চলতি সহস্রাব্দের শুরু থেকে বিশ্বব্যাপী চলছে ভেনামি চিংড়ির রাজত্ব। বিশেষ এ চিংড়ি এখন বিশ্ববাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করছে। উচ্চফলনশীলতা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, কম উৎপাদন খরচ ও বাজারে দাম কম হওয়ার কারণে ভেনামি চিংড়ির বাজার দ্রুত সম্প্রসারণ হচ্ছে। যদিও এ বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো নামমাত্র। প্রায় দুই দশক দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগার পর ২০২২ সালে দেশে পরীক্ষামূলকভাবে ভেনামি চিংড়ি চাষের অনুমতি দেয় সরকার। তবে এর সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয় বেশকিছু শর্তও। ভেনামি চাষ শুরু হলেও নীতিগত নানা সহযোগিতার অভাবে এখনো এটির পুরোপুরি সুবিধা পাচ্ছে না বাংলাদেশ।

ভেনামি নিয়ে এত আলোচনার পর প্রশ্ন জাগতেই পারে ভেনামি আসলে কী? ভেনামি চিংড়ি হচ্ছে একটি উচ্চফলনশীল চিংড়ি। এটি পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের একটি চিংড়ি প্রজাতি। আবার অনেকের মতে, এটি ব্রাজিল থেকে আসা দক্ষিণ আমেরিকান চিংড়ির একটি প্রজাতি। উচ্চফলনের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধক্ষমতার জন্যও এটি সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে। বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে যে চিংড়ি উৎপাদন হয় তার ৮০ শতাংশই ভেনামি জাতের।

ভেনামি চিংড়ির ইংরেজি নাম ‘হোয়াইটলেগ শ্রিম্প’ বা সাদা পায়ের চিংড়ি। তবে সাদা পায়ের চিংড়ি নাম হলেও এর শরীর দেখতে কিছুটা সাদাটে। বাংলাদেশের হরিণা জাতের চিংড়ির সঙ্গে এর গায়ের রঙের অনেকটা মিল রয়েছে। ফলে প্রথম দেখায় একে অনেকের কাছে হরিণা চিংড়ি মনে হতে পারে।

বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বে প্রায় সাড়ে চারশ প্রজাতির চিংড়ি আছে এবং বাংলাদেশেই প্রায় ২৭টি প্রজাতি আছে। এশিয়ার দেশগুলোতে এখন যত চিংড়ি চাষ হচ্ছে তার ৮০ ভাগই ভেনামি জাতের। বিশেষ করে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, চীন, মালয়েশিয়া, ভারতসহ এশিয়ার ১৬টি দেশে এ প্রজাতির চিংড়ির চাষ হচ্ছে। তবে বাগদা, চাকা, হরিণা ও গলদাই বাংলাদেশে বেশি চাষ হয়।

ভেনামি চিংড়িকে ব্রয়লার তথা ফার্মের মুরগির সঙ্গে তুলনা করা হয়। এটি দ্রুত সময়ে বড় হয়। অল্প পানিতে অনেক চিংড়ি একসঙ্গে চাষ করা যায়। গলদা, বাগদার তুলনায় ভেনামির উৎপাদনশীলতা কয়েক গুণ বেশি। ফলে বাংলাদেশের সনাতনী পদ্ধতির চাষ করা চিংড়ির চেয়ে এটি চাষ করা অনেক বেশি লাভজনক।

ভেনামি ও গলদা-বাগদার পার্থক্য

ভেনামি চিংড়ি গলদা ও বাগদার চেয়ে দ্রুত বাড়ে। এটি ৯০-১০০ দিনে বিক্রি উপযোগী হয়। বাগদার বৃদ্ধি তুলনামূলক ধীর। এটি ১৪০-১৬০ দিন সময় লাগে। গলদার বৃদ্ধি আরো ধীর। এটি ১৮০ দিন বা তার বেশি সময় লাগে। ভেনামির রোগ সহনশীলতা বেশি। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অনেক ভালো। মানসম্মত পোনা পেলে চাষে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে বাগদা চিংড়ির বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। গলদার রোগও তুলনামূলক কম। তবে ভেনামির চেয়ে বেশি। আধুনিক চাষে ভেনামির উৎপাদন হেক্টরপ্রতি ৮ থেকে ২০ টন। বিশ্ববাজারে এটি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ উৎপাদনশীল প্রজাতি। বিপরীতে বাংলাদেশে গলদার উৎপাদন হেক্টরপ্রতি দশমিক ৫২ টন। আর বাগদার উৎপাদন দশমিক ৩৩ টন। তবে সেমি-ইনটেনসিভ পদ্ধতিতে বাগদার উৎপাদন হয় হেক্টরপ্রতি ৪ দশমিক ৫১ টন পর্যন্ত।

ভেনামি জাতের চিংড়ি অল্প জায়গায় অধিক চাষ করা যায়। এখানে কৃত্রিম খাদ্য দেয়া হয়। লবণাক্ত ও অল্প লবণাক্ত দুই পানিতেই ভালো উৎপাদন হয়। তবে বাগদা উপকূলীয় লবণাক্ত পানিতে ভালো হয়। গলদার জন্য মিঠাপানির পরিবেশ লাগে। এটি প্রাকৃতিক খাদ্যের ওপর কিছুটা নির্ভরশীল।

ভেনামির আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বেশি। মাঝারি মানের দাম হওয়ায় এটি প্রায় সব শ্রেণীর ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে। ফলে এর ক্রেতাও বেশি। অন্যদিকে বাগদার দাম তুলনামূলক বেশি। গলদা দেশীয় বাজারে খুবই জনপ্রিয়। এটির দামও তুলনামূলক বেশি।