দেশে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের মাধ্যমে। ওই ব্যাংকটিতেই আমার কর্মজীবন শুরু হয় এরপর আমি আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকেও কাজ করেছি। গত এক দশক ধরে কাজ করছি সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে (এসআইবিএল)। দেশে রেমিট্যান্স আনার ক্ষেত্রে এ তিনটি ব্যাংকই অগ্রণী ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক রেমিট্যান্স আনার জন্য কর্মীদের বিভিন্ন দেশে ডেপুটেশনে পাঠায়। সে ধরনের নিযুক্ত কর্মী এসআইবিএলের না থাকলেও আমরা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দেশী-বিদেশী বিভিন্ন রেমিট্যান্স হাউজের সঙ্গে এগ্রিমেন্টের ভিত্তিতে আমরা রেমিট্যান্স আনছি। আমরা চেষ্টা করি সহজে ও দ্রুততম সময়ের মধ্যে রেমিট্যান্সের টাকাটা পৌঁছে দিতে। আন্তরিক সেবার কারণেই এসআইবিএলের রেমিট্যান্স বেড়েছে।
আমি নিজেও বিভিন্ন সময়ে দেশের বাইরে গিয়ে প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলেছি। প্রবাসীরা সহজে কীভাবে টাকা পাঠাতে পারেন, কীভাবে পাঠাতে পারলে তাদের সুবিধা হয় সেগুলো জেনেছি। তাদের অনেক সমস্যার কথা আমাকে বলেছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে কথা বলে কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। তার মধ্যে রয়েছে কীভাবে সহজে অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। কারণ তারা সহজে টাকা পাঠাতে চান। রেমিট্যান্স হাউজ হোক বা যেভাবে হোক তারা যোগাযোগটা সহজ চান। বিদেশে তারা সপ্তাহে একদিন ছুটি পান। ওই একদিনেই যেন সহজে টাকা পাঠাতে পারেন সেটা তাদের চাওয়া। আবার দেশে যিনি রেমিট্যান্সটা পাবেন, তিনি যেন সহজে টাকাগুলো পেতে পারেন তার ব্যবস্থা করাও জরুরি। এ সেবাগুলা যদি তাদের দেয়া হয় তাহলে তারা রেমিট্যান্স পাঠাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে গত আগস্টের পরে কয়েক মাস আমরা কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছি। তখন তারল্য সংকটের (লিকুইড ক্রাইসিস) কারণে আমরা গ্রাহকদের যথাসময়ে টাকা দিতে পারছিলাম না। যেদিন টাকা এসেছে সেটি দিতে ১৫ দিনও সময় লেগে যাচ্ছিল। তবে গ্রাহককে আশ্বস্ত করেছিলাম আমরা কোনোভাবেই রেমিট্যান্সের টাকা প্রদানকে বাধাগ্রস্ত করব না। রেমিট্যান্সের টাকা শতভাগ পরিশোধ করে দেব। এ নিশ্চয়তার পরে গ্রাহক আগের মতোই রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। ফলে এখন রেমিট্যান্সের গতি স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে এসেছে। এর মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে যে রেমিট্যান্স এসেছে, সেখানে এসআইবিএলের অংশীদারত্ব ৬ দশমিক ৯ বা ৭ শতাংশ।
প্রবাসীদের জন্য এসআইবিএলের বেশ কয়েকটি আমানত ও ঋণ প্রডাক্ট রয়েছে। প্রবাসীরা সেটির মাধ্যমে মুনাফা নিতে পারেন। যেমন আমরা এক লাখে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা মুনাফা দিয়ে থাকি। তবে এটি নিয়মিত গ্রাহকের জন্য নয়। যারা ফিক্সড ডিপোজিট রশিদ (এফডিআর) করেন তারা এ সুবিধা নিতে পারেন। এর মাধ্যমে একদিকে সঞ্চয়ও হবে, অন্যদিকে প্রাপ্য মুনাফা দিয়ে সংসারের খরচ করতে পারবেন। পাশাপাশি রেমিট্যান্সকে উৎসাহিত করার জন্য আমরা বিভিন্ন উপহারও দিচ্ছি।
