ঢাকা একটি মেগা সিটি। এখানে প্রায় দুই কোটির বেশি মানুষের বসবাস। একটি আধুনিক ও বসবাসযোগ্য নগরীর অন্যতম প্রধান সূচক হলো এর নাগরিকদের জন্য পর্যাপ্ত, স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা। কিন্তু এ মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি। ঢাকার পাবলিক টয়লেট সংকটকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি জনস্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং পরিবেশ সুরক্ষার মতো বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

আমাদের নগর পরিকল্পনায় দীর্ঘকাল ধরে পাবলিক টয়লেটের বিষয়টি অবহেলিত হয়ে আসছে। প্রয়োজনের তুলনায় টয়লেটের সংখ্যা নিতান্তই অপ্রতুল। যেগুলো আছে তার বেশির ভাগই অপরিচ্ছন্ন, ব্যবহার অনুপযোগী ও নিরাপত্তাহীন। এ অব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীরা। বিশেষ করে নারীদের জন্য এ সংকট এক অদৃশ্য শিকলের মতো। কর্মজীবী নারী, শিক্ষার্থী কিংবা সাধারণ প্রয়োজনে ঘরের বাইরে বের হওয়া যেকোনো নারীর জন্য একটি নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন টয়লেটের অভাব তার স্বাধীন চলাচলকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে বহু নারী বাইরে বের হলে পানি পানে বিরত থাকেন, যা তাদের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়। যে কারণে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই) এবং কিডনির সমস্যাসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এটি শুধু নারীর স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়, এটি নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণের পথেও একটি বড় অন্তরায়। একটি শহরে নারী কতটা স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করতে পারবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে সেখানকার পাবলিক টয়লেট ব্যবস্থার ওপর।

পরিবেশ ও পানিসম্পদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এ সংকট আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ঢাকার অধিকাংশ পাবলিক টয়লেটের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল। অনেক ক্ষেত্রেই পয়োবর্জ্য সরাসরি সিটি করপোরেশনের ড্রেন হয়ে নিকটস্থ খাল বা নদীতে গিয়ে পড়ছে, যা আমাদের জলাশয়গুলোকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। আমরা একদিকে বুড়িগঙ্গা ও ঢাকার খালগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য লড়াই করছি, অন্যদিকে অপরিকল্পিত স্যানিটেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত সেগুলোকে বিষাক্ত করে তুলছি। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় দেশের জলাধার রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত, কিন্তু পয়োবর্জ্যের এ অনিয়ন্ত্রিত প্রবাহ আমাদের সব প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে। একটি আধুনিক টয়লেট ব্যবস্থাপনায় পানিসাশ্রয়ী ফিটিংস, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং এবং পরিবেশবান্ধব বর্জ্য শোধনের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য, যা জলবায়ু সহনশীল নগরী গড়ার লক্ষ্যকেও সমর্থন করে।

এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও বহুস্তরীয় পদক্ষেপ। প্রথমেই প্রয়োজন একটি সামগ্রিক নগর-পরিকল্পনা, যেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব বিচার করে বাস টার্মিনাল, বাজার, পার্ক ও হাসপাতালের মতো জনবহুল স্থানগুলোয় পর্যাপ্তসংখ্যক পাবলিক টয়লেট নির্মাণ নিশ্চিত করা হবে। তবে শুধু সংখ্যা বাড়ালেই চলবে না, এ টয়লেটগুলোর নকশা হতে হবে আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। প্রতিটি টয়লেটে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে; যার মধ্যে নারীদের জন্য পৃথক ও নিরাপদ সেকশন, স্যানিটারি ন্যাপকিনের সুবিধা এবং সার্বক্ষণিক নারী অ্যাটেনডেন্টের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশগত দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে, প্রতিটি টয়লেটে পানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার এবং কার্যকর পয়োবর্জ্য শোধন ব্যবস্থা বা নিকটস্থ সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্টের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে হবে। এ ব্যাপারে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।

সঠিক পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অতীতে অনেক ভালো উদ্যোগ নষ্ট হয়েছে। তাই পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে পেশাদার ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের কাছে পরিচালনার ভার তুলে দেয়া একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। এর জন্য একটি টেকসই আর্থিক মডেল তৈরি করতে হবে এবং নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পরিশেষে নাগরিকদেরও এ ব্যবস্থাপনার অংশীদার হতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং টয়লেটের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে অভিযোগ ও মতামত জানানোর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে এ ব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী সুফল পাওয়া সম্ভব।