অনগবাসীর সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসে গ্রামীণ উন্নয়ন হলো একটি অন্যতম প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মধ্য দিয়ে উভয়ের ভেতর একটি আন্তঃসম্পর্ক স্থাপিত হয়। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান উভয়ের সংশ্লিষ্টতা ও উদ্যোগ গ্রামীণ উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করে তোলে। এ উন্নয়নে কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে প্রয়োজন হয় বলিষ্ঠ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের। এ দেশে বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় সরকার কাঠামো পরিবর্তিত হয়ে পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এবং জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের সূচনা হয়। উন্নয়নকাজে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে থাকে। স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে জেলা পরিষদের ভূমিকা সরকার কর্তৃক ১৯৯০ সালে গঠিত টাস্কফোর্স বিশেষভাবে উল্লেখ করে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান স্থানীয় নেতাদের নিজ এলাকার সমস্যা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা অর্জনের সুযোগ করে দেয়। গ্রামীণ উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এ দেশে উপজেলা পদ্ধতির সূচনা হয় ১৯৮২ সালে। শতাব্দীকালের পুরনো মহকুমা প্রশাসনের বিলুপ্তি ঘটে। মহকুমা জেলায় রূপান্তর হলেও স্থানীয় পরিষদ বহাল থাকে। থানা পরিষদও অপরিবর্তিত থাকে। তবে উপজেলা পর্যায়ে কার্যক্রম সরাসরি উপজেলা পরিষদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে ন্যস্ত হয়। উপজেলার কার্যক্রমে পরিবর্তন আসে। থানা থেকে উপজেলায় উন্নীত হয়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু হয়। প্রথম উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালে এবং এরপর ১৯৮৯ সালে। নির্বাচনে অংশগ্রহণে জেলা ও ইউনিয়নের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের আবির্ভাব হতে থাকে। রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও উন্নয়নকাজের জন্য গ্রামের ভোটারদের তাদের নেতা নির্বাচনের সুযোগ আসে। স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে সচেতনতা ও আগ্রহ সৃষ্টি হয়। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও কর্মসূচি হাতে নেয়া হতে থাকে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে গ্রামের মানুষদের সংগঠিত হয়ে সংশ্লিষ্ট হওয়ার সুযোগ আসে। নিজেদের সমস্যা সমাধানে কর্মসূচি ও প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে তারা সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। উপজেলা পদ্ধতিতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধাপ কমে যায়। উপজেলা পর্যায়ের আমলাতন্ত্র নির্বাচিত পদাধিষ্ঠিতদের নিয়ন্ত্রণে আসে। সার্বিক প্রশাসন ও উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে উপজেলা। উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিগত কালের তুলনায় অধিকতর স্বাতন্ত্র্য আসে। উপজেলা পর্যায়ের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় দক্ষ কর্মকর্তা নিয়োজিত হতে থাকে। উপজেলা পরিষদ অধিকতর প্রকল্প প্রণয়নের সুযোগ পায়। বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে রাস্তা, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের। গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়নে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এর প্রতিফলন দেখা যায় আশির দশকে গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে অগ্রগতি থেকে।
সারা দেশে জেলা পরিষদের অধীন পাকা রাস্তা সত্তরের দশকের শেষ দিকে ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার থেকে দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে নব্বইয়ের দশকে ৫ হাজার ৬৫০ কিলোমিটার পার হয়ে যায়। একই সময়ে কাঁচা রাস্তা ১৪ হাজার কিলোমিটার থেকে ১৬ হাজার কিলোমিটারের বেশি বৃদ্ধি পায়। থানা বা উপজেলা পরিষদের অধীনে পাকা রাস্তা ৫০০ থেকে ৫৪০ কিলোমিটার এবং কাঁচা রাস্তা ২১ হাজার থেকে প্রায় ৩৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটারে বৃদ্ধি পায়। ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে কাঁচা রাস্তা প্রায় ৯৮ হাজার থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার কিলোমিটারে চলে আসে। এছাড়া পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনগুলোর অধীনে পাকা ও কাঁচা রাস্তা থাকে যথাক্রমে ৫ হাজার ৩৪০ ও প্রায় চার হাজার কিলোমিটার। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের এ অগ্রগতির একটা প্রভাব দেখা যায় গ্রামে কর্মসংস্থান ও উপার্জনে পরিবর্তন থেকে। আশির দশকের দ্বিতীয়াংশে গ্রামে ব্যবসা ও বাণিজ্য প্রসারিত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। গ্রামে গড়পড়তা উপার্জন বৃদ্ধি পায় ১৬ শতাংশের উপরে। অন্যদিকে শহরে বৃদ্ধির হার থাকে ১৫ শতাংশের নিচে।
