রাজধানী ঢাকার জনবহুল স্থানে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও সহজগম্য পাবলিক টয়লেটের অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানে বেসরকারি সংস্থা ওয়াটারএইডের সহায়তায় এবং দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও ভূমিজর পরিচালনায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও আরো কয়েকটি শহরে বেশকিছু আধুনিক পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা হয়েছে। এ পাবলিক টয়লেটগুলো নগরবাসীকে স্বস্তিদায়ক ও স্বাস্থ্যসম্মত সেবা দিচ্ছে। এ টয়লেটগুলো বিশেষত নারী, শিশু ও পঙ্গু কিংবা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করছে।
এসব টয়লেটে ব্যবহারকারীরা পরিচ্ছন্ন ও সুরক্ষিত পরিবেশ পান। পরিচ্ছন্নতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পেশাদার পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং নারী কেয়ারটেকার নিয়োগ করা হয়েছে। নিরাপত্তা জোরদারে শৌচাগারের বাইরের প্রতিটি কোণে সিসিটিভি ক্যামেরা। আছে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, যা যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে ও ব্যবহারকারীদের মনে আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
এছাড়া এ পাবলিক টয়লেটগুলোয় হাত ধোয়ার জন্য বেসিন, লিকুইড সোপ এবং বিশুদ্ধ খাবার পানির সুবিধা রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। আছে গোসলের ব্যবস্থাও। ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র নিরাপদে রাখার জন্য লকার সুবিধা আছে। এটি ভ্রমণের সময় বা বিভিন্ন কাজে দরকারি জিনিসপত্র হাতে থাকা মানুষের জন্য অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য র্যাম্প এবং গ্র্যাব বারের মতো বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে হুইলচেয়ারে থাকা মানুষও সহজে টয়লেট ব্যবহার করতে পারেন।
এ জনবান্ধব ও আধুনিক পাবলিক টয়লেট স্থাপন এবং ব্যবস্থাপনা একটি বহুমুখী অংশীদারত্বের ফলাফল। এতে প্রধান ভূমিকা পালন করছে আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াটারএইড এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এগুলো পরিচালনায় যুক্ত হয়েছে বেসরকারি সংস্থা দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে) ও ভূমিজ।
এ প্রকল্পে ওয়াটারএইড নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে কারিগরি সহায়তা, প্রয়োজনীয় আর্থিক অনুদান এবং সার্বিক পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করছে। তাদের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান এই শৌচাগারগুলোর মানোন্নয়ন ও আদর্শ পরিবেশ নিশ্চিতে প্রধান ভূমিকা রাখছে।
প্রকল্পের মূল অংশীদার হিসেবে ঢাকার সিটি করপোরেশন প্রয়োজনীয় জমি বরাদ্দ, নির্মাণকাজের জন্য অনুমতি প্রদান এবং নগর পরিকল্পনার সঙ্গে এর সুষ্ঠু সমন্বয় নিশ্চিত করছে। অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবায়ন এবং কমিউনিটি সম্পৃক্ততার মূল দায়িত্বে রয়েছে বেসরকারি সংস্থা দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে) এবং ভূমিজ। এই দুটি সংস্থা পাবলিক টয়লেটগুলোর দৈনন্দিন পরিচালনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং কর্মীদের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছে।

ছবি: ওয়াটারএইড
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ওয়াটারএইড এখন পর্যন্ত ৪৮টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ বা সংস্কার করেছে। এর মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ওয়াটারএইড পার্টনার অর্গানাইজেশন ৩০টি টয়লেট পরিচালনা করছে। বাকি ১৮টি চুক্তি মোতাবেক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত প্রবেশমুখ গাবতলী বাস টার্মিনালে দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রের পরিচালনায় একটি পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা হয়েছে। এতে সহযোগিতা করছে ওয়াটারএইড। সরেজমিন দেখা যায়, টার্মিনালে ঢুকতেই কাচ দিয়ে ঘেরা এ টয়লেট দূর থেকে পরিচ্ছন্ন পরিবেশের জানান দিচ্ছে। আশপাশে ভবঘুরেদের আনাগোনা থাকলেও টয়লেটের ভেতরের পরিবেশ অত্যন্ত পরিপাটি। কয়েকজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর তৎপরতা চোখে পড়ার মতো; একজন ব্যবহারকারী বের হওয়ার পর পরই তারা দ্রুত সংশ্লিষ্ট চেম্বার ও পুরো স্থান ধুয়েমুছে সাফ-সুতরো করে রাখছেন। এ টয়লেটের একজন ব্যবহারকারী আবু সাইদ। পেশায় তিনি পরিবহন কর্মী। তিনি জানান, টার্মিনালে আরো তিনটি টয়লেট থাকলেও সেগুলোর নোংরা পরিবেশের কারণে তিনি নিয়মিত এখানে আসেন এবং গোসলসহ প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারেন।

ছবি: ওয়াটারএইড
