স্মার্ট কিচেনের প্রাথমিক সামগ্রী টাইলস। রান্নাঘরের জন্য কেমন টাইলস ব্যবহার করা উচিত? রান্নাঘরের জন্য আপনাদের বিশেষায়িত টাইলস নিয়ে জানতে চাই।
রান্নাঘরের মেঝের জন্য অ্যান্টি স্কিট বা রাফ অথবা ম্যাট টাইলস ব্যবহার করা ভালো। কারণ রান্নাঘরের বেশির ভাগ কাজে পানি ব্যবহার করা হয়। সে পানি যদি মেঝেতে পড়ে থাকে তাহলে পিছলে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ কারণে আমরা সবসময় পরামর্শ দিই রান্নাঘরে ম্যাট টাইলস বা রাস্টিক টাইলস ব্যবহারের। আর রান্নাঘরের দেয়ালে বিভিন্ন রকমের টেক্সচার টাইলস পছন্দ করে মানুষ। রান্নাঘরের জন্য তাই আমরা বিভিন্ন ধরনের টাইলস বাজারে সরবরাহ করি। আমরা শিগগিরই সুপার রকার নামে নতুন একটি টাইলসের সিরিজ লঞ্চ করতে যাচ্ছি। এ টাইলসের বিশেষত্ব হলো টাইলসের ওপরে পাঞ্চ না করেই টাইলসের ওপরে টেক্সচার বসানো সম্ভব হবে। আমাদের অত্যাধুনিক প্রডাকশন লাইন নাম্বার ৫ দিয়ে এ ধরনের টাইলস বাংলাদেশে শুধু আমাদেরই বানানোর সক্ষমতা আছে । এমনকি আমার মনে হয় না, আগামী দুই বছরেও আর কেউ এ ধরনের টাইলস বাজারে আনতে পারবে। আমার বিশ্বাস আমাদের এ টাইলসও গ্রাহকরা পছন্দ করবেন।
দেশের সিরামিক শিল্পে বর্তমানে চ্যালেঞ্জগুলো কী? সিরামিক শিল্পের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিকল্প কিছু আছে কি?
পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য একটু থমকে আছে। আমাদের রড ও সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিতে একটা বড় ধাক্কা এসেছে। আমাদের প্রডাক্টগুলো যেহেতু ফিনিশিং এন্ডের প্রডাক্ট, আমরা এখনো ওই ধাক্কাটা অনুভব করিনি। আমাদের মনে হচ্ছে, একটা ধাক্কা আমাদের প্রডাক্টের ওপরও আসবে। তবে আমাদের বিশ্বাস, বাজার ঘুরে দাঁড়াবে। যদি বৈশ্বিক অবস্থান ব্যাখ্যা করি, তাহলে আগেও অনেকবার বলেছি আমরা আসলে চীন ও ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো অবস্থানে নেই। ফলে রফতানিতে টাইলস খাতের তেমন কোনো সম্ভাবনা বৈশ্বিক বাজারে দেখা যাচ্ছে না। যদিও ইউরোপের কয়েকটি দেশে আমাদের টাইলস রফতানি করা যায় কিনা সে ব্যাপারে আমরা কাজ করছি।
সিরামিকসের আর দুটো প্রডাক্টের কথা যদি বলি, আমরা বাংলাদেশে ভালো করছি টেবিলওয়্যারে। এ ইন্ডাস্ট্রিতে বর্তমানে সবচেয়ে নতুন কোম্পানি আকিজ বশির। টেবিলওয়্যারে এ মুহূর্তে বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যের নেতৃত্ব দিচ্ছি আমরা। ইউরোপের ১৪টি দেশসহ আমাদের পণ্য যাচ্ছে ব্রাজিল, আফ্রিকা, আজারবাইজান, মধ্যপ্রাচ্যেসহ অনেক দেশে। আমাদের স্যানিটারিওয়্যার আমরা যুক্তরাজ্যে পাঠাচ্ছি। নতুন কিছু গ্লোবাল লিডিং বায়ারের সঙ্গে আমরা কাজ করছি। ওই জায়গাগুলোয় ঠিকঠাক কাজ করতে পারলে সামগ্রিকভাবে আমরা বলতে পারব আমাদের রফতানি বাজার ঘুরে দাঁড়াবে।
স্মার্ট কিচেন তৈরির অন্যতম সামগ্রী বিভিন্ন ধরনের বোর্ড। এক্ষেত্রে আপনারা বাংলাদেশের অন্যতম উৎপাদক। আকিজ বশির গ্রুপের বিভিন্ন ধরনের বোর্ড রান্নাঘরকে কতটা স্মার্ট করে তুলবে?
