দেশের গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের শাখা নেটওয়ার্ক বিস্তৃত। রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রে এ নেটওয়ার্ককে কিভাবে কাজে লাগানো যায়?
আপনি যথার্থই বলেছেন যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের শাখা নেটওয়ার্ক দেশের গ্রামাঞ্চলে বিস্তৃত। এ মুহূর্তে আমাদের ব্যাংকের শাখা সংখ্যা ১ হাজারেরও বেশি। প্রবাসী বাংলাদেশীদের একটি বড় অংশ প্রান্তিক অঞ্চলের। এ কারণে প্রবাসী পরিবারের হাতে রেমিট্যান্স পৌঁছানো কৃষি ব্যাংকের জন্য খুবই সহজ। এ মুহূর্তে আমরা সেটিই করার চেষ্টা করছি। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। এর পরিমাণ ১ দশমিক শূন্য ৮১ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪ শতাংশ।
এ অংশীদারত্ব আরো বাড়ানোর জন্য আপনাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই?
বিশ্বের স্বনামধন্য ৪৫টি এক্সচেঞ্জ কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চুক্তি রয়েছে। তবে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ তাদের স্বজনদের কাছে পৌঁছে দিতে আরো বেশি এক্সচেঞ্জের সঙ্গে চুক্তি করা দরকার। আমরা সে লক্ষ্যে এগুচ্ছি। দেশব্যাপী কৃষি ব্যাংকের রেমিট্যান্স সেবা কার্যক্রম ও প্রমোশনাল প্রোগ্রাম যেমন: রেমিট্যান্স উৎসব, রেমিট্যান্স সেবা মাস, রেমিট্যান্স সেবা পক্ষ, রেমিট্যান্স সেবা সপ্তাহ প্রভৃতি আয়োজন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া বিশ্বের যেকোনো স্থানে অবস্থান করা প্রবাসী বাংলাদেশীদের বিকেবির নিজস্ব মোবাইল অ্যাপলিকেশন বা অনলাইন ব্যাংকিং ফ্যাসিলিটির মাধ্যমে নিজ নামে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সঞ্চয়ী/মেয়াদি আমানত/ডিপোজিট স্কিম খোলার সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, সাউথ আফ্রিকা ও মালদ্বীপের প্রবাসীরা কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন।
প্রবাসীদের জন্য আপনার ব্যাংকে কী ধরনের আমানত ও ঋণ প্রডাক্ট রয়েছে?
আমরা প্রবাসীদের জন্য বিকেবি প্রবাসী মাসিক মুনাফা স্কিম, বিকেবি প্রবাসী ত্রৈমাসিক মুনাফা স্কিম, বিকেবি প্রবাসী স্থায়ী আমানত স্কিম, বিকেবি প্রবাসী সঞ্চয় স্কিম, বিকেবি প্রবাসী ডাবল প্রফিট স্কিম চালু করেছি। এ মুহূর্তে ঋণ প্রডাক্ট প্রণয়নের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
কেন আপনাদের ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীরা বেশি নিরাপদ মনে করবেন?
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক শতভাগ রাষ্ট্রমালিকানাধীন একটি বিশেষায়িত ব্যাংক। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলসহ নগর-শহর নির্বিশেষে ১ হাজার ৩৮টি শাখা পাঁচটি উপশাখা এবং প্রায় ৫০০ সাব এজেন্ট লোকেশনের মাধ্যমে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং এক্সচেঞ্জ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এপিআই এবং ইএফটি ও এনপিএসবি সার্ভিসের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক গ্রাহকের হিসাবভুক্তির পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে রেমিট্যান্স প্রদানে সক্ষম, বিধায় প্রবাসীরা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে রেমিট্যান্স পাঠাতে নিরাপদ বোধ করেন।
প্রবাসীদের বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করতে সরকার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন?
প্রবাসী বাংলাদেশীদের সরকার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে রেমিটার প্রিভিলেজ কার্ড সরবরাহ করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে রেমিটার বা বেনিফিশিয়ারিরা সরকারের বিভিন্ন সেবা দপ্তর থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। পাশাপাশি প্রণোদনা হিসেবে বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল, ট্যাক্স, ভ্যাট ইত্যাদি প্রদানের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় প্রদান করা যেতে পারে।
ব্যাংক থেকে রেমিট্যান্সের অর্থ উত্তোলনে অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ গ্রাহক হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে। রেমিট্যান্স পাঠানো ও উত্তোলন প্রক্রিয়া আরো সহজতর করতে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া দরকার বলে মনে করেন?
রেমিট্যান্স বেনিফিশিয়ারিদের দ্রুত ও উন্নত সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ব্যাংকগুলোর রেমিট্যান্স হেল্প ডেস্ক কর্মকর্তাদের জাতীয় অর্থনীতির বিকাশ এবং ব্যাংকের আমানত বৃদ্ধি ও মুনাফা অর্জনের ওপর রেমিট্যান্স কত গভীর গুরুত্ব রাখে সে বিষয়ে নিয়মিতভাবে সচেতনতা সৃষ্টিবিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করা যেতে পারে। গ্রাহকের কাছ থেকে রেমিট্যান্স সংশ্লিষ্ট অভিযোগ-পরামর্শ সংগ্রহ ও যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।
হুন্ডির বাজার নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন?
ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রেরিত ডলারের বিক্রিমূল্য ও খোলাবাজারে বিক্রীত ডলারের মূল্যের মধ্যে ব্যবধান বেশি হলে প্রবাসীরা অনেক সময় অধিক বিনিময়মূল্য লাভের আশায় বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠিয়ে থাকেন। এ সমস্যা নিরসনে দেশীয় হুন্ডি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ব্যাংকিং চ্যানেল ও খোলাবাজারে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়মূল্যের তারতম্য যথাসম্ভব ন্যূনতম পর্যায়ে রাখতে হবে এবং অবৈধ হুন্ডি যে দেশ ও জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্তরায় সে বিষয়ে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। বাস্তবিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে রেমিটারদের সরকার প্রদত্ত অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরণের সম্মাননা প্রদান যেমন—সিআইপি/ভিআইপি মর্যাদা প্রদান, বিমানবন্দরে রেমিটারদের জন্য স্বতন্ত্র লাউঞ্জ ব্যবহারের সুবিধা, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সেবা গ্রহণে অগ্রাধিকার প্রদানের মতো উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।
বিনিময় হার নিয়ে অস্থিরতার কারণেও রেমিট্যান্স প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে সমাধান কী হতে পারে?
প্রবাসীদের জন্য একটি স্থিতিশীল ও আকর্ষণীয় বিনিময় হার নিশ্চিত করতে হবে। রেমিটারদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে বিনিময় হারের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নিয়মিত পর্যালোচনা ও মনিটরিং করতে হবে। পরিস্থিতি ও বাস্তবতা বিবেচনায় বাস্তবভিত্তিক বিনিময় হার নির্ধারণ করতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে কৃষি ব্যাংকের অর্জন কী?
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের রেমিট্যান্স সংগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ৮ হাজার ১৪০ কোটি টাকা রেমিট্যান্স আহরিত হয়েছে যা বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা বেশি। সম্প্রতি রেমিট্যান্স অর্জনের সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কর্তৃক দেশের শীর্ষ ১০ রেমিট্যান্স আহরণকারী ব্যাংক হিসাবে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংককে অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। এছাড়া সেন্টার ফর এনআরবি কর্তৃক বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংককে টপ টেন রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়।