অন্যদিকে ফরিদপুর থেকে আসা একজন শিক্ষিকা টয়লেট ব্যবহারের অভিজ্ঞতায় সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এখানে নারী কর্মীরা রয়েছেন, যারা স্থানটি সাফ-সুতরো করে রাখেন। অন্যান্য সাধারণ পাবলিক টয়লেটের আশপাশে পুরুষের আধিক্য থাকে, তাই নারীরা অনেক সময় সেগুলো ব্যবহারে সংকোচ বোধ করেন। কিন্তু এখানে নিজেকে নিরাপদ মনে হয়।
গাবতলীর এ টয়লেটে একজন পুরুষ ও চারজন নারী কর্মীসহ মোট পাঁচজন কর্মী ২৪ ঘণ্টা রক্ষণাবেক্ষণ ও সেবা প্রদান করছেন। গাবতলীর পাবলিক টয়লেটের একজন কর্মীর তথ্যানুযায়ী, ছুটির দিন বাদে প্রতিদিন প্রায় ৮০০-১০০০ জন এ টয়লেট ব্যবহার করেন, যার মধ্যে প্রায় ১০০ জন নারী। গরমকালে ব্যবহারকারীর সংখ্যা কিছুটা কম থাকে। মাঝে মাঝে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিংবা শারীরিকভাবে বিভিন্ন সমস্যায় থাকা ব্যক্তিরাও এখানে আসেন। টয়লেটের অভিযোগ বইয়ে কোনো অভিযোগ না পেলেও একাধিক ব্যবহারকারীর প্রশংসাসূচক মন্তব্য পাওয়া যায়। এসব টয়লেট ব্যবহারে নামমাত্র ফি দিতে হয়—৫-১০ টাকা।
পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য এখানে সরাসরি বাথরুমে যাওয়ার র্যাম্প এবং বিশেষ বাথরুমের ব্যবস্থাও রয়েছে। গোসলের সুবিধাসহ এখানে লকার ও পানযোগ্য বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা রয়েছে। নারীদের জন্য রয়েছে স্যানিটারি ন্যাপকিন ও তা বদলানোর জন্য স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ। এ ব্যবস্থা কর্মক্ষেত্রে সক্রিয় নারীদের জন্য বিরাট স্বস্তি বয়ে এনেছে।
ওয়াটারএইডের সহায়তায় শুধু গাবতলী নয়, ফার্মগেট, ওসমানী উদ্যান, মিরপুর-১২, গুলশান-২-এর মতো ঢাকার আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত স্থানে আধুনিক পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা হয়েছে। সরজমিনে দেখা গেছে, এসব টয়লেটের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন এবং সার্বক্ষণিক পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। তবে গাবতলীর মতো ২৪ ঘণ্টা নয়, এ টয়লেটগুলো দৈনিক ১৬ ঘণ্টা খোলা থাকে।
বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় যে ওয়াটারএইডের সহায়তায় পরিচালিত এসব টয়লেটে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর বেশির ভাগই নারী। এটি নারীদের জন্য শৌচাগার ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সংকোচহীন পরিবেশ নিশ্চিত করছে। নারী ব্যবহারকারীরা কোনো দ্বিধা ছাড়াই এসব পবলিক টয়লেট ব্যবহার করতে পারছেন, যা তাদের বাইরের কাজকর্মে সুবিধা দিচ্ছে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিচ্ছে।
মিরপুর-১২ নম্বরে অবস্থিত পাবলিক টয়লেটে পাঁচজন নারী কর্মী কাজ করছেন। সেখানকার একজন কর্মী শ্যামলা মণ্ডল জানান, তারা সার্বক্ষণিক পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখেন। ব্যবহারকারীদের জন্য লকার সুবিধা রয়েছে বলেও জানান তিনি। শ্যামলা আরো বলেন, ‘প্রতিদিন প্রায় ৩০০-৪০০ মানুষ এ শৌচাগার ব্যবহার করেন। অভিযোগের খাতা থাকলেও সেখানে অভিযোগের বদলে প্রশংসাসূচক মন্তব্য লেখা রয়েছে।’ আরাফাত নাজমুল নামের একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘খুবই ভালো লাগল। বাংলাদেশের পাবলিক টয়লেট এত নিট অ্যান্ড ক্লিন চিন্তাই করা যায় না। এ মহান উদ্যোগের জন্য মন থেকে দোয়া থাকল। এখানে গোসল, খাবার পানি ও লকারের সুবিধা রয়েছে।’
গুলশান-২ ও ফার্মগেটে অবস্থিত টয়লেটগুলোর চিত্রও প্রায় একই রকম। ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতায় কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে আপসহীন। এখানকার কর্মীরা জানান, ব্যবহারকারীর সংখ্যা আবহাওয়া ও দিনের সময়ের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়।
গুলশান-২-এর কর্মী মরিয়ম জানান, তাদের টয়লেট দিনে ২০০ জন ব্যবহার করেন, যার মধ্যে ২০-৩০ জন নারী। তিনি আরো উল্লেখ করেন যে টাকা দিয়ে যারা টয়লেট ব্যবহারের সামর্থ্য নেই (বিশেষত ভাসমান মানুষ), তাদের অনেককেও আমরা এটা ব্যবহার করার সুযোগ দিয়ে থাকি। এখানে লকার ও খাবার পানির সুবিধা রয়েছে।
ওয়াটারএইড এবং দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও ভূমিজর এ যৌথ উদ্যোগ শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং এটি জনস্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পাবলিক টয়লেটের সহজলভ্যতা ঢাকার মতো ব্যস্ত শহরে নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলছে। বিশেষ করে নারী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য নিরাপদ স্থান নিশ্চিত হওয়ায় তাদের চলাচল ও সামাজিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগ দেশের স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে একটি মডেল হিসেবে কাজ করছে।





