রেমিট্যান্স প্রবাহে পূবালী ব্যাংকের অংশীদারত্ব কেমন?

এবার রেমিট্যান্স আহরণে আমাদের খুব বেশি অংশীদারত্ব ছিল না। কারণ এবার আমরা রফতানি আয়ের দিকে বেশি মনোযোগী ছিলাম। তবে আমরা সেরা দশের মধ্যে ছিলাম। ব্র্যান্ডিং অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছি আমরা। আমাদের রফতানি আয় বেশি এসেছে। আর রেমিট্যান্স প্রবাহ গতানুগতিক ছিল। রেমিট্যান্স বিষয়টি রেটনির্ভর। এটা বেশি আনতে গেলে বেশি রেট দিতে হয়। আবার এটা করতে গেলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রভাব পড়ে। তাই আমরা রফতানিতে বেশি ফোকাস করেছিলাম।

আগামীতে রেমিট্যান্সে অংশীদারত্ব বাড়ানোর জন্য আপনাদের পরিকল্পনা রয়েছে কি না?

রেট নির্দিষ্ট না হওয়ায় রেমিট্যান্স মার্কেটটি সুস্থ প্রতিযোগিতার বাজার হয়নি। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নানা ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। রেট নির্দিষ্ট হলে এটা সুস্থ একটি বাজার হবে। আমাদের সব শাখায় রেমিট্যান্স গ্রাহকদের আমরা বিভিন্ন উপহারসামগ্রী দিয়ে থাকি। প্লেট, গ্লাস, মগ বা বাটি। যেভাবেই হোক আমরা আমাদের লোগোটি গ্রাহকের বাসায় পৌঁছে দেয়ার চেষ্টাটা করি। আর ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির জন্য আমরা বিভিন্ন পরিকল্পনা করছি। যেমন যেখানে বেশি রেমিট্যান্স আসে সেসব এলাকায় প্রবাসীদের সন্তানদের জন্য খেলাধুলার আয়োজন করা। দরিদ্র পরিবারে শিক্ষার জন্য বরাদ্দ দেয়া যায়। কমিউনিটির জন্য পিকনিক বা সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার মতো অনুষ্ঠান আয়োজন করা যায়। তবে রেট একেক রকম থাকলে সেবার চেয়ে ডলারের রেটটাই বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। ভারতে কিন্তু এক রেটে রেমিট্যান্স প্রদান করা হয়।

কোন কোন মানি এক্সচেঞ্জের সঙ্গে আপনাদের চুক্তি রয়েছে?

অনেক মানি এক্সচেঞ্জের সঙ্গে আমাদের চুক্তি রয়েছে। প্রায় ৩০০-এর বেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের চুক্তি রয়েছে। আমরা পুরনো ব্যাংক হিসেবে সবার সঙ্গেই আমাদের যোগাযোগ আছে।

কোন কোন দেশের প্রবাসীরা আপনাদের ব্যাংকের মাধ্যমে বেশি রেমিট্যান্স পাঠান?

মধ্যপ্রাচ্য থেকেই বেশি রেমিট্যান্স আসে আমাদের। সৌদি আরব, দুবাই, কাতার বড় বাজার। বরিশাল অঞ্চলের জন্য ইতালি থেকেও বেশি রেমিট্যান্স আসে। এখন ইউরোপ ও আমেরিকা থেকেও আসে। আফ্রিকা থেকেও আসে। রেমিট্যান্স প্রদানের জন্য আমাদের আলাটা ডেডিকেটেড ডেস্ক রয়েছে। রেমিট্যান্স আসামাত্রই তারা ইনফর্ম করে।

কেন আপনাদের ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীরা বেশি নিরাপদ মনে করবেন?

আমরা নিরাপত্তার জন্য সবকিছু করে থাকি। নিরাপত্তার জন্য আলাদা একটি নিরাপত্তা ডেস্ক করা যায়। যেখানে পুলিশের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ থাকে। প্রতি শাখায় প্রবাসীদের পরিবারের সদস্যদের বসার জন্য আমরা সুন্দর ব্যবস্থা করেছি। চায়ের ব্যবস্থা আছে সেখানে। বাচ্চাদের জন্য লকলেট রাখা থাকে। তারপর তাদের গিফট দেয়া। নারীদের আমরা রান্নার হাঁড়ি-পাতিল ও কড়াই গিফট দিয়ে থাকি। যাতে তারা আমাদের শাখায় আসতে উৎসাহ বোধ করেন। ছেলেদের কলম দিয়ে থাকি।

প্রবাসীদের বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করতে সরকার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন?

মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলতে হবে। অনেক দেশ শুধু দেশকে ভালোবেসে হুন্ডি করে না। জনগণের মধ্যে এমন সচেতনতা তৈরি করা। যাতে পরিবারের সদস্যরাও বলে বৈধ চ্যানেলে যেন রেমিট্যান্স পাঠায়। ব্যাংকগুলোও এসব সচেতনতা তৈরির জন্য দেশে ও বিদেশে সেমিনার আয়োজন করতে পারে। যেখানে প্রবাসী শ্রমিকরা যুক্ত হয়ে হুন্ডির ভালো ও খারাপ দিক সম্পর্কে জানতে পারে। হুন্ডি না করার জন্য তাদের বোঝানো দরকার।

ব্যাংক থেকে রেমিট্যান্সের অর্থ উত্তোলনে অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ গ্রাহকরা হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে। রেমিট্যান্স পাঠানো ও উত্তোলন প্রক্রিয়া আরো সহজতর করতে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া দরকার বলে মনে করেন? এখন আগের মতো কোনো কাগজপত্র লাগে না। সবকিছু অটোমেটেড হয়ে গেছে এখন। এখন শুধু বাড়তি সেবা দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার বিষয় রয়েছে। এখন প্রবাসীদের পরিবারকে যেন প্রাপ্য সম্মানটা নিশ্চিত করা যায়, সেই বিষয়টি দেখতে হবে।

হুন্ডির বাজার নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া দরকার?

হুন্ডি প্রতিরোধ করা একটু জটিল বিষয়। যেকোনো পদক্ষেপ নিয়ে তারাও পাল্টা কৌশল নিয়ে কাজ করে। এটার জন্য সরবরাহ চেইনে কাজ করতে হবে। যেমন ধরুন যারা বিদেশ থেকে ডলার পাঠানোর কাজ করে তারা যেন ডলার অন্যভাবে ব্যবহার করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য আমদানির ক্ষেত্রে আন্ডার ইনভয়েসিং বন্ধ করা গেলে ডলারের চাহিদা কমে আসবে। কর ফাঁকি দেয়ার জন্য আন্ডার ইনভয়েসিং করা হচ্ছে। এটা যদি কঠোরভাবে মনিটরিং করা যায় তাহলে হুন্ডি কাজ করবে না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর হতে হবে। আর প্রবাসীদের পরিবারের সদস্যদের অ্যাকাউন্টগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে শ্রম মন্ত্রণালয় বা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে একটি ডাটাবেজ তৈরির মাধ্যমে সংরক্ষণ করা যায়। তখন সেসব অ্যাকাউন্টে টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে আসছে কিনা সেটা মনিটরিং করা যাবে। এভাবে প্রযুক্তিগত উন্নতি করা দরকার। ব্যবসায়ীদেরও মাইন্ড সেট ঠিক করতে হবে।

বিনিময় হার নিয়ে অস্থিরতার কারণেও রেমিট্যান্স প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে সমাধান কী হতে পারে?

কিছু কিছু ব্যাংক বেশি রেট দেয়। তখন তাদের কিন্তু বেশি রেমিট্যান্স আসে। কারণ কোনো দোকানে যদি ২ টাকা বেশি দেয় সেখানেই যাবে মানুষ। কারণ এখানে ভোগ্যপণ্যের মতো মানের কোনো বিষয় নেই। কে বেশি দিচ্ছে সেটাই আসল বিষয়। অনেকে এলসি দায় ঠিক রাখার জন্য বেশি দামে ডলার কিনছে। তবে উদ্বৃত্ত ডলার যদি অন্য ব্যাংকে দেয়ার ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে এ সমস্যা থাকবে না। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা মনিটরিং ব্যবস্থা করতে পারে।