একটি শহরের প্রাণ লুকিয়ে থাকে তার গণপরিসরে। আমরা যখন কল্পনা করি শহরের নকশা কেমন হবে, তখন শুধু ইতিহাসের কাঠামো গড়ি না, আমরা মানুষের জন্য স্বস্তি, নিরাপত্তা ও সংযোগের সুযোগ তৈরি করি। ধানমন্ডি লেক বা হাতিরঝিলের মতো প্রকল্পে আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক স্থানে নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত, নিরাপদ ও আকর্ষণীয় এক স্থান সৃষ্টি করা। কিন্তু এ একই দৃষ্টিভঙ্গিতে যে পরীক্ষা হওয়া উচিত ছিল শহরের সবচেয়ে উপেক্ষিত অথচ অপরিহার্য এক স্থাপনার পাবলিক টয়লেট। দুঃখজনকভাবে এ পরীক্ষায় আমাদের নগর প্রশাসকরা ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য-৬ (SDG Goal 6) অর্জনের জন্য সঠিক স্বাস্থ্যবিধি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভয়াবহ ব্যাপার হলো দুই কোটিরও বেশিসংখ্যক মানুষ এবং বিপুলসংখ্যক যাত্রীর শহরে ঢাকা উত্তর সিটির অধীনে (DNCC) অনুমোদিত ১২০টি এবং ঢাকা দক্ষিণের (DSCC) অধীনে ৭৫টিসহ মোট ১৯৫টি পাবলিক টয়লেট রয়েছে।

ঢাকার পাবলিক টয়লেট সংকট শুধু অপ্রতুল সংখ্যার সীমাবদ্ধতায় নয়, বরং পরিচ্ছন্নতার অভাব, স্থাপত্যিক দৃষ্টিভঙ্গির দুর্বলতা ও মানবিক সৃজনশীলতার অনুপস্থিতিতে বিদ্যমান। একজন স্থপতি হিসেবে আমি এটিকে দেখি একটি গভীর ‘নকশাগত দেউলিয়াত্ত্ব’ ও ‘মানবিক সৃজনশীলতার অনুপস্থিতি’ হিসেবে। আমাদের পাবলিক টয়লেটগুলো কেন অধিকাংশই বিশ্রী, অন্ধকার ও ভীতিকর কংক্রিটের বাক্স? এগুলোর নকশায় প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের খেয়াল রাখা হয় না, ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা, প্রতিবন্ধী ব্যবহারকারীর সহজগম্যতা কিংবা একজন মায়ের জন্য শিশুর ডায়াপার পরিবর্তনের মতো ন্যূনতম মানবিক সুযোগও ভাবা হয় না। ফলে এগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে এবং একসময় পরিত্যক্ত হয়। একটি স্থাপনা যখন তার ব্যবহারকারীকে স্বাগত জানাতে ব্যর্থ হয়, তখন বুঝি এর নকশার ভুল কোথায় লুকিয়ে আছে।

সম্ভাবনার কথা হলো পাবলিক টয়লেট হতে পারে একটি শহরের সৌন্দর্যের প্রতিফলন। আমাদের এ গৎবাঁধা ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে টয়লেটকে নান্দনিক নকশার অংশ হিসেবে ভাবা জরুরি। আমরা কি পারি না আধুনিক কোনো বাস স্টপেজের ভেতরেই একটি পরিচ্ছন্ন টয়লেট অন্তর্ভুক্ত করতে? টয়লেটের দেয়ালে একটি কবিতা কিংবা শিল্পকর্ম দিয়ে নান্দনিকভাবে টয়লেটটি সাজানো যেতে পারে। এমন স্থানটি সারাদিনই মানুষের চলাচলে মুখর থাকবে, যা স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

আমার সুপারিশ হলো পাবলিক টয়লেট নকশা করার জন্য একটি ‘ডিজাইন কম্পিটিশন’ বা ‘নকশা প্রতিযোগিতা’ আয়োজন করা হোক। দেশের মেধাবী ও প্রতিভাবান স্থপতিরা কম খরচে, পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করে কীভাবে সুন্দর, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক টয়লেটের মডেল তৈরি করা যায়, তার চমৎকার সব ধারণা নিয়ে আসবেন। এ নকশাগুলোয় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ফ্ল্যাশে ব্যবহার, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার, এমন উপকরণ নির্বাচন করা যেতে পারে, যা সহজে পরিষ্কার করা যায় ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

হাতিরঝিলের মতো প্রকল্পে আমরা দেখেছি সঠিক পরিকল্পনা ও নকশার মাধ্যমে একটি অবহেলিত জলাধারও শহরের প্রধান আকর্ষণ বানানো সম্ভব। তেমনি নগরবাসীর স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার চিন্তা থেকে সামাজিক প্রতিষ্ঠান ‘ভূমিজ’ একটি ব্যতিক্রমী ও উদ্ভাবনী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও রক্ষণাবেক্ষণযোগ্য টয়লেট ডিজাইনের মাধ্যমে ‘ভূমিজ’ শুধু স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন করছে না, বরং নারীদের জন্য নিরাপদ ও প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা নিশ্চিত করে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

গুলশান, মিরপুর, কল্যাণপুর, মহাখালী, আগারগাঁও, গাউছিয়া ও টিএসসি এলাকায়–ঢাকা কমিউনিটিকেন্দ্রিক বাসের কাজ এরই মধ্যে চলমান। পাশাপাশি ওয়াটারএইডের সহযোগিতায় মহাখালী বাস টার্মিনালে নারীদের জন্য ‘পিংক টয়লেট’ নির্মাণাধীন রয়েছে। এ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করলে ঢাকার পাবলিক টয়লেটগুলো আর লজ্জার প্রতীক থাকবে না, বরং হয়ে উঠবে নাগরিক স্বস্তি ও আমাদের উন্নত রুচির প্রতিচ্ছবি।