ঢাকায় একটি ঠিকানা খোঁজার অভিজ্ঞতা প্রায় সবারই অভিন্ন। ঘরের ভেতরের সৌন্দর্য চোখে পড়ে, কিন্তু জানালা খুললেই ধুলামলিন আকাশ। শিশুরা খেলার আবদার করে, অথচ নিচে নামলে কেবল সারিবদ্ধ গাড়ি। ভোরে একটু হেঁটে আসার অবকাশটুকুও মেলে না।
ঠিক এ শূন্যতা পূরণের অঙ্গীকার নিয়েই গড়ে উঠছে অনন্ত টেরাসেস।
মাদানী এভিনিউয়ের (১০০ ফিট) ৪৫ বিঘা জমিতে অনন্ত গ্রুপের প্রতিষ্ঠান অনন্ত রিয়েল এস্টেট লিমিটেড নির্মাণ করছে দেশের প্রথম লিড প্লাটিনাম সনদের আবাসিক গেটেড কমিউনিটি। পরিকল্পনা অনুযায়ী সমগ্র ভূমির ৬৪ শতাংশ থাকবে উন্মুক্ত, যেখানে শোভা পাবে ৮০০ প্রজাতির গাছ ও সবুজ। নয়টি আবাসিক টাওয়ারের প্রতিটি হবে জি+২১, অর্থাৎ ২২ তলা।
সংখ্যাটি একবার ভেবে দেখার মতো। নগরের ভেতরে ১৫ একর জমির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ উন্মুক্ত রেখে দেয়ার সিদ্ধান্ত—ঢাকায় এমন নজির বিরল।
ব্যতিক্রমী এক পরিকল্পনা
এ মাপের ও ধরনের আবাসিক প্রকল্প বাংলাদেশে এর আগে হয়নি। ৪৫ বিঘা জমিতে নয়টি টাওয়ার, দুই-তৃতীয়াংশ জমি উন্মুক্ত রেখে, প্রতিটি টাওয়ারে আলাদা আয়োজন—এ বিন্যাস দেশের আবাসন খাতে নতুন।
প্রকল্পটির মূল ভাবনা অনন্ত গ্রুপের চেয়ারম্যান জনাব শরীফ জহিরের। শুরু থেকেই তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট—জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে যত বেশি সম্ভব ইউনিট তোলা নয়, বরং এমন একটি কমিউনিটি গড়া; যেখানে একটি পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম থাকতে চাইবে।
এ ভাবনা থেকেই নকশার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সিঙ্গাপুর, নিউইয়র্ক ও দুবাইয়ের প্রতিষ্ঠানগুলোকে, আর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে লিড প্লাটিনাম—যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের সর্বোচ্চ সনদ; যা দেশের কোনো আবাসিক গেটেড কমিউনিটি এর আগে পায়নি।
ওয়াটারবডি ঘিরে একটি বাগান
প্রকল্পের ঠিক মাঝখানে থাকছে একটি বড় ওয়াটারবডি। তার ওপর ভাসবে কাচের একটি প্যাভিলিয়ন, যেখানে বসানো হবে অক্সিজেন কনসেনট্রেটর; হাঁটা বা ব্যায়ামের পর কিছুক্ষণ বিশ্রামের জন্য আলাদা করে ভাবা হয়েছে জায়গাটি।
ওয়াটারবডির চারপাশ ঘিরে গড়ে উঠবে সেন্ট্রাল গার্ডেন। থাকবে পানির ধারে বসার নিচু ধাপ, ভাসমান জলজ গাছের বেড, ছোট ছোট ফোয়ারা, সারিবদ্ধ পামগাছ আর ছাঁটাই করা সবুজ বেষ্টনী। বাগানটির নিজস্ব প্রবেশপথও থাকছে।
প্রবেশদ্বারে অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাবে সারি সারি কৃষ্ণচূড়া। বছরের একটি সময়ে পুরো প্রবেশপথ রাঙিয়ে দেবে এ গাছগুলো।
