বাংলাদেশ খুবই ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এখানে ভ্রাম্যমাণ মানুষ অসংখ্য, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা শহরে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা শহরে কাজের প্রয়োজনে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ চলাচল করে। রাজধানী এবং এর বাইরে বিভিন্ন মহানগর, জেলা শহর, উপজেলা সদর এবং স্থানীয় প্রসিদ্ধ স্থানগুলোয় প্রতিদিনই লাখ লাখ মানুষ যাতায়াত করে। বিভিন্ন কাজের জন্য তাদেরকে সরকারি দপ্তর ও হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। অনেকে সকাল থেকে সন্ধ্যা-রাত অবধি বাইরে থাকেন। এভাবে দীর্ঘ সময় বাইরে থাকতে গিয়ে তাদের শৌচাগারে যাওয়ার প্রয়োজন পড়া খুবই স্বাভাবিক। এজন্য প্রতিদিন অতিপ্রয়োজনীয় কাজ সারতে অগণিত মানুষকে পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করতে হয়। সুতরাং বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট নিত্যপ্রয়োজনীয় ও অত্যাবশ্যক।
ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও ছোট-বড় হাট-বাজারে পাবলিক টয়লেট দেখা যেত। তবে বাংলাদেশে ঠিক কবে এর যাত্রা শুরু তার সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না।
২০০৫ সালে বাংলাদেশ সরকার পাবলিক টয়লেটের প্রয়োজনীয়তাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়। এটিকে জাতীয় স্যানিটেশন পলিসি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সিদ্ধান্ত হয় যে সিটি করপোরেশন বা পৌরসভাগুলোয় পাবলিক টয়লেট এবং কমিউনিটি ল্যাট্রিন স্থাপন করা হবে, এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া হবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে। পাবলিক টয়লেট পলিসির সঙ্গে এনজিও এবং বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করতে জোর দেয়া হয়। এটি বাস্তবায়নের জন্য সিটি করপোরেশনগুলো একটি গাইডলাইন তৈরিতে প্রোগ্রামের আয়োজন করে।
পরে ঢাকা সিটি করপোরেশন অধ্যাদেশ ১৯৮৩-এর আওতায় ঢাকায় পাবলিক টয়লেট স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এখানে নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা টয়লেটের ব্যবস্থা করা হয়। তবে ঢাকায় স্থাপিত টয়লেটের সংখ্যা মোটেই পর্যাপ্ত নয়। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হলো পরিবেশ খুবই নোংরা। মানুষ এগুলো ব্যবহার করতে আগ্রহ দেখায় না, বিশেষত নারীদের জন্য এ টয়লেটগুলো মোটেই উপযুক্ত ছিল না।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দ্বিতীয় আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার প্রজেক্টের আওতায় ঢাকা সিটি করপোরেশন ৩৬টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করে। এর উদ্দেশ্য ছিল উন্নত জনসেবা দেয়া। ইজারা দেয়ার মাধ্যমে এ প্রজেক্টে এনজিওকে যুক্ত করা হয়। সেই ধাপের ৩৬টি টয়লেটের অনেকগুলো এখনো টিকে আছে।
ঢাকা সিটির বিশাল জনসংখ্যার জন্য এ স্বল্পসংখ্যক টয়লেট খুবই অপর্যাপ্ত ছিল। পরে ঢাকা সিটি করপোরেশন আরো কিছু উদ্যোগ নেয় এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাছে জমি চাওয়া হয়। তখন রাজউকের সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজ কমিশন ২০০৭ সালে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এখানে ঢাকার টয়লেটগুলোর অবস্থানকে চিহ্নিত করে ম্যাপ ও তালিকা করা হয়। বিদ্যমান টয়লেটগুলোর ওপর দ্রুত জরিপ ও মূল্যায়ন করা হয়। এরপর এগুলো পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার জন্য একটি খরচের খসড়া করা হয়। জরিপে পাবলিক টয়লেট উদ্যোগটি পরিপূর্ণ করার প্রধান ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা হয়। এরপর জরিপটি ২০০৭ সালেই প্রকাশ করা হয়। কিন্তু পরে সিটি করপোরেশন ও রাজউক এ জরিপকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয়নি।

পাবলিক টয়লেটের অভাবে ঢাকার ফুটপাতে দেখা যায় এমন দৃশ্য ছবি: তাওহীদুজ্জামান তপু