আমাদের আরেকটি সেবা হচ্ছে কোনো প্রবাসী যখন বিদেশ থেকে আসেন, তখন তাকে বিমানবন্দর থেকে আমাদের গাড়িতে বাড়ি পৌঁছে দেয়া। মাঝখানে এটি বন্ধ থাকলেও এখন নিয়মিত চালু রয়েছে। আমরা মনে করি প্রবাসীদের সর্বোচ্চ সম্মান ও অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। তারা যদি প্রাপ্য মর্যাদাটুকু পান তাহলে ব্যাংক চ্যানেলের মাধ্যমে টাকা পাঠাবেন। তারা অনেকে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠান। তারা যখন দেখবেন ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠালে বিশেষ সুবিধা রয়েছে এবং বিমানবন্দরে কোনো হয়রানির সম্মুখীন হতে হবে না, তখন উৎসাহিত ও সম্মানিত বোধ করবেন। আমরা এটাও চাচ্ছি যে সরকারি যত সংস্থার প্রবাসীদের সেবা দেয়ার সুযোগ রয়েছে তারাও যেন প্রবাসীদের অগ্রাধিকার দেন।
এসআইবিএলের পক্ষ থেকে আমাদের ইচ্ছা আছে যেসব দেশে আমাদের প্রবাসীরা বেশি রয়েছেন, সেখানে ক্যাম্পইন করা। আমারা জানতে চাই, কীভাবে তাদের আরো সহজে সেবা দেয়া যেতে পারে। তাদের কী কী সমস্যা হচ্ছে, সেগুলো যদি জানতে পারি এবং সমাধান করতে পারি, তাহলে এসআইবিএলের মাধ্যমে আরো বেশি রেমিট্যান্স আনা সম্ভব হবে।
গত ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আমাদের যে সংকটগুলো ছিল, সেগুলা এখন আর নেই। পরিস্থিতি এখন অনেকটা স্বাভাবিক। আমাদের ইউটিলিটি বিল সংগ্রহ থেকে শুরু করে অনলাইন সেবা, আরডিএস, ইএফটি যেগুলো সাময়িক বন্ধ ছিল এখন সেগুলো শতভাগ চলমান রয়েছে। এসআইবিএলের সব সেবা এখন কার্যকর। কাজেই এখন আমাদের কোনো লেনদেনই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে না। গ্রাহক আমাদের মূল শক্তি ও সম্পদ। আমাদের ব্যাংক তো অনেক পুরনো, অনেক পুরনো গ্রাহক এখানে আছেন। সংকটের মধ্যেও তারা এ ব্যাংক ছেড়ে যাননি। তারা আগেও ছিলেন, এখনো আছেন এবং তারা আশ্বস্ত করেছেন আমাদের সঙ্গেই লেনদেন করবেন। এছাড়া গ্রাহককে ফিরিয়ে আনতে আমরা বিভিন্ন শহরে গ্রাহক সমাবেশ করছি। গ্রাহকরা বলছেন, সাময়িক সমস্যায় পড়লেও আমরা আপনাদের সঙ্গে ছিলাম এবং আগের মতোই স্বাভাবিক লেনদেন করতে চাই।
তারল্য সংকটের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের পাশে ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমে অন্য ব্যাংকের মাধ্যমে আমাদের কিছু সাপোর্ট দিয়েছিল। তারপর যখন বলেছি এভাবে আমাদের ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন, তখন বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি বড় একটি সাপোর্ট দেয়। সেক্ষেত্রে আমরা ৪ হাজার কোটি টাকার মতো পেয়েছি। এখন আমাদের কার্যক্রম অনেকটাই স্বাভাবিক। আশা করছি, এ ধারা অব্যাহত থাকলে আর সমস্যা হবে না।
এসআইবিএলের গ্রাহক ও প্রবাসীদের বলব, আমাদের যে একটি ইমেজ ছিল সেটি আমরা পুনরুদ্ধার করতে চাই। এরই মধ্যে অনেকটা সফলও হয়েছি। যেসব গ্রাহক আমাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আছেন তারা যদি আমাদের সার্বিক সহযোগিতা করেন, তাহলে পুরনো সেই গৌরবোজ্জ্বল দিন আবার ফিরে পাব বলে আমরা আশাবাদী। আমরা বিশ্বাস করি, ২০২৫ সালের মধ্যেই সে অবস্থান ফিরে পাব।










