একসময় শৌখিন পণ্য হিসেবে বিবেচিত ফ্রিজ এখন সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রীতে পরিণত হয়েছে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, সহজ কিস্তি সুবিধা, বিদ্যুৎসাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং সহজলভ্য বিক্রয়োত্তর সেবা গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করতে সাহায্য করেছে। দেশের ফ্রিজ বাজারে এখন আর বিদেশী ব্র্যান্ডের আধিপত্য নেই। সময়ের ব্যবধানে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মান, ডিজাইন ও সেবার মানোন্নয়নের ফলে ক্রেতারা এখন দেশীয় ফ্রিজের প্রতিই আস্থা রাখছেন।

বর্তমানে বাংলাদেশে ফ্রিজের বাজারের ৯৫ শতাংশই স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন হচ্ছে। বিদেশী পণ্যের চেয়ে তুলনামূলক কম দাম, বিক্রয়োত্তর সেবা ও ওয়ারেন্টি সুবিধা থাকায় দেশীয় পণ্যের দিকেই ঝুঁকছেন ক্রেতারা। উৎপাদকেরাও দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানির পথে পা বাড়াচ্ছেন। এরই মধ্যে ওয়ালটন নিজেদের উৎপাদিত ফ্রিজ প্রায় ৫০ দেশে রফতানি করছে বলে দাবি করেছেন প্রতিষ্ঠানটির ওয়ালটন রেফ্রিজারেটরের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা তাহসিনুল হক। তিনি বলেন, ‘এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ৫০টিরও বেশি দেশে ফ্রিজ রফতানি করছি আমরা। সম্প্রতি শ্রীলংকায়ও আমাদের শোরুম উদ্বোধন হয়েছে। দেশীয় গ্রাহকদের চাহিদা মিটিয়ে আমরা বিদেশে রফতানি করছি। প্রযুক্তির নতুন সংযোজনে যুগোপযোগী ফিচার, সহজ কিস্তি ও বিক্রয়োত্তর সেবার কারণে গ্রাহকরা আমাদের ফ্রিজ পছন্দ করছেন। দেশের সব শ্রেণী-পেশা ও আয়ের ক্রেতাদের জন্যই আমাদের ফ্রিজ রয়েছে।’

মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, জীবনমানের উন্নয়ন ও দেশব্যাপী এখন বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছে যাওয়ায় শহর কিংবা গ্রাম উচ্চবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত এমনকি নিম্ন আয়ের মানুষের ঘরেও ফ্রিজ স্থান করে নিয়েছে। এক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদনও বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন যমুনা ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড অটোমোবাইলস লিমিটেডের মার্কেটিং বিভাগের ডিরেক্টর সেলিম উল্যা সেলিম। তিনি বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হওয়ায় দেশীয় ফ্রিজের দাম ক্রেতাদের সাধ্যের মধ্যে, বিষয়টিও ফ্রিজের বাজার বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।’

গতকাল রাজধানীতে কয়েকটি শোরুম ঘুরে দেখা যায়, ঈদকে সামনে রেখে প্রায় প্রতিটি শোরুমেই ক্রেতারা ভিড় করছেন। তাদের মধ্যে একজন বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বিদেশী ব্র্যান্ডগুলোর চেয়ে কম দামেই দেশীয় ব্র্যান্ডের পণ্য পাওয়া যাচ্ছে বাজারে। আবার স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের যন্ত্রাংশও খুব সহজেই পাওয়া যায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ফ্রিজের কোনো অংশ অকেজো হয়ে গেলেও বাজারে তা খুঁজে পেতে ও মেরামত করতে সহজ হয়। তাই মধ্যবিত্তরা এখন দেশীয় ব্র্যান্ডের ফ্রিজই বেশি কিনছেন। বিদেশী ব্র্যান্ডের ফ্রিজ কিনছেন মূলত উচ্চবিত্তরাই।’

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংযোগের বিস্তৃতি, মধ্যবিত্তের আয় বৃদ্ধি এবং কিস্তিভিত্তিক বিক্রির সুবিধা—এই তিন কারণেই গত এক দশকে ফ্রিজের চাহিদা বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকসের সর্বশেষ (২০২৩) প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৫৩ শতাংশের বেশি খানা বা পরিবারে এখন ফ্রিজ রয়েছে। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ। আর ২০২১ সালে দেশের ৪৫ শতাংশ পরিবারে ফ্রিজ ছিল।

একসময় ধারণা ছিল ইলেকট্রনিকস পণ্যের বড় বাজার কেবল রাজধানী ঢাকা বা দেশের শহরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ। কিন্তু বর্তমানে এ চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। মিনিস্টার-মাইওয়ান গ্রুপের ব্র্যান্ড মার্কেটিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন প্রধান সোহেল কিবরিয়া বলেন, ‘গ্রাম বা মফস্বলের ক্রেতারা খোঁজেন দীর্ঘস্থায়ী ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্রিজ, যা বৈদ্যুতিক সমস্যায়ও ভালো পারফর্ম করে। আমাদের মোট বিক্রির প্রায় ৫৫-৬০ শতাংশ এখন ঢাকার বাইরে গ্রামাঞ্চলে। বিশেষ করে উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে বিক্রির হার দ্রুত বাড়ছে।’

