনিরাপত্তায় ভুগছিলেন। কিছু ক্ষুদ্র চাষী (৫%) বলছেন, তাদের সব জমি একবারে চিংড়ি ফার্মে পরিণত করার পর বন্যার কারণে তাদের চিংড়ি চাষ ব্যর্থ হয়েছিল এবং তাদের পক্ষে বড় পরিবারকে খাদ্য সরবরাহ কঠিন হয়ে উঠেছিল। চিংড়ি ফার্মের কারণে ভাগাভাগি করে চাষ বা বর্গা চাষ পদ্ধতির ব্যবহার কমে গেছে। ধনী কৃষকরা যারা আগে নিজেদের অতিরিক্ত জমি বর্গায় দিতেন, তারা এখন চিংড়ি চাষের জন্য ইজারা দিতে পছন্দ করছেন। এর ফলাফল হিসেবে ভাগাভাগি করে চাষ পদ্ধতির ব্যবহার কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার খাদ্য অনিরাপত্তায় পড়েছে।
মিঠা পানির বাগদা চিংড়ি উৎপাদনের সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক সুবিধাও চলে এসেছে এবং এসব সুবিধা নির্ভর করে সম্পদ মালিকানার ওপর। তথ্য বলছে, চিংড়ি চাষের ইতিবাচক প্রভাব বড় ফার্মের মালিকদের মধ্যে বেশি। জরিপ অনুযায়ী, সব বড় চাষী (১০০%) সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছেন এবং সামাজিক অবস্থানের উন্নতি হয়েছে, যখন ৯৫ শতাংশ মাঝারি চাষীরও আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। বেশির ভাগ ছোট চাষীর (৮৮%) সামাজিক অবস্থান ভালো হয়েছে, তবে ১২ শতাংশের অবস্থানের পরিবর্তন হয়নি বা আরো খারাপ হয়েছে। এসব কম সফল কৃষক বলছেন, যথেষ্ট প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব, উচ্চতর উৎপাদন ব্যয়, চিংড়ির রোগবালাই, চুরি ও ঘেরে শত্রুতা করে বিষ প্রয়োগ তাদের এ করুণ অবস্থান জন্য দায়ী।
অনেক ছোট চাষী জানিয়েছেন, ঝুঁকি ও ঋণ তাদের কাছে নতুন নয়। কেননা তারা ঋণ নেয়ার মাধ্যমে চিংড়ি চাষে নেমেছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব চাষী স্থানীয় সুদ কারবারির কাছ থেকে ঋণ নেন উচ্চসুদে, যা কখনো হয় মাসে ১০ শতাংশ (বছরে ১২০ শতাংশ)। সাধারণভাবে ধনী কৃষক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সুদের কারবার করেন। কৃষকরা সাধারণত তাদের জমি, ঘরবাড়ি ইত্যাদি জামানত হিসেবে রাখেন। ঋণ পরিশোধ না করতে পেরে জমি-বাড়িঘর হারানো চাষীর সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বেড়েছে।
কৃষকরা চিংড়ি চাষের যেসব অসুবিধার কথা বলছেন, তা হলো চিংড়ি চাষের প্রথম বছর অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা গবাদিপশু, গহনা-গাঁটি বিক্রি করে ঋণ নিয়ে এটা শুরু করা হয় এবং ধান চাষ থাকে না। ফলে চাষী প্রকৃতপক্ষে অনেক গরিব হয়ে পড়েন। আবার যারা ইজারা নিয়ে চাষ করেন, তারাও পিছিয়ে পড়েন, কেননা চিংড়ি চাষের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায়, অর্থাৎ ইজারা নেয়ার বেশি লোক থাকায় ইজারা ব্যয় বেড়ে গেছে। অন্যদিকে চিংড়ি চাষের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মুনাফাও থাকে ঝুঁকিতে। তবে কিছু তথ্য বলছে, বেশির ভাগ ভূমিহীন ও ইজারা নেয়া চাষী চিংড়ির ফার্ম ইজারা নিয়ে লাভবান হয়েছেন।
