ভবন নিয়ন্ত্রণে দেশে অবশেষে একটি কর্তৃপক্ষের আইন হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি ভবন পরিদর্শনের জনবল ও সক্ষমতার একটি টেকসই ব্যবস্থা এ কর্তৃপক্ষের থাকতে হবে। আমরা যদি প্রতিটি নতুন ভবন নির্মাণে যথাযথ বিল্ডিং কোড অনুসরণ নিশ্চিত করতে চাই, তবে সরকারি নিয়ন্ত্রণে বেসরকারি খাতকে কাজে লাগানোর বিকল্প নেই।
২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর সকালে প্রায় ২৬ সেকেন্ড কেঁপেছিল ঢাকা। উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর মাধবদী, রাজধানী থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে। মারা যান ১০ জন, আহত হন ছয় শতাধিক। অথচ ৫ দশমিক ৪ মাত্রার এ ভূমিকম্প বিশ্বমানে মাঝারি; বিধিমালা মেনে তৈরি শহরে এতে প্রাণহানি হওয়ার কথা ছিল না।
সমস্যা কোথায়
প্রথমত, আইন আছে, প্রয়োগ নেই। দেশে বিল্ডিং কোড আছে ১৯৯৩ সাল থেকে; সর্বশেষ বিএনবিসি ২০২০ একটি আধুনিক বিধিমালা। কিন্তু ঢাকার মাত্র ৭-৮ শতাংশ ভবনের জন্য রাজউক অকুপেন্সি সনদ দিতে পেরেছে। অর্থাৎ বাকি ভবন অনুমোদিত নকশামতো তৈরি হয়েছে কিনা, কেউ নিশ্চিত করেনি।
ঢাকার প্রায় ২১ লাখ ভবনের মধ্যে নিরাপত্তা মূল্যায়ন হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ২৫২টির। ২০২২ সালে রাজউক যে ৪২টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাঙার নির্দেশ দিয়েছিল, ২০২৫ সালের শেষে তার মাত্র দুটি ভাঙা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, একই ভুলের পুনরাবৃত্তি। রানা প্লাজা, বেইলি রোড বা মিরপুরের রাসায়নিক গুদাম—সব ক্ষেত্রেই অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মাণ, অনুমোদনহীন ব্যবহার, জরুরি বহির্গমন পথের অভাব আর উপেক্ষিত সতর্কবার্তা।
তৃতীয়ত, দায় বিভক্ত। নকশা অনুমোদন রাজউকের, ট্রেড লাইসেন্স সিটি করপোরেশনের, অগ্নিনিরাপত্তা ফায়ার সার্ভিসের, কারখানা পরিদর্শন ডিআইএফইর, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ সেবা সংস্থার। সবাই আংশিক দায়ী বলে কেউ পুরো দায় নেয় না। দুর্ঘটনা ঘটলে একে অন্যের দিকে আঙুল তোলে।
চতুর্থত, পেশাগত জবাবদিহিতা দুর্বল। প্রকৌশলীর লাইসেন্স নবায়নের ব্যবস্থা নেই, নির্মাণকালীন তদারকি যাচাই হয় না, রাজমিস্ত্রি ও রড মিস্ত্রিরা শেখেন কাজ করতে করতে। পুরনো অনেক ভবনে কংক্রিটের শক্তি দুই হাজার পিএসআইয়ের কাছাকাছি পাওয়ার কথা প্রায়ই শোনা যায়, যা অপর্যাপ্ত।
পঞ্চমত, সরকারি সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। ২০২৬ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি (বিবিআরএ) আইন পাস হওয়া একটা বড় অগ্রগতি, কিন্তু কাগজের কর্তৃপক্ষ মাঠের পরিদর্শক এক নয়। ধরা যাক, বিবিআরএ এক হাজার দক্ষ পরিদর্শক পেল এবং যদি প্রত্যেকে দিনে দুটি পরিদর্শন করেন। তাতে শুধু ঢাকার বিদ্যমান ভবন একবার দেখতেই লাগবে চার বছরের বেশি। তাও তদারকির মান ও ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন থাকবে।
উত্তরণের পথ
সমাধান সরকারি নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেয়া নয়, এর ভূমিকা বদলানো। বিবিআরএ প্রতিটি ভবন নিজে পরিদর্শন করবে না; নিশ্চিত করবে, প্রতিটি ভবন যেন পরিদর্শিত হয় তার লাইসেন্সপ্রাপ্ত, নিরীক্ষিত পেশাজীবীদের হাতে। এ পেশাজীবীদের অসদাচরণও জবাবদিহিতার আওতায় থাকতে হবে।
এক. অভিন্ন জাতীয় ব্যবস্থা: রাজউকের ইলেকট্রনিক কনস্ট্রাকশন পারমিটিং সিস্টেম (ইসিপিএস) ও পেশাজীবী তালিকাভুক্তির মতো উদ্যোগ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে। বিবিআরএ মান নির্ধারণ, লাইসেন্স, স্বীকৃতি, নিরীক্ষা ও শাস্তির দায়িত্ব নেবে; উঁচু ভবন, হাসপাতাল, স্কুল ও ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পের ক্ষেত্রে থাকতে হবে ভেটিং ও দুই স্তরের তদারকির ব্যবস্থা।
