১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধনীতি বাংলাদেশের জন্য একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এর আগে বাংলাদেশে কোনো ওষুধনীতি ছিল না। ফলে বাংলাদেশের বাজারে বিপুল পরিমাণ ভেজাল, অনিরাপদ ও ক্ষতিকর ওষুধ ছিল। অধিকাংশই ছিল বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানির। ১৯৮২ সালে ওষুধনীতি প্রণয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ ওষুধনীতিভুক্ত দেশগুলোর গর্বিত সদস্য হয়। এ ওষুধনীতি দেশের ওষুধ শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বহু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ এ নীতি সংস্কার করে দ্বিতীয় জাতীয় ওষুধনীতি প্রণয়ন করে। সর্বশেষ ২০১৬ সালে দেশে তৃতীয় জাতীয় ওষুধনীতি প্রণয়ন করা হয়। এ প্রবন্ধে বাংলাদেশের ওষুধনীতিগুলোর তুলনামূলক পর্যালোচনা, প্রভাব বিশ্লেষণ এবং করণীয় শীর্ষক একটি সারসংক্ষেপ আলোচনা করা হয়েছে। দেশে প্রণীত তিনটি জাতীয় ওষুধনীতির আওতাভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়াদি পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা হয়েছে, সে বিষয়াবলির ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে।
১৯৮২ সালের ওষুধনীতিতে ১৫০টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের (Essential Drugs) তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। এ ওষুধগুলোর মূল্য একটি মূল্যনির্ধারণী ফর্মুলার মাধ্যমে সরকার তথা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণের বিধান রাখা হয়। উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সালে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে এ তালিকা কমিয়ে ১১৭টিতে আনা হয়। কিন্তু ২০০৫ সালের ওষুধনীতিতে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ উন্নতমানের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদনে স্থানীয় ও বিদেশী কোম্পানিকে উৎসাহিত করার কথা বলা হলেও কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রণয়ন করা হয়নি। বরং সবচেয়ে বেশি বিক্রয় হয় এমন কিছু ওষুধ, যেমন— cimetidine, Ranitidine, Diclofenac, Cephalosporin অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের আগের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। অন্যদিকে ২০১৬ সালের ওষুধনীতিতে ২৮৫টি অত্যাবশ্যকীয় অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের একটি নতুন তালিকা প্রণয়ন করা হয়। এছাড়া অত্যাবশ্যকীয় আয়ুর্বেদিক, ইউনানি, হারবাল ও হোমিওপ্যাথিক ওষুধের আলাদা তালিকা প্রণয়ন করা হয়।
১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধনীতিতে কিছু ব্যতিক্রমী ওষুধ ছাড়া মিশ্রণজাতীয় (Combination Drugs) অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ উৎপাদনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ২০০৫-এর ওষুধনীতিতে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। ফলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর বেশি বেশি মিশ্রণজাতীয় ঔষধ (Combination Drugs) উৎপাদনের অনুমোদন দিয়েছে, যার মূল্য উৎপাদনকারী নিজেই নির্ধারণ করে। আর ২০১৬-এর ওষুধনীতিতে এ জাতীয় ওষুধের নিবন্ধনকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, কিন্তু নিষেধ করা হয়নি।
১৯৮২ সালের ওষুধনীতিতে প্রতিটি ওষুধ উৎপাদনকারীকে তাদের মোট উৎপাদনের ৬০ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন করা বাধ্যতামূলক করা হয়। উল্লেখ্য, তালিকাভুক্ত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ ব্যতীত অন্যান্য ওষুধের দাম উৎপাদনকারী কর্তৃক নির্ধারণের ব্যবস্থা রাখা হয়। কিন্তু ২০০৫ সালের ওষুধনীতিতে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা ছিল না। অন্যদিকে ২০১৬ সালের ওষুধনীতিতে তালিকাভুক্ত ওষুধগুলোর মূল্য সরকার কর্তৃক নির্ধারণের কথা বলা হয়।
