আমরা আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে এ তিনটি বিষয় বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছি। আজ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও জানে, প্রয়োজন হলে কাছের দোকানেই ওরস্যালাইন পাওয়া যাবে। এ ধারাবাহিকতাই এসএমসি ওরস্যালাইনকে মানুষের কাছে একটি নির্ভরতার নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ওরস্যালাইন এসএমসির অন্যতম প্রধান পণ্য। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে ওরস্যালাইন পৌঁছে দিতে এসএমসি কী ধরনের সাপ্লাই চেইন এবং ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে?

শুরুতে আমরা নিজস্ব বিক্রয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরাসরি বাজারে পণ্য সরবরাহ করতাম। পাশাপাশি কিছু পাইকারি ব্যবসায়ী ও স্টকিস্টও কাজ করতেন। কিন্তু বাজারের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ২০১৮ সালে ডিস্ট্রিবিউটরভিত্তিক একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক চালু করি। বর্তমানে আমাদের নিজস্ব বিক্রয় টিমের পাশাপাশি সারা দেশে শক্তিশালী ডিস্ট্রিবিউটর নেটওয়ার্ক রয়েছে। তাদের মাধ্যমে দোকান পর্যন্ত নিয়মিত পণ্য পৌঁছে যায়। এ কারণেই দেশের অধিকাংশ এলাকায় প্রয়োজনের সময় ওরস্যালাইন পাওয়া যায় এবং সরবরাহে বড় ধরনের কোনো সমস্যা তৈরি হয় না।

এসএমসি এন্টারপ্রাইজের ওরস্যালাইন কারখানা সম্পর্কে কিছু বলুন। এ কারখানার বিশেষত্ব কী?

আমাদের ওরস্যালাইন কারখানাটি এসএমসির প্রথম উৎপাদন কারখানা এবং এটি প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের নির্দেশনা অনুসরণ করে পরিচালিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যবিধি, গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (জিএমপি) এবং উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ধরনের মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়। তবে শুধু আন্তর্জাতিক মান মেনে উৎপাদন করলেই আমাদের কাজ শেষ হয়ে যায় না। আমরা শুরু থেকেই ‘কন্টিনিউয়াস ইমপ্রুভমেন্ট’ বা ধারাবাহিক উন্নয়নের নীতি অনুসরণ করছি। সময়ের সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি, অটোমেশন এবং আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা যুক্ত করা হচ্ছে, যাতে প্রতিটি ব্যাচের পণ্যের মান একই থাকে। একজন ভোক্তা আজ যে মানের ওরস্যালাইন কিনছেন, কয়েক মাস বা কয়েক বছর পরও তিনি যেন ঠিক একই মানের পণ্য পান—এটি নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

এসএমসি ওরস্যালাইনের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার জন্য আপনারা কী কী পদক্ষেপ নিয়ে থাকেন?

ওরস্যালাইন এমন একটি পণ্য, যার নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক ফর্মুলা রয়েছে। তাই এখানে মান নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই। আমরা কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে উৎপাদন, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ ও বাজারজাত পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করি। শুধু কারখানার ভেতর নয়, গুদামজাত এবং সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি পর্যায়েও নজরদারি থাকে। আমাদের লক্ষ্য হলো ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত পণ্যের গুণগত মান যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় হঠাৎ করে ওরস্যালাইনের চাহিদা বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন বৃদ্ধি, মজুদ ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে এসএমসি কী ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে থাকে?

