বিদায়ী বছরে প্রবাসীরা সর্বোচ্চ পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। রেমিট্যান্সের এ প্রবৃদ্ধিকে কীভাবে দেখছেন?

দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের গুরুত্ব সীমাহীন। রফতানি খাত আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস হলেও এ আয়ের বিপরীতে বিপুল অর্থের পণ্য আমদানি করতে হয়। কিন্তু রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে সে অর্থে দেশের কোনো ব্যয় নেই। রেমিট্যান্সের পুরো অর্থই আমাদের ব্যালেন্স অব পেমেন্টে (বিওপি) যুক্ত হয়। গত বছর দেশে প্রবাসীরা রেকর্ড ২৬ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, ২০২৩ সালের তুলনায় যা প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বেশি। বাড়তি এ রেমিট্যান্স আমাদের ডলারের বাজারকে স্থিতিশীল করতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকেও সমৃদ্ধ করেছে।

রেমিট্যান্সের বাজারে আপনার ব্যাংকের অংশীদারত্ব কেমন ছিল?

গত বছর মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ৭৬১ মিলিয়ন ডলার দেশে এনেছে। এটি দেশের মোট রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রায় ৩ শতাংশ। আমরা এ অংশীদারত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করছি।

অংশীদারত্ব আরো বাড়ানোর জন্য আপনাদের পরিকল্পনা কী?

আমরা প্রবাসীদের জন‍্য অনলাইনে সহজ উপায়ে পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দিয়ে ব‍্যাংক হিসাব খোলার ব‍্যবস্থা করছি। একজন প্রবাসী অতি সহজেই তার বৈদেশিক অ‍্যাকাউন্ট থেকে আপনজনদের কাছে টাকা পাঠাতে পারবেন এবং নিজের জন্যও সঞ্চয় করতে পারবেন। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সারদের জন্য তাদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশে নিয়া আসা এবং অন্যান্য সুযোগসহ একটি বান্ডেল প্রডাক্ট নিয়ে আসছি, যেটি সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক। এটি যেন ফ্রিল্যান্সারদের কাছে সহজে পৌঁছতে সক্ষম হয় তা নিয়ে আমরা কয়েকটি এমটিওর সঙ্গে আলোচনা করছি।

রেমিট্যান্স আনার জন্য কোন কোন মানি এক্সচেঞ্জের সঙ্গে আপনাদের চুক্তি রয়েছে?

এ মুহূর্তে আমরা প্রচলিত ধারার মানি এক্সচেঞ্জের চেয়ে অ্যাপস বা অনলাইনভিত্তিক মানি ট্রান্সফার কোম্পানিগুলোর (ফিনটেক) সঙ্গে বেশি যোগাযোগ রাখছি। আমাদের সঙ্গে সব মিলিয়ে ৬১টি কোম্পানির চুক্তি রয়েছে।

কোন কোন দেশের প্রবাসীরা আপনাদের ব্যাংকের মাধ্যমে বেশি রেমিট্যান্স পাঠান?

অ্যাপস বা অনলাইনভিত্তিক মানি ট্রান্সফার কোম্পানিগুলোর যোগাযোগ বেশি থাকায় আমরা সাধারণত সব দেশের রেমিট্যান্সই পাই। তবে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, আমেরিকা থেকে বেশি রেমিট্যান্স আসে।

প্রবাসীদের জন্য এমটিবির কী ধরনের আমানত ও ঋণ প্রডাক্ট রয়েছে?

প্রবাসীদের জন্য আমরা তিনটি আমানত প্রডাক্ট চালু করেছি। এগুলো হলো এনআরবি সেভিংস, এনআরবি ডিপিএস ও এনআরবি এফডিআর। এ প্রডাক্টগুলো গ্রাহকের কাছে বেশ জনপ্রিয়ও। এখন আমরা একটি বান্ডেল প্রডাক্ট করছি, যেখানে প্রবাসী ও তাদের পরিবার এ তিনটি প্রডাক্টের পাশাপাশি আরো কিছু আমানত এবং ঋণ সুবিধার ব‍্যবস্থা পাবে।

প্রবাসীদের বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করতে সরকার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন?

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিইএফটিএন সুবিধা আরো বেশি কার্যকর করা প্রয়োজন। পাশাপাশি এনপিএসবির আওতায় সব ব্যাংককে নিয়ে আসা দরকার, যেন প্রবাসীদের কষ্টার্জিত টাকা সরাসরি এবং সঙ্গে সঙ্গেই ব‍্যাংকে পৌঁছতে পারে। পাশাপাশি এমএফএসগুলোয় যেন কোনো চার্জ ছাড়াই রেমিট্যান্স পাঠানো বা উত্তোলন করা যায় এ ব‍্যাপারে নজর দেয়া দরকার। একই সঙ্গে অবৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। কিছু উদাহরণ দিতে পারলে সুফল পাওয়া যাবে।

ব্যাংক থেকে রেমিট্যান্সের অর্থ উত্তোলনে অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ গ্রাহক হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে। রেমিট্যান্স পাঠানো ও উত্তোলন প্রক্রিয়া আরো সহজতর করতে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া দরকার বলে মনে করেন?

এখন আর আগের মতো এ সমস্যা থাকার কথা নয়। বেশির ভাগ রেমিট্যান্স এপিআই কানেকশনের মাধ্যমে সরাসরি ব‍্যাংক হিসাবে চলে যায়। তবে পিআইএনের যদি কাউন্টার থেকে ক‍্যাশ তোলার জন‍্য আসে তাহলে কিছু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দিতে হয়, যা কিছুটা সময়সাপেক্ষ। এটির পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে।

বিনিময় হার নিয়ে অস্থিরতার কারণেও রেমিট্যান্স প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে সমাধান কী হতে পারে?

বিনিময় হার সবসময়ই সংবেদনশীল। অস্থিরতা কাটাতে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। নিজেরা ঐক‍্যবদ্ধ না হলে বাইরের কোম্পানিগুলো ফরেন কারেন্সির চাহিদার ওপর বিনিময় হারের সংবেদনশীলতার সুযোগ নিয়ে থাকে।

রেমিট্যান্সের সিংহভাগই প্রবাসী পরিবার ভোগে ব্যয় করে। সঞ্চয়ে উদ্বৃত্ত করে রেমিট্যান্সকে উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগে রূপান্তর কীভাবে করা যায়?

সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ৯০ ভাগই পরিবারের ভরণপোষণ বা বিদেশে যাওয়ার সময়ের নেয়া ঋণ পরিশোধে খরচ হয়ে যায়। আমরা প্রবাসী ও তাদের পরিবারের জন্য একটি বান্ডেল প্রডাক্ট নিয়ে আসছি। এখানে মোট ছয়টি আমানত প্রডাক্ট রয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মোতাবেক প্রবাসী ঋণসহ তিনটি ঋণ সুবিধা রয়েছে। ফলে একজন প্রবাসী বিদেশে বসেই তার নিজের জন্য ডিপোজিট করতে পারবেন, যা তিনি দেশে এসে কাজে লাগাতে পারবেন। পাশাপাশি প্রয়োজনমতো আমানতের বিপরীতে বা রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রমাণসাপেক্ষে প্রবাসী ঋণ নিতে পারবেন।