ল্যান্ডস্কেপের নকশার দায়িত্বে রয়েছে সিঙ্গাপুরের কুপার্স হিল, যাদের কাজ ছড়িয়ে আছে ৩০টিরও বেশি দেশে। পুরো প্রাঙ্গণের আলোকসজ্জার পরিকল্পনা করেছে নিউইয়র্কের ব্র্যান্ডস্টন পার্টনারশিপ; যেখানে দিনের বিভিন্ন সময়ে আলো বদলে যাবে, সকালের নরম আলো আর রাতের আলো এক হবে না।
শিশুদের জন্য আলাদা ভাবনা
শহরের ফ্ল্যাটে বড় হওয়া শিশুদের সবচেয়ে বড় অভাব খোলা জায়গার। অনন্ত টেরাসেসের নকশায় বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।
সবুজের মাঝে থাকছে উন্মুক্ত খেলার মাঠ। এর পাশাপাশি প্রতিটি টাওয়ারের নিচতলায় থাকছে শিশুদের নিজস্ব ইনডোর প্লে এরিয়া, যাতে বৃষ্টি বা কড়া রোদের দিনেও খেলা বন্ধ না হয়।
সবচেয়ে বড় সুবিধাটি অবশ্য আসবে নকশার একটি সিদ্ধান্ত থেকে—পুরো কমিউনিটিতে গাড়ি চলাচল থাকবে না। অভিভাবকদের সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখতে হবে না।
যানবাহনমুক্ত কমিউনিটি
চার স্তরের বেজমেন্ট থাকছে সমগ্র ৪৫ বিঘাজুড়ে, ধারণক্ষমতা প্রায় ২,২০০ গাড়ি। ফটক পেরোলেই যানবাহন নেমে যাবে ভূগর্ভে।
ফলে ওপরের সমগ্র প্রাঙ্গণ থাকবে গাড়িমুক্ত। শিশুরা নির্ভয়ে হাঁটতে ও দৌড়াতে পারবে যেখানে ইচ্ছা। বেজমেন্টে থাকছে ইলেকট্রিক গাড়ির চার্জিং স্টেশন, গাড়ি ধোয়ার ব্যবস্থা এবং চালকদের জন্য আলাদা পরিসর।

প্রতিটি টাওয়ারে নিজস্ব সুবিধা
অধিকাংশ প্রকল্পে একটি কেন্দ্রীয় ক্লাব থাকে, যা সবাইকে ভাগ করে নিতে হয়। অনন্ত টেরাসেসে সেই আয়োজন ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে প্রতিটি টাওয়ারে, আলাদা আলাদা করে।
প্রতিটি টাওয়ারের নিচতলায় থাকছে নিজস্ব জিম, ৫০ ফুট দীর্ঘ উষ্ণ সুইমিং পুল, সনা ও স্টিম রুম, নামাজের ঘর, বলরুম এবং শিশুদের খেলার পরিসর। নয়টি টাওয়ার, অর্থাৎ নয়টি করে এই সবকিছু।
জিমে থাকছে পেশাদার প্রশিক্ষক, ট্রেডমিল, ইলিপটিক্যাল, সাইকেল, মাল্টি ট্রেনিং স্টেশন, ফ্রি ওয়েট এবং যোগব্যায়ামের আলাদা জায়গা। প্রতিটি টাওয়ারের অভ্যর্থনা ও লিফট লবি হবে দ্বিগুণ উচ্চতার ও মার্বেলে মোড়া, সঙ্গে থাকছে ছয়টি দ্রুতগতির ইউরোপীয় লিফট।
অবসর ও খেলাধুলা
ওয়াটারবডির পাশে থাকছে আলাদা ক্লাব হাউজ—ক্যাফে, পুল টেবিল, টেবিল টেনিস, কার্ড রুম ও স্পোর্টস লাউঞ্জ নিয়ে।
খেলাধুলার জন্য থাকছে একটি লন টেনিস কোর্ট, একটি বাস্কেটবল কোর্ট এবং দুটি স্কোয়াশ কোর্ট। মাল্টিপারপাস কোর্টগুলো হবে ঘেরা ও আলোকিত, ফলে সন্ধ্যার পরও খেলা চালিয়ে যাওয়া যাবে।
দ্বিতীয় ধাপে যুক্ত হবে এক হাজার মিটার দীর্ঘ জগিং ট্র্যাক, যা পুরো ৪৫ বিঘা ঘিরে চলে যাবে। ট্র্যাকের পাশে নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর থাকবে আউটডোর ফিটনেস স্টেশন, আর সঙ্গে থাকবে আলো ও সাউন্ড সিস্টেম।