প্রায় ৪০ বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের একটি বড় শক্তি। আমরা জানি, বছরের কোন সময়ে চাহিদা বাড়তে পারে এবং কোন পরিস্থিতিতে বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। তাই সম্ভাব্য চাহিদা বিবেচনায় রেখে আগেই কাঁচামালের মজুদ নিশ্চিত করি। একই সঙ্গে প্রস্তুত পণ্যের মজুদও বাড়িয়ে রাখা হয়। প্রয়োজন হলে উৎপাদনের সময় বাড়ানো হয় এবং দ্রুত বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়। এ পরিকল্পিত প্রস্তুতির কারণেই এখন পর্যন্ত বাজারে ওরস্যালাইনের বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি।

ওরস্যালাইনের বাইরে এসএমসি এন্টারপ্রাইজ এখন নতুন নতুন কনজিউমার প্রডাক্ট নিয়ে কাজ করছে। নতুন পণ্য নির্বাচন, বাজার গবেষণা এবং ভোক্তাদের চাহিদা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আপনারা কী ধরনের কৌশল অনুসরণ করেন?

নতুন কোনো পণ্য বাজারে আনার আগে আমরা প্রথমে দেখি, সেটি মানুষের কোনো বাস্তব চাহিদা পূরণ করছে কিনা। শুধু নতুন পণ্য আনার জন্য পণ্য আনি না। বাজারে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, ভোক্তার কী প্রয়োজন এবং সেই প্রয়োজন কীভাবে সাশ্রয়ী মূল্যে পূরণ করা যায়—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়। এরপর মান, মূল্য ও সহজলভ্যতার সমন্বয় করে পণ্য বাজারে আনা হয়। সম্ভবত এ কারণেই আমাদের ওরস্যালাইন, এসএমসি প্লাস, জয়া স্যানিটারি ন্যাপকিন, স্মাইল বেবি ডায়াপার, টেস্টমি, ফেমিকন, ফেমিপিল, সেনসেশন ও প্যান্থারের মতো ব্র্যান্ডগুলো নিজ নিজ ক্যাটাগরিতে শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডের মধ্যে রয়েছে।

ওরস্যালাইনের সাফল্যের বাইরে এখন এসএমসি এন্টারপ্রাইজের সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ কী বলে আপনি মনে করেন?

বর্তমানে উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের দাম, পরিবহন খরচ—সবই বাড়ছে। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য এখনো একই—মানসম্মত পণ্য সাশ্রয়ী দামে মানুষের হাতে পৌঁছে দেয়া। এ তিনটি বিষয়—গুণগত মান, সাশ্রয়ী মূল্য এবং সহজলভ্যতা—একসঙ্গে বজায় রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তার পরও আমরা বিশ্বাস করি, গত ৫০ বছরে যেভাবে মানুষের আস্থা অর্জন করেছি, ভবিষ্যতেও সেই আস্থা ধরে রাখতে সক্ষম হব।

এসএমসি এন্টারপ্রাইজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

২০২৫ সালে আমরা ৫০ বছর পূর্ণ করেছি। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। তবে অতীতের সাফল্য ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেয় না। তাই আমাদের সব পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে ভোক্তা। মানুষের জীবনযাত্রা, চাহিদা ও বাজারের পরিবর্তন বিবেচনায় রেখে আমরা নতুন পণ্য ও নতুন উদ্ভাবনের ওপর কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো এমন পণ্য বাজারে আনা, যা মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বাস্তব ভূমিকা রাখবে।

বিশ্ব ওআরএস দিবস উপলক্ষে আপনার বার্তা কী?

প্রতি বছর ২৯ জুলাই বিশ্ব ওআরএস দিবস হিসেবে পালিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ডায়রিয়া, কলেরা এবং অন্যান্য পানিবাহিত রোগে পানিস্বল্পতা প্রতিরোধে ওরস্যালাইনের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। এসএমসির জন্য এ দিবস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গত চার দশক ধরে আমরা শুধু ওরস্যালাইন উৎপাদনই করিনি, বরং দেশের মানুষের কাছে এর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতেও কাজ করেছি। আজও ডায়রিয়াজনিত পানিস্বল্পতা একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। এ সমস্যা মোকাবেলায় ওরস্যালাইন এখনো সবচেয়ে কার্যকর, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী সমাধান। তাই আমরা মনে করি, সচেতনতা বাড়ানোর এ কার্যক্রম অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: ফারিন জাহান সিগমা