পৌরসভা এবং জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ বিভিন্ন ধরনের রাস্তা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে। প্রশাসনিক পরিবর্তন, বিশেষ করে উপজেলা পদ্ধতি প্রবর্তনের পর এসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম প্রসারিত হয়। বৃদ্ধি পায় এদের কর্মভারও। এতে কারিগরি সহায়তা প্রদান এবং তত্ত্বাবধানের লক্ষ্যে ১৯৮৪ সালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বা লোকাল গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো, সংক্ষেপে এলজিইবি। উল্লেখ্য, এলজিইবির পূর্বসূরি ছিল পূর্ত কর্মসূচি উইং। প্রতিটি উপজেলায় এলজিইবির কর্মকাণ্ড শুরু হয়। একই সময়ে বাংলাদেশ সরকার পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প কৌশল প্রণয়ন করে। এ কৌশলের আওতায় পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে রাস্তা, সেতু, কালভার্ট, গুদাম ও হাটবাজার নির্মাণ, স্থানীয় পর্যায়ে সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতিসহ ক্ষুদ্রাকার পানিসম্পদ উন্নয়ন কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামে বসবাসকারী মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের অধিকতর সুযোগ সৃষ্টির সুপারিশ করা হয়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর অধীন অবকাঠামো উন্নয়নে এলজিইবি বড় রকমের ভূমিকা রাখতে থাকে। নতুন নতুন রাস্তা নির্মাণ হতে থাকে। রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণকাজ জোরদার করা হয়। রাস্তার দুই পাশে ফল, বন ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করা হয়। পর্যায়ক্রমে এলজিইবি পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গ্রোথ সেন্টার নির্মাণ ও হাটবাজার উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করতে থাকে। স্থানীয় পানিসম্পদ উন্নয়নে বাঁধ নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ, খাল খনন বা পুনঃখননকাজ হাতে নেয়া হয়। এসব কাজে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক বা লেবার কন্ট্রাক্টিং সোসাইটি, সংক্ষেপে এলসিএস নিয়োগ করাতে গ্রামে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়। এলসিএস যথাযথ হারে সঠিক মজুরি প্রাপ্তি নিশ্চিত করে। নারী ও পুরুষ শ্রমিকেরা সরাসরি নিয়োজিত হয়ে অধিকতর উপার্জন করতে থাকেন। নারীদের কাজের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। হাটবাজারের উন্নয়নে গ্রামে কৃষিপণ্য বাজারজাতের সুবিধা হয়।
এলজিইবি ১৯৯২ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে পরিণত হয়ে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে এলজিইডি হিসেবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করে। এ উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০০৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও কার্যক্রম শুরু করে। সূচনালগ্ন থেকে শুরু করে গত বছরের প্রারম্ভ পর্যন্ত এলজিইডি ১ লাখ ৭ হাজার কিলোমিটারের ওপর উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামীণ রাস্তা, প্রায় ৬৫ হাজার কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা এবং প্রয়োজনীয় সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ বা পুনর্বাসন করেছে। বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তার পাশে। সেই সঙ্গে দুই হাজারের উপর গ্রোথ সেন্টার এবং প্রায় একইসংখ্যক হাটবাজারের উন্নয়ন হয়েছে। এলজিইডি সারা দেশে তিন হাজারের বেশি ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ করেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণেরও দায়িত্ব পালন করে আসছে। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি বা সংক্ষেপে বার্ড উদ্ভাবিত কুমিল্লা মডেলের অন্যতম উপাদান উপজেলা সেচ কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় এবং জাতীয় পানিনীতি অনুসরণে এলজিইডি ক্ষুদ্রাকার পানিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে। স্থানীয় জনগণ কর্তৃক চিহ্নিত ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ প্রস্তাবিত সর্বোচ্চ এক হাজার হেক্টর বিস্তৃত আবাদি এলাকায় বন্যা ব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশন, পানি সংরক্ষণ ও ভূ-উপরিস্থ পানি দিয়ে সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে বাঁধ, স্লুইস গেট, রেগুলেটর ও সেচনালা নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ বা সংস্কার, খাল পুনঃখনন কিংবা খনন ও রাবার ড্যাম স্থাপন করা হয়। প্রস্তাবিত এলাকায় পানি সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর উপপ্রকল্প গ্রহণ করে স্থানীয় জনগণের চাহিদার ভিত্তিতে অবকাঠামো নির্মিত হয়। নির্মিত অবকাঠামোগুলো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থানীয় জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ পর্যন্ত এক হাজারের অধিক উপপ্রকল্প বাস্তবায়নে ছয় লাখ হেক্টরেরও বেশি এলাকায় কৃষি ও মত্স্য উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ মানুষের অধিকতর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। গ্রাম এলাকায় গড়পড়তা খানাপ্রতি মাসিক উপার্জন নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ৩ হাজার ১০০ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে চলতি দশকের মাঝামাঝি সাড়ে ১৩ হাজার টাকার কাছাকাছি হয়েছে। একই সময়ে শহরে প্রায় ৫ হাজার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে সাড়ে ২২ হাজার টাকার উপর হয়েছে। গ্রামে ও শহরে বৃদ্ধি হার যথাক্রমে ৪ দশমিক ৩ ও ৪ দশমিক ৭ গুণ।
নিজস্ব আয়বৃদ্ধি, দক্ষতার উন্নয়ন ও দায়িত্বাবলির পুনর্বিন্যাসের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় সরকারের কার্যক্রম সম্প্রসারণ হতে থাকবে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পাবে। স্থানীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণের ক্ষমতাও বাড়বে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। জনপ্রতিনিধি, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হবে। মুখ্য হয়ে উঠবে গ্রামীণ উন্নয়নে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা। একই সঙ্গে প্রসারিত হবে এলজিইডির কার্যক্রম।
লেখক: উন্নয়ন গবেষক





