দুই দশক ধরে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত প্রযুক্তিগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। তবে এ রূপান্তর উন্নত বিশ্বের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। আপনার দৃষ্টিতে দেশের ব্যাংক খাত কতটা ডিজিটাল হতে পেরেছে?
ব্যাংক খাতে নগদ লেনদেন যত কমছে, ডিজিটাল লেনদেন তত বাড়ছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বলা যায়, একটি ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে তহবিল স্থানান্তরের ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ফান্ড ট্রান্সফারের পুরো প্রক্রিয়াই এখন ডিজিটাল। তবে প্রক্রিয়াটি আরো সহজ ও দ্রুত হওয়া দরকার। আমরা এখনো দৈনন্দিন কেনাকাটায় নগদ অর্থই বেশি ব্যবহার করি। ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে বিল পরিশোধের সুযোগ এখনো তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি। এ ক্ষেত্রগুলোও দ্রুত ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনতে হবে, তবেই ব্যাংক খাতের ডিজিটাল রূপান্তর পূর্ণতা পাবে।
যতটুকু ডিজিটালাইজেশন হয়েছে, তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী বলে মনে করেন?
নিরাপত্তাহীনতার বেশকিছু ঘটনা এরই মধ্যে ঘটেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষেত্রে কিছু ঘটনা প্রকাশ পেলেও অনেকগুলোই প্রকাশ পায়নি। সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করতে যথেষ্ট বিনিয়োগ প্রয়োজন, কিন্তু আমাদের ব্যাংকগুলো সে ব্যয় সবসময় কার্যকরভাবে করছে না।
অনেক সময় দেখা যায়, নিরাপত্তা যন্ত্রপাতি কেনা হলেও সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। এ খাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা কিছু আদর্শ মান বা স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ করেছে, ব্যাংকগুলো সে অনুযায়ী সরঞ্জাম সংগ্রহ করছে। তবে বাস্তবে বেশির ভাগ ব্যাংক বাধ্যবাধকতার কারণে তা করছে; স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগে নয়।
যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর জন্য চিফ ইনফরমেশন সিকিউরিটি অফিসার (সিআইএসও) পদ চালুর নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে নির্দিষ্ট নীতিমালা ও মানদণ্ড না দিয়েছে, ততক্ষণ ব্যাংকগুলো বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। বর্তমানে এ পদে নিয়োগ বাধ্যতামূলক নয়, তাই অনেক ব্যাংকেই সিআইএসও নেই। নিরাপত্তা খাতে যে বিনিয়োগ হচ্ছে, তার বেশির ভাগই নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনার বাইরে ব্যাংকগুলো নিজস্ব উদ্যোগে নিরাপত্তা জোরদারের তেমন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলেই আমার মনে হয়।
সারা বিশ্বে সাইবার হ্যাকাররা খুবই সক্রিয়। নিরাপত্তার কোন দিকটিকে আপনার কাছে সবচেয়ে বড় হুমকি মনে হয়?
একটি কথা প্রায়ই বলা হয়—ব্যাংকের বেশির ভাগ সাইবার আক্রমণ ভেতর থেকেই ঘটে। অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ কর্মীরাই কখনো কখনো হ্যাকিং বা নিরাপত্তা ভঙ্গের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয়। কারণ যিনি রক্ষক হওয়ার কথা, তিনিই যদি ভক্ষক হয়ে যান, তবে প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সবার আগে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কর্মীদের কার্যক্রমে নিয়মিত মনিটরিং থাকা উচিত। এ মনিটরিংয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যুক্ত করা যেতে পারে। প্রযুক্তি যদি কোনো সন্দেহজনক কার্যক্রম শনাক্ত করে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে সতর্কবার্তা দিতে পারবে এবং সুযোগ থাকলে দ্রুত প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপও নিতে পারবে।
ব্যাংকগুলো সাধারণত নিরাপত্তাসংক্রান্ত সফটওয়্যার ও যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আমদানি করে। উন্নত মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে কি এমন সফটওয়্যার তৈরির সক্ষমতা নেই?