বোর্ড নিয়ে বলতে গেলে বলতে হবে, একটা রান্নাঘরে ঢোকার যে দরজা থাকে সেটিও আকিজ বশির গ্রুপের আছে। আমরা নান্দনিক ও আধুনিক ডিজাইনের ফ্ল্যাশ ডোর ও সলিড কাঠের দরজা তৈরি করি। আমরা পিভিসি ডোর নিয়ে কাজ করছি, ভবিষ্যতে হয়তো এটিও নিয়ে আসব।
আমরা তিন ধরনের বোর্ড বানিয়ে থাকি—পার্টিকেল বোর্ড, এমডিএফ বোর্ড ও প্লাইউড। এসব বোর্ডের ওপরের অংশে আমরা বিভিন্ন রকমের সারফেস দিয়ে থাকি। বোর্ডে আমরা মার্কেট লিডার এবং রয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। মেলামাইন বোর্ড, ভিনিয়ার বোর্ডসহ হাই-এন্ড ইউভি হাইগ্লস, এইচপিএল বোর্ড, অ্যাক্রিলিক বোর্ড, সুপারম্যাট বা জিরো গ্লস বোর্ড একমাত্র আমরাই বাংলাদেশে বানাচ্ছি। সবগুলো বোর্ডই রান্নাঘরে ব্যবহারের উপযোগী। তবে আমরা হাইগ্লস বোর্ডটিকে কিচেন কেবিনেটের জন্য সঠিক বোর্ড মনে করি। কারণ এ বোর্ডে ওপরে মেলামাইন পেস্ট করার পর কিছু কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। ফলে পেপার উঠে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। অন্যান্য অনেক বোর্ডে দেখবেন যে একটা সময় পর বোর্ডের চারপাশে হলদে ভাব চলে আসে। হাইগ্লস বোর্ডে এমন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই রান্নাঘরের জন্য আমরা পরামর্শ দিই হাইগ্লস অথবা ইউভি বোর্ড ব্যবহার করার। এছাড়া এইচপি বোর্ডও ব্যবহার করা যায়।
স্মার্ট কিচেনে গুরুত্বপূর্ণ ইউটিলিটি ফসেট। স্মার্ট ফসেটে কী কী বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত? ফসেট চাহিদার কতটুকু আপনারা পূরণ করতে পারছেন?