১৯৮২ সালের ওষুধনীতিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম নির্ধারণের জন্য খরচের উপাদান হিসেবে পাঁচটি ক্যাটাগরি নির্ধারণ করে দেয়া হয়। কিন্তু ২০০৫ সালের ওষুধনীতিতে এ ক্যাটাগরি বাড়িয়ে নয়টি করা হয়। কিন্তু ২০১৬ সালের ওষুধনীতি অনুযায়ী, এ ক্যাটাগরির সংখ্যা কত হবে তা এ মুহূর্তে আমাদের জানা নেই।
১৯৮২ সালের ওষুধনীতিতে বলা হয়, ওষুধের মান ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের জন্য ওষুধবিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সদস্যদের সমন্বয়ে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করতে হবে, যেখানে ওষুধ কোম্পানির মালিক থাকতে পারবে না। কিন্তু ২০০৫ সালের ওষুধনীতিতে ওই কমিটির অধিকাংশ সদস্যই ওষুধ শিল্পের মালিকদের প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠনের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া কমিটিতে মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের নিম্ন সারির একজন প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত হয়। অন্যদিকে ২০১৬ সালের ওষুধনীতিতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীর সমন্বয়ে কমিটি গঠনের কথা বলা হলেও কমিটিতে ওষুধ কোম্পানির মালিকদের প্রতিনিধিত্ব না থাকার বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই।
১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধনীতি প্রণয়নের পর অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সহজলভ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এক হিসাবমতে, ২০০২ সালে প্রায় ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা মূল্যের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন হয়, যা ১৯৭৩ সালের তুলনায় প্রায় ২৪ গুণ বেশি। ১৯৮১ সালে যেখানে দেশীয় কোম্পানিগুলোর মাত্র ২০ শতাংশ বাজার দখলে ছিল, ১৯৯৪ সালে তা বেড়ে ৬০ শতাংশে দাঁড়ায়। এবং দেশীয় কোম্পানিগুলো দেশের মোট চাহিদার ৯০ শতাংশ ওষুধ উৎপাদন করে। ১৯৮৪-৯৪ সালের মধ্যে ওষুধের মূল্য প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি কমে যায়। ১৯৮২ সালে দেশে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১৭৭, যা ২০০৪ সালে ৩০০টিতে উন্নীত হয়। ২০০২ সালে স্থানীয় কোম্পানিগুলো প্রয়োজনীয় ওষুধের ৮০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করে, যেখানে ১৯৭০ সালে ছিল মাত্র ৩০ শতাংশ। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তদারকির কারণে উৎপাদিত ওষুধের গুণগতমান উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল। নিম্নমানের ওষুধের অনুপাত ১৯৭০ সালের ৩৬ শতাংশ থেকে কমে ২০০২ সালে ২ শতাংশে নেমে আসে। আমদানির ওপর কম নির্ভরতা এবং অত্যাবশ্যকীয় ওষুধগুলোর প্রতি অগ্রাধিকার দেয়ার ফলে প্রতি বছর দেশে গড়ে আনুমানিক ৬০০ মিলিয়ন ইউএস ডলার সাশ্রয় হয়। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে দেশের ওষুধের বাজার ১ হাজার মিলিয়ন থেকে বেড়ে ২৫ হাজার মিলিয়ন টাকায় পৌঁছায়। ১০টি শক্তিশালী দেশীয় ওষুধ কোম্পানি গড়ে ওঠে।
ওষুধ শিল্পের উন্নয়নের এ ধারা পরবর্তীতেও অব্যাহত থাকে। যেমন— ২০১০ সালে দেশের ওষুধ খাত ১০৯৮ মিলিয়ন ডলারের ওষুধ বিক্রির রেকর্ড করে এবং দেশীয় চাহিদার ৯৭ শতাংশ স্থানীয় প্রতিষ্ঠান কর্তৃক উৎপাদিত হয়। ২০১০ সালে ৩৬টি দেশীয় কোম্পানি এবং তিনটি বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানির মাধ্যমে প্রায় ৫২ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলারের ওষুধ বিশ্বের প্রায় ৮৪টি দেশে রফতানি করা হয়। কিন্তু ২০০৫ সালের ওষুধনীতিতে বেশকিছু ধারা শিথিল করার কারণে ওষুধের গুণগতমান, ওষুধের ব্যবহার এবং দামের ওপর বেশকিছু নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
