দেশের ব্যাংকগুলো দ্রুত ডিজিটাল ব্যাংকিং ও অনলাইন লেনদেনের দিকে এগোচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে সাইবার হামলার ঝুঁকিও বেড়েছে। দেশের ব্যাংক খাত সাইবার হামলা মোকাবেলা করতে প্রস্তুতি কেমন?

বর্তমান যুগে ব্যাংকিং কার্যক্রম পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপ, এটিএম, কার্ডভিত্তিক লেনদেন এবং অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ ও তথ্য আদান-প্রদান হচ্ছে। এ ডিজিটাল লেনদেনের পরিবেশে সাইবার নিরাপত্তা (সাইবার সিকিউরিটি) এখন ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা, গ্রাহকের আস্থা ও আর্থিক সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ই-ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং ইত্যাদি সেবার পরিসর বৃদ্ধি পেলে ঝুঁকিও বাড়ে। এ ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদের ব্যাংক খাতে এখনো বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। ব্যাংকগুলোর মধ্যে তথ্য শেয়ারিং এবং সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় দুর্বলতা রয়ে গেছে। অনেক ব্যাংক এখনো পুরনো আইটি অবকাঠামো ব্যবহার করছে। দুর্বল অবকাঠামো ও প্রযুক্তির ফলে তারা যেকোনো সময়েই হ্যাকারদের আক্রমণের মুখে পড়তে পারে। আবার দেশে অভিজ্ঞ সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞেরও ঘাটতি রয়েছে। এসবের বাইরেও গ্রাহকদের সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ব্যাংক থেকে সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলেও গ্রাহকের অসচেতনতায়ও দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। আমাদের দেশে অধিকাংশ সাইবার হামলাকারীরা দুর্বল উপায়ে প্রতারণা করেন। তারা ফিশিং বা সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং আক্রমণের মাধ্যমে গ্রাহকের তথ্য হাতিয়ে নিতে চেষ্টা করে। গ্রাহকরা সচেতন থাকলে এ দুর্বল আক্রমণ রোধ করা সম্ভব।

বিশ্বব্যাপী সাইবার হামলার প্রকৃতি যেমন বদলাচ্ছে, তেমনি অনেক দেশ তাদের আর্থিক খাতের নিরাপত্তা নীতি নতুন করে সাজিয়েছে। বাংলাদেশেও কি সেই ধারা দেখা যাচ্ছে?

বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে গাইডলাইনস অন আইসিটি সিকিউরিটি ২০২৩ আপডেট করেছে, যাতে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি শনাক্ত ও মোকাবেলা করতে পারে। নিরাপত্তা (সিকিউরিটি) শুধু আইটি-সংক্রান্ত কোনো বিষয় নয়; এটি বিজনেস ম্যানেজমেন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সাইবার নিরাপত্তা (সাইবার সিকিউরিটি) এখন আর শুধু একটি আইটি বিষয় নয়; এটি ব্যাংকের টিকে থাকা, গ্রাহকের আস্থা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি। সাইবার নিরাপত্তা নির্দেশনা ও গাইডলাইন দেয়া হয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে। নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে রিস্ক-বেজড সাইবার সিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরির চেষ্টা চলছে। সিআইআরটি গঠন ও রিপোর্টিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এগুলো বেশ কার্যকর পদক্ষেপ। বাস্তবায়ন করা গেলে আমরা অনেকটুকুই এগিয়ে যাব।

পুরো আর্থিক খাতেই ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষা এবং প্রতিটি লেনদেন নিরাপদ রাখার জন্য জনতা ব্যাংক কী ধরনের প্রযুক্তি, নীতি বা মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করেছে?

ব্যাংকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো গ্রাহকের তথ্য ও অর্থ। একটি সামান্য নিরাপত্তা দুর্বলতা লাখো গ্রাহকের গোপন তথ্য ফাঁস, আন-অথরাইজড লেনদেন বা সিস্টেম ডাউনের কারণ হতে পারে। সাইবার আক্রমণ শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, ব্যাংকের সুনাম ও গ্রাহকের বিশ্বাস নষ্ট করে দেয়, যা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন। এসব মোকাবেলায় আমরা দ্বিস্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করেছি। এছাড়া এনক্রিপশন প্রযুক্তি ও রিয়েল টাইম ট্রানজেকশন মনিটরিং সিস্টেমও রয়েছে আমাদের। ফায়ারওয়াল ও ইনট্রুশন ডিটেকশন সিস্টেম (সন্দেহজনক কার্যকলাপ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি) ব্যবহার করছে। এর ফলে সন্দেহজনক লেনদেন চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নেয়া যায়। এছাড়া নিয়মিত বিপর্যয় মূল্যায়ন (ভালনারেবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট) ও অনুপ্রবেশ (ভিএপিটি) পরীক্ষাও করা হয়।

সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তো কেবল ব্যাংকের নয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থারও ভূমিকা আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এখানে কী ধরনের ভূমিকা রাখে?

বাংলাদেশ ব্যাংক বছরে একাধিকবার আইটি ও সাইবার নিরাপত্তা অডিট করে। ব্যাংকগুলোকে ত্রৈমাসিকভাবে নিরাপত্তা রিপোর্ট জমা দিতে হয়। নির্দেশনা লঙ্ঘনের জন্য জরিমানা বা সতর্কীকরণ ব্যবস্থাও আছে। তবুও তদারকির সক্ষমতা ও সম্পদে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আশা করি সময়ের সঙ্গে তা আরো বৃদ্ধি পাবে।

এ খাতে আমাদের জনবলের কী কী ঘাটতি রয়েছে? এসব ঘাটতি কাটাতে কী পদক্ষেপ কার্যকর বলে মনে করেন আপনি?

আমাদের দেশে সিআইএসএসপি (বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক সনদ), সিইএইচ (পেশাদার সাইবার নিরাপত্তা সনদ), সিআইএসএ (তথ্য-প্রযুক্তি নিরীক্ষায় পেশাদার সনদ) সনদধারী অভিজ্ঞ পেশাদার লোকবলের অভাব রয়েছে। এসব খাতে আমাদের স্থানীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও কোর্সও সীমিত। আবার স্বল্প সংখ্যক যারা দক্ষ হয়ে ওঠেন, তারা উচ্চ বেতন না থাকায় বিদেশে চলে যান। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সাইবার নিরাপত্তা কারিকুলাম অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিক সত্তাগুলোর যৌথ প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম, ইন্টার্নশিপ ও গবেষণা বৃত্তি চালু করা গেলে কর্মীরা যুগোপযোগী প্রশিক্ষণে আরো দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী হবে।

গ্রাহক পর্যায়ে প্রতরাণার ঝুঁকি কমাতে কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত?

গ্রাহকদের এসএমএস, ই-মেইল ও অ্যাপে সাইবার সচেতনতামূলক বার্তা পাঠানো যেতে পারে। ব্যাংকগুলো অনেক ক্ষেত্রে তা করেও। ছোট ভিডিও বা অ্যানিমেশন বানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার। ব্যাংক শাখায় তথ্যপত্র, পোস্টার এবং সচেতনতা দিবস পালন করা। গ্রাহকদের অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ে ইন্টারঅ্যাক্টিভ কুইজ বা ওয়ার্কশপের আয়োজনও করা যেতে পারে। এসব পদক্ষেপ নিলে গ্রাহকদের সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে সচেতনতা আরো বাড়বে বলে আশা করি।