বাংলাদেশে আমাদের যে ফসেট তৈরির কারখানাটি আছে সেটি বিশ্বমানের। যেকোনো দেশের ফসেট কারখানার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো সক্ষমতা আমাদের এ কারখানার আছে। আমি নিজেও চায়নার অনেক কারখানা পরিদর্শন করেছি, চীনের অনেক সাপ্লায়ারও আমাদের কারখানা দেখে গেছে। তারা আমাদের কারখানার বেশ প্রশংসা করেছে। আমরা এখান থেকে নতুন নতুন ডিজাইন ও সিরিজ লঞ্চ করছি। সম্প্রতি আমরা লঞ্চ করেছি স্মার্ট ফসেট। আধুনিক ফসেটের সব বৈশিষ্ট্য আছে আমাদের নতুন ফসেটে। আমরা এমন একটা দামে বাজারে পণ্যটি দিচ্ছি যে যারা বিশ্বমানের পণ্য কিনতে চাইছেন কিন্তু বাজেটে হচ্ছে না, তারা যেন কিনতে পারেন। আমরা বিশ্বমানের তথা গ্লোবাল ব্র্যান্ডের ফসেট দিচ্ছি কিছুটা সাশ্রয়ী দামে। যারা চান ঘরকে সুন্দর করে সাজাতে কিন্তু বাজেট বেশি না, তারা চাইলে রোসা ব্র্যান্ড ব্যবহার করে নিজের রান্নাঘর বা ওয়াশরুমকে সাজিয়ে তুলতে পারবেন।
আমরা বর্তমানে রান্নাঘরের জন্য রোসা ব্র্যান্ডের সাত-আট লিটারের গিজারও বাজারে এনেছি। বাজারে আমাদের গ্যাসস্টোভ দিচ্ছি। এছাড়া শিগগিরই রোসা ব্র্যান্ড বাজারে আনতে যাচ্ছে কিচেনহুড। আপনার রান্নাঘরের প্রয়োজনীয় সব পণ্যই আসলে আমাদের কাছে আছে।
অনেকেই মনে করে রোসার ফসেটের দাম বাজারের অন্যান্য ফসেটের তুলনায় বেশি। এটা কতটুকু সঠিক?
আমরা যদি রোসার প্রডাক্টগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করি—বেসিক প্রডাক্ট, মিক্সার ও অ্যাকসেসরিজ। বেসিক প্রডাক্টে আমরা ব্যাপক প্রতিযোগিতা করি স্থানীয় উৎপাদনকারীদের সঙ্গে, কিন্তু আমাদের মিক্সার আইটেমগুলো একটু হাই-এন্ড। সেক্ষেত্রে লোকাল সাপ্লায়ারদের চেয়ে আমরা একটু বেশি দামে এগুলো বিক্রি করলেও গ্লোবাল মার্কেটের চেয়ে আবার কম দামে বিক্রি করছি। অ্যাকসেসরিজ আমাদের দুই ধরনের আছে। লোকাল প্রডিউসারদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো পণ্য যেমন আছে, ঠিক তেমনি বিশ্বমানের পণ্যও আছে। বিশ্বমানের প্রডাক্টগুলো স্বাভাবিকভাবেই তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। আমরা আসলে লোকাল ও গ্লোবাল দুটো মার্কেটেই ধরার চেষ্টা করছি রোসার পণ্য দিয়ে।
সিরামিক খাতে আপনাদের যাত্রা সম্পর্কে জানতে চাই।
সিরামিক ব্যবসায় আমরা যাত্রা শুরু করি ২০১২ সালে টাইলসের ব্যবসার মাধ্যমে। দীর্ঘ ১২ বছরের যাত্রায় গত ছয় বছরে আমরা পরপর বেস্ট ব্র্যান্ড অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। আমরা এ মুহূর্তে সর্ববৃহৎ ম্যানুফ্যাকচারার। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে আমরা আমাদের সিরামিকসের সর্বশেষ সংযোজন টেবিলওয়্যারের যাত্রা শুরু করি। গুণগত ও সংখ্যাগত হিসাবের জায়গা থেকে টেবিলওয়্যারের ক্ষেত্রে স্থানীয় বাজারে এবং রফতানিতে নিজেদের সেরা প্রতিষ্ঠান বলে মনে করি।
সিরামিক শিল্প একটা সময় আমদানিনির্ভর ছিল। এখন ৯০ শতাংশই দেশে উৎপাদন হচ্ছে। এ খাতের রফতানি সম্ভাবনা কতটুকু?