এ সময় বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে উন্নত পাবলিক টয়লেট সেবা চালুর চেষ্টা করা হয়। বেসরকারি সংস্থা ওয়াটারএইড বাংলাদেশ ঢাকা ও প্রধান শহরগুলোয় যথাযথ নিয়ম মেনে পাবলিক টয়লেট সেবার মান বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে। ২০০৫ সালে বিশেষ কর্মসূচি হাতে নেয়। বিভিন্ন স্থানে পাবলিক টয়লেট মানসম্পন্ন করার জন্য সংস্থাটি ২০০৬ সালে গাইডলাইন তৈরি করে। পরে ২০১০ সালে পাবলিক টয়লেটের ওপর একটি মূল্যায়ন প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়। এতে ১৬৪টি পাবলিক টয়লেট চার ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়। এগুলো হলো এক. ঢাকা সিটি করপোরেশনের ভাড়ায় দেয়া উন্মুক্ত টয়লেট, দুই. বিপণি-বিতানগুলোর পাবলিক টয়লেট, তিন. সংরক্ষিত প্রবেশাধিকারের পাবলিক টয়লেট যেমন: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, প্রেক্ষাগৃহ, হাসপাতাল ও ফিলিং স্টেশন ইত্যাদি। চার. বিশেষ উৎসব উপলক্ষে নির্মিত পাবলিক টয়লেট, যেমন সাময়িক ভ্রাম্যমাণ টয়লেট। জরিপে দেখা যায়, ঢাকায় ৬৯টি উন্মুক্ত প্রবেশাধিকারযুক্ত পাবলিক টয়লেট ছিল, যার ৫২ শতাংশ ইউপিসিএইচপি প্রকল্পের আওতায় বানানো। ৬৯টির মধ্যে ১০টি টয়লেট সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত। ফুটপাতের কারণে দুটি ব্যবহারযোগ্য নয়। বাকি ৫৭টির মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ টয়লেট সচল, বেশির ভাগ আংশিক; ৯২ শতাংশ খুবই খারাপ অবস্থায় ছিল। আরো সীমাবদ্ধতা হলো এগুলোর মধ্যে নারী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য কোনো ব্যবস্থা ছিল না। পর্যাপ্ত আলো ও পানির ব্যবস্থা নেই। এ কারণে ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তারও অভাব ছিল।
বেশির ভাগ টয়লেট পানি বিক্রি, যানবাহন ধোয়াসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হতো। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ঢাকা সিটি করপোরেশনের অর্ধেক টয়লেট নিয়ে মামলা চলমান ছিল।
এ জরিপ থেকে পাওয়া তথ্য ও গবেষণার ফলাফলে ঢাকায় পাবলিক টয়লেট উন্নত করার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়। ওয়াটারএইড ২০১৩ সালের অক্টোবরে ‘সানরাইজ’ নামে ওয়াটার পাবলিক টয়লেট নিয়ে একটি প্রকল্প শুরু করে। এর আর্থিক জোগান দেয় এইচঅ্যান্ডএম ফাউন্ডেশন। প্রকল্পের আওতায় পাবলিট টয়লেটে নারীদের সুবিধা বৃদ্ধি, ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যসম্মত করার প্রতি জোর দেয়া হয়। পরে ২০২০ সালে কিম্বার্লি ক্লার্ক করপোরেশনের এর সহযোগিতায় সিটি করপোরেশন এলাকায় এ সেবা আরো বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়। সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে আটটিরও বেশি টয়লেট নির্মাণ করা হয়। সেখানে নান্দনিক মডেল, উন্নত মান ও স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। নারীদের জন্য আলাদা চেম্বার এবং প্রতিবন্ধীদের জন্যও সুব্যবস্থা রাখা হয়।
২০১৮ সালের আগস্টে পাবলিক টয়লেট সেবায় আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়। সে বছরের ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ঘরমুখী মানুষের যাত্রাপথে গণশৌচাগার বা পাবলিক টয়লেট খুঁজে পেতে স্মার্টফোনভিত্তিক একটি অ্যাপস চালু করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়াটারএইড বাংলাদেশ। অ্যাপস ব্যবহারকারীর জিপিএসের অবস্থান অথবা সরাসরি অনুসন্ধানের মাধ্যমে পাবলিক টয়লেটের অবস্থান ও সুযোগ-সুবিধা সংক্রান্ত তথ্য জানার সুবিধা যুক্ত করা হয়। সে সময় ওয়াটারএইডের পক্ষ থেকে বলা হয়, তখন পর্যন্ত ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনায় সংস্থাটির সহযোগিতায় নির্মিত আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ২৮টি পাবলিক টয়লেট রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সবার জন্য শৌচাগার ব্যবহার সহজলভ্য ও সুগম করতেই তারা ওই অ্যাপস তৈরি করে।
দেশে দিনদিন জনসংখ্যা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে নাগরিক সেবাও বাড়ছে, আধুনিক হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে পাবলিক টয়লেট সুবিধার কিছুটা অগগ্রতি হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। পাবলিক টয়লেটের সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নোংরা পাবলিক টয়লেটের কারণে ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন রোগব্যাধি হতে পারে। তাই নাগরিকদের প্রত্যাশা, উপযুক্ত স্থানগুলোয় পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা যেমন জরুরি, একই সঙ্গে এগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা, নিরাপত্তা ও সার্বক্ষণিক ব্যবস্থাপনাও জরুরি।










