২০২৪ সালে প্রবাসী বাংলাদেশীরা রেকর্ড ২৬ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। রেমিট্যান্সের এ বাজারে আপনার ব্যাংকের অংশীদারত্ব কেমন ছিল?

২০২৪ সালে রেমিট্যান্স আহরণে অগ্রণী ব্যাংকের অবস্থান আটটি সরকারি ব্যাংকের মধ্যে প্রথম এবং সব ব্যাংক অর্থাৎ ৬০টি ব্যাংকের মধ্যে দ্বিতীয়। গত বছর আমাদের ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ১৮১ কোটি ডলার, যা টাকার অংকে ২১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। রেমিটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৩ লাখ এবং মার্কেট শেয়ার হচ্ছে ৬ দশমিক ৭০ শতাংশ।

এ অংশীদারত্ব বাড়ানোর জন্য আপনাদের পরিকল্পনা কী?

সম্প্রতি অগ্রণী ব্যাংক সরকারি-বেসরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত জনশক্তি রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে তাদের মাধ্যমে যারা বিদেশ যাচ্ছেন তাদেরকে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ট্রেনিং সেশন পরিচালনা শুরু করেছে অগ্রণী ব্যাংকের টিম। তাদের অংশীদারত্ব বৃদ্ধির জন্য বিদেশ যাওয়ার আগেই একটি ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা করাসহ দেশ ও বিদেশের ঠিকানা অনুযায়ী তাদের সুবিধা-অসুবিধা মনিটরিং করা হচ্ছে, যা চলমান থাকবে।

আমাদের ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ জনশক্তি রফতানি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রবাসীদের তথ্য সংগ্রহপূর্বক কোন দেশে কী পরিমাণ জনশক্তি যাচ্ছে, কী পরিমাণ রেমিট্যান্স সেসব দেশ থেকে আসছে এবং ওই দেশগুলোয় অগ্রণী ব্যাংকের অবস্থান কী পর্যায়ে আছে ইত্যাদি তথ্য বিশ্লেষণ করে। এ সব বিশ্লেষণের ভিত্তিতে অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডার মতো দেশে যে অভিজ্ঞ ব্যাংকাররা মাইগ্রেশন করেছেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। অগ্রণী ব্যাংক সংশ্লিষ্ট দেশে তাদের কর্ম-অভিজ্ঞতার আলোকে সেসব দেশের অধিক সংখ্যক রেমিট্যান্স কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হবে এবং এ ব্যাংকের রেমিট্যান্স প্রবাহ বহুলাংশে বাড়বে।

অন্যান্য উদ্যোগের মধ্যে আছে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে মার্কেট শেয়ার বৃদ্ধির জন্য ফিনটেকগুলোর সঙ্গে ডিজিটাল রেমিট্যান্স সার্ভিস প্রদানের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা। সম্প্রতি প্রবাসী বাঙালিদের রেমিট্যান্স-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার সমাধান এবং চাহিদা অনুযায়ী তথ্য প্রদান করতে এই ব্যাংকে রেমিট্যান্স ডিভিশনে দক্ষ কর্মীদের সমন্বয়ে বিশেষ সেবা কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এর ফলে এই ব্যাংকের প্রতি রেমিটারদের আস্থা আরো বাড়বে। গত ডিসেম্বরে রেমিট্যান্স আহরণে মার্কেট শেয়ার বৃদ্ধির জন্য ব্যুরো বাংলাদেশ নামক এনজিওর সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রদান চুক্তি সম্পাদন হয়েছে এবং বর্তমানে এ-সংক্রান্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অন্যান্য এনজিওর সঙ্গেও এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের কর্মপরিকল্পনা রয়েছে।

কোন কোন দেশের প্রবাসীরা আপনাদের ব্যাংকের মাধ্যমে বেশি রেমিট্যান্স পাঠান?

এই ব্যাংকে ২০২৪ সালে একক দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্য থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। তার পরের দেশগুলো যথাক্রমে সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, সৌদি আরব, ইউএসএ, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি।

প্রবাসীদের জন্য আপনার ব্যাংকে কী ধরনের আমানত ও ঋণ প্রডাক্ট রয়েছে?