সব কাঁচামালই আমাদের দেশের বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হয়। সেক্ষেত্রে ওই ডিউটির ভ্যাট দিয়ে কাঁচামাল এনে চীন বা ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা আসলে সম্ভব না। কারণ এ দুটো দেশেরই নিজস্ব খনিজ সম্পদ রয়েছে। এক্ষেত্রে টাইলস রফতানির বিরাট কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু আমি ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও সম্ভাবনা দেখি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সিরামিকস নিয়ে কাজ করছে। আশা করি, আমরা অল্প হলেও কিছু করতে পারব। আর টেবিলওয়্যারের ক্ষেত্রে আমাদের দেশের বেশ ভালো সম্ভাবনা রয়েছে বিশ্ববাজারে। যদি চীন ও বাংলাদেশের টেবিলওয়্যারের মধ্যে তুলনা করি, ইউরোপীয়রা চীনের তুলনায় বাংলাদেশী টেবিলওয়্যার গুণগত পণ্য হিসেবে কেনে।
আপনাদের গ্লাস প্রডাক্টের বিষয়ে জানতে চাই।
গত বছরই আমরা গ্লাস উৎপাদন শুরু করেছি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে বাজারে এটি পাওয়া যাচ্ছে। এ মুহূর্তে বাজারে আমাদের ফোর্ট গ্লাস আছে। এছাড়া ক্লিয়ার ও রিফ্লেক্টিভ দুই ধরনের গ্লাসই রয়েছে। আমাদের সেভেন হান্ড্রেড পিপিএম গ্লাস বাংলাদেশের সবচেয়ে স্বচ্ছ গ্লাস। এটি রান্নাঘরের জানালায় ব্যবহার করলে বেশ ভালো ফল পাওয়া যায়। এছাড়া বাংলাদেশে উৎপাদিত গ্লাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রিফ্লেক্টিভ গ্লাসও আমাদের কোম্পানির। আমরা মিরর দেয়াও শুরু করেছি বাজারে। এ মিরর কপার ফ্রি, যা বাংলাদেশে আমরাই একমাত্র উৎপাদনকারী। পাশাপাশি টেম্পার গ্লাস তো আছেই। আশা করছি, এক বছরের মধ্যে আমরা বলতে পারব, বাংলাদেশে একমাত্র লো-ই গ্লাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও আমরাই। লো-ই গ্লাস মূলত বাণিজ্যিক ভবনগুলোয় ব্যবহার হয়। বর্তমানে এটি চীন ও ভারত থেকে আমদানি করা হয় আমাদের দেশে।
বাংলাদেশে আমরা খুবই প্রাথমিক পর্যায়ের গ্লাস উৎপাদন করি— ফোর্ট গ্লাস, ক্লিয়ার ও রিফ্লেক্টিভ গ্লাস। আমাদের সক্ষমতা এতটুকুই। সর্বোচ্চ হয়তো আমরা একে লেমিনেশন ও টেম্পার করি। আকিজ বশির গ্লাস নিজেকে এ কয়টা গ্লাসে সীমাবদ্ধ করতে চাচ্ছে না। আমরা চাই, বাংলাদেশের রেফ্রিজারেটর বাজারে যে গ্লাসটা ব্যবহার করা হয় সেটি বানাতে, ক্রোকারিজ বাজারে লিড হিসেবে যে গ্লাসটা ব্যবহার করা হয় সেটি বানাতে, ভবিষ্যতে সোলার গ্লাস বানানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
স্মার্ট কিচেনের জন্য ব্যবহৃত প্রায় সব পাওয়া যাচ্ছে আপনাদের কাছে। ইলেকট্রনিক খাতে প্রবেশ করার পরিকল্পনা আছে কি?
বিজনেস স্ট্র্যাটেজির কারণে এ প্রশ্নের উত্তর এ মুহূর্তে সরাসরি দিতে চাচ্ছি না। তবে গিজার, কিচেন স্টোভ, কিচেনহুডের মতো অনেক ইলেকট্রনিকস পণ্য কিন্তু এরই মধ্যে আমরা বাজারে এনেছি। ইলেকট্রনিক খাতে প্রবেশের বিষয়ে এখনই কথা বলব না। তবে আমরা যেহেতু একটা এক্সপান্ডিং কোম্পানি, যেকোনো সময়েই আমরা নতুন কোনো ব্যবসা শুরু করতেই পারি।










