সাভারের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গত মাসে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন ঢাকার আগারগাঁওয়ের বাসিন্দা ফজিলাতুন্নেছা ইভা। পড়ালেখা শেষ করার পর এটি তার প্রথম চাকরি, যার কারণে কর্মজীবনে পদার্পণ নিয়ে আগ্রহটা একটু বেশিই ছিল। তবে এক মাস যেতে না যেতেই তার আনন্দে ভাটা পড়ে। শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে যান তিনি। ধরা পড়ে ইউরিনারি ইনফেকশন। নিজের বাসা থেকে কর্মস্থলের দূরত্ব বেশি হওয়ায় বাসে বেশখানিকটা সময় তাকে বসে থাকতে হতো। বাইরে চলাফেরার খাতিরে টয়লেটের ঘাটতির কারণে আগে নানা সময়ে ইভা প্রকৃতির চাপ আটকে রাখতেন। নিজের রেচন প্রক্রিয়ার ওপর চাপ দিতে দিতে একটা সময় আবিষ্কার করলেন তার ইউরিন ইনফেকশনের সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। প্রস্রাবে জ্বালাপোড়াসহ বারবার প্রস্রাবের বেগ পেতে থাকে তার। এ অবস্থায় একবার চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরবর্তী সময়ে কর্মস্থলের পাশেই বাসা নিতে হয় তাকে।
শুধু ইভাই নয়, এ রকম আরো ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয় ঢাকা শহরের চলাচল করা নারীদের। মাসিকের সময়টিতে এ ধরনের প্রতিবন্ধকতাগুলো আরো প্রবল আকার ধারণ করে। বাইরে চলাফেরা করার সময় বেশির ভাগ নারীই চাপ আটকে রাখতেন। অপরিচ্ছন্ন, পানি না থাকা ইত্যাদি বিড়ম্বনায় না পড়তে পাবলিক টয়লেট এড়িয়ে চলেন নারীরা। এভাবে দীর্ঘ সময় চেপে রাখা, বাইরে কিছু না খাওয়া, বিশেষ করে পানি পান না করার প্রবণতা দেখা দেয় নারীদের মধ্যে, যার কারণে অনেক নারীর ইউরিনারি ইনফেকশন ধরা পড়ে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের শতকরা ৮৫ ভাগ নারীর মাঝে এ সমস্যা দেখা যায়। ইউরিন ইনফেকশন হলো এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট রোগ, যা ইউটিআই বা মূত্রনালির সংক্রমণ। এ রোগের প্রধানতম লক্ষণ প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া ও ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ পেতে থাকা। এর কারণে নারীর প্রজনন ক্ষমতায়ও প্রভাব পড়ে। শুধু নারীরা নন, একই সমস্যার জন্য পুরুষরাও ভোগেন মূত্রনালিতে সংক্রমণসহ নানা ধরনের শারীরিক জটিলতায়।
বর্তমানে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতায় পাবলিক টয়লেট রয়েছে ১৯৫টি। তবে এর অনেকগুলো ব্যবহার অনুপযোগী। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনের তুলনায় ঢাকায় পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা যথেষ্ট নয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের দেশে পাবলিক টয়লেট সংকট তীব্র। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই। তবে এ সংকটে বেশি সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন নারীরা। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য পাবলিক টয়লেট একটি মৌলিক অধিকারের অংশ। এটি রাষ্ট্রের একটি জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো। কিন্তু এটিকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। হিসাব অনুযায়ী অতিঘনবসতি এলাকায় প্রতি ৪০০ মিটারে একটি করে পাবলিক টয়লেট থাকার কথা ছিল, কিন্তু সেটি হচ্ছে না। সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে অল্প কিছু পাবলিক টয়লেট হয়েছে। সেগুলোও পুরোপুরি ব্যবহারযোগ্য না। আবার কিছু পাবলিক টয়লেটে টাকা দিয়ে ঢুকতে হচ্ছে, যার কারণে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও ভাসমান মানুষ পাবলিক টয়লেট ব্যবহারে আগ্রহী থাকেন না। আমরা এ পাবলিক টয়লেটে ডিজাইন ও বিনিয়োগ নিয়ে চিন্তা করি না, যার কারণে নারীদের স্বাস্থ্যের ওপর তা বিরূপ প্রভাব ফেলছে।’
