দেশের পার্সোনাল কেয়ার ব্র্যান্ডগুলো নব্বই দশক থেকে মূলত জনপ্রিয় হতে থাকে রঙিন টেলিভিশন জনপ্রিয় হওয়ার পর থেকে। দাম কমে আসার ফলে তখন থেকেই রঙিন টেলিভিশন ব্যবহার শুরু হয় সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের মাঝে আর তাতে রঙবেরঙের বিজ্ঞাপন দেখে মানুষ বিদেশী ব্র্যান্ডের পাশাপাশি দেশী অসংখ্য ব্র্যান্ডের সঙ্গে পরিচিত হয়। তবে আমাদের দেশী পার্সোনাল কেয়ার ব্র্যান্ডগুলোর ইতিহাস আরো পুরনো। স্যান্ডালিনা, ফাস্টওয়াশ, আইসকুল, তিব্বত ইত্যাদি বহুল জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের সাবান, ট্যালকম পাউডার ও হাইজিন পণ্যের উৎপাদক কোহিনূর কেমিক্যাল কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড, যারা মহীরুহের মতো বাংলাদেশের সর্বস্তরে আনাচ-কানাচে নিজেদের শেকড় বিস্তৃত করে চলেছে। ১৯৫৬ সাল থেকে বাংলাদেশের কসমেটিকস, টয়লেট্রিজ, সাবান ও সুগন্ধি প্রস্তুতকারীদের মধ্যে অন্যতম স্থান দখল করে আছে কোহিনূর কেমিক্যাল কোম্পানি। সবসময়ই বিশ্বমানের এবং আকর্ষণীয় পণ্য উপহার দেয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ বাজারে তাদের সুনাম অক্ষুণ্ন রয়েছে এবং বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে তাদের ব্র্যান্ড শ্রেষ্ঠ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।
একজন পাকিস্তানি উদ্যোক্তার হাত ধরে কোহিনূর শিল্প গোষ্ঠীর সূচনা হয়। ১৯৫৬ সালে প্রথম তারা তিব্বত স্নোর উৎপাদন শুরু করে। এর ক্রমধারায় অন্যান্য পরিচিত ব্র্যান্ড যেমন তিব্বত পমেড, তিব্বত ৫৭০ লন্ড্রি সোপ, তিব্বত বল সাবান, তিব্বত কদুর তেল ইত্যাদির যাত্রা শুরু হয়। কোম্পানিটি ১৯৫৯ সালে নিবন্ধিত ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত হয়। কোহিনূর গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (কেজিআই) ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে দুই ভাগে বিভক্ত ছিল—কোহিনূর কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (১৯৫৯) এবং কোহিনূর ব্যাটারি ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেড (১৯৬৪)।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালে কোহিনূর কেমিক্যাল বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার, কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) কোহিনূর কেমিক্যাল পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। বর্তমান কার্যকর ও ব্যবস্থাপনা পরিষদ ১৯৯৩ সালে কোম্পানির দায়িত্ব গ্রহণ করে সফলভাবে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে আসছে। কোম্পানিটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্ত রয়েছে।
‘মানে-গুণে শ্রেষ্ঠ’—এটিই কোহিনুর কেমিক্যালের মূলমন্ত্র। যখন মানের ক্ষেত্রে আপসহীন থাকা যায়, তখন কোনো বাধা ছাড়াই ব্র্যান্ড আনুগত্য অর্জন করা যায়। আর এটিই কোহিনূরের মূল শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন কোম্পানির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অব ব্র্যান্ড মো. গোলাম কিবরিয়া সরকার।
ভোক্তাদের চাহিদা মাথায় রেখে এবং সর্বোচ্চ বিশ্বস্ততার সঙ্গে কোহিনূর কেমিক্যাল বিভিন্ন পণ্য বাজারজাত করে থাকে। প্রসিদ্ধ ও ঐতিহাসিক ব্র্যান্ড হিসেবে"‘তিব্বত’ সুপরিচিত। এছাড়া অন্যান্য সুপ্রসিদ্ধ ব্র্যান্ডের মধ্যে স্যান্ডালিনা, ফাস্ট ওয়াশ, ব্যাকট্রল, আইসকুল ও টাইফুন উল্লেখযোগ্য। এর পাশাপাশি বর্তমান বাজারে আরো কিছু ব্র্যান্ড যেমন জেনস্টার, এএমপিএম, ফ্রুটি, এক্সপার্ট, বিউটিনা ও ক্লিনমাস্টার কোহিনূরের জনপ্রিয়তার দাবিদার। বাজারে কোহিনূরের মোট ব্র্যান্ড সংখ্যা ১৩ ও মোট পণ্যসংখ্যা ৭৬। তাদের কারখানাও এত ভিন্ন ভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন ইউনিটে বিভক্ত। উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন ইউনিট ও সেখানে উৎপাদিত পণ্যের কিছু ব্র্যান্ড সম্পর্কে এখানে ধারণা দেয়া হলো।
সোপ সেকশন
