দেশের ওষুধ রফতানিকারক কোম্পানিগুলোর মধ্যে বর্তমানে শীর্ষে রয়েছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে উন্নত ও আধুনিক ওষুধ সরবরাহ করা প্রতিষ্ঠানটি ‘বেক্সিমকো ফার্মা’ নামেই সমধিক পরিচিত। বেক্সিমকো বর্তমানে দেশের নেতৃস্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক। ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কোম্পানিটি শুরুর দিকে জার্মানির বেয়ার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আপজন ব্র্যান্ডের পণ্য আমদানি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করার মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ১৯৮০ সালে বেক্সিমকো ফার্মা লাইসেন্সিং ব্যবস্থার অধীনে (আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের দেশে উৎপাদনের অনুমতি গ্রহণ) উল্লিখিত ব্র্যান্ডের পণ্যগুলো দেশেই উৎপাদন শুরু করে এবং ১৯৮৩ সালে কোম্পানিটি তার নিজস্ব উৎপাদিত ব্র্যান্ড চালু করে। ছোট কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপ দিয়ে শুরু করার পর থেকে এত বছরের পথচলায় বেক্সিমকো ফার্মা বর্তমানে শক্তিশালী এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বেক্সিমকো দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের নামকরা একটি জেনেরিক ফার্মা কোম্পানি হিসেবে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
বেক্সিমকোর প্রধান উৎপাদন সাইটটি রাজধানী ঢাকার কাছে গাজীপুরের টঙ্গীতে প্রায় ২৩ একরের বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। সাইটটিতে ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, ইনজেকশনে ব্যবহারযোগ্য তরল, সেবনযোগ্য তরল ওষুধ, ক্রিম, মলম, সাপোজিটরি, মিটারড ডোজ ইনহেলার, সিরিঞ্জ, নেবুলাইজার সলিউশন, ইনসুলিন, ড্রাই পাউডার ইনহেলার, ছোট আকারের API ইউনিট, চোখের ড্রপস, বড় আয়তনের প্যারেন্টেরাল, চোখে ব্যবহারযোগ্য জীবাণুমুক্তকরণ সলিউশন, প্রিফিলড সিরিঞ্জ, লায়োফিলাইজড ইনজেক্টেবল ইত্যাদি তৈরির সুবিধা রয়েছে। সম্পূর্ণ ফ্যাসিলিটিতে ব্যবহারযোগ্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করার জন্য পানি বিশুদ্ধকরণ, পরিবেশ রক্ষায় বর্জ্য বিশুদ্ধকরণ এবং তরল নাইট্রোজেন ও বাষ্প উৎপাদনের প্লান্টের পাশাপাশি ১৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পর্যাপ্ত বিতরণ সক্ষমতাবিশিষ্ট নিজস্ব অবকাঠামো রয়েছে এখানে। জিএমপির (গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাক্টিস) সব নির্দেশ বজায় রেখে উপকরণ এবং উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ করার জন্য ১ লাখ ২৫ হাজার বর্গফুট আয়তনের পাঁচ স্তরবিশিষ্ট বিশাল গুদামও রয়েছে এখানে।
এছাড়া বেক্সিমকোর পেনিসিলিন ইউনিট মূল সাইট থেকে ২১ কিলোমিটার দূরে কালিয়াকৈরে আলাদাভাবে অবস্থিত। কালিয়াকৈর প্লান্টে ফর্মুলেশন এবং সক্রিয় ফার্মাসিউটিক্যাল উপাদান (এপিআই) উভয়ই বিদ্যমান। জিএমপির নীতিমালা মেনে এ সাইটে পেনিসিলিন উৎপাদন করা হচ্ছে।
সম্প্রতি সেবনযোগ্য সলিড, আধা-সলিড ও তরল ওষুধ তৈরির জন্য তিন লাখ বর্গফুট আয়তনের নতুন একটি ফ্যাসিলিটি সম্পূর্ণরূপে চালু করেছে বেক্সিমকো। সর্বোচ্চ মান ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য পরিচিত শীর্ষস্থানীয় ইউরোপীয় যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে এখানে।