কিছু ছোট চাষীর (১০%), যারা আগে ব্যবহার না হওয়া নিজেদের নিচু জমিগুলো চিংড়ি ফার্মে রূপান্তর করেছিলেন, তাদের জীবনমানের নাটকীয় উন্নতি ঘটেছিল। অল্প কিছু কৃষক (১২%) উচ্চসুদভিত্তিক ঋণ এড়াতে পেরেছিলেন এবং অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে নগদ উপার্জন বাড়িয়েছিলেন। এসব চাষীর জন্য অবশ্যই চিংড়ি চাষ ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। অন্যদিকে চিংড়ি চাষ শুরুর পর থেকে জমির দাম আকাশ ছুঁয়েছিল। ফলে অনেক গরিব লোক নিজেদের জমি বিক্রি করে লাভবান হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে বড় কৃষক ও ধনী লোকরা গরিবদের জমি বিক্রি করতে বাধ্য করেছিল। এতে মাঝে মধ্যে এ দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত দেখা দিত। তবে বিভিন্ন বাধা সত্ত্বেও চাষীদের অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল। চিংড়ি চাষ থেকে আসা মুনাফায় এদের বাড়িঘর, ক্রয়ক্ষমতার উন্নতি ঘটেছিল। টিউবওয়েল স্থাপনসহ স্বাস্থ্য ও স্যানিটারি পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে। রেডিও, টেলিভিশন ও বিশেষ করে মোবাইল ফোনের ব্যবহার বেড়েছে।
চিংড়ি চাষ গরিবদের জীবনযাত্রায় নাটকীয় উন্নতি ঘটিয়েছিল। এদের একটি বড় অংশ চিংড়ি পোনা ব্যবসা, শামুক চাষ ও সংগ্রহ, ফিড ব্যবসা, মধ্যস্থতা করা, চিংড়ি ব্যবসা, পরিবহনে যুক্ত হয়ে উন্নতি করেছে। এসব কাজে যুক্ত দৈনিক শ্রমিকদেরও, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে, অবস্থানের উন্নতি হয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের প্রান্তিক লোকেরা চিংড়ি পোনা সংগ্রহ করে এবং এটি এদের আয়ের একটি অংশ। একটি পোনা বাণিজ্য সিস্টেম গড়ে উঠেছে, যার মধ্যে রয়েছে বন্য পোনা সংগ্রহ, সরবরাহ, ব্যবসায়ী ও এজেন্ট। সার্বিকভাবে শামুক সরবরাহ ও সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহন ও মার্কেটিং ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ তৈরি করেছে।
কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় দরিদ্রতম ও ভূমিহীন পরিবারগুলোও চিংড়ি ফার্মিং দ্বারা উপকৃত হয়েছে। চিংড়ি চাষ ও মার্কেটিং কার্যক্রমে দিনমজুরদের কাজের সুযোগ বেড়েছে। চিংড়ি ফার্ম নির্মাণ, নাইট গার্ড, পোনা ব্যবসা, শামুক ভাঙা, ফিড ব্যবসা, চিংড়ি চাষ ও মার্কেটিংয়ে জন্য শ্রমিকের প্রয়োজন রয়েছে। চিংড়ি বাজারে শ্রমিকরা চাষ-পরবর্তী কাজ করেন যেমন— হ্যান্ডলিং, পরিষ্কার, সাজানো, গ্রেডিং ও বরফ দেয়া। শ্রমিকরা বরফকল থেকে বরফ আনা-নেয়া ও ভাঙা, চিংড়িতে বরফ মেশানো ও চিংড়ি গাড়িতে ওঠানো-নামানোর কাজ করেন। এছাড়া রয়েছে চিংড়ি হ্যাচারি, বাণিজ্যিক চিংড়ি ফিড শিল্প ও পরিবহন খাত, রিকশা-ভ্যান থেকে শুরু করে বড় গাড়ির (যেগুলো চিংড়ি প্রক্রিয়াকরণ প্লান্টে নিয়ে যায়) কর্মক্ষেত্র। শ্রমিকদের মধ্যে একটা বড় অংশ চুক্তিভিত্তিতে চিংড়ি প্রক্রিয়াকরণ প্লান্টে কাজ করেন। চিংড়ি চাষ এলাকায় মজুরি নিকটবর্তী কৃষি মজুরির চেয়ে বেশি হয়।
চিংড়ি চাষ প্রক্রিয়ায় নারীদেরও কর্মসংস্থান বেড়েছে। চিংড়ি চাষের বিভিন্ন পর্যায়ে যেমন— ফিড, ফার্ম দেখাশোনা ও ব্যবস্থাপনা, আইল চাষ, চিংড়ি চাষ ও চাষ-পরবর্তী কাজে নারীরা যুক্ত রয়েছেন। চিংড়ি বাজারজাতেও কাজ করছেন। আগের বছরগুলোয় নারীরা নিজ বাড়িতে চিংড়ির মাথা বিচ্ছিন্নকরণের কাজ করলেও এখন এ প্রক্রিয়ার অন্যান্য কাজেও যুক্ত হচ্ছেন। চিংড়ি চাষ শুরুর পর থেকে ভূমিহীন নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বেড়েছে। আগে গরিব নারীরা কাজের খোঁজে শহরে