দুই. তিন ধাপের সনদ: নকশা, নির্মাণকালীন তদারকি ও অকুপেন্সি—প্রতিটি ধাপে দায়ী পেশাজীবীর স্বাক্ষর থাকবে, ভুল সনদে থাকবে ফৌজদারি দায়। অকুপেন্সি সনদ ছাড়া স্থায়ী গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সংযোগ বা ট্রেড লাইসেন্স মিলবে না। অফিসে রেস্তোরাঁ কিংবা কারখানায় ক্যান্টিন বা গুদাম যুক্ত করার মতো ব্যবহার বদলের ক্ষেত্রে থাকতে হবে নতুন অনুমোদনের ব্যবস্থা।
তিন. নজরদারির মধ্যে বেসরকারি খাত: যুক্তরাষ্ট্রের প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার লাইসেন্সের মতো পরীক্ষাভিত্তিক লাইসেন্স চালু করতে হবে, যা নিয়মিত নবায়ন করতে হবে। সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের মতো স্বীকৃত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নকশা যাচাই ও পরিদর্শন করবে। স্বার্থের দ্বন্দ্ব ঠেকাতে ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পে পরিদর্শক বাছাই করে দেবে বিবিআরএ, ফি জমা হবে কেন্দ্রীয় হিসেবে, দৈবচয়নে নিরীক্ষা হবে, প্রতিবেদন থাকবে প্রকাশ্যে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সক্ষমতার ভিত্তিতে তাদের কাজের ব্যপ্তি নির্ধারণ হবে।
নির্মাণ সামগ্রীর গুণাগুণ পরীক্ষা হতে হবে স্বীকৃত ল্যাবে, মিস্ত্রিদের সনদ হবে বাধ্যতামূলক, অগ্নিনিরাপত্তায় মানা হবে বিএনবিসি ও এনএফপিএর মতো স্বীকৃত মান। ব্যাংকঋণ ও বীমায়ও যুক্ত হবে নিরাপত্তা সনদের শর্ত।
চার. পোশাক খাতের শিক্ষা: রানা প্লাজার বিপর্যয়ের পর অ্যাকর্ড, একটি সমান্তরাল কর্মসূচি এবং পরে আরএমজি সাসটেইনেবিলিটি কাউন্সিলের (আরএসসি) উদ্যোগে ২ হাজার ৪০০-এর বেশি কারখানায় ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি ত্রুটি সংশোধিত হয়েছে। স্বাধীন পরিদর্শন, প্রতিবেদন সবার জন্য প্রকাশ করা ও সময়সীমা কঠোরভাবে মানা হয়েছিল বলেই তা সম্ভব হয়েছে। তবে আরএমজি সেক্টরে ক্রেতার কার্যাদেশ সংযুক্ত থাকায় মালিকরা উৎসাহী হয়ে পরিদর্শনে সহযোগিতা করেছেন। বিবিআরএ আইনি ভিত্তির ওপর এমন একটি মডেল দাঁড় করাতে পারে।
পাঁচ. বিদ্যমান ভবনের ঝুঁকিভিত্তিক বাছাই: অগ্রাধিকার পাবে স্কুল, হাসপাতাল, কারখানা, জনাকীর্ণ বাণিজ্যিক ভবন ও তরলীকরণপ্রবণ (liquifiable) মাটির ওপর গড়া ভবন। প্রতিটির জন্য সিদ্ধান্ত হবে চারটির একটি: নিরাপদ, জরিমানাসহ নিয়মিতকরণ, নির্দিষ্ট সময়ে রেট্রোফিট, নয়তো ভেঙে ফেলা। ঢালাওভাবে দায়মুক্তি দেয়া যেন না হয়; এর সঙ্গে থাকতে হবে স্বল্প সুদে রেট্রোফিট ঋণের ব্যবস্থা।
সমস্যা সমাধানে ১০ বছরের পথনকশা: ২০২৬-২৮ সালে বিধি, বাজেট, লাইসেন্স পরীক্ষা, স্বীকৃতি ব্যবস্থা ও জাতীয় নিবন্ধন চালু। ২০২৯-৩১ সালে শহরের সব নতুন ভবনে তৃতীয় পক্ষের পরিদর্শন বাধ্যতামূলক এবং জেলা শহরে সম্প্রসারণ। ২০৩২-৩৬ সালে উপজেলা ও শহরতলিতে বিস্তার। সেই সঙ্গে নির্মাণ শিল্পে জড়িত সুপারভাইজার/মেসন/মিস্ত্রিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
প্রতি বছর নিরীক্ষিত প্রতিবেদনে বিবিআরএ জানাবে, কত ভবন সনদ পেল আর কত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রেট্রোফিটিংয়ের মাধ্যমে শক্তিশালী হলো।
পরের ভূমিকম্প আমরা ঠেকাতে পারব না। কিন্তু ভবন দাঁড়িয়ে থাকবে কিনা, বহির্গমন পথ খোলা থাকবে কিনা, তা আমাদের হাতে। বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণই হতে পারে নিরাপদ ভবন গড়ার একমাত্র পথ। বিবিআরএ আইন আমাদের একজন রেফারি দিয়েছে; আগামী দশক ঠিক করবে, সেই রেফারি ভবন নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে যায়।