তিন তলাবিশিষ্ট নতুন এ ফ্যাসিলিটিতে ওএসডি অপারেশনের এগারোটি গ্রানুলেশন, তেরোটি ট্যাবলেট কম্প্রেশন এবং এগারোটি ব্লিস্টার লাইন রয়েছে। আলাদা আলাদা উৎপাদন, স্টোরেজ, স্থানান্তর, ফিলিং ও স্বয়ংক্রিয় প্যাকিং সুবিধাসহ পাঁচটি লিকুইড উৎপাদন লাইন রয়েছে এখানে। ক্রিম এবং মলম, এইচডিপিই শ্যাম্পু, স্যাশে প্যাক, পাতলা ফিল্ম, ইফারভেসেন্ট ট্যাবলেট এবং শুকনো সিরাপ তৈরির আলাদা উৎপাদন লাইনও রয়েছে কারখানায়।
প্রায় আড়াই লাখ বর্গফুটের একটি নিজস্ব টেকনোলজি বিভাগ বিশিষ্ট ৩ নম্বর ইউনিটটি শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য শক্তি সঞ্চয় প্রযুক্তিসহ উন্নত HVAC সিস্টেম নিয়োগ করেছে। ১৫.৭৫ মেগাভোল্টের সাবস্টেশনটি এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া এ ইউনিটে আল্ট্রাভায়োলেট জীবাণুমুক্তকরণ ক্ষমতাসম্পন্ন ৭৩.৫ মিটার কিউব আকারের বড় একটি পানি বিশুদ্ধকরণ প্লান্ট আছে। পাশাপাশি ইউরোপিয়ান প্রযুক্তিতে নির্মিত ঘণ্টায় ২৫ হাজার লিটার উৎপাদন সক্ষমতার বিশুদ্ধ পানি উৎপাদন এবং বিতরণ ব্যবস্থা রয়েছে।
বেক্সিমকোর সবগুলো প্লান্টই জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, চীন, ভারত প্রভৃতি বিশ্বসেরা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আমদানি করা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি দ্বারা সজ্জিত। মানসম্পন্ন উৎপাদন ব্যবস্থার স্বীকৃতিস্বরূপ বর্তমানে বেক্সিমকো ফার্মার স্থাপনাগুলো শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ দ্বারা স্বীকৃত এবং তাদের উৎপাদিত ওষুধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার উচ্চ নিয়ন্ত্রিত বাজারসহ প্রায় ৫০টিরও বেশি দেশে রফতানি করা হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (জিএমপি) মেনে চলা হয় বেক্সিমকোর সব প্লান্টে। অল্প সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের বিভিন্ন মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার স্বীকৃতি অর্জন করে যার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জিসিসিভুক্ত দেশ, ব্রাজিল, তাইওয়ান, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের AIM-এ তালিকাভুক্ত একমাত্র বাংলাদেশী কোম্পানি হিসেবে বেক্সিমকোর অনন্য স্বাতন্ত্র্য রয়েছে দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে।
১৯৯২ সালে ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা উপকরণ (এপিআই) উৎপাদন শুরু করে বেক্সিমকো। প্রথম বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২০০৩ সালে অ্যান্টিরিট্রোভাইরাল (এআরভি) ওষুধ উৎপাদন শুরু করে এবং ২০০৫ সালে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের (এলএসই) অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেটে (এআইএম) তালিকাভুক্ত হয়। বেক্সিমকোর সবচেয়ে উদ্ভাবনী পণ্য ছিল ক্লোরোফ্লোরো কার্বনমুক্ত এইচএফএ ইনহেলার। বর্তমানে ফার্মাসিস্ট, ডাক্তার, প্রকৌশলী, রসায়নবিদ, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, হিসাবরক্ষক, ব্যবসা শিক্ষা স্নাতক ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ প্রায় ৫ হাজারের বেশি মানুষ কাজ করছে এ প্রতিষ্ঠানে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মালয়েশিয়ার বায়োকেয়ার ম্যানুফ্যাকচারিং প্রাইভেট লিমিটেডের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ওষুধ তৈরির কারখানা স্থাপন করেছে বেক্সিমকো। বাংলাদেশের বাইরে এটিই বেক্সিমকোর প্রথম যৌথ উদ্যোগ।