দেশে মূলত তিন ধরনের ফ্রিজ বিক্রি হয়। এমডব্লিউবির গবেষণার তথ্য বলছে, ফ্রিজের বাজারের প্রায় ৮৫ শতাংশই দখল করে আছে ফ্রস্ট ফ্রিজ। আর বাকি ১৫ শতাংশ বাজার রয়েছে নন-ফ্রস্ট ও চেস্ট বা ডিপ ফ্রিজের। সামনে আসছে ঈদুল আজহা। এর সঙ্গে প্রবাহিত হচ্ছে তীব্র গরম আবহাওয়া। এ সময়ে সাধারণত ফ্রিজের বিক্রি অনেক বেশি বেড়ে যায়। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ক্রেতা টানতে দেশী-বিদেশী প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই মূল্যছাড়সহ ফ্রিজের বিভিন্ন অফার দিয়েছে। তাই এবার ফ্রিজ বিক্রি আরো বাড়বে বলে আশা খাতসংশ্লিষ্টদের।

দেশে রেফ্রিজারেটর উৎপাদনে প্রথম উদ্যোগ নেয় দেশীয় প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন। এরপর একে একে যমুনা, মিনিস্টার, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ভিশন, ট্রান্সকম, ইলেক্ট্রো মার্ট, ওরিয়ন ও র‍্যাংকন কারখানা স্থাপন করে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশে উৎপাদন শুরু করে বিদেশী ব্র্যান্ড স্যামসাং, সিঙ্গার, ওয়ার্লপুল, কনকাসহ আরো বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ড। এখন দেশী-বিদেশী অন্তত ১৩টি কোম্পানি ফ্রিজ উৎপাদন করে বাজারজাত করছে।

কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় খাবার সংরক্ষণ ও অনুজীব বৃদ্ধি রোধের ধারণা থেকে ফ্রিজের ব্যবহার শুরু হলেও এখন আরো ব্যাপ্তি বেড়েছে ফ্রিজের। গ্রাহকদের চাহিদাকে মাথায় রেখে ফ্রিজের ফিচারেও প্রযুক্তির নিত্যনতুন সংযোজন ও ভিন্নতা আনার চেষ্টা করছে ফ্রিজ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো। স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফ্রিজের তাপমাত্রা নির্ধারণ ও ত্রুটি শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে ফ্রিজে যোগ করতে দেখা গেছে স্মার্টফোন প্রযুক্তিও। এর মধ্যে অন্যতম ওয়ালটন। পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠানটি নতুন সাত মডেলের ফ্রিজ বাজারে এনেছে। এর মধ্যে তাদের স্মার্ট ফ্রিজে যোগ করা হয়েছে ২১ দশমিক ৫ ইঞ্চি অ্যান্ড্রয়েড ডিসপ্লে ও স্টেরিও সাউন্ড সিস্টেম। এতে গ্রাহকেরা অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনের প্রায় সব ফিচারই উপভোগ করতে পারবেন। সাধারণ ফ্রিজের চেয়ে এ ধরনের ফ্রিজের দামও বেশি। ফলে রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোয় আকর্ষণ বাড়ছে এসব ফ্রিজের। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকরা চাইলে তাদের ঘরের সাজের সঙ্গে মিল রেখে ফ্রিজের রংও বদলে নিতে পারেন। আবার প্রযুক্তির উৎকর্ষ ও পরিবর্তিত চাহিদার কারণে দেশের জেলা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বাড়ছে ফ্রিজের ব্যবহার। পুরনো ফ্রিজ বদলে নতুন কেনার প্রবণতাও বেড়েছে অনেক। সব মিলিয়ে আরো বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে পণ্যটির বাজার। তবে দেশে এসব পণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত করতে সরকার যেসব নীতিসহায়তা দিচ্ছে, সেটি আরো কয়েক বছর অব্যাহত রাখার দাবি খাতসংশ্লিষ্টদের। তাতে যেমন বিদেশী বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হবেন, তেমনি দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের বিনিয়োগ তুলতে সক্ষম হবে বলে দাবি করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বর্তমানে দেশে ফ্রিজের বাজার প্রায় ১২-১৩ হাজার কোটি টাকার। বাজারে পণ্যটির মডেল রয়েছে কয়েকশ। চাহিদার কথা বিবেচনায় তৈরি হচ্ছে এসব মডেল। বাংলাদেশ ইলেকট্রনিকস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বেমা) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ফ্রিজের ৯৫ শতাংশই দেশীয়ভাবে উৎপাদিত। এ খাতে বছরে বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩৫ লাখ ইউনিট, যার প্রায় পুরোটাই দেশীয় ব্র্যান্ডের।

দেশে ফ্রিজের বাজারের অন্যতম বড় অংশীদার ইলেক্ট্রো মার্ট গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ফ্রিজ রফতানির চেষ্টা করছে। প্রতিষ্ঠানটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল আফছার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফ্রিজ শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে সরকারের নীতিসহায়তা প্রয়োজন। যেকোনো দেশে তাদের পলিসি দীর্ঘ সময় ধরে অপরিবর্তিত থাকে। ফলে বিনিয়োগকারীরা ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। বিপরীতে আমাদের দেশে প্রায় প্রতি বছরই কিছু না কিছু পলিসি পরিবর্তন হয়। আমাদেরকে যে নীতিসহায়তা দেয়া হয়, সেটাও এক বছর মেয়াদে। পরের বছর কী হবে, সেটা আমরা জানি না। এখানে বিনিয়োগ করার পর সে বিনিয়োগ উঠে আসবে কিনা, এ নিয়ে সবসময় চিন্তিত থাকতে হয়। এসব না করে সরকার যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জানায়, তাহলে বিনিয়োগকারীদের ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়ে। ফলে কর্মসংস্থানও তৈরি হবে। আবার বৈদেশিক মুদ্রা আহরণেও বৈচিত্র্য বাড়বে।’

WhatsApp-Image-2025-05-19-at-3.53

ছবি: ওয়ালটন