যাচ্ছেন, কিন্তু এখন তারা ফিরে এসে মজুরি শ্রমিক হিসেবে চিংড়ি চাষে কাজ করছেন। চিংড়ি পরিষ্কার, মাথা বিচ্ছিন্নকরণ, ফ্রিজিং ও প্যাকেজিংয়ের কাজে বহু নারী কাজ করছেন। শামুক চাষ, ভাঙা ও মার্কেটিং কাজও করছেন নারীরা। কিছু নারী চিংড়ি চাষের জন্য জাল বোনারও কাজ করেন। এভাবে চিংড়ি চাষ গ্রামপর্যায়ে নারীদের অবস্থার উন্নতি করছে। নগদ উপার্জন তাদের আর্থিক স্বাধীনতা দিয়েছে। এখন তারা শিশুর লেখাপড়া, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, পরিবার পরিকল্পনাসহ পরিবার ব্যবস্থাপনায় আগের তুলনায় শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং সমাজে বাগদা ও গলদা চিংড়ি চাষ কী প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে গত দশকে যথেষ্ট বিতর্ক হয়েছে। তবে বাংলাদেশে বাগদা চিংড়ি চাষের কোনো ধরনের পরিবেশগত নেতিবাচক প্রভাব নেই, যে প্রভাবের কারণে গলদা চিংড়ি নিয়ে এত সমালোচনা। তবে ইদানীং বাগদা চিংড়ি চাষে পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিবেশে যে প্রধান পরিবর্তনগুলো দেখা গেছে, তা চিংড়ি চাষে ফার্ম নির্মাণ, বন্য চিংড়ি পোনা সংগ্রহ ও চিংড়ির খাদ্য হিসেবে শামুক চাষে জড়িত।
ফসলি জমির বিশাল এলাকা চিংড়ি চাষের অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহার হচ্ছে। ধান উৎপাদনের জমি হ্রাসের কারণে ধান উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং কমতে পারে চাল উৎপাদন। ফলে কমতে পারে খড়ের সরবরাহ, যা রান্নার জ্বালানি ও গোখাদ্য উভয় হিসেবে ব্যবহার হয়। ধানের জমি কমে যাওয়ায় ভারতীয় বুলফ্রগের সংখ্যা কমে যেতে পারে, যা ধান চাষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এরা পোকামাকড় খেয়ে থাকে। পোনা সংগ্রহের কারণে পরিবেশগত প্রভাব পড়তে পারে। সাধারণভাবে যে নেট ব্যবহার করে চিংড়ি পোনা চাষ করা হয়, তার কারণে জলজ প্রাণীর ক্ষতি হয়। বিপুল পরিমাণ মত্স্য পোনা ধরা ও খারিজ করা হয়। এতে বহু মাছের মৃত্যু ঘটে, ফলে উপকূল অঞ্চলে মত্স্য পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে চিংড়ি পোনা ধরার কারণে বন্য চিংড়ি উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
শামুক চাষের সঙ্গে নেতিবাচক পরিবেশগত প্রভাব জড়িত রয়েছে। বর্ষাকালে অতিরিক্ত সংগ্রহের ফলে চিংড়ি চাষ এলাকায় শামুক হারিয়ে যেতে বসেছে। কেননা এটি তাদের জন্মদানের সেরা সময়। শামুক হারিয়ে গেলে জলজ প্রাণ প্রক্রিয়ায় ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। অন্যদিকে শামুক সংগ্রহের কাজ শামুকের খোলস ব্যবস্থাপনাগত বড় সমস্যা তৈরি করেছে। শামুকের খোলসে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে এবং যেসব খালে এগুলো ফেলা হচ্ছে, তাতে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। (জরিপভিত্তিক গবেষণা প্রবন্ধটি অ্যাকুয়াকালচার ইন্টারন্যাশনাল, জুন ২০১০-এ প্রকাশিত)
সংক্ষেপে ভাষান্তর— সাঈদ সরকার
লেখক: ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়ার স্কুল অব ন্যাচারাল অ্যান্ড বিল্ট এনভায়রনমেন্টের অ্যাডজাঙ্ক সিনিয়র রিসার্চ ফেলো; অ্যাকুয়াকালচারে পিএইচডি করেছেন ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব স্টারলিংক থেকে





