বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও ব্যবহারযোগ্য পাবলিক টয়লেটের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। অন্যদিকে নেই পর্যাপ্ত গণশৌচাগার। নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ এবং গণপরিসরে চলাফেরার পরিসর বিস্তৃত হলেও তাদের জন্য উপযুক্ত পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা নেই। এ কারণে ঢাকার মতো জনবহুল নগরে নারী, পুরুষ, শিশু সবাইকেই নিত্য ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হলেও তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টিকে শুধু সরকারের দায়িত্ব বা সমাজসেবা হিসেবে বিবেচনা না করে একে বাণিজ্যিক কাঠামোয় আনতে পারলে একদিকে যেমন এক্ষেত্রে অনেকে বিনিয়োগ করবেন, আবার যৎসামান্য সেবামূল্যের মাধ্যমে নগরবাসী একটি অস্বস্তিকর সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, পাবলিক টয়লেট শুধু দৈনন্দিন প্রাকৃতিক চাহিদা পূরণের স্থান নয়, এখন সেগুলো আধুনিকতার পরিচায়ক ও আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইউরোপের অনেক দেশে পেইড টয়লেট ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি সংস্থা বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান টয়লেট আয় করছে। জার্মানি, ফ্রান্স এবং পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে টার্নস্টাইল ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মাধ্যমে পেইড টয়লেটের ব্যবস্থা রয়েছে। যুক্তরাজ্যে যদিও বেশির ভাগ পাবলিক টয়লেট বিনামূল্যে, তবে অনেক বাস ও রেলস্টেশনে পেইড টয়লেট রয়েছে।

রয়টার্সের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, আধুনিক টোকিওতে পাবলিক টয়লেট এখন আর শুধু প্রয়োজনীয় স্থান নয়, বরং এক ধরনের পর্যটক আকর্ষণের কেন্দ্র। বিশ্বব্যাপী পাবলিক টয়লেট ব্যবস্থায় বিভিন্ন আধুনিক অনুষঙ্গের সংযুক্তি ও অর্থায়নের দৃষ্টান্ত দেখায়, কীভাবে সাধারণ একটি স্থানও বিনিয়োগ, আয়, নগরসেবায় নতুন মাত্রা পেতে পারে। একই সঙ্গে আধুনিক পাবলিক টয়লেট নাগরিক ও পর্যটকদের জন্য একটি উন্নত অভিজ্ঞতা উপহার দেয়।

DSC08570

এ রকম পরিপ্রেক্ষিতে পাবলিক টয়লেট প্রকল্প বাংলাদেশে একটি টেকসই সামাজিক ব্যবসার মডেল হতে পারে, যা ব্যবহারকারীর সেবার পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক উদ্যোগ হিসেবে বিনিয়োগকারীরা গ্রহণ করতে পারবেন। বিভাগীয় শহর যেমন ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, রাজশাহী ও অধিকাংশ জেলা শহরে দৈনিক লাখো মানুষ পাবলিক টয়লেটের প্রয়োজন অনুভব করেন। কিন্তু বিদ্যমান পাবলিক টয়লেট পর্যাপ্ত নয় এবং বেশির ভাগই অরক্ষিত। ফলে নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের বিশেষ চাহিদা বিদ্যমান রয়েছে। পরিকল্পিত উদ্যোগ ও প্রযুক্তি ব্যবহারে এ খাত থেকে নগর সেবা ও আর্থিক উপার্জন দুই-ই সম্ভব।

পাবলিক টয়লেটের বাণিজ্যিক সম্ভাবনার ক্ষেত্রে কিছু বিষয়কে বিবেচনায় নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা—

বাজার ও চাহিদা বিশ্লেষণ

বিদ্যমান পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা, অবস্থা ও ব্যবহারের হার

জনসংখ্যার ঘনত্ব ও চলাচলের পরিসংখ্যান (যেমন বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, বাজার, পার্ক, অফিস এলাকা ইত্যাদি)

নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের জন্য পৃথক শৌচাগার

সিসি ক্যামেরা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব টয়লেট

হাত ধোয়ার ব্যবস্থা, স্যানিটাইজার ডিসপেনসার

সার্বক্ষণিক পরিচ্ছন্নতা কর্মীর মাধ্যমে টয়লেটের স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখা

নারীদের মাসিক চলাকালীন সময়ে স্যানেটারি প্যাড পরিবর্তন ও ব্রেস্ট ফিডিংয়ের ব্যবস্থা রাখা

টয়লেট ব্যবহারকারীদের ব্যাগ ও মালপত্র নিরাপদ হেফাজতের জন্য লকারের ব্যবস্থা থাকা

আয়ের ক্ষেত্র

গ্রাহক ফি: প্রত্যেক ব্যবহারকারীর কাছ থেকে যৎসামান্য ফি অর্থাৎ ৫-১০ টাকা ব্যবহার ফি ধরা হলে বড় নগরে প্রতিটি টয়লেট থেকে দৈনিক ২-১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় সম্ভব। দৈনিক হাজার হাজার ব্যবহারকারী টার্গেট করা সম্ভব যেখানে ট্রাফিক বেশি।

ব্র্যান্ডিং ও বিজ্ঞাপন: পাবলিক টয়লেটের ভেতর-বাইরে স্থানীয় ও জাতীয় ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের মাধ্যমে আয় করা সম্ভব। যেমন হাইজিন পণ্য, বেভারেজ কোম্পানি, মোবাইল অপারেটর ইত্যাদি।

ক্ষুদ্র বা মাঝারি উদ্যোক্তারা এ ধরনের বাণিজ্যিক পাবলিক টয়লেটের ধারণা নিয়ে কাজ করতে পারেন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া বড় কোম্পানি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো টয়লেট নির্মাণ বা রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগ করতে পারে ব্র্যান্ড ইমেজ গড়ার অংশ হিসেবে। এটি তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কার্যক্রমের অংশ হতে পারে।

পাবলিক টয়লেট বিষয়ে মাঠে কাজ করছেন এমন অনেকে মনে করেন পাবলিক টয়লেটকে সঠিক পরিকল্পনা ও অংশীদারত্বের ভিত্তিতে একটি টেকসই সামাজিক ব্যবসা মডেল হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এতে স্বাস্থ্য সুরক্ষা যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি উদ্যোক্তাদের জন্য আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।