এ ইউনিটে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বাথ সোপ, হেলথ কেয়ার সোপসহ ওয়াশিং সোপ প্রস্তুত করা হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশের বাজারে স্যান্ডালিনা সোপ সবচেয়ে বড় স্থান দখল করে আছে। অন্যান্য জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের মধ্যে রয়েছে তিব্বত লাক্সারি সোপ, ব্যাকট্রল ফ্যামিলি হেলথ সোপ, তিব্বত ৫৭০ সোপ, তিব্বত বল সোপ, তিব্বত লন্ড্রি সোপ ইত্যাদি।
কসমেটিকস সেকশন
এ ইউনিটে স্কিন কেয়ার, হেয়ার কেয়ার, ওরাল কেয়ার, হেলথকেয়ার, মেনস প্রডাক্ট, সুগন্ধি, হাউজ হোল্ড, বেবি কেয়ারের বিভিন্ন পণ্য প্রস্তুত করা হয়। এ ইউনিটে উৎপাদিত তিব্বত পমেড ও তিব্বত স্নো প্রায় অর্ধশত বছর ধরে একক নাম হিসেবে ঐতিহ্যগতভাবে ঘরে ঘরে বহুল সমাদৃত। এছাড়া অন্যান্য পণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: এএমপিএম হারবাল টুথপেস্ট, তিব্বত লেদার শেভিং ক্রিম, জেনস্টার শেভিং ক্রিম, তিব্বত লিপজেল, তিব্বত পেট্রোলিয়াম জেলি, ফ্রুটি লিপ বাম, তিব্বত কদুর তেল, তিব্বত লাক্সারি ট্যালকম পাউডার, ব্যাকট্রল হ্যান্ডওয়াশ, তিব্বত চন্দন আতর, বিউটিনা বডি লোশন, বিউটিনা হেয়ার অয়েল, বিউটিনা ফেস ওয়াশ ইত্যাদি।
ডিটারজেন্ট সেকশন
গুণগত মানসম্পন্ন ও সাশ্রয়ী তিব্বত ডিটারজেন্ট পাউডার দেশব্যাপী জনপ্রিয় একটি পণ্য। এছাড়া এ ইউনিটে ফাস্ট ওয়াশ ডিটারজেন্ট পাউডার প্রস্তুত করা হয়, যা বর্তমান বাজারে ভোক্তাদের কাছে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। পাশাপাশি প্রিমিয়াম ডিটারজেন্ট ক্যাটাগরিতে নতুন নাম ‘টাইফুন ফেব্রিক কেয়ার’, যা কোহিনূর কেমিক্যালের নতুন সংযোজন।
হাউজহোল্ড সেকশন
এ ইউনিটের জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলো হলো ক্লিনমাস্টার, ওয়াইপার, এক্সপার্ট ইত্যাদি, যা বাংলাদেশের ঘরে ঘরে বহুল ব্যবহৃত হয়।
কোয়ালিটি কন্ট্রোল সেকশন
কোয়ালিটি কন্ট্রোল সেকশনে মূলত সর্বাধুনিক মানসম্পন্ন যন্ত্রপাতি রয়েছে, যা দ্বারা বিভিন্ন কাঁচামাল, পণ্যের গুণগত মান ও গুণাগুণ পরীক্ষা করা হয়। এর আরো গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো পূর্বপ্রস্তুতিমূলক গবেষণা, উৎপাদন পর্যবেক্ষণ, নতুন পণ্যের উৎপাদনসংক্রান্ত গবেষণা ও পুরনো পণ্যের মানোন্নয়ন।
বর্তমান সময়ে টয়লেট্রিজ, ডিটারজেন্টসহ হাউজহোল্ড পণ্যের চাহিদা অনেক বেশি। মহামারীর পর থেকে দেশের মানুষ হয়ে উঠেছে আরো বেশি স্বাস্থ্যসচেতন। আমদানি করা বা বহুজাতিক পণ্যের সঙ্গে এদিক থেকে দেশী কোহিনূর কেমিক্যালের পণ্যের দাম তুলনামূলক কম। পাশাপাশি গুণগত মানের দিক থেকেও তারা আন্তর্জাতিক মান রক্ষা করে বাজারে পণ্য সরবরাহ করছে। কোহিনূর কেমিক্যাল সবসময়ই বিএসটিআইসহ দেশের সংশ্লিষ্ট সব মান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানের নিয়ম-নীতি অনুসরণ করে গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে অঙ্গীকারবদ্ধ। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে কোহিনূরের সব পণ্য একই মান নিশ্চিত করে যাচ্ছে। ফলে গত ৬৮ বছর কোম্পানিটি দেশের ভোক্তার মাঝে আস্থা ও ভালোবাসার জায়গা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
কোহিনূরের দেশে তৈরি পণ্যের অল্প কিছু বর্তমানে রফতানি হচ্ছে সার্কভুক্ত দেশগুলোসহ মধ্যপ্রাচ্যে। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ডলারের মূল্য বাড়ায় রফতানি বাজারে কিছুটা ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা শিগগিরই উত্তরণের বিষয়ে আশাবাদী কোহিনূর কর্তৃপক্ষ।
অদূরভবিষ্যতে ক্রমাগত সম্প্রসারণশীল বাজার ও ভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী লিকুইড ডিটারজেন্ট, লিকুইড বাথ সোপসহ পারসোনাল কেয়ার মার্কেটে নতুন মানসম্মত পণ্যের সমাবেশ ঘটানো এবং তা দেশীয় পণ্যের তালিকায় সাধারণ ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে বাজারজাত নিশ্চিত করাই কোহিনূরের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন তারা।