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ জনবহুল স্থান যেমন বাস স্ট্যান্ড, ট্রেন স্টেশন, শপিংমল, পার্কিং এরিয়াসহ যেসব স্থানে মানুষের বেশি প্রয়োজন, সেসব স্থানে পাবলিক টয়লেট সংখ্যা খুবই কম। আবার অনেক স্থানে টয়লেট থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো একেবারেই ব্যবহারের অনুপযোগী। এ কারণে যাত্রাপথে টয়লেটের প্রয়োজন হলে বেশি বিপদে পড়েন নারীরা। ঢাকার অভ্যন্তরে গাবতলী বাসস্ট্যান্ড, নাবিস্কো হাজী মরণ আলী রোড, তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ড, ফার্মগেট ইন্দিরা রোড, শ্যামলী পার্ক, মহাখালী ওয়াসার পানির পাম্প, মুক্তিযোদ্ধা ক্লাব ও গেটসংলগ্নসহ বেশ কয়েকটি স্থানে পাবলিক টয়লেট তৈরি করা হয়েছে, যার সব ব্যবহার উপযোগী নয়। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোয়ও নারী শিক্ষার্থীদের জন্য যে টয়লেটগুলো থাকে তার বেশির ভাগ ব্যবহার অনুপোযোগী।
ভুক্তভোগীরা জানান, অনেক স্থানে টয়লেট থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী। এ কারণে যাত্রাপথে টয়লেটের প্রয়োজন হলে বেশি বিপদে পড়েন নারীরা। ভুক্তভোগীরা জানান, নারীদের জন্য একটি টয়লেটে সবার আগে যা দরকার তা হলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অথচ দিন দিন তার অবনতি ঘটতে দেখা যাচ্ছে। এছাড়া টয়লেটে প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা থাকে না। মাসিকের সময় অতিরিক্ত কাপড়, তুলা, টিস্যু বা স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতে হয়। প্যাড পরিবর্তনে একটা গোপনীয় স্থান থাকা প্রয়োজন এবং ব্যবহৃত সামগ্রী ফেলার জন্য টয়লেটগুলোয় ঝুড়ি থাকা আবশ্যক। অনেক টয়লেটে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ থাকে না, যা আরো বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে নিয়ে যায় নারীদের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক বলেন, ‘বাসস্টেশন-রেলস্টেশন, মার্কেটসহ যেসব জায়গায় মানুষের যাতায়াত আছে, সেসব জায়গায় মানসম্মত পাবলিক টয়লেট থাকা একটি মৌলিক চাহিদা। কিন্তু আমাদের দেশে বিষয়টিকে গুরুত্বই দেয়া হয় না। বিশেষ করে মেয়েরা সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখোমুখি হয়। একদিকে মেয়েদের জন্য পাবলিক টয়লেট পর্যাপ্ত সংখ্যক নেই আবার যেগুলো আছে সেগুলোও ব্যবহার করার মতো অবস্থায় থাকে না। এগুলো নির্মাণের সময় বিবেচনা করা হয় না এটি একজন গর্ভবতী নারীর জন্য ব্যবহার উপযোগী কিনা এবং এগুলোর পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের অবস্থা এত খারাপ যে তা ব্যবহারে বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।’
কর্মজীবী নারী ছাড়াও নানা কারণে নারীদের ঘরের বাইরে যাওয়া লাগে। টয়লেট সমস্যার কারণে অনেক নারী বাইরে যেতে চান না। মাসিকের দিনগুলোয়ও সে সমস্যা আরো প্রকট আকার ধারণ করে। নগরায়ণের যুগে নারীদের এ স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।