প্রবাসীদের জন্য আমাদের রয়েছে ছয়টি আমানত স্কিম। এগুলো হলো, অগ্রণী ব্যাংক প্রবাস ডিপোজিট স্কিম, অগ্রণী এনআরবি ডিপোজিট স্কিম, ওয়েজ আর্নার্স ডিপোজিট স্কিম, ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড, ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড এবং ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড। এছাড়া প্রবাসীদের আমাদের চালু করা দুটি ঋণ প্রডাক্ট হলো, অগ্রণী বিদেশ যাওয়ার ঋণ (সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে জামানতবিহীন) এবং অগ্রণী ঘরে ফেরার ঋণ (বিভিন্ন কারণে ফেরত আসা প্রবাসীদের জন্য)

কেন আপনাদের ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীরা বেশি নিরাপদ মনে করবেন?

অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠানো রেমিটারদের কষ্টার্জিত অর্থ সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত। কারণ সরকারি ব্যাংক হিসেবে তাদের পাঠানো ডিপোজিটের জন্য সার্বভৌম গ্যারান্টি রয়েছে। অগ্রণী ব্যাংকের রেমিট্যান্স সেবা প্রদানের জন্য ব্যাপক আকারে নিজস্ব সার্ভিস কাভারেজ এরিয়া আছে। দেশের ভেতরে আমাদের মোট ৯৭৯টি শাখা, ৫৬৭টি এজেন্ট ব্যাংকিং ইউনিট রয়েছে। এছাড়া যেসব রেমিট্যান্স প্রবণ এলাকায় আমাদের শাখা নেই সেসব এলাকায় স্পট ক্যাশ রেমিট্যান্স পেমেন্ট করার জন্য আমাদের মোট ২৯৭টি রেমিট্যান্স ওনলি পয়েন্ট (আরওপি) চালু আছে, সেখান থেকে তাৎক্ষণিকভাবে রেমিট্যান্স সেবা প্রদান করা হয় এবং শুক্রবার ব্যতীত সপ্তাহে ছয়দিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এ সেবা কার্যক্রম চালু থাকে। এর ফলে ঝামেলাবিহীন ও নিরাপদে সারা দেশব্যাপী বেনিফিশিয়ারিরা প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ করতে পারেন। ডিজিটাল সেবার দিক থেকেও অগ্রণী ব্যাংকের অবস্থান এখন সামনের সারিতে। রেমিট্যান্স সেবা প্রদানের জন্য অগ্রণী ব্যাংকের প্রশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মী বাহিনী রয়েছে, যারা দীর্ঘ সময় ধরে আন্তরিকতার সঙ্গে রেমিট্যান্স সেবা প্রদান করে আসছে।

প্রবাসীদের বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করতে সরকার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন?

সরকার ইতোমধ্যে বৈধপথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির জন্য অনেক ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। যেমন— বিমানবন্দরে প্রবাসীদের জন্য আলাদা লাউঞ্জের ব্যবস্থা করেছেন।বিভিন্ন ধরনের নগদ প্রণোদনা চালু আছে যা অব্যাহত থাকতে পারে। এছাড়া সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রেরণকারীদের জন্য ক্যাশ রিওয়র্ডের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সরকার এখন রেমিট্যান্সের বিপরীতে আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দেয়। প্রণোদনার এ হার ৫ শতাংশে উন্নীত করলে প্রবাসীরা বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে আরো বেশি উৎসাহিত হবেন। কর্মীদের বিদেশ যাওয়ার বা অভিবাসন খরচও কমানো দরকার।

সরকারি উদ্যোগে প্রবাসীদের বিভিন্ন ধরনের সম্মাননা প্রদান করা দরকার। রেমিটারদের জন্য ওয়েজ আর্নার্স কার্ড ব্যবস্থা চালু করা, যার মাধ্যমে তারা নিম্নোক্ত সুবিধাগুলো প্রাপ্য হতে পারে, যেমন: বাড়ি বা জমি রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে ভ্যাট কমানো, তাদের সন্তানদের স্কৃল ফি ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমিয়ে দেয়া, পরিবারের সদস্যদের জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, টপ রেমিটারদের জাতীয়ভাবে রেমিট্যান্স ট্রফি প্রদানের ব্যবস্থা করা (এক্সপোর্ট ট্রফির আদলে)। ওই সম্মাননা প্রদানের বিষয়টি প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচার করা।