আমাদের দেশে অবশ্যই সেই সক্ষমতা আছে। ইসলামী ব্যাংক প্রায় ২০ বছর আগে নিজস্ব সফটওয়্যার তৈরি করে তা প্রমাণ করেছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অন্যান্য ব্যাংক তেমন উদ্যোগ নেয়নি—এটি ব্যাংক খাতের একটি বড় দুর্বলতা।
কয়েক বছর আগে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) থেকে একটি প্রতিবেদন তৈরি হয়েছিল, যেখানে সোনালী, অগ্রণী, রূপালী ও জনতা ব্যাংকের প্রকৌশলীদের মাধ্যমে নিজস্ব সফটওয়্যার তৈরির প্রস্তাব দেয়া হয়। সেখানে একটি জাতীয় সফটওয়্যার কোম্পানি গঠনের কথাও বলা হয়েছিল, যার মালিকানা থাকত সরকারি এ চার ব্যাংকের হাতে এবং তারা নিজেরাই সেই প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক হতো।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখনো দেশে তেমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য দেশীয় আইটি কোম্পানি গড়ে ওঠেনি। এ শূন্যতা পূরণে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। আমি মনে করি, অন্তত এক হাজার দক্ষ প্রকৌশলী নিয়ে একটি উচ্চমানের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা দরকার, যা ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সাইবার নিরাপত্তা ও সফটওয়্যার উন্নয়নে কাজ করবে। এতে শুধু নিরাপত্তাই বাড়বে না, বিপুল কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে। এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে তা ভবিষ্যতে ভারতের ইনফোসিস বা টাটা কনসালট্যান্সির মতো আন্তর্জাতিক মানের কোম্পানিতে পরিণত হতে পারত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে প্রস্তাবেই এটি আটকে আছে, বাস্তবে তেমন অগ্রগতি হয়নি।
আমাদের দেশের বাস্তবতায় এমন একটি প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। দেশে সফটওয়্যারের বিপুল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও আমরা কেন তা নিজেরা তৈরি করব না? কেন বিদেশ থেকে আনব? ব্যাংক খাতে সফটওয়্যার অটোমেশনে এখনো অনেক ঘাটতি রয়ে গেছে। শুধু মৌলিক লেনদেন প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় হলেও পুরো কার্যপ্রবাহের বেশির ভাগই এখনো ম্যানুয়াল। অনেক সফটওয়্যার এখনো ‘স্ট্যান্ড-অ্যালোন’ সিস্টেম হিসেবে কাজ করছে। অন্যান্য সিস্টেমের সঙ্গে এর সমন্বয় নেই। সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়েই এ বিষয়ে পর্যাপ্ত মনোযোগ প্রয়োজন।
বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ বাংলাদেশে সফটওয়্যার উন্নয়ন ও আইটি নিরাপত্তায় কী ভূমিকা রাখছে?
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ সফটওয়্যার উন্নয়ন ও নিরাপত্তা খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আমরা বুয়েটের প্রতিটি বিভাগের পরামর্শক (কনসাল্টিং) প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছি। সফটওয়্যার উন্নয়নের সময় নিরাপত্তা, দক্ষতা, রক্ষণাবেক্ষণসহ নানা বিষয় বিবেচনা করা হয়। আগে নিরাপত্তা বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেয়া হতো না, কিন্তু এখন এটি সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের পরিকল্পনা, মান যাচাই ও ‘প্রুফ অব কনসেপ্ট’ তৈরিতে বুয়েট সহায়তা করে।
সফটওয়্যার উন্নয়নে সাধারণত তিনটি পক্ষ থাকে—একটি ডেভেলপার গ্রুপ, একটি গ্রাহক গ্রুপ ও একটি থার্ড-পার্টি গ্রুপ। এ তৃতীয় পক্ষ সফটওয়্যারের সামগ্রিক মান যাচাই করে এবং সবকিছু সঠিকভাবে কাজ করছে কিনা তা নিশ্চিত করে। বুয়েট এ ‘থার্ড-পার্টি অ্যাসিউরেন্স’ ভূমিকায় কাজ করতে সক্ষম এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সফটওয়্যার কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স ইনস্টিটিউট রয়েছে, কিন্তু আমাদের দেশে এখনো এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। বুয়েট সেই শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করছে। আমরা সফটওয়্যারের নকশা বা আর্কিটেকচার তৈরি করতে পারি, কিন্তু এর জন্য ব্যবহারকারীদের আস্থা ও সহযোগিতা প্রয়োজন। আমাদের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে যে আমরা উচ্চমানের সফটওয়্যার তৈরি করতে পারি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এখনো কেউ আমাদের কাছে এসে বলে না, ‘আপনাদের ওপর আস্থা আছে, এটা করে দিন।’ এ আস্থার অভাব কাটানো জরুরি।
এছাড়া যেকোনো সফটওয়্যার উন্নয়নের সময় কিছু সমস্যা দেখা দেয়, সেগুলো চিহ্নিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন সাধারণ ডেভেলপাররা কোথাও আটকে যায়, তখন একাডেমিক বা অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ দরকার হয়—বুয়েট সেই জায়গাটি পূরণ করছে। পাশাপাশি সফটওয়্যার রিভিউ প্রক্রিয়াটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো সফটওয়্যার বিশ্লেষণ করে তাতে কোনো দুর্বলতা থাকলে তা শনাক্ত ও সমাধানের দিকনির্দেশনা দেয়। এতে ডেভেলপাররা তাদের সফটওয়্যারের নিরাপত্তা ও গুণগত মান উন্নত করতে পারে। এভাবেই বুয়েট সফটওয়্যারের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে অবদান রাখছে।