যেমন— অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা থেকে সর্বোচ্চ বিক্রয় হয় এমন ওষুধের সংখ্যা হ্রাস করা, দাম নির্ধারণের জন্য খরচের উপাদান হিসেবে ওষুধের ক্যাটাগরি ৫ থেকে ৯-এ উন্নীতকরণ, উৎপাদনকারী কর্তৃক দাম নির্ধারণযোগ্য ওষুধ উৎপাদনের হার অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধি, মিশ্রণজাতীয় ওষুধের উৎপাদন বৃদ্ধি, বেশি মূল্য নির্ধারণের জন্য ওষুধের রাসায়নিক গঠন সামান্য পরিবর্তন করে একই থ্যারাপেটিক মানের বিভিন্ন ওষুধ উৎপাদন ও তা বাজারজাতে নিয়মবহির্ভূতভাবে ওষুধের প্রচারকাজ (Aggressive Promotion) চালানো, এবং একই উৎপাদনকারী কর্তৃক একই থ্যারাপেটিক গ্রুপের একাধিক ওষুধ ভিন্ন দামে বাজারজাত করা। এছাড়া অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশনে হারবাল ওষুধ লিখতে শুরু করেন, যার অধিকাংশের মান এবং নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ফলে ২০১০ সাল থেকে ওষুধের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে এবং ওষুধের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের জাতীয় ওষুধনীতির প্রভাব পর্যালোচনার জন্য আমাদের আরো অপেক্ষা করতে হবে। তবে ২০১৬ সালের ওষুধনীতিতে কিছু বিষয়ে অস্পষ্টতা থাকা সত্ত্বেও এর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে ওষুধ শিল্পের বিরাজমান সমস্যাগুলো অনেকাংশে হ্রাস করা সম্ভব হবে। তবে এর জন্য কিছু কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যেমন— জিএমপি (Good Manufacturing Practices) অনুসরণ ও বাস্তবায়রেন তদারকি করা, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও বায়ো-ইকুইভ্যালেন্স টেস্টের সুবিধা সৃষ্টি, বর্তমান ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে রূপান্তর, প্রেসক্রিপশন ব্যতীত অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ বিক্রি বন্ধ নিশ্চিতকরণ, সব হাসপাতাল ও ওষুধের দোকানে বাধ্যতামূলকভাবে ‘অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার নির্দেশিকা’ রাখা এবং দক্ষ জনবল নিয়োগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে একটি শক্তিশালী স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরে বিশেষ নজর দিতে হবে। তাছাড়া ওষুধ বিশেষজ্ঞ, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে টেকনিক্যাল কমিটিকে সামাঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
মনে রাখা প্রয়োজন, বাংলাদেশ ২০৩৩ সাল পর্যন্ত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মেধাসত্ত্ব ও বাণিজ্য আইন ট্রিপসের (TRIPS) চুক্তির আওতামুক্ত। তাই বাংলাদেশী ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো অনুমতি এবং অর্থ প্রদান ছাড়াই পেটেন্টেড ওষুধের জেনেরিক উৎপাদন করতে পারবে। ফলে কোম্পানিগুলো অনেক ওষুধ তুলনামূলক কম খরচে উৎপাদন করে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করে রফতানি বৃদ্ধির সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশের তালিকাভুক্ত হলে তখন ট্রিপসের সুবিধা হারাবে। ফলে ওষুধের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে। এক্ষেত্রে দেশীয় বাজারে ওষুধের দাম বেড়ে যাবে এবং রফতানির বাজার আরো প্রতিযোগিতামূলক হবে। তাই আগে থেকেই প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহূত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ‘এপিআই’ অর্থাৎ Active Pharmaceutical Ingredients-এর আমদানি বর্তমানের ৯৭ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে হবে। তাই দেশীয় উৎস থেকে এপিআইয়ের সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মুন্সীগঞ্জে সম্প্রতি স্থাপিত ‘এপিআই পার্ক’কে অনতিবিলম্বে কার্যকর করতে হবে।
লেখক: পরিচালক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়