প্রকল্পের সঙ্গেই, মাদানী এভিনিউ ঘেঁষে থাকছে নিজস্ব শপিং মল ‘দ্য মল অ্যাট অনন্ত’—সুপারশপ, রেস্তোরাঁ, ফুড কোর্ট ও সিনেমা নিয়ে। ভবনটি একই সঙ্গে এভিনিউয়ের শব্দ ও ব্যস্ততা থেকে আবাসিক অংশকে আড়াল করবে।

ফলে দৈনন্দিন প্রয়োজনে দূরে যাওয়ার প্রয়োজন অনেকটাই কমে আসবে।
পরিবেশ ও বাতাস
ঢাকার বায়ুমান নিয়ে উদ্বেগ যখন বাড়ছে, তখন প্রকল্পটির একটি দিক আলাদা করে নজর কাড়ে। উন্নত এইচভিএসি ও বায়ুশোধন ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে একিউআই পঞ্চাশের নিচে রাখার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
প্রকল্পে থাকছে ২৫টি পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্য—সোলার পিভি সিস্টেম, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পানি শোধনাগার, পয়ঃশোধনাগার, স্বল্প ভিওসি রঙ এবং এফএসসি সনদপ্রাপ্ত কাঠ। নিজস্ব পানি শোধনাগার থাকায় প্রতিটি কলে পানির আয়রনের মাত্রা কম থাকবে।
নকশা ও প্রকৌশল
স্থাপত্য পরিকল্পনার দায়িত্বে রয়েছে সিঙ্গাপুরের ইকো.আইডি। ল্যান্ডস্কেপের ভার নিয়েছে কুপার্স হিল, আর আলোকসজ্জার রূপরেখা করেছে নিউইয়র্কের ব্র্যান্ডস্টন পার্টনারশিপ, পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের আলোকসজ্জাও যাদের কাজ। কাঠামো ও প্রকৌশল পরামর্শের দায়িত্বে রয়েছে ইজিস গ্রুপ।
প্রকল্পটি রাজউক অনুমোদিত এবং বিএনবিসি ২০২০ অনুসারে পরিকল্পিত। কাঠামোটি নির্মাণ করা হচ্ছে ৮ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প ও ঘণ্টায় ২৪০ কিলোমিটার বেগের বাতাস সহ্য করার উপযোগী করে। নির্মাণস্থলেই রয়েছে ব্যাচিং প্লান্ট ও নিজস্ব পরীক্ষাগার, যেখানে প্রতিটি উপকরণ যাচাই করে তবেই ব্যবহার করা হয়।
নির্মাণকাজে ঢাকা ব্যাংক পিএলসির নেতৃত্বে নয়টি ব্যাংক যৌথভাবে ৫০০ কোটি টাকার সিন্ডিকেটেড ঋণ সুবিধা দিয়েছে।
অবস্থান ও হস্তান্তর
গুলশান-২ থেকে দূরত্ব তিন কিলোমিটার, কূটনৈতিক এলাকা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার, এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আট কিলোমিটার। নির্মাণাধীন এমআরটি-৫ লাইনের ভাটারা স্টেশন পড়বে হেঁটে যাওয়ার দূরত্বে, যা ২০২৮ সালের মধ্যে চালু হওয়ার কথা—প্রায় সেই সময়েই, যখন প্রথম ধাপের ফ্ল্যাট হস্তান্তর হবে।
প্রথম ধাপে নির্মাণাধীন দুটি টাওয়ার—‘দ্য পয়েন্ট’ ও ‘দ্য কিউব’। সঙ্গে থাকছে শপিং মল, ক্লাব হাউজ, কেন্দ্রীয় ওয়াটারবডি ও সেন্ট্রাল পার্ক। দ্বিতীয় ধাপে যুক্ত হবে টাওয়ার ৩, মাল্টিপারপাস কোর্ট এবং জগিং ট্র্যাক। আবাসনগুলো তিন, চার ও পাঁচ বেডরুমের, সঙ্গে রয়েছে ডুপ্লেক্স। আয়তন ৩,৮৫০ থেকে ১০,৮০০ বর্গফুট। প্রথম ধাপের হস্তান্তরের লক্ষ্য ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর।










