মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত হলে শিক্ষা, উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি সবকিছুরই ভিত্তি আরো শক্তিশালী হবে। তাই জনস্বাস্থ্য কেবল স্বাস্থ্য খাতের বিষয় নয়, এটি জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশ আজ জনস্বাস্থ্যে বিশ্বের কাছে একটি অনুকরণীয় উদাহরণ। শিশু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচি ও পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির অভাবনীয় সাফল্য এবং গড় আয়ু বৃদ্ধির মতো অর্জনগুলো দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত ও সমন্বিত প্রচেষ্টার ফল। সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, স্বাস্থ্যকর্মী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতের সম্মিলিত উদ্যোগে এ সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানি (এসএমসি) এ দীর্ঘ যাত্রায় বাংলাদেশ সরকারের এক গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে মানুষের পাশে রয়েছে।
একসময় ডায়রিয়াজনিত পানিস্বল্পতা বাংলাদেশের হাজারো পরিবারের জন্য ছিল এক আতঙ্কের নাম। আশির দশকে বাংলাদেশে ডায়রিয়া ছিল শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ। কিন্তু একটি সহজ, সাশ্রয়ী ও বৈজ্ঞানিক সমাধান ‘ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ওআরএস)’ সেই বাস্তবতাকে বদলে দিয়েছে। কিন্তু তা সম্ভব হয়েছে এসএমসির প্যাকেটজাত ওরস্যালাইন দেশজুড়ে সহজলভ্য হওয়ার ফলে। লাখ লাখ পরিবারের হাতের নাগালে এসএমসির ওরস্যালাইন পৌঁছে যাওয়ায় ডায়রিয়াজনিত শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। ফলে ওরস্যালাইন শুধু একটি চিকিৎসা পদ্ধতি নয়, পরিণত হয় জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসে একটি বৈপ্লবিক অর্জন হিসেবে।
ওরস্যালাইনের সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যপণ্যকে সহজলভ্য করা ছিল এসএমসির প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসএমসি উপলব্ধি করে যে একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে শুধু রোগের চিকিৎসা নয়; প্রয়োজন রোগ প্রতিরোধ, সঠিক পুষ্টি, সচেতনতা এবং মানুষের স্বাস্থ্যকর জীবনধারা গড়ে তোলা। সেই উপলব্ধিই এসএমসিকে একটি সামাজিক বিপণন প্রতিষ্ঠান থেকে একটি সমন্বিত জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে।

আজ এসএমসির কার্যক্রম জনস্বাস্থ্যের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে স্পর্শ করেছে। পরিবার পরিকল্পনা, মা ও শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি, কৈশোরকালীন স্বাস্থ্য, নিরাপদ মাতৃত্ব, সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং আচরণগত পরিবর্তনসহ নানাবিধ সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে এসএমসি।
পরিবার পরিকল্পনা বাংলাদেশের অন্যতম সফল জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি। এ সাফল্যের পেছনে এসএমসির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত আধুনিক পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির অর্ধেকই এসএমসির বিভিন্ন ব্র্যান্ডের। শুধু পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ নয় এসএমসি; এটি পরিণত হয়েছে অসংখ্য মায়ের নিরাপদ মাতৃত্ব, শিশুর সুস্থ জন্ম এবং পরিকল্পিত পরিবারের গল্পে।
তবে আজ বাংলাদেশের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নতুন এক বাস্তবতা—অপুষ্টি। খোলা চোখে বোঝা না গেলেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। একজন কিশোরীর আয়রনের ঘাটতি, একজন গর্ভবতী মায়ের প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব, একজন বয়স্ক নারীর ক্যালসিয়ামের ঘাটতি কিংবা একটি শিশুর মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই এসএমসি পুষ্টিকে জনস্বাস্থ্যের অন্যতম নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করছে।
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে শিশুদের জন্য পাঁচটি ভিটামিন এবং মিনারেলসমৃদ্ধ মনিবিস্কুট, কিশোর-কিশোরীসহ সবার জন্য মনিবিস্কুট প্লাস, গর্ভবতী মায়েদের জন্য মাল্টিপল মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সাপ্লিমেন্টস ‘ফুলকেয়ার’ এবং ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট ‘ফরবোন’, জিংক এবং অন্যান্য পুষ্টিপণ্য নিয়ে দেশব্যাপী এসএমসি কাজ করছে। এসএমসি বিশ্বাস করে, একটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা শুরু হয় একজন সুস্থ মা ও একটি সুস্থ পরিবারের মধ্য দিয়ে।

এসএমসির অভিজ্ঞতা বলে, স্বাস্থ্যকে আলাদা বা ভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি, মা ও শিশুস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতা—এ সবকিছু একই ধারার অংশ। একটি ক্ষেত্রের অগ্রগতি অন্য ক্ষেত্রকে আরো শক্তিশালী করে। তাই জনস্বাস্থ্যের প্রতিটি উদ্যোগকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করাই সবচেয়ে কার্যকর পন্থা।
আগামী দিনের বাংলাদেশের সামনে আরো বড় চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ, নতুন সংক্রামক রোগ, অসংক্রামক রোগের বিস্তার এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা হবে আরো প্রতিরোধমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর ও মানুষকেন্দ্রিক। এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসএমসি উদ্ভাবনী স্বাস্থ্যপণ্য, শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা, ডিজিটাল স্বাস্থ্য যোগাযোগ এবং কমিউনিটিভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করছে। মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিনিয়োগ মানে দেশের ভবিষ্যৎ আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বিনিয়োগ। কারণ সুস্থ জাতির হাতেই থাকে টেকসই উন্নয়নের চাবিকাঠি।
পাঁচ দশক আগে ওরস্যালাইনের মাধ্যমে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল আজ তা মানুষের সুস্বাস্থ্য ও জীবনমান উন্নয়নের এক বিস্তৃত অভিযাত্রায় রূপ নিয়েছে। সেই অভিযাত্রায় এসএমসি অতীতের মতো ভবিষ্যতেও সরকারের উন্নয়ন প্রচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে মানুষের পাশে থাকবে। কারণ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ আর সেই মানুষের সুস্বাস্থ্যই একটি সমৃদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।