২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার থেরাপিউটিক গুডস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (টিজিএ) জিএমপি অ্যাক্রেডিটেশন সার্টিফিকেট পায় বেক্সিমকো। একই বছরে জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর গালফ সেন্ট্রাল কমিটি ফর ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অ্যাক্রেডিটেশনও অর্জন করে। পরের বছর ব্রাজিলের জিএমপি অনুমোদন পায়। ২০১১ সালে অস্ট্রিয়ার জিএমপি অ্যাক্রেডিটেশন পায় প্রতিষ্ঠানটি। প্রথম বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২০১২ সালে সিঙ্গাপুরে সালবিউটামল এইচএফএ ইনহেলার রফতানি করে বেক্সিমকো। ২০১৩ সালে ইউরোপের বাজারে চক্ষুসংক্রান্ত পণ্য রফতানি শুরু করে এবং ২০১৪ সালে তাইওয়ানের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (টিএফডিএ) ও হেলথ কানাডার জিএমপি অনুমোদন লাভ করে। ওই বছর অস্ট্রেলিয়া ও রোমানিয়ায় ওষুধ রফতানি শুরু হয় তাদের। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) জিএমপি অনুমোদন পাওয়ার পর কুয়েতের বাজারে প্রবেশ করে তারা।
বেক্সিমকো সাতবার জাতীয় রফতানির গোল্ড ক্যাটাগরিতে ট্রফি জিতেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সপ্তমবারের মতো ট্রফিটি জিতেছিল তারা।"উদীয়মান বাজারে সেরা ফার্মা কোম্পানি" হিসাবে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ SCRIP পুরস্কার এবং COVID-19-এ রেসপন্সের জন্য CPhI ফার্মা পুরস্কার ২০২০ পাওয়া দেশের একমাত্র কোম্পানি বেক্সিমকো। কভিড-১৯ চিকিৎসার ব্রেক থ্রু ওষুধগুলোর জেনেরিক ভার্সন বিশ্বের প্রথম বেক্সিমকো ফার্মাই উৎপাদন করে। ২০২১ সালে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস জিতে নেয় বিশ্বের অন্যতম গৌরবময় পুরস্কার গ্লোবাল জেনেরিকস অ্যান্ড বায়োসিমিলারস অ্যাওয়ার্ড।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নতুন সাইট নির্মাণ, ছোট প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ ইত্যাদির মাধ্যমে বেক্সিমকো ফার্মা নিজেদের সম্প্রসারন করে যাচ্ছে। ২০১৮ সালে বেক্সিমকো ফার্মা দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় হরমোন ও স্টেরয়েড প্রস্তুতকারক নুভিস্তা ফার্মার (আগে অর্গানন বাংলাদেশ) বেশির ভাগ অংশীদারত্ব কিনে নিয়ে অধিগ্রহণ করে নেয়। ২০২১ সালে বেক্সিমকো সানোফি বাংলাদেশ লিমিটেডের একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশীদারত্ব (৫৪.৬%) অধিগ্রহণ করে, যা গ্লোবাল ফার্মাসিউটিক্যাল জায়ান্ট সানোফি গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। অধিগ্রহণের পর ২০২২ সালের এপ্রিলের ১ তারিখ থেকে সানোফি বাংলাদেশ লিমিটেডের নাম পরিবর্তন করে সাইনোভিয়া ফার্মা পিএলসি হিসেবে নিবন্ধিত করা হয়েছে।
বর্তমানে বেক্সিমকোর প্রায় ৫০০-এর অধিক ক্যাটাগরির ওষুধ রয়েছে। দেশের বাজারে বেক্সিমকোর সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্র্যান্ড নাপা, যা এক নামে পরিচিত। ২০২২ অর্থবছরে বেক্সিমকোর নেট প্রফিট ছিল প্রায় ৫০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। বেক্সিমকোর প্লান্টগুলোয় স্বাস্থ্যসেবা পণ্য উৎপাদনের সব পর্যায়ে বজায় রাখা হচ্ছে বৈশ্বিক মানদণ্ড। শতভাগ মান নিশ্চিত করে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার ফলে সংগত কারণেই আস্থা অর্জনের পাশাপাশি সব শ্রেণীর মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশ ও ব্রাজিলসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হয় বেক্সিমকোর ওষুধ।










