দেশের ব্যাংক খাতে সাইবার ঝুঁকির পরিস্থিতি কী? সাইবার হামলা মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি কেমন?
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত গত এক দশকে নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। এটিকে আমরা ‘ডিজিটাল রূপান্তরের যুগ’ বলতে পারি। এখন দেশের প্রায় প্রতিটি ব্যাংকই প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সেবা দিচ্ছে। গ্রাহকরা ব্যাংকিং সব সুবিধা হাতের নাগালে পাচ্ছেন। এটি আমাদের আর্থিক খাতের সক্ষমতা, উদ্ভাবন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার উজ্জ্বল প্রতিফলন। এই দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে এসেছে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও। এর মধ্যে অন্যতম হলো সাইবার নিরাপত্তা। দেশের ব্যাংকগুলোয় সাইবার হামলার প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কর্মীদের তথ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, গ্রাহক সচেতনতার ঘাটতি, নিয়মিত নিরাপত্তা অডিট ও রিস্ক অ্যাসেসমেন্টের অভাব এবং নতুন হুমকির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার ধীরগতি। পাশাপাশি র্যানসমওয়্যার মোকাবেলায় সীমিত ব্যাকআপ ও দুর্বল ডাটা পুনরুদ্ধার ব্যবস্থাও ঝুঁকি বাড়ায়। এ চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য আমরা প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত তদারকিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছি।
ডিজিটালাইজেশনের ফলে ব্যাংকগুলো এখন ক্লাউড সার্ভার, এআই-বেজড সলিউশন এবং অনলাইন চ্যানেল ব্যবহার করছে। এ নতুন পরিসরে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করতে কী ধরনের নীতি, অবকাঠামো ও বিনিয়োগ দরকার বলে আপনি মনে করেন?
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে ডিজিটালাইজেশন যত বাড়বে, নিরাপত্তা ঝুঁকিও তত বৃদ্ধি পাবে। এ ঝুঁকি নিরূপণের জন্য ভবিষ্যতে সাইবার নিরাপত্তায় বিনিয়োগও তাই বাড়াতে হবে। প্রতিটি ব্যাংক এখন তাদের সিস্টেম, নেটওয়ার্ক ও মানবসম্পদকে আরো শক্তিশালী করার পথে কাজ করছে। সাইবার নিরাপত্তা শুধু প্রযুক্তির বিষয় নয়, এটি একটি বিশ্বাসের সংস্কৃতি তা প্রতিটি ব্যাংকই এখন জানে। সফটওয়্যার বা সিস্টেমেই কেবল বিনিয়োগ বৃদ্ধি নয়, মানুষ, নীতি আর সচেতনতার ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। সাইবার ঝুঁকি মোকাবেলায় ব্যাংকগুলোর মধ্যে তথ্য ও অভিজ্ঞতা বিনিময়, সাইবার অপারেশন সেন্টার ও মনিটরিং সিস্টেম আধুনিকায়ন এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং ইকোসিস্টেমকেও আরো উন্নত করতে হবে। পাশাপাশি ডাটা প্রাইভেসি, জিরো ট্রাস্ট আর্কিটেকচার ও ব্যাকআপ সুরক্ষার মতো বিষয়গুলোয় আরো গুরুত্ব দিতে হবে। আমি মনে করি, ব্যাংক খাতকে এখন ‘প্রযুক্তিনির্ভর’ ও ‘বিশ্বাসনির্ভর’—উভয় দিকেই সমানভাবে শক্তিশালী করতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে সাইবার নিরাপত্তা নীতি নিয়ে কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ উদ্যোগগুলো বাস্তবে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে কিনা?
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে সাইবার নিরাপত্তা নীতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক নির্দেশিকায় মাল্টিফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (এমএফএ), তথ্য এনক্রিপশন, সার্ভার প্যাচিং ও নিরাপত্তা মনিটরিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ২০২৩ সালে ক্লাউড কম্পিউটিং-সংক্রান্ত গাইডলাইন প্রণয়ন করে ডাটা প্রাইভেসি ও রিকভারি সক্ষমতা নিশ্চিতের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নির্দেশ প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলো নিয়মিত নিরাপত্তা অডিট, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও সার্টিফিকেশন (যেমন আইএসও ২৭০০১, পিসিআই ডিএসএস) গ্রহণ করছে। অনেক ব্যাংক এরই মধ্যে সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার (এসওসি) স্থাপন করেছে এবং মানবসম্পদ প্রশিক্ষণ জোরদার করছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার রিস্কভিত্তিক তদারকি মডেলও বাস্তবায়নের পথে, যা সাইবার ঝুঁকিসহ সার্বিক রিস্ক গভর্ন্যান্সকে শক্তিশালী করবে। সব মিলিয়ে ব্যাংক খাত এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রস্তুত রয়েছে।
নীতিনির্ধারক সংস্থাগুলো নিয়মিত তদারকি ও অডিটের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা পরীক্ষা করার কথা। বাস্তবে এ তদারকি কতটা ধারাবাহিকভাবে হয়? ব্যাংকগুলো কি সে পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট অনুযায়ী নিজেদের সিস্টেমে পরিবর্তন আনে?
বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে এবং সাইবার নিরাপত্তাকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করে ব্যাংকগুলোর সাইবার নিরাপত্তা নিয়মিত তদারকি করে থাকে। ব্যাংকগুলোকে আইসিটি পলিসি, আইটি রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক ও সাইবার সিকিউরিটি গাইডলাইন মেনে চলার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
অনলাইন ও মোবাইল ব্যাংকিং বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তথ্য সুরক্ষাও এখন বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। প্রিমিয়ার ব্যাংক গ্রাহকের তথ্য, লেনদেন ও সার্ভারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে? হঠাৎ কোনো সাইবার আক্রমণ হলে তা মোকাবেলায় ব্যাংকের প্রস্তুতি কেমন?
আমাদের ব্যাংক ডিজিটাল লেনদেন ও তথ্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। সব অনলাইন ও মোবাইলভিত্তিক চ্যানেলে মাল্টিফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (এমএফএ) চালু রয়েছে, যাতে প্রতিটি লেনদেন নিরাপদ থাকে। ব্যাংকের আইটি সিকিউরিটি গভর্ন্যান্স ডিভিশন সার্বক্ষণিকভাবে সম্ভাব্য সাইবার হুমকি মনিটর করে এবং নিয়মিত ভালনারেবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট ও পেনিট্রেশন টেস্টিং (ভিএপিটি) পরিচালনা করছে। পাশাপাশি গ্রাহকের তথ্যের নিরাপদ সংরক্ষণে শক্তিশালী ডাটা এনক্রিপশন, ব্যাকআপ ও ডিজাস্টার রিকভারি সেন্টার সক্রিয় রয়েছে। প্রিমিয়ার ব্যাংক এখন আএসও/আইইসি ২৭০০১:২০২২ সনদপ্রাপ্ত। গ্রাহকের নিরাপত্তায় আমাদের প্রতিটি কর্মী অনবরত আপসহীন ভূমিকায় কাজ করে যাচ্ছে। কর্মী ও গ্রাহকদের সাইবার সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এবং তৃতীয় পক্ষ দ্বারা সেবাদানের ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করা হয়। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তা ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করছি, যাতে প্রতিটি গ্রাহক একটি নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ ডিজিটাল ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা গ্রহণ করতে পারেন।










